Font Size

Profile

Menu Style

Cpanel

23June2017

ISO 9001:2008 Certified


Qurbani Rochona Sonkolon

কুরবানী সংক্রান্ত রচনা সংকলন

সম্পাদনা: আবু সাঈদ

 

প্রথম প্রকাশ: ফব্রেুয়ারী ২০১০

 

 

প্রকাশক:

দাওয়াহ এন্ড এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট

 

ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামী)

 

=========== 1 ==========  

আমাদের কুরবানী

খন্দকার মোহাম্মদ জারীর

বছর ঘুরে আবার ঈদের সময় এসেছে। আমাদের পরিবারের সবাই কুরবানী দেবার আলোচনা শুরু করেছে। আমার জানতে ইচ্ছা হল কুরবানী কী ? দাদু জানালেন, কুরবানী মানে সান্নিধ্য বা উৎসর্গ। আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন কিছু ত্যাগ করা। যদিও কুরবানী শব্দটি কুরআনে আসেনি। এটি ফারসী শব্দ। কুরআনে আছে ফিদয়া যার অর্থ ত্যাগ করা। যাই হোক, ইসলামী পরিভাষায় বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে আরবী জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আযহার দিন যে পশুকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবাই করা হয় তাই কুরবানী। আরও জানতে পারলাম, কুরবানীর এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কুরআনে সে ঘটনাটি এভাবে এসেছে, সেই ছেলে (ইসমাঈল) যখন তার (ইব্রাহীম) সাথে দৌড়ঝাপ করার বয়স পর্যন্ত পৌছাল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললেন, আব্বা ! আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি এখন তুমি বল, তুমি কী মনে কর ? ছেলে বলল, আব্বা ! আপনাকে যে হুকুম দেয়া হয়েছে তা করে ফেলুন। ইনশাল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। সব শেষে যখন দুজনেই অনুগত হয়ে মাথা নত করে দিলেন এবং ইব্রাহীম তার ছেলেকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন, তখন আমি (আল্লাহ) আওয়াজ দিলাম, “হে ইব্রাহীম আপনি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমি নেক লোকদেরকে এভাবেই পুরষ্কার দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটি একটি স্পষ্ট পরীক্ষা ছিল। এক বড় কুরবানী ফিদীইয়া হিসেবে দিয়ে আমি ঐ ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নিলাম এবং তার প্রশংসা ও গুণচর্চা চিরকালের জন্য পরবর্তী বংশীয়দের জন্য রেখেদিলাম (সূরা সফফাত ১০২-১০৮) এভাবেই কুরবানী মানব সমাজে সকল সম্প্রদায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, “আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। যাতে আমি তাদেরকে জীবনের উপকরণ হিসাবে যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর উপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (সূরা হাজ্জ-৩৪)

দাদুর কাছে  তাকওয়া  সম্পর্কে আরও জানতে পারলাম, এই কুরবানীর মাধ্যমে তাকওয়া (আল্লাহর ভীতি) অর্জনই মানুষের মূল লক্ষ্য। তাই আল্লাহ বলেছেন,“ আল্লাহর কাছে কুরবানীর রক্ত ও গোশত পৌছে না, পৌছে কেবল তোমাদের তাকওয়া (সূরা হাজ্জ-১০২)

আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলাম, কুরবানী কাদের দিতে হয় ? জানতে পারলাম, ১০ জিলহাজ্জ থেকে ১২ই জিলহাজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত যার কাছে যাকাত দেবার মত অর্থ (নেসাব পরিমাণ অর্থ) থাকে তাকেই কুরবানী দিতে হয়।

ঈদের আগের দিন সকালে আমরা সবাই কুরবানীর গরু কেনার জন্য বের হলাম। আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি রকম গরু কিনবে ? আব্বু বললেন, রাসূল (স.) বলেছেন,“চার প্রকারে ক্রটিযুক্ত পশু কুরবানী করা যায়েয নয়। অন্ধত্ব - যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন-যার রোগ সুস্পষ্ট, যার হাড়ের মজ্জা নেই বৃদ্ধ ও দূর্বল, খোড়া-যার খোড়ামী সুস্পষ্ট। (সুনান আবু দাউদ ২৮০২; উবাইদ ইবনে ফাররুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত) তাই আব্বু এ রকম ভাল একটি গরু দেখে কিনলেন। আমার খুব ভাল লাগল। পরে আমরা সবাই গরুটিকে সাথে করে নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম। এদিন সারাদিন গরুটিকে খেতে দিলাম, ওর সাথে মজা করলাম। এবার বেশ কিছুক্ষণ খেলার পর মনে হল একে আগামীকাল জবাই করব। একটু খারাপ ও লাগতে লাগল।

রাতে ঘুমানের আগে গরুটার জন্য মন খারাপ লাগা বেড়ে গেল। তখন দাদু শোনালেন শিশু ইসমাঈলের সেই গল্প। সেই গল্প আবার শুনে মনে সাহস আসল। আমার বুঝে আসল আমাকে যিনি জীবন দিয়েছেন তার নির্দেশ মেনে নেয়াতেও মুক্তি। তাহলেই আল্লাহ খুশী হবেন।

যাইহোক পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ঈদের নামাজের জন্য রেডী হলাম। তখন আব্বু নামাজে যাওয়ার আগে কিছু খেতে মানা করলেন। আব্বুর কাছে জানলাম রাসূল (স.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খাওয়া পর্যন্ত নামাযে বের হতেন না এবং ঈদুল আযহার দিনে নামায না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না। (তিরমিযী ৫০৮)

এরপর আমরা (আল্লাহু আকবার,আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবর, ল্লাহু আকবর, ওয়ালিল্লাহি হামদ আল্লাহ মহান। আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নাই, আল্লাহ  মহান, আল্লাহ মহান, প্রশংসা কেবল তার।

এ তাকবীর দিতে দিতে আমরা ঈদগাহে গেলাম। ইমাম সাহেব খুতবায় কুরবানী নিয়ে আলোচনা করলেন। নামাজ শেষে সবার সাথে কুলাকোলি করলাম।এরপর আমরা বাড়িতে গিয়ে গরুটাকে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত করলাম। আব্বু আগে থেকেই ধারালো ছুরি প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এত ধারাল ছুরি কেন? এর জবাবে আব্বু বললেন, ধারালো ছুরি দিয়ে জবেহ করলে পশু তাড়াতাড়ি মারা যায়, কষ্ট কম হয়। এরপর গরুটিকে আল্লাহু  আকবার বলে জবেহ দিলেন। আমার এ দৃশ্য দেখে কিছুটা কষ্ট লাগলো হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর ত্যাগের কথা স্মরণ হলে আল্লাহর কাছে কুরবানী কবুল হওয়ার জন্য দোআ করলাম। এরপর কসাই কুরবানী চামড়া কাটল। তারপর আমরা গোশত কাটা শুরু করলাম। আব্বু চামড়াটি গরীবদের জন্য দান করে দিলেন আব্বুর কাছ থেকে জানতে পারলাম, আলী (রাঃ) বলেছেন রাসূল (স.) আমাকে তার কুরবানীর পশুর রক্ষনাবেক্ষন করা; চামড়া বিতরণ করা ও তার আচ্ছাদন সদকা করার জন্য আদেশ করেছেন ও কসাইকে তা থেকে কিছু না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ হাদীস নং (১৭৬৯)

গোশত কাটা শেষ হওয়ার পর আব্বু কুরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করলেন। এরপর এক ভাগ গরীবদের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়দের জন্য আর এক ভাগ আমাদের জন্য রাখলেন। আব্বুর কাছ থেকে জানতে পারলাম, সাহাবীরা এভাবেই তাদের কুরবানীকে ভাগ করতেন। বিতরণের পর আম্মু গোশত রান্না করলেন। আমরা সবাই মিলে সেই গোশত খেলাম মজা করে। কুরবানীর ঈদ আমাকে ত্যাগের নমুনা শিখালো। মানুষের জীবন যিনি দান করেছে তাকে খুশী করাই যে জীবনের লক্ষ্য তা আমি এই ঈদ থেকে জানতে পারলাম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার রাস্তায় ত্যাগ করার মানসিকতা সৃষ্টি করুন এটাই আমার প্রার্থনা। আল্লাহ আমাদের উপর সহায় হোন। আমীন ।। 

 

 =========== 2 ============

কুরবাণীর শিক্ষা

মুহিবুল ইসলাম

প্রাকবচনঃ

মহান আল্লাহর বাণী

فصل لربك وانحر

সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানী দাও। (সূরা কাওছার-২)

মহানবী (স.) এর বাণীمن وجه سعة ولم يضح فلايقربن مصلانا

সামর্থ্য থাকতে ও যারা কুরবানী করে না, তারা যেন আমাদের ঈদ-গাহের কাছেও না আসে। (ইবনে মাজাহ)

প্রতিবছর বিশ্বমুসলিমের কাছে শাশ্বত পবিত্র কুরবানীর ঈদ আসে মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি বান্দার আনুগত্য স্বীকারে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনে। আত্মসমর্পনের শাশ্বত বাণী ও কল্যাণ নিয়ে। আমিত্ব বিসর্জনের দৃঢ় শপথ বাস্তবায়নের অনুপ্রেরণা নিয়ে পালিত হয় কুরবানী। কবি নজরুল ইসলাম এর কবিতায়                       এলো স্বরণ করিয়ে দিতে

ঈদজ্জোহার এই সে চাঁদ

তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে

ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ।

কুরবানী কি?

আরবী কুরব   قرب  ধাতু থেকে কুরবানী শব্দের উৎপত্তি। যার শাব্দিক অর্থ-

১)       التقرب

২)       الصحبة

৩)      নৈকট্য লাভ করা

৪)      সান্নিধ্য লাভ করা

৫)      To get nearness

৬)       To get vicinity.

 

পরিভাষায় :

          আল্লাহর সান্নিধ্যে ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আল্ল-াহরই নামে নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট নিয়মে পশু জবেহ করাকে কুরবানী বলে। (ফাতওয়ায়ে শার্মী)

মহাগ্রন্থ আলকুরআনে শব্দাটির ব্যবহার

الذين قالوا ان الله عهد الينا الا نؤمن لرسول حتى يأتينا بقربان تأكله النار

যে সমস্ত লোক যারা বলে যে, আল্লাহ আমাদেরকে এমন কোন রাসূলের প্রতি বিশ্বাস না করতে বলে রেখেছেন যতক্ষণ না তারা আমাদের নিকট এমন কুরবানী নিয়ে আসবেন যাকে আগুন গ্রাস করে নেবে। (আলে ইমরান-১৮৩)

واتل عليهم نبا ابنى ادم بالحق اذ قرباقربانا فتقبل من احد هما ولم يتقبل من الاخر

আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শোনান, যখন তাারা উভয়েই কুরবানী নিবেদন করেছিল, তাদের একজনেরটি গৃহীত হল অন্যজনেরটি গৃহীত হয়নি। (মায়িদা আয়াত-২৭)

فلولا نصر هم الذين اتخذوا من دون الله قربانا الهة

অতঃপর আল্লাহর  পরিবর্তে তারা যাদেরকে সান্নিধ্যে লাভের জন্য উপাস্যরূপে গ্রহন করেছিল, তারা তাদেরকে সাহায্য করলো না কেন ?” (আহকফ-২৮)

কুরবানীর বিধান যুগে যুগেঃ

বস্তুত ঃ উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য নির্দেশিত কুরবানী প্রথা কোন বিশিষ্ট বা অভিনব হুকুম নয়। আল্লাহর অনন্ত সানিধ্যর তরে আত্মোৎসর্গ করাই হল কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য। তাই অন্যান্য মূল ইবাদতের মত কুরবানী প্রথা ও হযরত আদম (স.) থেকে এ পর্যন্ত সকল শরীআতেই প্রবর্তিত ছিল।

মহান আল্লাহ বলেন,

          ولكل امة جعلنا منسكا ليذكروا اسم الله على ما رزقهم من بهيمة الانعام فالهكم اله واحد فله اسلموا وبشر المخبتين 

          আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কুরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা অ আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, অতঃপর তোমাদের আল্লাহর তো একমাত্র আল্লাহ। সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও। (হজ্জ-৩৪)

          বিশিষ্ট তাফসীর বিশারদ আল্লামা আব্দুল হক হক্কানী লিখেন, “হযরত মূসা, ইয়াকুব, ইসহাক ও ইব্রাহীম (আঃ) এর শরীআতসমূহেও কুরবানীর প্রথা প্রবর্তিত ছিল। বিকৃত বর্তমান বাইবেলেও অনেক জায়গায় কুরবানীর প্রথা উলেল্লখ আছে। (তাফসীরে হক্কানী)

          মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানীর প্রচলন হয় হযরত আদম (আঃ) এর পুতদ্বয় হাবিল ও কাবিলের হাতে।

মহান আল্লাহ সূরা মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে বলেন,

وتل عليهم نبا ابنى ادم بالحق اذ قربا قربانا فتقبل من احدهما ولم يتقبل من الاخر

                   আপনি তাদেরকে আদমেরই দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শোনান, যখন তারা উভয়েই কুরবানী নিবেদন করেছিল, তাদের একজনেরটি গৃহীত হল অন্যজনেরটি গৃহীত হয়নি। (মায়িদা-২৭)

ল্লামা ফরীদ ওয়াজদী লিখেছেন।

          হযরত নূহ (আঃ) জন্তু জবেহ করার উদ্দেশ্য একটি কুরবানগাহ নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে জবেহকৃত  জন্তুগুলিকে আগুন দ্বারা পুড়িয়ে দিতেন। (দ-ইরাতুল-মাআরিফ) এছাড়াও পৃথিবীর ইতিহাসে নজীরবিহীন কুরবানীর দৃষ্টান্ত পেশ করে দিলেন ইসলামী আর্দশের উজ্জল প্রতীক  হযরত ইব্রাহীম (আঃ)।

ইব্রাহীম (আঃ) এর কুরবানীর মূলতত্ত্ব ও তাৎপর্যঃ

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কুরবানী বলতে সাধারনত পুত্র কুরবানীর ঘটনাকেই ধরা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ইব্রাহীমী কুরবানী শুধু এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রিয়পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করা ছিল ইব্রাহীমী জীবনের অসংখ্য কুরবানীর চরমতম ও শ্রেষ্ঠতম একটি ঘটনা। বস্তুত হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর শুরু হতে শেষ পর্যন্ত গোটা জীবনটাই ছিল কুরবানী তথা অতুলনীয় আত্মোৎসর্গ তথা আত্মত্যাগের মাহিমায় উজ্জ্বল। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে প্রতি মুহুর্তে রাব্বুল আলামীনের অনন্ত সানিধ্যর জন্য প্রেম, ভালবাসা, সমর্পণ ও নিবেদনের দিকে নিজেকেও নিজের সবকিছুকে নিঃশেষে উজাড় করে তিনি এভাবে বিলীন হয়েছিলেন যে, স্বীয় স্বতন্ত্র্য অস্তিত্ব বলতে কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-

اذقال له ربه اسلم قال اسلمت لرب العلمين

          তার প্রতিপালক যখন তাঁকে (ইব্রাহীমকে) বলেছিলেন, আত্মসমর্পন কর তিনি বলেছিলেন বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পন করলাম। (বাকারা-১৩১)

সাধারণত সকল নবী রাসূলই আল্লাহর তাওহীদ বা একত্বের প্রতি আহবান এবং কুফর ও শিরকের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্য প্রেরিত হয়েছিলেন। যে কারণে সকল আম্বিয়া কেরামের দাওয়াত কার্যে এই দুটি বিষয় অনিবার্য পর্যায়ে দেখতে পাওয়া যায়। বরং প্রকৃত প্রস্তাবে রূহানী দাওয়াতের মূলভিত্তিই এই দুটি বিষয়ের উপর কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর জীবনে এই সব কিছুর পরেও যে একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, তা অন্যকোন নবীর জীবনে পরিদৃষ্ট হয় না। অর্থাৎ তিনিই সর্বপ্রথম ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহর এই রাহে চরম দুঃখ এবং কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। মহান আল্লাহ এই ঘটনাকে চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন-

رب هب لي من الصالحين فبشرنه بغلام حليم . فلما بلغ معه السعي قال يني إني ارني في المنام اني اذبحك فانظر ماذا ترى . قال ياابت افعل ماتؤمر ستجدني ان شاء الله من الصابرين . فلما اسلما وتله للجبين . وناديناه ان ياابراهيم . قد صدقت الرؤيا . انا كذلك نجزي المحسنين . ان هذالهوالبلؤ المبين. وفدينه بذبح عظيم وتركنا عليه في الاخرين . سلم على ابراهيم . كذلك نجزي المحسنين.

সে বলল, হে আমার পরওয়ারদেগার, আমাকে পুত্র সন্তান দান করো। সুতরাং আমি তাঁর ডাকে সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলেন। অতঃপর সে যখন চলাফেরার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বলল, বৎস আমি স্বপ্ন দেখি যে, তোমাকে জবেহ করিছ। এখন তোমার অভিমত কি? সে বলল, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আমাকে সবরকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রাহীম তাকে জবেহ করার জন্য শায়িত করলো, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্য পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবে সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে জবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু (ফিদিয়া) প্রদান করলাম। আর ভবিষ্যতের জন্য ইব্রাহীমের এ সুন্নাত স্বরণীয় করে রাখলাম।(আছ ছফ্ফাত ঃ ১০০-১১১)

ইসলামের কুরবানীর প্রবর্তন ও এর স্বরূপ

বস্তুত ঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কুরবানী মুখর জীবনের এই বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠতম ঘটনা স্বরণ করিয়ে দেয় তাঁর গোটা জীবনের অসংখ্যা অতুলনীয় আত্মোৎসর্গের স্মৃতিসমূহ মূলত ঃ ইব্রাহীম (আঃ) এর সমগ্র জীবনে ব্যপ্ত আত্মোৎসর্গের এই মহান আদর্শই ইসলামের ভিত্তি। ইসলাম অর্থই হল-(১) আনুগত্য    (২) আত্মসমর্পন

          আর ইসলাম অনুসরণকারীদের বলা হয় মুসলিম। এই মুসলিম নামটি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-ই সর্বপ্রথম নির্বাচন করেন। আল্লাহর কাছে এই নির্বাচন এতই সমাদৃত হয়েছিল যে, পরবর্তীকালের আম্বিয়া কেরামের মূল দাওয়াত তালিম এ নামেই আখ্যায়িত হয়। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (স.) এর শেষ পয়গাম ও তাঁর অনুনসারীদেরকে যথাক্রমে ইসলাম ও মুসলিম নামে অভিহিত করা হয়। আল্লাহ বলেন, ورضيت لكم الاسلام دينا

          এবং আমি তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (মায়িদা-৩ (

          অন্যত্র বলেছেন,

          ان الدين عند الله الاسلام

          নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবন ব্যবস্থা ইসলাম। (আলে ইমরান-১৯)

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃকব মুসলিম নাকরণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-

          ملة ابيكم ابراهيم هو سماكم المسلمين

তোমরা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের ধর্মে কায়েম থাক। তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন। (হজ্জ-৭৮)

শুধু এতটুকুই নয় বরং এর সাথে সাথে ইব্রাহীম (আঃ) এর আত্মোৎসর্গের অতুলনীয় কুরবানীর মাহিমায় উজ্জ্বল গোটা জীবনকেও আদর্শ ও সুন্দরতম দ্বীন হিসেবে পেশ করে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে তা অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে এসেছে-আয়াত

          قدكان لكم اسوة حسنة في ابراهيم

তোমাদের জন্য ইব্রাহীমের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (মুমতাহিনা-৪)এ সম্পর্কে আরো কয়েকটি আয়াত রয়েছে। সেগুলো হল-

          সূরা নিসা-১২৫

          সূরা আলে ইমরান-৯৫

          সূরা আনআম-১৬৫

          সূরা ইউসফ-৩৮

          সূরা নাহল-১২৩

          সূরা হজ্ব-৭৮

          সূরা বাকারা-১৩০-১৩৫

মূলতঃ ইব্রাহীম (আঃ) এর আদর্শের সাথে উম্মতে মুহাম্মাদীর এই তাৎপর্যপূর্ণ গভীর সম্পর্ক ও নিবিড় একত্বের কারণেই শুধু বিশেষ ঘটনার বা আংশিকভাবে নয় বরং সামগ্রিকভাবে জীবনের পূর্ণরূপে তাকে অনুসরণ করে ইব্রাহীম (আঃ) এর আনুগত্য, আত্মসমর্পণ, আত্মত্যাগ, প্রেম, ভালবাসা ও নিবেদনের গুণে গুণান্বিত হতে উদ্বুদ্ধ করার মহান উদ্দেশ্য ইসলামে কুরবানীর প্রবর্তন।

ইসলামের কুরবানীর উদ্দেশ্য ও সার্থকতাঃ

কবির কাব্যিক ছন্দে-

ওরে হত্যা নয় আজ

সত্যা-গ্রহ শক্তির উদ্বোধন

দুর্বল ভীরু চুপরহো,

ওহো খামোখা ক্ষুদ্ধ মন।

                   (কুরবানী ঃ কাজী নজরুল ইসলাম)

বস্তুতঃ কুরবানী একটি নিছক অনুষ্ঠানের নাম নয়, তা একটি পবিত্র ইবাদত। জাহেলিয়াত যুগের প্রথানুযায়ী প্রতিমাত্মাকে সন্তুষ্ট করা, মূছিবত দূরকরা, জানের সদকা দেয়া অথবা শুধু শুধু রক্ত প্রবাহিত করা আর গর্দান কাটা ইসলামী শরীআতে প্রবর্তিত কুরবানীর লক্ষ্য ও উদ্দশ্যের সম্মূর্ণ বিপরীত ও পরিপন্থি কাজ। তাই রাসূল (স.) জাহিলিয়াত যুগে গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু জবাইয়ের সকল প্রথা-পদ্ধতিকে সমূলে উৎপাটন করে একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সানিধ্য লাভের পবিত্র লক্ষ্যে কুরবানীর প্রবর্তন করেছেন। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-আয়াত

فصل لربك وانحر

          তুমি তোমার প্রভূর উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানী করো। (কাওছার-২)

নামাযের সঙ্গে কুরবানীর কথা এভাবে উল্লেখ করে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নামায যেমন আল্লাহ ব্যতিত আর কারো উদ্দেশ্য পড়া যেতে পারে না, অনুরূপ কুরবানী ও এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা যেতে পারে না। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে-আয়াত

ولكل امة جعلنا منسكا ليذكروا اسم الله على ما رزقهم من بهيمة الانعام فالهكم اله واحد فله اسلموا وبشر المخبتين

আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কুরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, এতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও। (হজ্জ-৩৪)

          একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে করার এই মূল বিষয়টির কারণে ইসলামী শরীয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে পশু জবাই করলে তা কুফর ও শিরকের অন্তর্ভূক্ত হয় এবং পশুর গোশত খাওয়া হারাম হয়ে যায়। এতদ্ব্যতিত কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর বিশ্বজাহাজন ও সমুদয় সৃষ্টির স্রষ্টা হওয়ার আকিদাগত বিশ্বাসের সাথে কার্যত এর স্বীকৃতি দান ও শুকরিয়া আদায় করা হয় যে, এই সকল পশুর অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই। তিনিই এইগুলোকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন এবং নানাভাবে তাদের দ্বারা আমাদেরকে উপকার লাভের সুযোগ দিয়েছেন। তত্ত্ব জ্ঞানীদের মতে,পশু কুরবানী মূলত নিজের নফস

তথা কুপ্রবৃত্তিকে কুরবানী করার প্রতীক (আহকামুল কুরআন,খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৯৬)

তাই পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্যাবলীর পাশাপাশি কুরবানী আমাদেরকে সকল প্রকার লোভ-লালসা, পার্থিব স্বার্থপরতা, ইন্দ্রয়জ কামনা বাসনার জৈবিক আবিলতা হতে মুক্ত ও পবিত্র হতে উৎসাহ দেয়, মহান স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত বান্দা হওয়ার প্রেরণা যোগায় এবং সত্য হকের পক্ষে আত্মোৎসর্গীকরণে অনুপ্রাণিত করে। কুরবানীর সার্থকতা এখানেই, তাই পশুর সঙ্গে সঙ্গে মানব মনে-

১.       কুফর

২.       শিরক

৩.       লোভ-লালসা

৪.       হিংসা-বিদ্বেষ

৫.       ক্রোধ

৬.       রিয়া

৭.       পরনিন্দা

৮.       অহংকার

৯.       আত্মগর্ব

১০.     কৃপণতা

১১.     ধন-লিপ্সা

১২.     সম্মান-কামনা

১৩.     দুনিয়ার মায়া-মহব্বত

এবং আরো অসংখ্য পাপ-পংকিলতা ও কলুষতার যে ঘৃণ্য পশু সযত্নে লালিত হচ্ছে তার কেন্দ্রমূলে ছুরি চালাতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতি মহুর্তে প্রভূর আনুগত্য, আজ্ঞাপালন ও তাকওয়ার দ্বিধাহীন শপথ গ্রহন করতে হবে। নিচের আয়াতটি যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ-

قل ان صلاتي ونسكي ومحياي ومماتي لله رب العالمين

নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার সকল ইবাদাত আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্য নিবেদিত। (আনআম-১৬২)

কুরবানীর শিক্ষা ঃ

ত্যাগের মানসিকতা তৈরি ঃ

সাধারণত ঃ ত্যাগ শব্দটির অর্থ হচ্ছে- বর্জন পরিহার বিসর্জন ভোগ লালসা বিমুখতা 

তবে শব্দটি ব্যাপক। এর ব্যাপ্তি বিস্তার। সীমিত বাক্যে এভাবে বলা যায়, কন্টাকীর্ন পথ মাড়িয়ে কুসুমাস্তীর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য অথবা বাতিলকে সারিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার যাবতীয় সকল প্রকার প্রচেষ্টাই হলো ত্যাগ। এর গন্ডি অনেক বড়। যেমন- আত্মত্যাগ স্বার্থ ত্যাগ সম্পদ ত্যাগ আত্মোৎসর্গ সময় ত্যাগ শারীরিক ত্যাগ মানসিক ত্যাগ, ইত্যাদি।

          পৃথিবীতে যে কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই প্রয়োজন হয় ত্যাগ বা কুরবানীর যে কাজ যত বড়, তার সাফল্যের জন্য প্রয়োজন তত বড় আত্ম ত্যাগের। ইসলামের মত মহত্তম জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠা আত্মত্যাগ ছাড়া সম্ভব নয়। কুরবানী আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে থাকে। প্রতি বছর কুরবানী আমাদের নতুন করে শিক্ষা দেয় আল্লাহর নির্দেশের কাছে কিভাবে মাথানত করতে হয়, ইসলামের মত মহত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হলে বড় ধরনের আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।

কবির আহবান-

ডুবে ইসলাম আসে আঁধার

ইব্রাহীমের মতো আবার

কুরবানী দাও প্রিয় বিভব।

জবীহুল্লাহহ ছেলেরা হোক

যাক সবকিছু-সত্য রোক

মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।(মেহেদী ঈদ-কাজী নজরুল ইসলাম)

আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করার শিক্ষাঃ

          কুরবানীর দ্বারা পার্থিব জীবন ও ইহকালীন ধনসম্পদের ভালবাসা ইত্যাদি হতে পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়, কেননা কুরবানীর পশু জবেহ করার দ্বারা বাহ্যত কুরবানী দাতার মালের ক্ষতি হয়, আর এ ক্ষতি আল্লাহর জন্যই এবং শুধু তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই হয়ে থাকে। তাই যাকাতের মত এর দ্বারা সম্পদের ভালবাসার মাঝে কিছুটা স্বপ্ন¬তার সৃষ্টি হয়ে থাকে। সাথে সাথে কুরবানী দাতার মনে এ শুভ চেতনা-জাগ্রত হয় যে, একটি জানোয়ার কুরবানী যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের কারণ হতে পারে তাহলে স্বয়ং নিজের জান ও মাল আল্লাহর রাহে কুরবানী করে দেয়া তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের কত বড় মাধ্যম হতে পারে। 

আল্লাহ বলেন,

تجاهدون في سبيل الله باموالكم وانفسكم ذالكم خير لكم ان كنتم تعلمون

                   তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের জান ও মাল দিয়ে লড়াই করবে, এর মধ্যেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। যদি তা তোমরা বুঝতে পার।(ছফ-১১)

          এ অনুভূতিই একজন মানুষকে তার আত্ম ভালবাসার মাঝে স্বল্পতা এনে নিজেকে রাহে লিল্লাহ উৎসর্গ করার চেতনাকে উজ্জীবিত করে। রাসূল (স.) বলেছেন,

من احب لله وابغض لله واعطى لله ومنع لله فقد استكمل الايمان

                   যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই ভালবাসল, আল্লাহর জন্যই রাগান্বিত হল, আল্লাহর জন্যই দান করলো, আল্লাহর জন্যই বিরত থাকল সে তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করলো। (আল হাদীস)

পাশবিক শক্তি দমনঃ

          মানুষ মানুষের অবস্থা অবলোকনে প্রভাবিত হয়। প্রাণীকুলের অবস্থা অবলোকনেও মানুষের মনে প্রভাব পড়ে। বন্ধুর অসন্তোষজনক অবস্থা দর্শনে নিজের মনেও বেদনার শিহরণ জাগে। জানোয়ারের দুঃখ কষ্টে ও মানুষ দুঃখিত ও ব্যথিত হয়। এটা এক নিত্য পরীক্ষিত সত্য। এর দ্বারা অনুয়িত হয় যে, মানব হৃদয়ে প্রতিটি বিষয় উপলব্দির প্রখর অনুভূতি শক্তি রয়েছে। কুরবানীর এ আচরণটিকে ও এর দ্বারা বিচার করলে দেখা যায় একটি প্রাণীকে শুধু আল্লাহর নামে তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জবেহ করে দিয়ে প্রকাশ্যে তার পশুত্বে হনন করা হয়। এর দ্বারা মানুষের মাঝে লুকায়িত পশুত্ব ও তার অবাঞ্চিত কামনাসমূহ নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হয় এবং যেভাবে নিজের আদরের একটি পশুকে কষ্টে পতিত হতে দেখে নিজ অন্তরেও কষ্ট অনুভূত হয়, ঠিক তেমনিভাবে নিজের পাশবিক শক্তি সমূহকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী দেয়ার এক অদম্য উৎসাহ চেতনা জাগ্রত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

          واما من خاف ربه ونهى النفس عن الهوى فان الجنة هى المأوى

          পক্ষান্তরে যে স্বীয় পতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে। জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল। (নাযিআত-৪০-৪১)

কবির কাব্যিক ছন্দমালা-

কুরবানী, কুরবানী, কুরবানী,

আল্লাহর প্রেমে করো কুরবানী

প্রিয়বস্তু কারো কুরবানী

পবিত্র বিধান এ কুরবানী

তাকওয়া ও আল্লাহহর সন্তুষ্টি অর্জন ঃ

          মুমিন জীবনের চরম ও পরম লক্ষ হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই তার প্রতিটি কাজ শুধু আল্লাহর জন্যই হওয়া উচিত। কুরবানী নামক ইবাদতটিও তদনুরূপ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাকওয়ার একটি অনুশীলন।

ইরশাদ হচ্ছে-

لن ينال الله لحومها ولادمائها ولكن ينال التقوى منكم

আল্লাহর নিকট এই কুরবানীর গোশত বা রক্ত কিছুই পৌছে না। বরং তোমাদের অন্তরের তাকওয়া বা খোদাভীতি পৌছে। (হজ্জ-৩৭)

তাকওয়া শব্দের অর্থ হল-

          বেঁচে থাকা মুক্ত থাকা সতর্ক থাকা ভয় করা ইত্যাদি

এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষস্থল অনেক হতে পারে। প্রাসঙ্গিকভাবে এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন হতে পারে যে, এ তাকওয়া কুরবানীর মাধ্যমে কিভাবে অর্জিত হবে। এর জবাব হচ্ছে ইবাদতের সাথে তাকওয়ার বিভিন্ন দিক বিশেষ সামঞ্জস্য রাখে। যার কতিপয় কুরবানীর উদ্দেশ্যে পূর্ব থেকেই অর্জন করা জরুরী। অন্য ভাষায় বলতে গেলে তা কুরবানী কবুল হওয়ার জন্য শর্ত। আর তাকওয়ার কতিপয় দিক আছে এরূপ, যে কুরবানীর পর তার ফলসরূপ অর্জিত হয়।

কুরবানীর পূর্বে রিয়া বা লৌকিকতা ও সুখ্যাতি লাভের মনোভাব থেকে তাকওয়া অর্জন করতে হবে, এটা নিত্যন্তই অপরিহার্য লৌকিকতা বা সুখ্যাতি লাভের বিষয়টি যাতে কল্পনায়ও না আসতে পারে, এ ব্যাপারে খুবই সাবধান থাকতে হবে। কেননা-

انما الاعمال بالنية

সকল কাজ তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল। (বোখারী শরীফ)

          তাই শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কুরবানী করতে হবে, তারপর ও যদি কেউ এসব উদ্দেশ্য কুরবানী করে তবে কুরবানীর রক্ত প্রবহন পর্যন্তই শেষ, মহান আল্লাহর নিকট তার এ কুরবানীর কোনই মূল্য নেই। কবির কবিতায়,

আল্লাহ তায়ালা নেন না তো ভাই

কুরবানীর গোশত রক্ত,

নিবেন তিনি মনের শুধু

ঈমান বলের অক্ত।

কুরবানীর পূর্বে অর্জনীয় আরেক প্রকারের তাকওয়া হচ্ছে কৃপণতা ও মনোসংকীর্ণতা থেকে তাকওয়া অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ কুরবানী সন্তুষ্ট ও প্রশান্তচিত্তে করতে হবে। তাই সবচেয়ে ভাল প্রাণী (যার যার সাধ্য অনুযায়ী) এ কাজের জন্য মনোনীত করা উচিত।

রাসূল (স.) বলেন,من وجه سعة ولم يضح فلايقربن مصلانا

সামর্থ থাকতে যারা কুরবানী করে না, তারা যেরন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।(ইবনে মাজাহ)

হুব্বে নাফস ও হুব্বে মাল তথা আত্মভালবাসা ও সম্পদের ভালবাসা অর্থাৎ পশু-প্রবৃত্তির সাথে মানুষের যে লড়াই চলে, এটা তাকওয়ার তৃতীয় প্রকার, যা কুরবানীর পর তার ফলস্বরূপ অর্জিত হয়। আর তাকওয়ার ফলাফল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

ان اكرمكم عند الله اتقاكم

নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী।(হুজরাত-১৩)

বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ঃ

          কুরবানীর দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানীর গোশতের কিছু অংশ আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের গরীব, দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে, এতে করে সমাজের সকলে মিলে এই উৎসব উপলক্ষে সাময়িকভাবে হলেও বৈষম্যহীনভাবে একটা আনন্দ উপভোগ করে থাকে।

আল্লাহ বলেন,

                                                فكلوا منها واطعموا القائع والمعتر

তা থেকে তোমরা নিজেরা খাও এবং তাদেরকে খাওয়াও যারা চেয়ে বেড়ায় না ও যারা চায়। (হজ্ব-৩৬)

          দুঃখ -দারিদ্র মানুষ যাদের অনেকের সারা বছর কোনদিন নিজেদের অর্থে গোশত খাওয়ার আয়োজন করতে সামর্থ হয় না; কুরবানীর উসিলায় তাদের ও একটু উত্তম খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায়। শুধু তাই নয় সাময়িকভাবে সকলে মিলে এ উৎসব আদায়ের মাধ্যমে সামর্থবানদের অনুভূতিতে এ মর্মে পড়ে যে, সারা বছরই এভাবে দুঃখ-দারিদ্রের প্রতি ইহসান করা উচিত।

মহান আল্লাহ বলেন,

وفي اموالهم حق للسائل والمحروم

          এবং সামর্থবানদের সম্পদে অভাবীও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। (যারিয়াত-১৯)

          কবির ভাষায়,

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

এ জীবন মন সকলি দাও,

পরের কারণে মরণেও সুখ

আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

পশু পালনে উৎসাহঃ

          কুরবানীর জন্য প্রতি বছর পশু জবাই করতে হয়। ফলে মানব সমাজে পশু পালনের উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, পশুকে ভালভাবে ক্রটি মুক্ত রেখে লালন-পালন করার প্রতি ও উৎসাহিত করা হয়েছে পরোক্ষভাবে। কেননা ক্রটিযুক্ত পশু কুরবানীর জন্য অনুপযোগী বলে ঘোষিত হয়েছে। তাই খুব স্বাভাবিভাবেই এক্ষেত্রে মানুষের বিবেক জাগ্রত হওয়ার কথা।

হাদীসে এসেছে,

عن البراء بن عازب رض ان رسول الله صلى الله عليه وسلم سئل ماذا يتقى من الضحايا فاشار بيده فقال اربع العرجاء البين ظلعها والعوراء البين عورها والمريضة البين مرضها و العجفاء التى لا تنتقى

বারায়া ইবনে আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এরূপ রাসূল (স.) এর খেদমতে আরজ করা হলো যে, কুরবানীতে কি ধরনের পশু পরিত্যাগ করতে হবে ? রাসূল (স.) হাত দ্বারা ইশারা করে বললেন, তোমরা চার রকমের পশু পরিত্যাগ করবে খোঁড়া, যার খোঁড়ামী সুস্পষ্ট, অন্ধ, যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রোগা, যার রোগ সুস্পষ্ট, শক্তিহীন, যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে। (দায়েমী, মালেক, আহমদ, তিরামযী, ইবনে মাজাহ)

উল্লে¬খিত হাদিসটি পশুকে ভালভাবে ও ক্রটিমুক্তভাবে পালন করার শিক্ষা দেয়।

শিরকমুক্ত সমাজ গঠনঃ

শিরক (شرك) শব্দের অর্থ অংশীদার স্থাপন করা

          মহান আল্লাহর সাথে কোনকিছু অংশীদার স্থাপন করাকে শিরক বলে। শিরক মস্তবড় গুণাহ। কুরআনে এসেছে-

ان الشرك لظلم عظيم

নিশ্চয়ই শিরক ভয়ানক অত্যাচার। (লোকমান-১৩)

          কুরবানী শিরক থেকে মুক্ত থাকার অনন্য একটি মাধ্যম। কেননা মুশরিকদের মাঝে জানোয়ার পূজার রেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ইসলাম মুসলমানদের কুরবানীর বিধান দিয়ে তাওহীদ তথা একত্বাবাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় ও উজ্জ্বল করার পাশাপাশি এ শিক্ষা দেয় যে, জীব-জানোয়ার, পশু, পাখি এসব পূজা ও উপাসনার জন্য সৃষ্টি হয়নি। বরং আল্লাহ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে সে পদ্ধতিতে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে তার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই এসব জীব-জানোয়ার তথা প্রাণীকূলকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

          ফলে কুরবানী দ্বারা একদিকে যেমন তাওহীদের বিশ্বাস শানিত হয়, অপরদিকে কাফির-মুশরিকদের প্রতিও কার্যত এ আহবান জানানো হয় যে, তোমরাও এসব প্রাণীর পূজা দিয়ে ছেড়ে ইসলামের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ  হও। আল্লাহ বলেন,

ام لهم اله غير الله سبحان الله عما يشركون

আল্লাহ ছাড়া কি তাদের আর কোন মামুদ আছে। এরা যে শিরক করেছে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। (তুর-৪৩)

          শিরক বর্তমানে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় এ শিরককে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ শিরকমুক্ত সমাজ গঠন করার জন্যই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (স.) আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। কুরবানী আমাদের সে শিক্ষাই দেয়।  আল্লাহর বাণী-

واعبدوا الله ولاتشركوا به شيئا

তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সাথে আর কাউকে অংশীদার করো না।

          প্রতি বছর হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর স্কৃতি বিজড়িত কুরবানী আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে যায় তার মূল কথা হল-

          সকল প্রকার মিথ্যাপ্রভূ তথা তাগুত, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি বিভাগে প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে প্রভূ সেজে বসে আছে। তাদের গলায় ছুরি চালাতে হবে।

          একমাত্র আল্লাহর প্রভূত্ব কায়েমের নিমিত্তে নিজের দেশ ও জাতিকে অসংখ্য মিথ্যা রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

          শিরকমুক্ত সমাজ কায়েমের আন্দোলনের জন্য নিজেদের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ ও লোভ-লালসার গলায় ছুরি চালাতে হবে।

শেষকথনঃ

          কুরবানী বিশ্ব মুসলিমদের ঐক্য ও ত্যাগের অপূর্ব নির্দশন। ঝঞ্চাবিক্ষুদ্ধ এই বিশ্বে মুসলিমদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে ঐক্য ও ত্যাগের বিকল্প নেই। সাহাবায়ে কেরামের ঐক্য ও ত্যাগই মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রকে বিশ্বস্ত ও বিশ্বাসীর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত স্বরণ করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে। বর্তমান মুসলিমবিশ্ব শুধু স্বরণই করছে, পালন করছে না। ফিলিস্তিন ও ইরাকিদের জন্য চোখের পানির ঐক্য ও ত্যাগ দেখা গেলেও বাস্তব ঐক্য ও ত্যাগ নেই। মুসলমানদের হৃত গৌরব ফেরাতে হলে সবাইকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এক সুরে কথা বলতে হবে। ভয় কাউকে নয়, কেবলমাত্র এক আল্লাহকে এটাই হল কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা।

          কবি নজরুলের ভাষায়-এ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,

আজ আল্লাহর নামে জান, কোরবানে ঈদের পূত বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদবোধন।

 

 ================== 3 ===================

কুরবাণীর চেতনা ও যুব সমাজ

মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম

নিজ ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে মহান আল্লাহর নিরপেক্ষ আইন ও বিধি ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার দ্বারা মানবতার সার্বিক মুক্তি কল্যাণ নিশ্চিত করা হচ্ছে নবী রাসূলদের কাজ। এ পথে মহাত্যাগের মহাদৃষ্টান্ত স্থাপনকারী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর অতুলনীয় ত্যাগের স্মৃতি বহন করে কুরবানী। এই কুরবানী আল্লাহর নির্দেশের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চরম পরাকাষ্ঠার নিদর্শন। নিজের সালাত, কুরবানী, জীবন-মরণ সব কিছুকেই কেবল আল্লাহর নামে, শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির জন্যে চূড়ান্তভাবে নিয়োজিত ও ত্যাগের মানস এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে কুরবানী। পশু জবাই থেকে শুরু করে নিজের পশুত্ব জবাই বা বিসর্জন এবং জিহাদ-কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাৎ বরণ পর্যন্ত এর পরিধি সম্প্রসারিত। ঈদুল আযাহার সময়, হজ্জ পালনকালে মুসলমানদের পশু জবাইয়ের কুরবানী সমগ্র জীবন ও সম্পদের কুরবানীর তৌহিদী নির্দেশের অঙ্গীভূত এবং তা একই সঙ্গে আল কুরআনে আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত মানব জাতির ইমাম হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর পুত্র কুরবানীর চরম পরীক্ষা প্রদান ও আদর্শ চেতনার প্রতীকী রূপ। তাঁর এ চূড়ান্ত ত্যাগের স্পৃহা গোটা মানব জাতির জন্য বিশেষ করে সভ্যতার ধারক ও বাহক যুব সমাজের জন্য এক অন্যন্য আদর্শ। এ মহান আদর্শ অনুসরণ করতে তরুণ সমাজের প্রতি বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম আহবান জানিয়েছেন এভাবে-

ডুবে ইসলাম আসে আঁধার

ইব্রাহীমের মতো আবার

কুরবানী দাও প্রিয় বিভব।

কুরবানী কী এবং কেন ?

           قربধাতু থেকে এসেছে । এর অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। কাছাকাছি হওয়া, নৈকট্য অর্জন করা, নিজেকে উৎসর্গ করা। এ শব্দটি কুরআনুল কারীমে দু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ-ঝধপৎরভরপব.উরপঃরড়হধৎু ড়ভ  ওংষধস এ উল্লেখ করা হয়েছে-ঞযবৎব ধৎব ংরী ড়িৎফং ঁংবফ রহ ঃযব গঁযধসসধফধহ ৎবষরমরড়হ ঃড় বীঢ়ৎবংং ঃযব রফবধ ড়ভ ংধপৎরভরপব. ঞযবংব ধৎব

ذبح،قربان نحر، أضحية ، هدى ، منسك     প্রত্যেক পূণ্য কাজ যার দ্বারা আল্লাহর রহমত লাভের আশা করা হয় তাই কুরবান। কিন্তু সাধারণ অর্থে এ শব্দটি জন্তুর কুরবানীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভের প্রতাশায় জিলহজ্জ মাসের ১০-১২ তারিখে প্রাণপ্রিয় বস্তুকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করে দেওয়া হচ্ছে কুরবানী।

          কুরবানী আল্লাহ তায়ালার মালিকানা ও প্রভূত্বের স্বীকৃতি এবং ধ ংুসনড়ষ ড়ভ ষড়াব ধহফ ংধপৎরভরপব. আল-াহর নামে নিজের প্রিয়বস্তু কুরবানীরূপে উৎসর্গের মাধ্যমে মানুষ যে নিষ্ঠাবান এবং আল্লাহর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধাবনত, কুরবানী হচ্ছে তার বহিঃপ্রকাশ। আর্থিক যা কিছু ভোগের সে সবই   আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া। আর তাঁরই দান থেকে তাঁরই উদ্দেশ্যে উজাড় করে দিয়ে আত্মশুদ্ধি ও আত্মতৃপ্তি লাভ এবং আত্মত্যাগে বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই কাছে গমন, তাঁরই নৈকট্য লাভের আকাঙ্খায় আত্মসংযমে প্রশান্ত চিত্ততার পরিশীলনী এই কুরবানীতে বিবৃত। এ কুরবানী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মাহাপরীক্ষার মহা সাফল্যের তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানী করতে উদ্যত হওয়ার স্মৃতি বিজড়িত সুন্নত। হাদীস শরীফে এসেছে-

عن زيد بن أرقم قال قال أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم : فما لنا فيها يا رسول الله ؟ قال بكل شعره حسنة (ابن ماجه ،أحمد)৯

বস্তুত আল্লাহর নির্দেশকে ইব্রাহীম (আঃ) অধিক গুরুত্ব দেন, নাকি তাঁর কাছে নিজের সন্তানের মমতাই বড়, এ পরীক্ষা নেয়ার জন্যে আল্লাহর তায়ালা তাঁর ইব্রাহীম প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর নামে জবেহ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইব্রাহীম (আঃ) সেই ঈমানী পরীক্ষায় যথাযথ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি পুত্রের গলায় চালিয়েছিলেন ধারালো ছুরি। কিন্তু ইব্্রাহীমের প্রাণাধিক পুত্রকে বধ করা আল্লাহর ইচ্ছা ছিল না বলেই তিনি ইসমাঈলকে রক্ষা করে ইব্রাহীম (আঃ) কে লক্ষ্য করে বললেন, ঈমানী পরীক্ষায় তুমি সফল। তুমি ঈমানের দাবির সত্যতার প্রমাণ দিয়েছ।

          তবে মানব ইতিহাসে আল্লাহর এহেন একটি কঠোর নির্দেশ পালনের এতো বড় ত্যাগের ঘটনা এভাবে কালে স্রোতে ভেসে যাবে, এটা আল্লাহ চাননি। তিনি এ ঘটনাকে পরবর্তীদের জন্য আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে ত্যাগের প্রেরণা হিসেবে চির স্মরণীয় করে রাখার ব্যবস্থা করলেন। যুগে যুগে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালন করে যাতে মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, এজন্যে তিনি ত্যাগের এ ঘটনাকে অনুপ্রেরক করে রাখলেন। এর বিকল্প হিসেবে প্রতীকী ব্যবস্থা স্বরূপ পশু কুরবানীর নির্দেশ দিলেন। এর মাধ্যমে আমাদেরকে আত্মত্যাগের নমুনা দেখানো হয়েছে। এটি মূলত ঘটনার আঙ্গিকে একটি দৃষ্টান্ত। এর সাহায্যে আত্মত্যাগ ও কুরবানীর মহৎ চেতনাকে অবয়ব দান করা হয়েছে। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী-

لن ينال الله لحومها ولا دماؤها ولكن يناله التقوى منكم (الحج ৩৭)১২

কুরবাণীর মৌলিক চেতনাসমূহ

আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ ঃ

কুরবানী মানে কেবল পশু হত্যা নয়, কিংবা পশু হত্যার মাধ্যমে আত্মপ্রসাদ লাভ, অর্থহীন আত্মপ্রচার ও প্রতিযোগীতামূলক সামাজিক প্রদর্শনী নয়। বরং আমার জীবন-মৃত্যু, জ্ঞান, বুদ্ধি, ধর্ম-কর্ম, সুখ-দুঃখ, এক কথায় আমার বস্তু ও নির্বস্তু সব ভাবনা চিন্তা সব কিছুই বিশ্ব প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তাঁর কাছ থেকে এসেছি, তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে। আমি সব কিছুসহ তাঁরই ইচ্ছার কাছে বিলীন হতে চাই। আর এ চাওয়ার সাধনাই কুরবানীর মূল কথা। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এ কাজটিই আগে করেছিলেন।

          পুরোহিত, নক্ষত্র পূজারী এবং আপাদমস্তক শিরক ও মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত পরিবারে জন্ম নেয়া ইব্রাহীম (আঃ) মহান সৃষ্টিকর্তা ও প্রভূর সন্ধানে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্রকে ব্যর্থ প্রভূ ভেবে ভেবে অবশেষে যখন সত্যের আলোর সন্ধান পেলেন, তখন নিজ পরিবার ও জাতিকে উদাত্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন-

إني وجهت وجهي للذي فطر السماوات والأرض حنيفا وما أنا من المشركين - ১৩

এ পূর্ণাঙ্গ মানুষটি যৌবনের শুরুতে যখন আল্লাহকে চিনতে পারলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিলেন তিনি অকুণ্ঠ চিত্তে বললেন-أسلمت لرب العالمين

তিনি রাব্বুল আলামীনের জন্য শত শত বছরের পৈতৃক ধর্ম এবং এর যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আকীদা বিশ্বাস পরিত্যাগ করলেন। এটাই ছিল তাঁর প্রথম কুরবানী। এটাই হলো তাঁর প্রথম ছুরি চালানো যা তিনি পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুকরণ, বংশীয় ও জাতীয় গোঁড়ামীর উপর এবং নিজের প্রবৃত্তির সে সকল লোভ-লালসার দূর্বলতার উপর চালিয়েছেন। যার কারণে মানুষ নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে নিজ পরিবেশ ও সমাজের সাথে অন্যায়ে জড়িয়ে যায়। বস্তুত আল্লাহর তাঁর প্রতিটি বান্দার মধ্যে এই ইব্রাহীম ত্যাগ ও ঈমানী দৃঢ়তা দেখতে চান। টগবগে যুবকের আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পনের এ চেতনা যুগে যুগে মুসলিম যুবকদের অনুপ্রেরণা যোগায়।

 

 

তাওহীদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিরকের মূলোৎপাটন ঃ

একমাত্র আল্লাহর প্রভূত্ব কায়েমের নিমিত্তে নিজের দেশ ও জাতিকে অসংখ্য মিথ্যা রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানো  কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এ কাজটি করেছেন। তিনি মানব মনের দূর্বলতার উৎস শিরক তথা গায়রু¬ল্লাহর শক্তিমত্তার উপরে মানুষের আস্থার মূলে কুঠারঘাত হেনেছিলেন এবং এই শক্তির মূল আঁধার আল্লাহর ওয়াহদানিয়াত তথা একত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন নিজ সমাজে। কারণ আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের উপর আস্থাই মানুষকে দুর্জয় শক্তির অধিকারী করতে পারে এবং মানব সমাজে তাওহিদী ঐক্যই আনতে পারে শান্তি, সাম্য, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার। এজন্য আল্ল¬ামা ইকবাল বলেছেন-

তাওহীদ কি আমানত সিনে মেঁ হ্যায় হামারে

আঁসা নেহিঁ মিটানা নাম ও নিশানা হামারা।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যে পরিবার, সমাজ এবং পরিবেশে আগমন করেছিলেন তার পুরোটাই শিরকের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমনকি রাষ্ট্রশক্তি পরিপূর্ণভাবে শিরকের পৃষ্ঠপোষকতা করত। তরুন-যুবক ইব্রাহীম(আঃ) তাওহীদের সন্ধান পেয়ে দুনিয়ার মানুষকে অসংখ্য রবের গোলামীর নাগপাশ হতে মুক্ত করে কিভাবে এক আল্লাহর বান্দায় পরিণত করা যায় সে চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন। তিনি প্রথমে নিজের পিতাকে, নিজের খান্দানকে, নিজের জাতিকে এমনকি রাজাকে পর্যন্ত শিরক থেকে বিরত থাকতে এবং তাওহীদের আকীদা কবুল করতে দাওয়াত দিলেন। এর ফলশ্রতিতে তিনি এক দিকে একা অপর দিকে গোটা দেশ ও জাতি তাঁর বিরোধীতায় এক সারিতে এসে দাঁড়ালো। কিন্তু এর পরও হতোদ্যম হননি তিনি। তখন সিদ্ধান্ত হলো আগুনে পুড়িয়ে মারার, তাতেও তিনি বিরত হলেন না বরং  এ কাজের জন্য লেলিহান অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়া কে পছন্দ করলেন। এটা তাঁর দ্বিতীয় কুরবানী।

          সুতরাং প্রত্যেক কুরবানী যে কোন পরিবেশে শিরক উচ্ছেদ ও তাওহীদের দাওয়াত দানের জন্য সকল প্রকার ভয়ভীতি ও জান-মালের ক্ষতির আশংকার গলায় ছুরি চালিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় চূড়ান্ত কুরবানী সারা বছরের কসাইয়ের দোকানের গোশত খাওয়ার চাইতে উত্তম কিছু আশা করা যায় না।

তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় সবকিছু বিসর্জনের মানসিকতা থাকা ঃ

শিরকমুক্ত সমাজ কায়েমের আন্দোলনের জন্য নিজেদের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ ও লোভ-লালসার গলায় ছুরি চালাতে হবে। ইসলামের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে নিজের মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করার মানসিকতা থাকতে হবে। যুগে যুগে কালে কালে আল্লাহর প্রিয়জনেরা এ পথ অবলম্বন করার অসংখ্যা নজির রয়েছে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আগুন থেকে বাঁচার পর মাতৃভূমিতে থাকা তাঁর জন্য আর সম্ভব হলো না। তাওহীদের জন্য তিনি বহিস্কৃত জীবনই পছন্দ করলেন। তাওহীদের দাওয়াতের জন্য শিরক আর শিরকের অনুসারী থাকায় কোথাও তিনি ঠাঁই পেলেন না। তিনি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর ও হিযাযে গিয়েছেন। মোটকথা আরাম-আয়েশকে পিছনে ঠেলে দিয়ে গোটা জীবনই দেশ-দেশান্তরের মাটি যাচাই করেছেন। নিজ বাড়ি, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো ছিল। কিন্তু এগুলোর প্রতি লোভাতুর হননি। তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার দুর্বারী স্পৃহা তাকে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরিয়েছে। শেষ ও চূড়ান্ত কুরবানীর পূর্বে এটি ছিল তাঁর তৃতীয় কুরবানী। আমাদেরকেও নিজ বাড়ি, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্যের লোভকে সংবরণ করে তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার নিমিত্তে দাঁড়াতে হবে।

সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ গ্রহণের অনুপ্রেরণাঃ

কুরবানী জাগতিক স্বার্থপরতা, বৈষয়িক লোভ, ইন্দ্রজ কামনা-বাসনার জৈবিক আবিলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র হবার, আল্লাহর প্রতি চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পিত বান্দাহ হবার প্রেক্ষিত সৃষ্টি করে এবং বাতিলকে পরিত্যাগ করে হকের সৃষ্টি করে এবং বাতিলকে পরিত্যাগ হবার পক্ষে আত্মোৎসর্গের প্রেরণা যোগায়। অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যেই ইস্পাত কঠিন মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও ন্যায়ের উপর অটল থেকেছেন তা অনুকরণীয় আদর্শ। এ আদর্শ একদিকে যেমন ত্যাগের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ইব্রাহীম (আঃ) এর ত্যাগদ্বীপ্ত সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস আমাদের স্মৃতিপটে জাগিয়ে দেয়, তেমনি প্রতিটি মুমিন অন্তরকে ঈমানী চেতনায় সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকতে উজ্জীবিত করে তোলে। তাই আমাদেরকে বাতিল ও তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মতোই আপোষহীন হতে হবে।

মনের পশু কুরবাণী করে মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করা ঃ

          কুরবানী নিছক রক্ত প্রবাহের কোন হোলিখেলা কিংবা অনুষ্ঠান সর্বস্ব কোন ভোজ উৎসব নয়; বরং মানবস্বভাবের পশুত্বকে, স্বার্থসর্বস্বতাকে, নফসানিয়াতকে হত্যা করে মনুষ্যবোধকে জাগ্রত করার হাতিয়ার আসলে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুটি বিপরীত ধর্মী বৈশিষ্ট্য রাব্বানিয়াত ও নফসানিয়াত (পশুত্ব ) দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের মধ্যে র‌্যাশনালিটি ও এনিম্যালিটি দুটিই আছে। পশু কুরবানী মূলত নিজের নফসানিয়াত তথা কুপ্রবৃত্তিকে কুরবানী করার প্রতীক। তাই পশুর সঙ্গে সঙ্গে মানব মনে কুফর, শিরক, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ,রিয়া, পরনিন্দা, অহংকার, আত্মগর্ব, কৃপণতা, ধনলিপসা প্রভূত্ব-প্রিয়তা, সম্মান কামনা, দুনিয়ার মায়া-মহব্বত এবং আরো অসংখ্য পাপ-পঙ্কিলতা ও কলুষতার যে ঘৃণ্য পশু সযতেœ লালিত হচ্ছে তারও কেন্দ্রমূলে ছুরি চালাতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি মুহুর্তে মনুষ্যত্ববোধ কে কুরবানীর এ মনোভাব জাগ্রত করার জন্যই বার বার আমাদের মাঝে ফিরে আসে।

ভোগ নয়, ত্যাগেই সুখ ঃ

          কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা থেকে মুসলমানরা দূরে থাকার কারণে সারা বিশ্ব আজ ত্যাগ ও ভোগের দ্বন্দ সংঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। অথচ কুরবাণী হচ্ছে চিত্তশুদ্ধির এবং পবিত্রতার প্রস্তাব। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে প্রয়োজন সুষ্ঠু, সুস্থ, অহিংস, সমাজ রীতির প্রতিষ্ঠা। আর তারই নিষ্কুলুষ রূপায়ন সম্ভবপর ঐতিহ্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগের মাধ্যমে। ভোগ যখন মানুষকে লোভ-মোহ, মদমাৎসর্যের অতলে নিয়ে যায়, ত্যাগের মহিমা তখন অগ্নিশিখার মতো সব অহংকে পুড়ে ছাই করে দিয়ে পরমাতœার কল্যাণময় স্বরূপের বিকাশে সহায়ক হয়। তাই ত্যাগ মানুষের ধর্ম তথা সমগ্র জীবনবোধের অঙ্গ।

          কেবল ব্যক্তি জীবনে নয়, সমগ্র সমাজ দেহে আজ এ ত্যাগের মহিমা ও আত্মবিসর্জনের প্রভাব অপূর্ব ও অতুলনীয়। অহংবোধ যখন মানুষকে আতœম্বরিতার চরমে নিয়ে পৌঁছায়, তখন এ ত্যাগ ও তিতিক্ষার মহিমাই মানুষকে মহত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করে, বিশ্বে প্রকৃত মানবতা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এ মহা শিক্ষাই কুরবানীর শিক্ষা। কুরবানীর আনন্দ ত্যাগের আনন্দ, উৎসর্গ করার আনন্দ। সুতরাং আজ যখন মুসলমানদেরকে ভিটে মাটি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। যুবকদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, বোনদের ইজ্জত আব্র ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে, তখন ভোগ বিলাসে বিভোর থাকা নয়; বরং মিল¬াতের পিতার চরম ও পরম ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আমাদের মরনাপন্ন জাতির জন্য রক্ত দিয়ে তাদের সঞ্জীবনী দিতে হবে-এতেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত সুখ।

পারিবারিক ঐক্যঃ কুরবাণরি মৌলিক শিক্ষা ঃ

                   মুসিলম জাতির জনক হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার জীবন সংগ্রামের প্রতিটি পদে সাফল্য পেতে এমন এক আদর্শ পরিবার গঠন করেছিলেন-যেখানে পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীতে ভিন্ন মত, ভিন্ন     চিন্তাধারা বা ভাবের দ্বন্দ ছিল না। ব্যাপারটি সামান্য নয়। একমাত্র সন্তানকে জবাই করে দেয়া প্রশ্নেও স্ত্রী স্বামীর এবং পুত্র পিতার বিরুদ্বাচরণ করেন না। কারণ এ পরিবারেরর সদস্যবৃন্দ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়েছেন আদর্শ ও বিশ্বাসের বন্ধনীতে।

          ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃক স্ত্রী হাজেরার নির্বাসন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক মনে হলেও হাজেরা যখন শুনলেন যে, আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি নির্বাসিত হন তিনি কোন প্রতিবাদ করলেন না। কারণ যে আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহীম (আঃ) নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ও গভীর বেদনা নিয়ে পতœীকে নির্বাসন দিচ্ছেন সে আল্লাহকে বিবি হাজেরাও গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। তাই তিনি প্রশান্ত চিত্তে  জনমানবহীন মক্কায় নির্বাসন মেনে নিলেন। এরপর কুরবানী করার খবরে হাজেরা (আঃ) ইব্রাহীম (আঃ) কে বলেননি যে, একটি মাত্র ছেলেকে তো তুমি পূর্বেই নির্বাসনে দিয়েছ। কত কষ্টে, আমি একে সহায়হীন অবস্থায় লালন পালন করেছি। তার উপর তোমার কিসের অধিকার? কোন অধিকারে আমার পুত্রের গলায় তোমার প্রভূকে সন্তুষ্ট করার জন্যে ছুরি চালাতে চাইছ? তাতো তিনি বললেনই না, বরং স্বেচ্ছায় পুত্রকে সাজিয়ে দিলেন। অথচ এ কুরবানী পিতার জন্য যতটা কষ্টকর ছিল, মা হাজেরার জন্যে ছিল তার লক্ষ্যগুণ বেশি বেদনাদায়ক। তাহলে কোথা থেকে তিনি এত বিরাট আত্মত্যাগের শক্তি পেলেন ? কেন তিনি স্বামীর সঙ্গে দ্বিমত হলেন না ?

          অন্যদিকে পুত্র ইসমাঈলকে যখন পিতা ইব্রাহীম (আঃ) তার প্রতিপালকের নির্দেশের কথা জানালেন, তখন সেও দ্বিধাহীনচিত্তে জটপট বলে ফেলল يابت افعل ما تؤمر ستجدني إن شاء الله من- الصبرين- ১৯ 

অথচ ইব্রহাীম ও হাজেরার কুরবানী ছিল পুত্রের জান আর ইসমাঈলের কুরবানী ছিল তার নিজের জীবন। হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) এর আদর্শ পরিবারের সদস্যদের মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্যেই কুরবানীর অনুষ্ঠান।

          আর আজকে আমরা কোথায় ? বি জাতাীয় সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার অনুপ্রবেশে আমাদের মুসলিম পরিবারে আজ মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে-যার যে দিক ইচ্ছা ছুটছে। মা আছেন এক মেরুতে, কন্যা সেকেলে মেরুতে। ফজরের নামাযের পর মা টিপছেন তসবীহ, মেয়ে করছেন নৃত্যের চর্চা। মাগরিবের আযান শুনে বাবা চলছেন মসজিদে আর সে সময়ে ছেলে ছুটছে নাট্যমঞ্চের দিকে। এতো অতি সাধারণ ব্যাপার। আরো যে কত স্ববিরোধীতা ও বৈপিরত্যি আমাদের পরিবারে দেখা যায় তার কোন ইয়াত্তা নেই। সুতরাং মুসলিম পরিবারের জন্যে কুরবানী ভোজ উৎসব। সুতরাং আত্মবিশ্লে¬ষণ ও আত্মশুদ্ধির উৎসব।

ইসলামী সভ্যতার মূল ভিত্তি কুরবানী ঃ

          সভ্যতার প্রতিটি ইট, কৃষ্টি, তমদ্দুনের প্রতিটি মিনার, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় রচিত হয়েছে ত্যাগ ও কুরবানীর ঘাম ও খুনে। মূলত ঃ সভ্যতার ইতিহাস কুরবানীরই ইতিহাস। তাই আগামী ইসলামী সভ্যতার কারিগরদেরকে ত্যাগ, কুরবানী ও খুনের দরিয়ার উপর গড়ে তুলতে হবে শান্তি ও সুখের নীড়। সেক্ষেত্রে তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে রক্ত ঝরাতে হলে সে রক্তই হবে সর্বোচ্চ ত্যাগ। কারণ বান্দার অশ্রর ফোঁটা ও রক্তের ফোঁটা আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে প্রিয়।

এছাড়াও কুরবানী আরো যে সকল চেতনার বাহক তা হলো-

১)       দ্বীনকে বিশ্বে বিজয়ী করতে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ-সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হবে। সেক্ষেত্রে মুসলিম মুজাহিদ যাতে দুশমনদের রক্তস্রোত দেখে হত্যা প্রতিহত্যার ভয়াবহতায় বিচলিত হয়ে না যায়, কুরবানী তারই একটি মহড়া।

২)       কুরবানী পার্থিব জীবন ও ধন সম্পদকে রাহে লিল্লাহ উৎসর্গ করার সৃষ্টি করে।

৩)      এর মাধ্যমে মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন উদ্বেলিত হয়ে ইসলাম পুর্নজাগরনের উম্মেষ ঘটে।

৪)      এটা মুসলমানদের সমাজ তথা জাতীয় জীবনে সাম্য ও সৌহার্দের মাধ্যমে ঐক্য গঠনের বাস্তব নিদর্শন।

৫)      এটা মানুষকে ধৈর্যশীল, বিনয়ী, সহনশীল ও হৃদয়বান করে তোলে। ফলে সমগ্র মুসলিম জসসাধারনের নির্মল মন, সচ্চরিত্রতা, প্রেম-ভালবাসা, নিষ্ঠা, মানসিক ও আধ্যাতিœক শক্তির বিকাশ ঘটে।

৬)       পিতা-মাতার প্রতি আনুগত্যের অনুপ্রেরণা যোগায়

৭)      ত্যাগের প্রেরণায় সমাজ সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণের উৎসাহ দেয়।

৮)      তাকওয়ার চেতনা জাগ্রত হয়

৯)       সুসন্তান গর্বের প্রতীক। তাই সন্তানকে সৎ ও যোগ্য বানানোর অনুপ্রেরণা দেয়।

১০)     অহংবোধ খতমের হাতিয়ার এটা। কারণ শিরকের জন্মস্থান অহংকারের পেট।

১১)     মুমিনের গোঁটা জীবন পরীক্ষার কাঁটায় বিছানো।

কুরবানীর চেতনা বনাম মুসলিম যুব সমাজ ঃ

                   কুরবানীর উপরোক্ত চেনাসমূহের সাথে বর্তমান মুসলিম যুব সমাজে কর্মকান্ডের তেমন কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরমলগ্নে সভ্যতা ও ভদ্রতার খোলসে উদভ্রান্ত যুব সমাজ আজ মানবীয় গুনাগুণ থেকে বিচ্যুৎ হয়ে নির্লজ্জ যৌনাচার, মাদকাসক্তি, বিজাতীয় কালচারের প্রতি আকর্ষন , চর দখলের মতো হল ও ক্যাস্পাস দখল বর্বরতার পাশবিক আচরণে লিপ্ত হয়ে বড়ই অসুস্থ, বিশৃঙ্খল ও অরাজক হয়ে উঠেছে। আজ পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায়-অবিচার, হিংসা-বিদ্বেষ স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা, জুলুম-নির্যাতন, প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং কথা ও কাজের গরমিল আমাদের সবুজ তারুণ্যকে দিশেহারা করে তুলেছে। শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়, সমাজ জীবনের নানা ক্ষেত্রে যুব সমাজের হতাশা ও ক্ষোভ প্রতিনিয়ত নানা রকম ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

          এতদসত্ত্বেও আমরা নিরাশ হতে পারি না। কারণ ইতিহাসের সকল কল্যাণ, সুন্দর আর ঐতিহ্যের অনন্য রূপকার হলো যুব সমাজ। তারা বাঁধার প্রাচীর তৈরি কিংবা ভাঙ্গনের মূল হাতিয়ার। তারা এক প্রচন্ড বিস্ফোরণ, প্রতিবাদী-সাহসী সত্ত্বার আগ্নেয়গিরি, মহাসাগরের ঊর্মিমালার জোয়ার, ঢেউরূপী সমাজ ভাঙ্গা-গড়ার দুঃসাহসী কারিগর। তারাই সভ্যতার ধারক ও বাহক। তারাই ইব্রাহীম, ইসলামঈল, ওমর, আলী, খালিদ, তারেক, মুসা। তারা যেকোন মুহুর্তে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। তাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা। শুধু প্রয়োজন ইব্রাহীম ইসমাঈলের মতো সদিচ্ছা এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা।

এ প্রত্যাশায় নজরুলের আহবান ছিল এরকম-

রক্ত মাংস খেয়েছে তোদের

কংকাল শুধু আছে বাকী

এ হাড় নিয়ে উঠে দাঁড়া তোরা

আজও বেঁচে আছি বল ডাকি।

কুরবানীর চেতনার আলোকে যুব সমাজের কর্তব্য ঃ

ক. দ্বিমুখী পরিহার করে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করতে হবে।

খ. কুরবানীর ঐতিহাসিক চেতনাকে ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) এর ন্যায় শিরক উচ্ছেদ এবং মানুষকে

    অসংখ্য মিথ্যা রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার আপোষহীন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে হবে।

গ. আল্লাহর দ্বীনকে আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে স্বেচ্ছায় জীবনের একমাত্র মিশন হিসেবে গ্রহণ

    করতে হবে । এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও কুরবাণীর মানসিকতা সুদৃঢ় করতে হবে। বিরুদ্ধ পথ

    থেকে যতই বাধা আসুক, যতই ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হোক, যতই তারা খুনের দরিয়া বইয়ে

    দিক ইব্রাহীমের ত্যাগ-চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তাদেরকে বলতে হবে-

খুনের দরিয়া দেখে নাই কোন ভয়

সংগ্রাম এনে দেবে আমাদের জয়।

ঘ. কুরবানীর চেতনায় আল্লাহর ভালবাসার উত্তম নজরানা পেশ করার সুপ্ত প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতে

    হবে। এক্ষেত্রে সময়ের ত্যাগ, শারীরিক ও মানসিক ত্যাগের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ঙ. আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্ম অনুসন্ধানের মাধ্যমে অতীতকে সামনে রেখে সোনালী ভবিষ্যতে গড়ার

    পরিকল্পনা নিতে হবে।

চ. ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, কাশ্মির, উইঘুর, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের মজলুম মুসলীম জনগোষ্ঠীর অশ্র মোচনের জন্য যুব সমাজকে কুরবানীর চেতনা ধারণ করে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ অন্যায়ের প্রতিবাদ, মজলুমের পক্ষে জিহাদ, নিপীড়িতদের পক্ষে ত্যাগ প্রভৃতি কাজে যুবকরা যতটুকু ঝাপিয়ে পড়ে প্রবীণরা তা পারেন না। মুমিন আত্মা ঈমানী শক্তির নতুন উদ্বোধন ঘটাবার জন্যে কুরবানী অনুষ্ঠান প্রতি বছর আমাদেরকে এই আহবানই জানিয়ে যায়।

সার্বিক পর্যালোচনা ঃ

                   শুধু পুত্রকে কুরবানীর ঘটনা নয় বরং হযরত ইব্রহাীম (আঃ) এর জীবন ভর কুরবানীর ঘটনাবলী আমাদেরকে আল্লাহর প্রেমে উদ্বেলিত করে। আর এসব থেকে শিক্ষালব্ধ তাকওয়া তথা খোদাভীতিপূর্ন সংযমী ও ত্যাগী জীবনের অধিকারী হওয়ার মধ্যেই কুরবাণীর আসল স্বার্থকতা। কারণ এ শ্রেণীর মানুষের দ্বারাই শোষণমুক্ত, শান্তিময় আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। কুরবানীর ইতিহাস এবং তা সৃষ্টিকারী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর ঈমানী পরীক্ষা সমূহের ত্যাগদীপ্ত ঘটনাবলীর স্মৃতি যেমন একজন লোকের অন্তরে আল্লাহর নির্দেশসমূহ যথাযথ পালনের তাগিদ সৃষ্টি করে, তেমনি মহান ত্যাগী নবী ইব্রাহীমের ন্যায় আল্লাহর আইন ও তাঁর নির্দেশ পালনের মধ্য দিয়ে সমাজে আল্লাহর বিধানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আপোষহীন মানসিকতা ও তাঁর মধ্যে জন্ম নেয়। এর মধ্য দিয়ে সে আল্লাহর নিষিদ্ধ পন্থায় এবং প্রবৃত্তির অন্যায়, অশ্লীলতার প্রবণতামুক্ত হয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হিসেবে জীবন পরিচালনায় যতœবান হবার কথা। তদ্রুপ এ শিক্ষা দ্বারা সমাজের একজন সৎ নাগরিক সৎ চিকিৎসক, সৎ বিচারক, সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে উঠবে। এভাবে একের দ্বারা অপরের সম্পদ আত্মসাৎ, জবর দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি গর্হিত মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠিত হবে। কুরবানীর এই দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের কারণেই আজ সমাজের এই দুরবস্থা।

          পদে পদে আজ আমরা আপন প্রবৃত্তির পূজা করে যাচ্ছি। ন্যায়, অন্যায়, হালাল, হারাম, হক না হক কোন কিছুই আমাদের মধ্যে আজ তমিজ নেই। এক দিকে দূর্নীতি অসাধুতা আমাদের ছেয়ে ফেলেছে, অপর দিকে আমরা প্রকাশ্যে ইব্রাহীম (আঃ) এর অনুসৃত নীতি আদর্শের বিরুদ্ধাচরণ করছি। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে অসত্যের কাছে মাথা নত করা আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। মুমিনসূলভ দৃঢ়তা ও সৎ সাহস আজ নির্বাসিত। ফলে আজ যেমন ব্যক্তিগত জীবন থেকে আমাদের   আল্লাহর হুকুমের আনুগত্য ও ন্যায়-নীতি বিদায় নিয়েছে। তেমনি সমষ্টিগত জীবনের অবস্থা ও ইব্রাহীম (আঃ) এর শিক্ষার মাকাঠিতে সম্পূর্ণ অপূরণীয়। গোটা উম্মতের মধ্যেই যেন এক ঘুণে ধরা অবস্থা বিরাজমান। ইব্রাহীম আঃ এর মতো ঈমানী বলে বলীয়মান হয়ে মুসলমানরা নিজ নিজ দেশ থেকে নমরুদ বিধি বিধান উৎখাত করে যদি খোদায়ী ন্যায় বিধান  প্রতিষ্ঠা করত, তাহলে যেমন-নিজেদের মধ্যে এতোসব আত্মকলহ থাকত না, তেমনি বিজাতীয় কোন নমরুদী শক্তি মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে আফগানিস্তান বা ইরাক কোথাও নিজেদের দন্তনখরাঘাতে মুসলিম জনপদকে ক্ষ-বিক্ষত করতে সাহসী হত না।

          পরিশেষে বলা যায় যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আজ গোটা মানব সমাজে অশান্তির সেই আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, তার একমাত্র উৎস হচ্ছে ভোগের প্রবণতা। সকল অশান্তিই এই প্রবণতা আশ্রিত। ভোগ ও ত্যাগের এ দ্বন্দ-কলহ জনিত আগুন থেকে রক্ষা পেতে হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইব্রাহীম (আঃ) আদর্শের বাস্তবায়ন এবং তার ত্যাগদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের অনুসরণই একমাত্র পন্থা। অর্থাৎ ঈদুল আযাহার কুরবানী অনুষ্ঠানকে সার্থক ও সফল করে তুলতে হলে প্রথম মুসলমানকে আগে নিজের খোদাদ্রোহী ও স্বার্থপর কুপ্রবৃত্তিকে কুরবানী দিয়ে সমাজ থেকে আল্লাহর অবাধ্যজনিত অন্যায় অবিচার উৎখাত করতে হবে এবং হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর অনুরূপ ঈমানী তেজ ও সংগ্রামী চেতনা নিয়ে নমরূদী পশু শক্তির কবল থেকে মানবতা বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করার শপথ নিতে হবে। তাহলেই ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি সম্ভব।

তথ্য নির্দেশনা ঃ

১.       এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে) قل إن صلاتي ونسكي ومحياى ومماتي لله رب العلمين- সূরা আনয়াম-১৬২(

২.       ইরশাদ হচ্ছেإن الله اشترى من المؤمنين أموالهم وأنفسهم بأن لهم الجنة -  )সূরা তাওবা-১১১(

৩.       কুরআনুল হাকীমে আছে) قد كان لكم اسوة حسنة في إبراهيم والذين معه - সূরা মুমতাহিনা-৪(

৪.       বিদ্রোহী কবির মেহেদী ঈদ কবিতা থেকে সংকলিত।

৫.       (ক ) ) إذ قربا قربانا فتقبل من أحدهما ولم يتقبل من الآخر সূরা আহকাফ-২৮(

(খ))    فلولا نصرهم الذين اتخذوا من دون الله قربانا آلهة    সূরা আহকাফ -২৭(

৬.       উরপঃরড়হধৎু ড়ভ ওংষধস, ঐঁমযবং, চৎরসববৎ ইড়ড়শ যড়ঁংব, ষধযড়ৎব, চ.৫৫১

৭.       ইসলামী বিশ্বকোষ খন্ড-৯, পৃ. ৩১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

৮.       ড. কাজী মুহাম্মদ, হজ্জ ও কুরবানী শীর্ষক প্রবন্ধ, অগ্রপর্থিক সংকলন হজ্জও কুরবানী, রওশন আলী খোন্দকার সম্পাদিত, ইফাবা, জানুয়ারী-২০০৪, পৃ. ২২

৯.       মিশকাতুল মাসাবীহ পৃ. ১২৯

১০.     ইরশাদ হচ্ছে فلما بلغ معه السعى قال يبنى إني أرى في المنام أني أذبحك فانظر ماذا ترى-  )আস্ সাফফাত-১০২(

১১.     এ প্রসঙ্গে আল¬াহ বলেন فلما أسلما وتله للجبين ونديناه أن يا إبراهيم – قد صدقت الرؤيا – أنا

 )  كذلك نجزى المحسنين  সাফফাত-১০৩(

১২.     সূরা হজ্জ-৩৭

১৩.     সূরা আনয়াম-৭৯

১৪.     জাফর আহমদঃ সমাজে হজ্জ ও কুরবানী পালনের মূল লক্ষ্যের প্রতিফলন আবশ্যক শীর্ষক কলাম, দৈনিক সংগ্রাম, ২২ নভেম্বর ২০০৯, পৃ. ৮

১৫.     উদ্ধত- দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, ঈদুল আযহা শীষক প্রবন্ধ, অগ্রপথিক সংকলন, প্রীগুক্ত

১৬.     জাফর আহমদ, প্রাগুক্ত।

১৭.     আহকামুল কুরআন, খন্ড-২, পৃ. ১৯৬

১৮.     ড. কাজী দীন মুহাম্মদ, প্রাগুক্ত, পৃ.২৩

১৯.     আস্সাফফাত-১০২

 

================== 4 ================

কুরবাণী: ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

এ কে এম সালাহ উদ্দীন

প্রারম্ভিকা ঃ

          পৃথিবীর ইতিহাসে আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত কুরবানী। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃক পুত্র, ইসমাঈল (আঃ) কে আল্ল¬াহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার বিরল ঘটনা থেকে মূলত ঃ কুরবানী প্রথা চালু হয়েছে। তবে ধরন ও কারণ ভিন্ন হলেও কুরবানীর ইতিহাস আরো প্রাচীন। মানব ইতিহাসের সূচনা কালেই আদম (আঃ) এর দুপুত্র হাবিল ও কাবিল কর্তৃক কুরবানী পেশের ঘটনা পবিত্র কুরআন মাজীদে বিবৃত হয়েছে। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সকল যুগে সকল উম্মতের উপর ছিল। আল্ল¬াহ পাক বলেন, আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেনো তারা আমার দেয়া পশুর উপর আল্ল¬াহর নাম নিতে পারে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মা হাজিহিল উজাহী ? এইসব কুরবানী  (কেমন) জবাবে রাসূল (স.) বলেছিলেন, সুন্নাতু আবিকুম ইব্রাহীম অর্থাৎ এই কুরবানী তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত। পৃথিবীর ইতিহাসের মত পুরানো কুরবানীর ইতিহাস। ঐতিহ্যবাহী এই কুরবানী প্রথা সারা বিশ্বের মুসলিম এমনকি অমুসলিম সমাজেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। কুরবানী তথা উৎসর্গের এই প্রথা বিশ্ব সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। মূলত কুরবানীর প্রচলন হয়েছে আল্ল¬াহর প্রতি একচ্ছত্র আনুগত্য প্রকাশ ও তার নির্দেশ পালনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা ও মহান নিদর্শন । আলোচ্য প্রবন্ধে কুরবাণীর মহান শিক্ষা, ঐতিহ্য, দেয়ার জন্য। পশু জবেহের মাধ্যমে নিজের পশুত্বকে ত্যাগের এক ঐতিহাসিক মূল্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তার প্রভাব তুলে ধরার প্রয়াস পাব।

১.       সূরা আল মায়িদা-২৭

২.       সূরা হজ্জ-৩৪

৩.       মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজী

কুরবানীর অর্থ ঃ

          কুরবানী শব্দটি আরবী  قربশব্দ থেকে নির্গত। কুরব শব্দের অর্থ নৈকট্য শব্দটি  লাভ। সেই ভিত্তিতে যে বস্তু কারো নৈকট্য লাভের উপায় হিসাবে ব্যবহৃত হয়, সেটাকে কুরবানী বলা হয়। ইংরেজীতে বলা হয়-ঝধপৎরভরপব, ওসসড়ষধঃরড়হ, ঙনষধঃরড়হ, ঙভভবৎরহম বঃপ.

শরীয়াতের পরিভাষায় কুরবাণী হচ্ছে, আল্ল¬াহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট তারিখে বিধান মুতাবিক বিশেষ পশু আল্ল¬াহর নামে জবেহ করা المرادف গ্রন্থে قربان শব্দের অর্থে যে বলা হয়েছে অর্থাৎ বস্তু দ্বরা আল্ল¬াহর নৈকট্য অর্জন করা যায়।

ঘবি পড়সঢ়ধপঃ ড়ীভড়ৎফ উরপঃরড়হধৎু ঃযবংধঁৎঁং ড়িৎফঢ়ড়বিৎ মঁরফব গ্রন্থে বলা হয়েছে-ঞযব শরষষরহম ড়ভ ধহ ধহরসধষ ড়ৎ ঢ়বৎংড়হ ড়ৎ ঃযব মরারহম ঁঢ় ড়ভ ধ ঢ়ড়ংংবরড়হ ধং ধহ ড়ভভবৎরহম ঃড় ধ এড়ফ ড়ৎ এড়ফফবংং, অহ ধহরসধষ ড়ৎ ঢ়বৎংড়হ ড়ৎ ড়নলবপঃ ড়ভভবৎবফ রহ ঃযরং ধিু; অহ ধপঃ ড়ভ মরারহম ঁঢ় ংড়সবঃযরহম ধৎব াধষঁবং ভড়ৎ ঃযব ংধশব ড়ভ ংড়সবঃযরহম ঃযধঃ রং সড়ৎব রসঢ়ড়ৎঃধহঃ.

মোট কথা প্রাণপ্রিয় বস্তুকে আল্ল¬াহর রাহে উৎসর্গ করা আল্ল¬াহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি কামনা প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করাকেই কুরবানী বলা হয়। মুসলিম বিশ্বে যিলহজ্জ মাসের ১০,১১, ও ১২ তারিখ আল্ল¬াহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনায় প্রতীকীভাবে পশু জবেহের মাধ্যমে কুরবানী পালন করা হয়। কুরআন মাজীদে কুরবানী বুঝাতে ৭(জবেহ), ৮ (নহর), ৯(মানসিক) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

৪.       অৎধনরপ-ঊহমষরংয উরপঃরড়হধৎু ঔগ. ঈড়ধিহ চ.৭৫৫

৫.       المرادف পৃ-৫১৭

৬.       ঘবি পড়সঢ়ধপঃ ড়ীভড়ৎফ উরপঃরড়হধৎু ঃযবংধঁৎঁং ্ ড়িৎফঢ়ড়বিৎ মঁরফব-চ.৭৮৮

৭.       يا بني إني أرى في الأنعامহে বৎস আমি স্বপ্নেœ দেখেছি আমি তোমাকে যবেহ (কুরবাণী) করছি। সূরা সাফ্ফাত-১০২

৮.       فصل لربك وانحرঅতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ন এবং কুরবাণী করুন। সূরা কাওসার-০২

৯.       ولكل أمة جعلنا منسكاআর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবাণীর বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি। সূরা হজ্জ-৩৪

কুরবানীর সূচনা ঃ

          হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে প্রতিটি ধর্মে কুরবানীর নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান। আল্ল¬াহ ইরশাদ করেন ولكل أمة جعلنا منسك ليذكروا اسم الله على ما رزقهم من بهيمة الأنعام  ।১০

অর্থাৎ আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেনো তারা আমার দেয়া পশুর উপর আল্ল¬াহর নাম নিতে পারে। তোমাদের ইলাহ তো একমাত্র আল্ল¬াহ। সুতরাং তারই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।

          প্রত্যেক ধর্মে কুরবানীর বিধান থাকলেও তা পালনের পদ্ধতিগত পার্থক্য ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদায় হযরত আদম (আঃ) এর পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। ঘটনাটি সংক্ষেপে তুলে ধরছি। ১১

          যখন হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও বংশ    বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন একশ্রেণীর ভ্রাতা-ভগ্নী ছাড়া হযরত আদমের আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভ্রাতা-ভগ্নী পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্ল¬াহ তায়ালা উপস্থিত প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে আদম (আঃ) এর শরীআতে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগহণ করবে নির্দেশ জারি করেন, তারা পরস্পর সহোদর ভ্রাতা-ভগ্নী গণ্য হবে সুতরাং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্ম গ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারিনী  কন্যা সহোদর ভগ্নী গণ্য হবে না। তাই তাদের পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে।

১০.     সূরা হজ্জ-৩৪

১১.     তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন পৃ.-৩২৪ [সূরা আল মায়িদা ২৭ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য]

ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সহোদর ভগ্নটি ছিল সুশ্রী, তার নাম ছিল আকলিমা এবং হাবিলের সহজাত ভগ্নীটি ছিল অসুন্দরী, তার নাম ছিল গাজা। বিবাহের সময় হলে, নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত অসুন্দরী কন্যা কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্র হয়ে গেল। সে জেদ ধরল যে, আমার সহজাত ভগ্নীকেই আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। হযরত আদম (আঃ) তার শরীআতের আইনের প্রেক্ষিতে কাবিলের মতভেদ দূর করার জন্যে বললেন, তোমরা উভয়ে আল্ল¬াহর জন্য নিজ নিজ কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী গৃহীত হবে, সেই উক্ত কন্যার পানি গ্রহণ করবে। হযরত আদম (আঃ) এর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, যে সত্য পথে আছে, তার কুরবানীই গৃহীত হবে। তৎকালে কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীর বস্তুকে ভস্মিভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যে কুরবাণী অগ্নিতে ভস্মিভূত হত না তা প্রত্যাখ্যাত বলে গণ্য করা হত। হাবিল ভেড়া বা দুম্বা আর কাবিল শষ্য, গম কুরবানীর জন্য রাখল। আকাশের অগ্নিশিখা হাবিলের কুরবাণী ভস্মিভূত করে গেল আর কাবিলের কুরবানীকৃত  বস্তু পড়েই থাকল এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না। তাই সে হাবিলকে হত্যা করে ফেলল। হাবিল ও কাবিলের কুরবাণীর ঘটনা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

واتل عليهم نبأ ابن آدم بالحق – إذ قربا قربانا فتقبل من احدهما ولم يتقبل من الآخر – قال لا فتلنك – قال إنما يتقبل الله من المتقين (مائده ২৭  ) 

১২.     সূরা আল মায়িদা-২৭

তাদেরকে আদমের দুপুত্রের ঘটনাটি ঠিকভাবে শুনিয়ে দিন। তা হচ্ছে এই যে, তারা দুজনেই কুরবানী করলল। একজনের কুরবানী কুবল করা হলো আরেকজনের কুরবানী কবুল করা হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করবো। উত্তরে সে বলল, আল্ল¬াহ তো মুত্তাকীদের (খোদাভীরু) কুরবানী কবুল করেন। হাবিল ও কাবিল কর্তৃক পেশকৃত কুরবানীই ইসলামের ইতিহাসের প্রথম কুরবাণী।  ইতিহাস বর্ননার কারন হলো কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা। কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে এর তাৎপর্য উদঘাটনের নিবীড় সর্ম্পক রয়েছে। প্রবন্ধের যথাস্থানে তা বর্ণনা করব।

কুরবানীর ধারাবাহিকতা ঃ

          বর্ণিত আছে, হযরত নূহ (আঃ) জন্তু জবেহ করার জন্য একটি কুরবানীগাহ নির্মাণ করেছিলেন। যেখানে তিনি জবেহকৃত জন্তু আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দিতেন।

 ইসলাম ধর্মে আল্ল¬াহর উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গ (জবেহ) করা হলেও বিশ্বের নানাদেশ ও জাতির মধ্যে মানব বলি দেয়ার মর্মন্তুদ প্রথাও চালু ছিল এবং বর্তমানেও কিছু কিছু পরিলক্ষিত হয়। মানুষ বলীদানের মত ঘটনা আজকের তথাকথিত সভ্য সমাজেও বিরাজমান যা অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তব।

 প্রাচীনকালে আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের মধ্যে মানব বলী দেয়ার কথা জানা যায়। বিশেষত, মেক্্িরকোর বিভিন্ন আদিম সম্প্রদায় বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে দেবতার নামে মানুষ উৎসর্গ করত।  এবং তারা অধিকাংশই অবিবাহিত যুবতীদের উৎর্সগ করত। মজার ব্যাপার এই যে আফ্্িরকার ইদম অধিবাসীদের মধ্যে অনুরূপ প্রথা চালু ছিল। এইসব কন্যা, রাজা, বাদশাহ -

১৩.     অগ্রপথিক, নভেম্বর ২০০৯ পৃ. ৯৩

১৪.     প্রাগুক্ত পৃ. ৯২

১৫.     মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল¬াহ সিদ্দিকী মুসলি¬ম উৎসব ঐতিহ্য পৃ. ৩২৬

নেতৃস্থানীয় সমাজপতি এবং ধর্ম গুরুদের নিকটই লালিত পালিত হত। প্রাচীন মিশরীয় ও গ্রীক রোমানদের মধ্যে নরবলি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন মিশরীয় বা নীল নদের নামে একজন করে কুমারী কন্যা প্রতি বছরই উৎসর্গ করত। মেয়েটিকে তারা নীলনদে ডুবিয়ে দিত। তাদের বিশ্বাস ছিল তাতে নদী সন্তুষ্ট হয়ে দেশকে পানিতে সয়লাব করে দিবে এবং এতে দেশের মহাকল্যাণ সাধিত হবে। মিশরে মুসলমানদের করাগত হওয়ার পর এ জঘন্য প্রথা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে গভর্ণর আমার ইবনুল আস (রাঃ) হযরত উমর (রাঃ) এর কাছে চিঠি লিখেন। হযরত উমর (রাঃ) সমাজ থেকে এ কুসংস্কার চিরতরে বন্ধের জন্য নির্দেশ দেন এবং নীলনদের নামে একটি পত্র লিখেন।

          হে নীলনদঃ তুই যদি নিজ থেকেই পানি প্রবাহিত করে থাকিস, তাহলে তোর প্রয়োজন আমাদের নেই। আর তুই যদি আল্ল¬াহর হুকুমে পানি প্রবাহিত করে থাকিস, তাহলে আল্ল¬াহ তালার কোন কুমারী কন্যার প্রয়োজন নেই।

          প্রাচীন গ্রীকদের মধ্যে দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছোট ছেলেদের তাদের প্রধান দেবতার নামে উৎসর্গ করার প্রথা চালু ছিল। জুস নামক দেবতার নামে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তারা এ প্রথার অনুসরণ করত। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া এবং দেবতাদের তুষ্ট করার জন্য এসব নরবলির প্রথা চালু ছিল। ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে পাঠা বলিদানের প্রথা চালু আছে। আরব দেশেও প্রাচীনকালে আতিয়া ও ফারা নামক দু শ্রেণীর বলি উৎসর্গ প্রথা চালু ছিল।

১৬.     প্রাগুক্ত পৃ. ৩২৬

১৭.     অগ্রপথিক নভেম্বর ২০০৯ পৃ. ৯২

হযরত মূসা (আঃ) এর সময়ে একটি জবেহ বা কুরবানীর ঘটনা সূরা বাকারাহ এর ৬৮-৭৩ আয়াতে বিবৃত হয়েছে। বণী ইসরাঈলে এক ব্যক্তি (আমিল) নিহত হয়েছিল, তার হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। তখন আল্ল¬াহর নির্দেশে মূসা (আঃ) তাদেরকে একটি গাভী জবেহ করে তার এক টুকরো গোশত দ্বারা নিহত ব্যক্তিটির দেহে আঘাত করতে বলেন। তারা নানা হঠকারিতার পরে তদ্রুপ কাজ করলে নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে উঠেন এবং হত্যাকারীর নাম বলে দিয়ে মারা যান। আরব জাহিলী যুগের একটি ঘটনার কথা ইতিহাসে ও সীরাত গ্রন্থে উলে¬¬খ আছে। তখনকার লোকেরা দেবতার নামে তাদের সন্তানদেরকে কুরবানী করত। রাসূলুল্ল¬-াহ (স.) এর দাদা আব্দুল মুত্তালেব বন্ধ হয়ে যাওয়া জমজম কুপ খননের সময় এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন। তার একমাত্র সন্তান হারেস ব্যতীত তখন আর কেউ এ ব্যাপারে তার সহায়তাকারী ছিল না। আব্দুল মুত্তালেব এ অবস্থায় মান্নাত করলেন যে, তার যদি দশজন পুত্র জন্ম লাভ করে, তাহলে অন্য লোকের সহযোগিতার নামে উৎসর্গ করবেন। তার পুত্র সংখ্যা দশজন হলে তিনি একজনকে কুরবানী দেয়ার জন্য লটারী দিলেন, লটারীতে আব্দু¬ল্লাহর নাম আসে। তিনি আব্দু¬ল্লাহকে জবেহ করতে মনস্থ করলেন। কিন্তু কুরাইশরা এতে বাধা দিল এবং  পরামর্শ দিল একজন ভবিষ্যৎ বক্তার নিকট যেতে। গণক পরামর্শ দিল, একটি পাত্রে আব্দু¬ল্লাহ নাম ও দশটি উটের নাম লিখতে লটারীতে যতবার আব্দু¬ল্লাহ নাম আসবে ততবার দশটি করে উটের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। আব্দুল মুত্তালেব কথামত কাজ করলেন। উটের সংখ্যা একশতে পরিণত হলে আব্দু¬ল্লাহর পরিবর্তে উটের নাম আসে। অতঃপর আব্দুল মুত্তালেব একশতটি উট জবেহ করেন, আব্দু¬ল্লাহ রক্ষা পেয়ে যান। এই আব্দু¬ল্লাহ

১৮.     সূরা বাকারা ৬৮-৭৩ [ফাতহুল কাদীর-সংশি¬ষ্ট আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য]

১৯.     সীরাত ইবনে হিশাম-১ম খন্ড পৃ. ১৪২-১৪৭

ছিলেন রাসূল (স.) এর পিতা এজন্য রাসূল (স.) বলতেন, انا ابن الذبحين আমি দুই জবেহকৃতের সন্তান। কেননা রাসূল (স.) এর পূর্বপুরুষ ইসমাঈল (আ.) কুরবানীর জন্য পেশাকৃত ছিলেন। ২০

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কুরবানী ঃ

          সারাবিশ্বে মুসলিম সমাজে প্রচলিত কুরবানী মূলত ঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃক পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে আল্লাহর রাহে উৎসর্গের ঘটনা থেকে প্রচলিত হয়েছে। আল্লাহপাক প্রত্যেক নবী ও রাসূল (স.) কেই পরীক্ষা করেছেন। মহা সংকটে ফেলে, বিপদাপদ সন্তানহীন রেখে ঈমানী দৃঢ়তার শিখা শিক্ষা দিয়ে ও পরীক্ষা নিয়েছেন। কুরআন মাজীদে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন-و إذا ابتلى غبراهيم ربه بكلمات فاتمهن – قال إني جاعلك للناس أماما – قال ومن ذريتي – قال لا ينال عهد الظالمين

(আর স্মরণ কর!) যখন ইব্রাহীমকে তার রব কতিপয় বিষয়ে (তার আনুগত্যের) পরীক্ষা নিলেন, অতঃপর তা পুরোপুরি সে পূরণ করল, আল¬াহ তাআলা বললেন, (এবার) আমি তোমাকে মানবজাতির জন্যে নেতা বানাতে চাই।তিনি বললেন,আমার ভবিষ্যৎ বংশধরেরাও (কি নেতা হিসাবে বিবেচিত হবে) ? আল্লাহ বললেন, আমার এ প্রতিশ্রতি যালিমদের কাছে পৌঁছাবে না। ২১

          হযরত ইব্রাহীম (আঃ) দীর্ঘ ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। প্রথম জীবনে নমরুদের তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশত্যাগ করেছিলেন। এক সময় পিতৃসূলভ স্বভাববশত ঃ তিনি   সন্তানের আশায় আল্লাহর দরবারে

২০.     ইবনে হিশাম ১ম খন্ড পৃ. ১৪২-১৪৭

২১.     সূরা বাকারা-১২৪

প্রার্থনা করে বলেন, ربي هب ليمن الصلحين

হে আমার পরওয়ার দিগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর।

জবাহে আল্লাহ বলেন, فبشرناه بغلام حليم

সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ৮৭ বছর বয়সে আল্লাহর কৃপায় পুত্র সন্তান লাভ করলেন। মা হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। জম্মের পর শিশু পুত্র দ্বারা আল্লাহর তাআলা ইব্রাহীম (আঃ) কে পরীক্ষায় ফেলেন। শিশু ইসমাঈল ও তার মা হাজেরাকে নির্জন জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে রেখে আসার নির্দেশ অম্লান বদনে পালন করেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। মহান আল্লাহর নির্দেশ জেনে মা হাজেরা কোন অভিযোগ, অনুযোগ ছাড়াই স্বামী কর্তৃক এ নির্বাসন মেনে নেন। মরু প্রান্তরে মা হাজেরার অক্লান্ত পরিশ্রমে শিশু ইসমাঈল (আঃ) বড় হতে থাকেন। মহান আল্লাহ যাকে মুসলিম মিল্ল¬¬াতের সর্দার, নেতা নির্বাচন করবেন তাকে তার যোগ্য করে গড়ে তুলবেন এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহীমকে (আঃ) ঈমাণী দৃঢ়তা ও আনুগত্যের এক চরম পরীক্ষার সামনে ফেলে স্বপ্নে জানিয়ে দিলেন, ইব্রাহীম তোমাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানকে জবেহ কর। আল্লাহর নির্দেশ অকপটে মেনে নিয়ে ইব্রাহীম (আঃ) প্রস্তুতি নিতে থাকলেন পৃথিবীর ইতিহাসে এক লোমহর্ষক ঘটনার। মানুষ যে সময়ে-

২২.     সূরা সফ্ফাত- ১০০

২৩.     সূরা সফ্ফাত-১০১

২৪.     বুখারী-৩৩৬৪

সন্তানের মায়ায় আবদ্ধ থেকে ভবিষ্যত জীবনে নানা প্রাপ্তির হিসাব নিকাশ করে, যখন সন্তানের সহযোগিতায় কিছু গড়া ও করার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যত জীবন যাপনকে নিরাপদ করে। ঠিক সে সময়ে আসলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা। যে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে যেকোন বাবা-মাই নিস্কৃতি চাইবে। পৃথিবীর কোন বাবার জন্য এর চেয়ে কষ্টের ও মনোবেদনার আর কিছু থাকতে পারে কি? নিজের হাতে নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানকে জবেহ করা। ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েও কোন ফেরেশতার সহায়তা ও নিরাপত্তা চাননি। তিনিই তো সেই ব্যক্তি যিনি সারা দেশের এমনকি নিজের পিতার বিরোধিতা করে দেবমূর্তি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করেছিলেন। তিনিই তো সেই ব্যক্তি যিনি শিশু পুত্রসহ স্ত্রী হাজেরাকে বিরান প্রান্তরে রেখে গিয়েছিলেন। তার মত বিশ্বাসী ও খোদার অনুগত রাসুল কি এ পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পারেন? কখনই নয়, শয়তানের স্বপ্নসাধকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহর আনুগত্যে অটল থেকে ইব্রাহীম (আঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন। আমার আল্লা¬হর সন্তুষ্টির কাছে পৃথিবীর সকল কিছুই নস্যি। আমি দিব সেই মহা পরীক্ষা যা ইতিহাসে কেউ দেয়নি, দিতে চাইবেও না। ইব্রাহীম (আঃ) প্রাণপ্রিয় পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশ ও তার গৃহীত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিলে। যে ইব্রাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক।

فلما بلغ معه السعى قال يبنى إني أرى في المنام أني أذبحك فانظر ماذا ترى- قال يابت افعل ما تؤمر ستجدني إن شاء الله من الصبرين ........................وتركنا عليه في الأخرين - سلام على إبراهيم

২৫.সূরা সাফ্ফাত-১০২-১০৮

ইব্রাহীম (আঃ) ও পুত্র ইসমাঈল (আঃ) আল্লাহর হুকুমের কাছে যেভাবে আত্মসমর্পন করেছেন তা পৃথিবী বাসীর জন্য বিরল ঘটনা। এজন্য মহান রব্বুল আলামীন এ মহান ঘটনাকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষের জন্য শিক্ষনীয় হিসাবে চালু রেখেছেন। ইসমাঈলের পরিবর্তে সেদিন যে বেহেশতী দুম্বা এসেছিল তদরূপ পশু জবেহের প্রথা চালু রেখে সেদিনের সে ত্যাগকে চিরকালীন শিক্ষনীয় ও করণীয় হিসাবে জগৎবাসীর সামনে পেশ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত পশু কুরবানী উপরোক্ত ঘটনার পরই প্রবর্তিত হয়েছে।

মুহাম্মদ (স.) এর সময় কুরবানীর প্রবর্তণ ঃ

          জাহেলী সমাজের বাতিল আনন্দ উৎসব ও সংস্কৃতি পরিহার করে ইসলাম তার আদর্শের ভিত্তিতে দুই ঈদ প্রবর্তন করেছে। হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম (স.) আগমনের পর দেখলেন মদীনাবাসীদের দুটি উৎসবের দিন রয়েছে, এ উৎসবে তারা খেলাধুলা করে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এ দুটি দিন কি ? তারা বললো, জাহেলী যুগে আমরা এই দিনে আনন্দ-উৎসব, খেলাধুলা করতাম। রাসূল (স.) বললেন, আল্লাহ তাআলা সেই দুদিনের পরিবর্তে সেগুলো অপেক্ষা উত্তম দুটি দিন তোমাদের দান করেছেন। একটি হলো ঈদুল আযাহা বা কুরবাণীর ঈদ। আর অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন। সেই থেকে মুসলমানদের বার্ষিক উৎসবের দিন হিসাবে এ দুদিন ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে পালিত হয়ে আসছে। মক্কার ওকায মেলার সময়ও মক্কাবাসী অনন্দ উৎসব করতো এবং পশু কুরবানী করে কাবার সামনে রেখে দিতো।

          (মুসনাদে আহমদ)

পবিত্র কুরআনে নবী করীম (স.) কে নামাযের মত কুরবানী করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে তোমার রবের জন্য নামায পড় এবং কুরবানী করো।

 আব্দুল্ল¬াহ ইবন উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি প্রতি বছর কুরবানী করতেন। অপর স্থানে বলা হয়েছে, নবী (স.) মদীনায় দশ বছর অবস্থান করেন। এ সময়  সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করে না, সে যেনো আমাদের ঈদগাহের দিকে না আসে। এ থেকে বোঝা যায় নবী করীম (স.) কে কুরবানীর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি নিজে কুরবানী করেছেন এবং উম্মতকে কুরবানীর নির্দেশ দিয়েছে। মহানবী (স.) বিদায় হজ্জের সময় নিজ হাতে ৬৩টি জন্তু কুরবানী দিয়েছিলেন।

          কুরবানী তথা আত্মত্যাগের মাধ্যমে মহান প্রতিপালকের সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভের উদাহরণ কুরআন হাদীস ও ইতিহাসে অপ্রতুল নয়। যেখানেই কোন ঘটনা আছে সেখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে প্রাপ্তির ত্যাগ ও বিসর্জনের ইতিহাস। পৃথিবীতে কোন কিছুই ত্যাগের ও আনুগত্যের সামনে জাগ্রত করাই পরীক্ষা ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। এ শিক্ষা মানবজাতির কুরবানী প্রথা প্রচলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। ঈমাণের দাবী পূরণ করতে হলে স্ত্রী-পুত্র পরিজনের ভালবাসা, দেশের প্রতি টান, ধন-ঐশ্বর্যের কামনা সর্বপরি দুনিয়ার মোহ প্রতিবন্ধক হিসাবে বাঁধা হিসাবে আমাদের সামনে আসবে। কুরবানীর শিক্ষা ও ঐতিহ্য হলো এ সমস্ত প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে লক্ষ্য পানে এগিয়ে যেতে হবে দ্বিধাহীনভাবে।

২৭.     সূরা কাওসার ০২

২৮.     মুসলিম উৎসব ঐতিহ্য পৃ. ৩২৫

 

 

কুরবাণীর শিক্ষা ঃ

                   পবিত্র কুরআন মাজীদে হাবিল-কাবিলের কুরবাণীর ঘটনা, হযরত ইব্রাহীম-ইসমাঈল (আঃ) এর কুরবানীর ঘটনা এমনি এমনিই আলোচিত হয়নি। মানবজাতির সামনে কুরবানীর উদ্দেশ্য, গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা ও শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। শুধু তাই নয় কুরবানীর শিক্ষা যেন সবিস্তারে চিরজাগরুক থাকে তার জন্য প্রতি বছর পশু কুরবানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পশু কুরবানীর মাধ্যমে শুধু গোশত খাওয়া বা আনুষ্ঠানিকতা পালন নয় ইব্রাহীমী জিন্দেগী অনুসরণে আমরা যেন দৃঢ়কল্প হই তারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাস সম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুরবানীর তাৎপর্য ও শিক্ষা নিচে তুলে ধরছি।

তাকওয়া অর্জন ঃ

                   বিবাহ সংকান্ত জটিলতায় হাবিল ও কাবিল যখন খোদার রাহে কুরবানী পেশ করল তখন হাবিলের কুরবাণী কুবল হল। আর কাবিলের কুরবাণী কবুল না হওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হলো এবং হাবিলকে হত্যা করতে চাইল। এ সময় হাবিল বলেছিলেন,   إيما يتقبل الله من المتقين অর্থাৎ মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই তো (কুরবানী) গোশত, রক্ত, পশম নয় কুরবাণী দাতার তাকওয়াকেই কুবল করেন। কুরবানী গ্রহণ করেন।  অন্য সূরায় বর্ণিত হয়েছে আল্লাহ কুরবানীর  আমাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার শিক্ষা দেয়।

          (সূরা আল মায়িদা-২৭)

ভাল জিনিসই গ্রহণযোগ্য ঃ

                   উৎসর্গের জন্য, অন্যকে কিছু দেয়ার জন্য আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য প্রয়োজন উত্তম জিনিস কুরবাণী করা। নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করতে না পারলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়। হাবিল উত্তম বস্তু কুরবানীর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন আর কাবিল অনাগ্রহের সাথে অনুত্তম বস্তু কুরবানীর জন্য পেশ করেছিল। তাই তার কুরবানী গৃহীত হয়নি। সূরা আলে ইমরানে বলা হয়েছে বলা -- لن تنا لو البر حتي تنفقو ا مما تحبون وما تنفقوا من شيء فإن الله به عليم (العمران - ৯২)

          কখনই তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর আল্লাহ তা জানেন। ৩০

          ইব্রাহীম (আঃ) তার প্রাণপ্রিয় সন্তানকে আল্লাহর রাহে কুরবানী করেছিলেন।

আইনের পতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ঃ

          হাবিল-কাবিলের ঘটনায় কাবিল ক্ষুদ্ধ হয়ে হাবিলকে হত্যা করতে চাইলেও হাবিল অসহিষ্ণু ও ক্ষুদ্ধ হননি, বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আল্লাহর উপর ভরসা ও তাকে ভয় করেছেন।

৩০.     সূরা আলে ইমরান ৯২

আল্লাহর নির্দেশ সহজে মেনে নেয়া ঃ

          বনী ইসরাইলদের এক ব্যক্তিকে খুন করা হলে হত্যাকারী চিহ্নিত করার জন্য মূসা (আঃ)    আল¬াহর নির্দেশে গাভী কুরবাণীর নির্দেশ দেন কিন্তু হঠকারী জাতি ইসরাঈলীরা গাভীর ধরণ, রং, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নানা বিষয় জানতে চেয়ে গাভী খুঁজে জবেহ করে। এখানে আল্লাহর নির্দেশ সহজে মেনে নিলে বর্ণি ইসরাঈলীদের কষ্ট স্বীকার  ও বিপুল অর্থ ব্যয় করার চেয়ে শেষ অবধি অর্থব্যয়ে কাঙ্খিত হতো না। এ ঘটনা আমাদেরকে হঠকারিতা পরিহারের শিক্ষা দেয়।

আখিরাতের ভয় করা ঃ

          উপরি বর্ণিত ঘটনায় মৃত গাভীর এক টুকরো গোশত মৃত ব্যক্তির শরীরে আঘাত করায় নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেয়। এ থেকে আমাদের শিক্ষানীয় বিষয় হলো আমরা কেউই জবাবদিহিতা ও আল্লাহর বিচারের বাইরে নই। আমাদের পরকালে জীবিত করে যাবতীয় ভাল-মন্দের হিসাব নেয়া হবে।

          (সূরা আল মায়িদা ২৮)

          (সূরা আল বাকারা ৬৮-৭৩)

আল¬াহর নির্দেশ পালনে অবিচল থাকা ঃ

          হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিজ পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে জবেহ করার জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও অবিচল ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। তিনি ইব্রাহীমের ঈমানী দৃঢ়তা ও আনুগত্যের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। তাইতো ইব্রাহীম (আঃ) যখন পূর্ণভাবে আনুগত্য প্রকাশ করে পিতৃ সত্তা বির্সজন দিয়ে বান্দার সত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে ইসমাঈল কে উৎসর্গে অগ্রসর হন তখন আল্লাহ তাআলা দুম্বা পাঠিয়ে তা কুরবানী করান। এবং পরবর্তী মানবগোষ্ঠীর জন্য তা আদর্শ ও অনুকরণীয় স্বরূপে কিয়ামত পর্যন্ত চালু রাখার ব্যবস্থা করেন। এখানে লক্ষণীয় আল্লাহ তাআলা পশু কুরবানী প্রথা চালু করে লক্ষ লক্ষ পশু জবেহের উৎসব নয়, পশু জবেহের মাধ্যমে ইব্রাহীম জীবন ও চেতনা জাগ্রত রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য প্রকৃত কুরবানী তখনই গৃহীত ও পালিত হবে যখন অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে অবিচল ইব্রাহীম (আঃ) এর জীবন অনুসৃত ও ইব্রাহীমী গুণ মানুষের মাঝে প্রস্ফুটিত হবে। এজন্য কুরআনে বলা হয়েছে। তোমরা ইব্রাহীমের আদর্র্শের অনুসরণ কর। একজন কুরবানীদাতার মধ্যে যেমন ইব্রাহীম গুণ থাকা প্রয়োজন তা বর্ণনা করছি।

আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ঃ

          আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার ফলেই ইব্রাহীম (আঃ) অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েও গায়রুল্লাহর সাহায্য গ্রহণ করেননি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ সকল কিছুর স্রষ্টা হিসাবে সর্বশক্তিমান। কাজেই স্রষ্টার ইচ্ছা না হলে সম্রাট নমরূদের অগ্নিকুন্ডের আগুন ও দহন শক্তিহীন হতে বাধ্য। বস্তুত ঃ নমরুদের অগ্নিকুন্ড নাতিশীতোষ্ণে পরিনত হবার মধ্য দিয়ে তার বিশ্বাসেরই বাস্তব ফলশ্রতি মিলেছে। কুরআনের ভাষায়قلنا يا نار كوني بردا وسلاما على إبراهيم  অর্থ-আমি বললাম ঃ হে অগ্নি তুমি ইব্রাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।

বাতিল ও তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে আপোষহীন ঃ

          বাতিল ও তাগুতী তথা শয়তানী কু চক্রীদের বিরুদ্ধে সর্বদা আপোষহীন হতে হবে। তাদের ষড়যন্ত্র ও হুমকিতে ভীতি হওয়া যাবে না।

তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া ঃ

          আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু, অন্য কাউকে শক্তিশালী মনে করাই শিরক। কারো অন্তরে শিরক থাকলে সে আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না। এজন্য অন্তরকে শিরক মুক্ত করে তাওহীদে বিশ্বাসী হতে হবে। একমাত্র তাওহিদী ঐক্যই সমাজে আনতে পারে শান্তি, সাম্য, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার।

(সূরা আম্বিয়া ৬৯)

আদর্শ সমাজ গঠনে তৎপর হওয়া ঃ

          ইব্রাহীম (আঃ) মানুষের অন্তরকে শুধু শিরকমুক্ত করতে সচেষ্ট ছিলেন না, তিনি সমাজ থেকেও শিরক উচ্ছেদ করে তাওহীদি আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সেই চেতনায় উদ্বৃদ্ধ হয়ে কাজ না করলে প্রতি বছর কুরবানীর পশু জবেহ হবে। ঈদ আসবে কিন্তু আসবে না শোষণমুক্ত, অনাচারমুক্ত সমাজ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার শহীদী ঈদ কবিতায় বলেছেন-

পশু কুরবানী দিস তখন

আজাদ মুক্ত হবি যখন

জুলুম মুক্ত হবে রে দ্বীন

কুরবাণীর আজ এই যে খুন

শিখ হয়ে যেন জ্বালে আগুন,

জালিমের যেন রাখো না চিন।

 

সর্বস্ব ত্যাগের শিক্ষা ঃ

          ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর দীন পালন করতে গিয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন। আমাদেরকেও সে চেতনায় উজ্জীবিত হবে হবে। ইব্রাহীম (আঃ) প্রথমে মাতৃভূমি, পরে স্ত্রী, সন্তান, পরবর্তীতে পুত্রকে পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন। শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। আমাদেরকেও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে।

নিঃশর্তভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালন ঃ

          বাস্তবে বা জাগ্রত অবস্থায় ওহী নাযিলের মাধ্যমে নয় ইব্রাহীম (আঃ) কে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নের মাধ্যমে ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানীর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এতে সহজেই অনুমতি হয় ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ পালনে কতটা নিঃশর্ত ও নিঃশঙ্ক ছিলেন।

আদর্শ পরিবার গঠন ঃ

                   কুরবানীর ঘটনা আমাদের আদর্শ পরিবার কেমন তার রূপ রেখা। যেমন জানিয়ে দিয়েছে তেমনিভাবে  পরিবার গঠনেও উদ্বুদ্ধ করছে। ইব্রাহীম (আঃ) এর পরিবারে পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীতে ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তাধারা ছিল না। একমাত্র সন্তানকে জবেহ করে দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেও স্ত্রী স্বামীর, পুত্র পিতার বিরুদ্ধাচারণ করেনটি।

 

মায়ের দায়িত্ব ঃ

          মা হাজেরা যে শিক্ষায় ইসমাঈল (আঃ) কে গড়ে তুলেছিলেন সে শিক্ষার ফলে সন্তান বলতে পেয়েছিলেনقال يابت افعل ما تؤمر ستجدني إن شاء الله من الصبرينহে পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করুন। আল্লাহ চাহে তো আমাকে ধৈর্যশীলদের   অন্তর্ভূক্ত পাবেন।

(সূরা সফ্ফাত ১০৩)

শয়তানের ধোকাকে পদদলিত করা ঃ

কুরবানীর জন্য মিনার দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় মা হাজেরাকে, ইসমাঈলকে এবং ইব্রাহীমকে শয়তান ধোকা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। ইব্রাহীম ও ইসমাঈল পাথর ছুড়ে শয়তানকে বিতাড়িত করেছিলেন। আমাদেরকেও শয়তানের ধোকাকে প্রতিহত করে জীবনযাপন করতে হবে।

পশুত্বকে জবেহ করা ঃ

          মানুষের মধ্যে পশুত্ব আছে। আছে প্রবৃত্তির পূজা। ন্যায়-অন্যায়, হালাল-হারাম, হক না হক কোন কিছুই আমাদের মধ্যে আজ তমিয নেই। দুর্নীতি, অসাধুতা আমাদের সমাজকে ছেঁয়ে ফেলেছে। সামান্য অর্থ, স্বার্থ, পদমর্যাদার লোভে নীতি-আদর্শকে জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করছি না। আমাদের এসব পশু প্রবৃত্তিকে জবেহ করতে হবে। পশু জবেহের মাধ্যমে আমরা যে কুরবানী আদায় করি তা তখনই সফল, কার্যকর ও গ্রহণীয় হবে যখন মনের পশুত্বকে দমন ও জবেহ করতে পারব।

কুরবানী ঃ আমাদের সংস্কৃতি ঃ

          পূর্বেই উলে¬খ করা হয়েছে কুরবানী প্রথা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে তা সচেতন মাত্রই ওয়াকিবহার। প্রশ্ন হলো কুরবাণীর ঐতিহ্যকে আমাদের সংস্কৃতিতে কতটা একিভূত করা পেরেছি ? কতটা বাস্তবায়ন করেছি ? কুরবানীর শিক্ষা থেকে আমাদের দূরত্ব কমছে না বাড়ছে ? আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে কুরবানীর শিক্ষা কতটা এবং কিভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে গেলে আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও কুরবানীর তাৎপর্য থেকে দূরে থাকার চিত্র সহজেই প্রতিভাত হবে।

সংস্কৃতি কী ?

          সংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্ণয়ে অনেকের অনেক মত থাকলেও সহজ কথায় বলা যায়। আমাদের     অন্তনির্হিত বিশ্বাসের নাম সংস্কৃতি। আর বিশ্বাসজাত কর্মকান্ড তার ফল, সংস্কৃতির প্রকাশিত রূপ। অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের যাবতীয় আচার আচরণ, কর্মকান্ডকেই সংস্কৃতি বলা যেতে পারে। তাওহীদী বিশ্বাস সংক্রান্ত ইসলামী বিধান মোতাবেক পালিত ও আচরিত বিষয়াদিকে ইসলামী সংস্কৃতি বলা যায়।

কুরবানীর সংস্কৃতি ও আমরা ঃ

          হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত কুরবানীর যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি তারই স্মৃতি বহন করছে।  আল্লাহর তাআলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন, وفدينه بذبح عظيم وتركنا عليه في الآخرين

অর্থ তার পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। আর আমরা এ ব্যবস্থা পরবর্তীদের জন্য প্রচলিত করেছিলাম। ৩৫

          কুরবানীর শিক্ষা আমাদেরকে শুধু পশু জবেহ করতে নির্দেশ দেয়নি। কুরবানীর মহা তাৎপর্যের মধ্যে রয়েছে আদর্শ পরিবার গঠন, নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন আল্লাহর বান্দা হওয়ার গুণ অর্জনসহ সর্বপরি ব্যক্তিগত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনের যাবতীয় কল্যাণ ও করণীয়ের দিক নির্দেশনা। এজন্য কুরবানী আমাদের সংস্কৃতির উপর দারুনভাবে প্রভাব কুরবানী করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন রকম, কুরবানী সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক। যেমন-আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। আবার কুরবানীর শিক্ষা বিরোধী কর্মকান্ড ও বেশ শক্তিশালীভাবে বিরাজিত। কুরবানী প্রথার সাথে সংশি¬ষ্ট বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

পশু কুরবানী ঃ

          কুরবানীর প্রধান ও আলোচিত বিষয় পশু জবেহ করা। এর মাধ্যমে ইসমাঈল (আঃ) আর কুরবানীর ঘটনা স্মরণ করা হয়। সন্তানের বদলে পশু কুরবাণীর ব্যবস্থার কারণে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করা কর্তব্য। হজ্জের অন্যতম একটি ওয়াজিব পশু কুরবানী। যা প্রতিবছর হাজীসহ বিশ্বের কোটি কোনটি মুসলিম পালন করে থাকেন।

৩৫.     সূরা সফ্ফাত ১০৭-১০৮

শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ ঃ

          লক্ষ লক্ষ মুসিলমের সমাবেশ হজ্জের সময়ে হাজীগণ মিনার শয়তানকে লক্ষ করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। যা আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় জীবন চলার পথে, আল্লাহ হুকুম নাতে গিয়ে শয়তানী বাধা আসলে তাকে পায়ে দলে সামনে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

নর বলি নিষিদ্ধ ঃ

          প্রাচীন ও বর্তমান সভ্য সমাজের কোথাও কোথাও নরবলির প্রচলন রয়েছে। ইসলাম নরবলি নিষিদ্ধ করে পশু জবেহের নির্দেশ দিয়েছে। যা নানাদিক দিয়ে কল্যাণকর।

সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির শিক্ষা ঃ

          ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম একটি অনুষঙ্গ কুরবানী। কুরবানীর মাধ্যমে ধনী-গরীবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন হয় এবং সৌহার্দ্য সম্প্রীতিভাব গড়ে উঠে। জবেহকৃত জন্তুর গোশত বন্টনের মাধ্যমে আত্মীয় ও প্রতিবেশীর মধ্যে সম্ভাব বৃদ্ধি পায়।

অর্থনৈতিক উন্নতি ঃ

          কুরবানীর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অর্থনৈতিক ও অগ্রগতি সাধিত হয়। পশু পালন ক্রয় বিক্রয়,উন্নত পশুর চামড়া, চামড়া বিক্রিত টাকা মানুষের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব অর্থ থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

কুরবানী কেন্দ্রিক অপসংস্কৃতি ঃ

          কুরবানী ও কুরবানীর ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম দেশ ও সমাজে নানা আনাচার অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। পশু ক্রয়ে নিজের অর্থ বিত্তের অবস্থা জাহির করা, গোশত খাওয়া কেন্দ্রিক পশু কেনা, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না দেয়। ঈদকে কেন্দ্র করে সিনেমা, নাটক, গল্প,উপন্যাস প্রকাশ যার অধিকাংশই অশ্লীলতা ও কুরুচিপূর্ণ বিষয়ে ভরপুর। ঈদের মহিমা ও তাৎপর্যের সাথে এ সবের কোন মিল নেই। কুরবানীর মহান শিক্ষা ত্যাগের পথ মাড়িয়ে অনেকেই অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন, দখল, ভোগ করছে। ব্যক্তি স্বার্থে দ্বীন ইসলামকে পদ দলিত করে অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের পরিবর্তে দূরত্বই সৃষ্টি হচ্ছে।

সমাপিকা ঃ

          বস্তুত নিজের কামনা-বাসনা, ব্যক্তিসত্তা, কষ্টার্জিত সম্পদ ও প্রানাধিক প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির সামনে সমর্পনের উদাত্ত আহবান নিয়েই প্রতি বছর কুরবানীর ঈদ আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। কুরবাণী একদিকে যেমন ত্যাগের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মহান নবী ইব্রাহীম (আঃ) এর ত্যাগদ্বীপ্ত সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস আমাদের স্মৃতিপটে জাগিয়ে দেয়, তেমনি প্রতিটি মুমিন অন্তরকে ঈমাণী চেতনায় করে তোলে উজ্জীবিত। ঈদুল আযহার দিনে কুরবানীর পশুর গলায় ছুরি চালানোর সময় কুরবানীর দাতা যখন উচ্চারণ করে- 

 قل إن صلاتي ونسكي ومحياى ومماتي لله رب العلمين-অর্থ-আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার বেঁচে থাকা, মৃত্যুবরণ সবকিছু বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে। এ কথার দ্বারা একজন কুরবানী দাতা মূলত ঃ নতুন করে আল্লাহর সাথে এই অঙ্গীকারেই আবদ্ধ হয় যে, হে খোদা! হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যেভাবে পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় সকল প্রকার বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তোমার নির্দেশের উপর অটল ছিলেন এবং বাতিলের সাথে আপোষ না কের নিজের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধা করেননি। আমিও ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল¬াহর বিধানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় যাবতীয় প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইব্রাহীমী সুন্নাত কুরবানী এ উম্মতের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে। কারণ ইব্রাহীম (আঃ) এর ত্যাগের ন্যায় অনুরূপ ত্যাগ ও বাধা-বিপত্তি মুহাম্মদ (স.) ও তার উম্মতকে স্বীকার করতে হবে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়। আমরা ইব্রাহীমী ত্যাগের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। কুরবানীর সংস্কৃতিকে গ্রহন করে ইব্রাহীমী ত্যাগে উদ্বৃদ্ধ হয়ে নব্য জাহেলিয়াতের নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে আসীন হতে হবে। যা আল্লাহ পাক ইব্রাহীম (আঃ) কে দিয়েছিলেন। কুরবানীর শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে উঠার এখনই সময়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন

দূর্বল ভীরু চুপরাহ, ওহো খামখা ক্ষুদ্ধ মন!

(কুরবানী)৩৬.   সূরা আনআম ঃ ১৬২

 

 ==============