Font Size

Profile

Menu Style

Cpanel

14December2017

ISO 9001:2008 Certified


Qurbani Fazilat O masla Masael

কুরবানীর ফযিলত ও মাসআলা-মাসায়েল

কুরবানী কী

 

সারা পৃথিবীর মুসলমানদের কাছে কুরবানী শব্দটি অতি পরিচিত একটি শব্দ। কুরবানী বলতে আমরা বুঝি কোন কিছু বিসর্জন করা। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর কুরবানী শব্দের উৎপত্তি হলো قربان কুরবানুন শব্দ থেকে। কুরবানুন শব্দের শাব্দিক অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ। আল্লাহর পথে কোন কিছু ত্যাগ করা বা উৎসর্গ করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করাই কুরবানীর মুল উদ্দেশ্য। শরিয়তের পরিভাষায় কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার নাম কুরবানী। তবে আমাদের সমাজে ঈদুল আযহায় আল্লাহ নির্ধারিত পথে পশু জবাই করাকেও কুরবানী বলে অভিহিত করা হয়। কারণ এর মাধ্যমে মূলত নিজের উপার্জিত সম্পদ আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়া হয়।

 

 

কুরবানী কেন?

কুরবানী একটি অন্যতম ইবাদত। ইসলামী বিধানে ইবাদত তিন রকম। একটি শারীরিক, অন্যটি আর্থিক আর তৃতীয়টি আর্থিক ও শারীরিক। সালাত ও সিয়াম যেমন শারীরিক ইবাদত তেমনি জাকাত ও কুরবানী হলো আর্থিক ইবাদত। তৃতীয় ইবাদত হলো আর্থিক ও শারিরিক যেমন হজ্জ। যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ আছে তারা শারীরিক ইবাদতের পাশাপাশি আর্থিক ইবাদতেও সমান যত্নবান হবেন এটাই আল্লাহর ইচ্ছা। এই লক্ষ্যেই আল্লাহ কুরবানীর বিধান নাজিল করেছেন।

 

কুরবানীর জন্য নিয়ত

 

কুরবানীর জন্য নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। নিয়ত সহিহ না হলে কুরবানী হবে না। ইসলামের যে কোন ইবাদতই এই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। কুরবানীর সূচনাই হয়েছে নিয়তকে কেন্দ্র করে। নিয়ত সহিহ হলে কুরবানী আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়, নিয়ত সহিহ না হলে আল্লাহ কারো কুরবানী কবুল করেন না। মানব সভ্যতার শুরুতে যখন কুরবানীর বিধান চালু হয় তখন থেকেই এই এই ধারা চলে আসছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কুরবানীর সূচনা হয় হযরত আদম আলাইহিস সালামের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানীর মাধ্যমে। তাদের একজনের কুরবানী আল্লাহ কবুল করেন, অন্য জনেরটা করেননি। এই না করার কারণ ছিল সহিহ নিয়তের অভাব। সূরা মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

 

 وَاتلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً فَتُقُبِّلَ مِن أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الآخَرِ قَالَ لاَقْتُلَنَّك َقَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ

 

 

আর তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের ঘটনা ঠিকমত শুনিয়ে দাও। যখন তারা দুই জনেই কুরবানী করলো, তখন তাদের একজনের কুরবানী কবুল হলো, আর অন্য জনের কুরবানী কবুল হলো না।

 

কুরবানীর গোশত বা রক্ত কোন কিছুই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না, আল্লাহর দরবারে পৌঁছে বান্দার তাকওয়া। কুরবানীদাতাই সে গোশত ভোগ করে। গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে কুরবানী করলে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। আমাদের সমাজে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য কে কত দামী পশু কুরবানী করলো তার প্রতিযোগিতা অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক সম্মান বজায় রাখার জন্য কুরবানী করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল  হবে না। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কুরবানীর সহিহ নিয়ত করা অত্যাবশ্যক। নিয়ত পরিশুদ্ধ হলে আল্লাহ বান্দার কুরবানী অবশ্যই কবুল করবেন। যেমন অন্যান যাবতীয় কাজ কর্মের বেলায় হয়।

 

 

কুরবানীর ইতিহাস

 

এ পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাস যত প্রাচীন কুরবানীর ইতিহাসও তত প্রাচীন। আদম আলাইহিস সালামের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ইকলিমাকে বিয়ে করা নিয়ে পেশ করা কুরবানীর মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসে কুরবানী প্রথার সূচনা হয়। এরপর যুগে যুগে বিভিন্ন নবীর ওপর কুরবানীর বিধান এসেছে বিভিন্নভাবে। কুরআন মজীদে ইরশাদ করা হয়েছে:

 

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌفَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ ( سورة الحج-৩৪)

 

আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। যাতে আমি তাদেরকে জীবনের উপকরণ হিসাবে যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (সূরা হজ্জ:আয়াত ৩৪)

 

কিন্তু এ সবই প্রাচীন কালের কথা। বর্তমানে কুরবানীর যে বিধান চালু আছে তার সূচনা ঘটে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আমল থেকে। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বৃদ্ধ বয়সে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করে একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন। এই একমাত্র পুত্রকে নিয়ে তিনি বড় ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হন। সন্তানের বয়স ৯ বছর হলে তিনি এক রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে দেখেন, তিনি তার পুত্রকে জবাই করে আল্লাহর রাহে কুরবানী দিচ্ছেন। নবীদের স্বপ্নও এক ধরনের ওহী। খোদায়ী এই নির্দেশ নবী হিসাবে পালন করা তার কর্তব্য। এর পরের ঘটনা আল্লাহ নিজেই তার কালামে পাকে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন:

 

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ {১০২} فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ {১০৩} وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ {১০৪قَدْصَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ {১০৫} إِنَّ هَذَا لَهُوَالْبَلَاء الْمُبِينُ {১০৬وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ {১০৭وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ {১০৮} سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ {১০৯كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ {১১০سورة الصفات-১০২-১১০

 

অত:পর সে (ইসমাঈল) যখন কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলো তখন ইবরাহীম তাকে বলল, হে আমার প্রিয় সন্তান, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি। এতে তোমার মতামত কি? সে (ইসমাঈল) বলল, হে আমার পিতা, আপনাকে যা হুকুম করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলএবং ইবরাহীম তার পুত্রকে কাত করে শায়িত করল তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যি পালন করলে! এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক সুস্পষ্ট মহা পরীক্ষা। (পরীক্ষায় সে পাশ করল এবং) আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান যবেহ এর বিনিময়ে। এই ঘটনা আমি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রেখেছি। ইবরাহীমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। (সূরা সাফফাত: আয়াত ১০২-১১০)।

 

ত্যাগের কি মহিমান্বিত কাহিনী। আল্লাহর পথে জান-মাল, সহায়-সম্পদ, প্রিয়জন সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার কি অপূর্ব দৃষ্টান্ত। তিনি নবীদের দিয়ে এই শিক্ষা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন যাতে পৃথিবীর মানুষও দীনের জন্য প্রয়োজনে সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। সন্তান পিতামাতার কাছে কতটা প্রিয় তা কোন বাপ-মায়ের কাছেই ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ রাখে না। সে সন্তানকেই যে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে পারে তার কাছে আল্লাহর রাহে অদেয় আর কিছুই থাকতে পারে না। কামনা-বাসনা, সহায়-সম্পদ এসব তো তুচ্ছ বিষয়। বস্তুত বান্দাকে লোভ ও মোহের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই আল্লাহ এ বিধান জারি করেছেন। কারণ লোভ ও মোহ-ই পৃথিবীতে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টির অন্যতম কারণ। পশু তথা সম্পদ কুরবানীর মাধ্যমে আমরা এ সত্যেরই স্বীকৃতি দেই যে, আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং তার আনীত দীনের চেয়ে আমাদের কাছে আর কিছুই অধিক প্রিয় নয়।

 

এর পরের কাহিনী সবাই জানেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন ছেলেকে জবাই করার চেষ্টা করছিলেন এবং ছেলেও আল্লাহর হুকুমের স্বার্থে নিজের জীবন জেনেশুনে বিলিয়ে দেয়ার জন্য ছুরির নিচে মাথা পেতে দিয়েছিলেন তখন আল্লাহ খুশি হয়ে পশুসহ এক ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দিলেন সেখানে এবং পুত্রের পরিবর্তে পশু কুরবানী করার মধ্য দিয়ে এ ঘটনাকে দুনিয়াবাসীর জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা হিসাবে রেখে দিলেন। এই ঘটনার স্মৃতি কেয়ামত পর্যন্ত যেন মানুষ স্মরণ রাখে সে জন্য হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে মুসলিম জাতির পিতা ঘোষণা করে আল্লাহ সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের উম্মতের ওপরও তা ওয়াজিব করে দিলেন। আর নবী মুহাম্মদকে বললেন:

 

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

 

সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। (সূরা কাউসার: আয়াত ২)।

 

 

 

কুরবানীর গুরুত্ব ও ফযিলত

 

 নেক আমল সমূহের মধ্যে কুরবানী একটি বিশেষ আমল। এ জন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম সব সময় কুরবানী করেছেন এবং সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানী বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। ইবনে মাজাহর হাদীসে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।

 

অন্য এক হাদীসে হযরত যায়েদ ইবনে আকরাম রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলকে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কুরবানী কি? তিনি বললেন, কুরবানী তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুন্নত। তারা আবার বললেন, এতে আমাদের জন্য কি কল্যাণ রয়েছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে। তারা পূনরায় জিজ্ঞেস করলেন, বকরীর পশমেও কি তাই? জবাবে তিনি বললেন, বকরীর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকী আছে।

 

কুরবানীর এ ফজিলত লাভ করতে হলে প্রয়োজন সেই আবেগ, অনুভূতি, সেই আল্লাহ প্রেম, যার অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন আল্লাহর খলিল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। কেবল গোশত খাওযার নাম কুরবানী নয়, কুরবানী হচ্ছে আল্লাহর পথে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার দৃপ্ত শপথ। কুরবানীদাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালায় না, বরং সে ছুরি চালায় নিজের নফস ও কুপ্রবৃত্তির ওপর। দীনের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার মানসিকতা তৈরী না করে পশুর গলায় ছুরি চালালে তাতে কুরবানী আদায় হয় না। কুরবানীর প্রাণশক্তি হচ্ছে তাকওয়া ও ত্যাগ, যার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ প্রেম। আল্লাহ তার কালামে পাকে বলেন:

 

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَاوَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوااللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ

 

 

 

আল্লাহর কাছে কুরবানীর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া। (সূরা হজ্জ: আয়াত ৩৭)।

 

যে কুরবানীর সাথে তাকওয়া ও ত্যাগ নেই, আল্লাহর দৃষ্টিতে তার কোন মূল্য নেই। আল্লাহর কাছে সেই আমলই গ্রহণযোগ্য যার উৎস হলো তাকওয়া। কুরআন মজীদে এ কথা আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিযেছেন।  আল্লাহ বলেন:

 

َقالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ (سورة مائدة-২৭)

 

অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবূল করেন। (সূরা মায়িদা: আয়াত ২৭)।

 

নিজের জীবনসহ সবকিছু আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়ার চেতনা সর্বক্ষণ মনে জাগ্রত রাখার জন্য আল্লাহ তার নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এই কথা শিখিয়ে দিয়েছেন:

 

قل إن صلاتي و نسكى و محياى و مماتى لله رب العلمين لاشريك له و بذلك أمرت و أنا أول المسلمين.

 

আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও মরণ সবকিছুই আল্লাহর জন্য। তার কোন শরীক নেই। আমাকে এ আদেশই করা হয়েছে এবং আমি প্রথমেই এ আনুগত্য কবুল করে নিয়েছি। (সূরা আল আনআম: আয়াত ১৬২-৬৩)।

 

কুরবানী কাদের ওপর ওয়াজিব

 

কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রয়োজন নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। জাকাতের মত নিসাব পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ এক বছর ধরে কারো কাছে জমা থাকা এ ক্ষেত্রে জরুরী নয়। মাসয়ালা হচ্ছে, ১০ জিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ জিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত কারো কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যায়।

 

কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য আরো যে সব শর্ত প্রযোজ্য তা হল, যিনি কুরবানী দেবেন তাকে হতে হবে মুসলমান ও সুস্থ-মস্তিষ্কের মানুষ। তাকে হতে হবে বালেগ এবং পূর্ণ বয়স্ক। তাকে হতে হবে মুকীম, মানে মুসাফির নন এমন ব্যক্তি। মুসাফিরের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। কোন মহিলা নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব। কুবরানীর ব্যাপারে নারী ও পুরুষে কোন পার্থক্য নেই। সক্ষম সবার জন্যই কুরবানী ওয়াজিব।

 

কেমন পশু কুরবানী করা ওয়াজিব

 

কুরবানীর জন্য উত্তম পশু হলো- দুম্বা, ছাগল, মেষ বা ভেড়া, গরু, মহিষ, উট ইত্যাদি। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ ও অনুকরণে উঁঠ, ছাগল, ভেড়া, কিংবা দুম্বা দিয়েই কুরবানী করতেন।

 

ইবনে মাজাহর বর্ণনা সূত্রে ইউনুস ইবনে মায়সারা ইবনে হালবাস রাদিয়াল্লাহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবী আবু সাঈদ আয-যরাফী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে কুরবানীর পশু ক্রয় করতে গেলাম। বর্ণনাকারী ইউনুস বলেন, আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি কালো বর্ণের মেষের দিকে ইশারা করেন, যা খুব উঁচুও ছিলো না, নিচুও ছিলো না। তিনি আমাকে বলেন, এই মেষটিই আমার জন্য ক্রয় করো। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ধরনের মেষ দিয়ে কুরবানী করতেন তার সাথে এর একটা সাদৃশ্য রয়েছে। (হাদীস নং ৩১২৯)।

 

 

 

যে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়

 

হযরত বারাআ ইবনে আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর মারফু এর হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন:

 

لايضحى بالعرجاء بين ظلعها ولا بالعوراء بين عورها و لا بالمريضة بين مرضها و لا بالعجفاء التى لاتنقى

 

 

 

খোঁড়া জন্তু যার খোঁড়ামী সুস্পষ্ট, অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন জন্তু যার রোগ সুস্পষ্ট এবং ক্ষীণকায় পশু যার হাঁড়ের মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে তা কুরবানী করা যাবে না। (তিরমিযী: হাদীস নং ১৪৩৭)

 

 কোন বয়সের পশু কুরবানী করা যাবে

 

হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:

 

عَنْ جَابِرٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- ্র لاَ تَذْبَحُوا إِلاَّ مُسِنَّةً إِلاَّ أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ গ্ধ.مسلم

 

তোমরা (কুরবানীর জন্য) মুসিন্না (অর্থাৎ পাঁচ বছরের উট, দুই বছরের গরু এবং এক বছরের ছাগল বা মেষ ছাড়া জবেহ্ করবে না। কিন্তু তা সংগ্রহ করা তোমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হলে ছয় মাস বয়সের মেষ বা ভেড়া জবেহ করতে পার। (মুসলিম: হাদীস নং ৪৯২৬)।

 

হারিয়ে যাওয়া পশুর মাসআলা

 

যদি কুরবানীর পশু হারিয়ে যায় এবং তার বদলে আরেকটি পশু ক্রয় করা হয় এবং তারপর প্রথম পশুটি পাওয়া যায় তবে যে কোন একটি পশু কুরবানী করলেই তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। গরীবের উপর কুরবা ওয়াজিব নয়।

 

কুরবানী করার সময়

 

কুরবানীর ঈদে সূর্য উদয়ের পর ঈদের নামায তাড়াতাড়ি শেষ করেই কুরবানী করতে হবে। এটাই কুরবানীর উৎকৃষ্ট সময়। তবে ঈদের দিন, ঈদের পরের দিন এবং এর পরের দিন এই তিন দিন কুরবানী করা যায। কিন্তু ঈদের নামায পড়ার আগে কুরবানী করা যায় না।

 

বুখারীর বর্ণনা সূত্রে হযরত বারাআ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবু বুরদা রাদিয়াল্লাহু ঈদের নামাযের আগে কুরবানীর পশু জবেহ করলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, এর বদলে আরেকটি জবেহ কর। তিনি বললেন, আমার নিকট কেবল ছয় মাসের একটি ছাগলের বাচ্চা আছে। শুবা বলেন, আমার ধারণা তিনি বলেছেন, এ ছয় মাসের বাচ্চাটি এক বছরের ছাগলের চেয়ে উত্তম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ঐটির স্থলে এটি কুরবানী কর। তবে তোমার পর আর কারো জন্য এটা যথেষ্ট হবে না। (হাদীস নং ৫১৫০)

 

কুরবানী পরিবারের সবার পক্ষ থেকে করা সুন্নত

 

যার কুরবানী করার সামর্থ আছে সে যখন কুরবানী করবে তখন সেই কুরবানীটি সে নিজের ও তার পরিবারের সবার পক্ষ থেকেই করবে। অর্থাৎ সে যদি একটি গরু কিংবা ছাগল কুরবানী করে অথবা সে যদি অন্য কারো সাথে মিলে একভাগ, দুইভাগ এভাবে ভাগের কুরবানী করে তাহলে সে তার কুরবানী নিজের ও তার পরিবারের সবার পক্ষ থেকেই করবে। কারণ একটি গরু, ছাগল বা এক ভাগ কুরবানী নিজের ও পরিবারের সবার জন্যে যথেষ্ট। অনুরূপভাবে একাধিক গরু ছাগল কিংবা একাধিক ভাগ কুরবানী যদি কেউ করে, তাহলে সেই কুরবানী নিজের ও তার পরিবারের সবার পক্ষ থেকেই করবে। একজনের জন্য সামর্থ অনুযায়ী একটি বা একভাগ কুরবানীই যথেষ্ট এবং এ পরিমাণই তার জন্য ওয়াজিব। যদি কেউ এর থেকে বেশি করে সেটা নফল হিসাবে গণ্য হবে। এটাই কুরবানী করার সুন্নাত ও সঠিক নিয়ম।

 

আয়েশা ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত:

 

أن رسول الله صـ كان اذا اراد ان يضخى اشترى كبشين عظيمين سمينين اقرنين املحين موجؤين فذبح احدهما عن امته لمن شهد لله بالتوحيد و شهدله بالبلاغ وذبح الأخر عن محمد و عن ال محمد

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর ইচ্ছা করলে দুটি মোটা তাজা, মাংসে ভরা, শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের মেষ ক্রয় করতেন। অতঃপর দুটির একটি নিজ উম্মতের জন্য যারা কুরবানী দেয়ার সামর্থ রাখে না তাদের পক্ষ থেকে এবং অপরটি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। (ইবনে মাজাহ হাদীস নং ৩১২২)।

 

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু  আনহা আরো বর্ণনা করেছেন:

 

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم نحر عن ال محمد صلى الله عليه وسلم في حجة الوداع بقرة واحدة.

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মাত্র গরু কুরবানী করেন। (ইবনে মাজাহ্, হাদীস নং ৩১৩৫)।

 

বুখারীর বর্ণনা সূত্রে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসের শেষাংশে বর্ণনা করা হয়েছে:

 

ضحى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن نسائه بالبقر.

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করেছেন। (হাদীস নং ৫১৫২)।

 

তিরমিযীর বর্ণনা সূত্রে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ঈদুল আজহার নামায পড়তে মাঠে হাজির হলাম। তিনি তাঁর ভাষণ শেষে মিম্বর থেকে নেমে এলেন। অতঃপর একটি ভেড়া নিয়ে আসা হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বহস্তে তা জবেহ করেন এবং বলেন: আল্লাহর নামে এবং আল্লাহই মহান। এই কুরবানী আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মধ্যে যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদের পক্ষ থেকে। (হাদীস নং ১৪৬৩)।

 

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর জন্য এমন একটি শিংওয়ালা দুম্বা নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন, যা কালোতে হাঁটে, কালোতে দেখে ও কালোতে শোয় (অর্থাৎ যার পা, চোখ ও পেট কালো)। তিনি বললেন: হে আয়েশা! আমাকে ছুরিটা দাও। তবে ছুরিটা পাথরে ঘষে ধারালো কর। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি তাই করলাম। অতঃপর তিনি তা নিয়ে দুম্বাকে ধরলেন এবং তাকে কাৎ করে শোয়ালেন। অতঃপর তা জবাই করতে গিয়ে বললেন:

 

আল্লাহর নামে; হে আল্লাহ! তুমি এই কুরবানী মুহাম্মদ, মুহাম্মদের পরিবার ও তার উম্মতে পক্ষ থেকে কবুল কর। অতঃপর তা তিনি কুরবানী করলেন। (আবু দাউদ: হাদীস নং ২৭৯২)।

 

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত:

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জে তাঁর পরিবারের সবার পক্ষ থেকে একটি মাত্র কুরবানী করেন। (ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩১৩৫)।

 

বস্তুত: কেউ একাই একটি বা একাধিক গরু কুরবানী করলে তাতে প্রতি গরুর জন্য সাত ভাগের এক ভাগ নাম দিতে হবে- একথা সঠিক নয়। বরং তা নিজের ও পরিবারের সবার পক্ষ থেকেই কুরবানী দিতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ একটি ছাগল কিংবা এক ভাগ/দুই ভাগ এভাবে ভাগে কুরবানী করলেও সেই একটি ছাগল কিংবা ঐ একভাগ/ দুই ভাগ কুরবানীও নিজের এবং পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কুরবানী করা যেতে পারে। শুধুমাত্র কুরবানীদাতা কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নামে কুরবানী করা সঠিক নয়।

 

 

 

কি পরিমাণ কুরবানী করা ওয়াজিব

 

সচ্ছল ও সামর্থবান পূর্ণবয়ষ্ক মুসলিমের উপর একটি কুরবানী করা ওয়াজিব। একাধিক কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। যদিও সে অধিক সম্পদের মালিক হোক না কেন। তবে কেউ যদি একাধিক কুরবানী করে তাহলে সে জন্য সে সওয়াব পাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামর্থবান প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে পরিবারের সবার জন্য কুরবানী করার বিধান ঘোষণা করেছেন।

 

এক পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কুরবানীর পশুই যথেষ্ট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ আমল ও ঘোষণা অনুসারেই সাহাবাগণ কুরবানী করতেন। আতা ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহুর নিকট জিজ্ঞাসা করলাম:

 

 

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে কুরবানীর নিয়ম-কানুন কেমন ছিল? তিনি বলেন, (সামর্থবান) ব্যক্তি তার ও তার পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী করতো এবং তা নিজেরাও খেতো, অন্যদেরও খাওয়াত। অবশেষে লোকেরা গর্ব ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ফলে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তা তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছো। (ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩১৪৭, মুয়াত্তা মালেক)।

 

সুতরাং কুরবানী প্রথমত নিজের ও পরিবারের সবার পক্ষ থেকেই করা বাঞ্ছনীয়। দ্বিতীয়ত: কুরবানী বড় আকারের পশু দিয়ে করে গর্ব বা আভিজাত্য প্রদর্শনের বিষয় নয়। বরং কুরবানীর সাফল্য নির্ভর করে সামর্থ অনুযায়ী সহিহ নিয়তের ওপর।

 

 

 

ভাগে কুরবানী করার নিয়ম

 

কুরবানী করার জন্য একটি ছাগল কিংবা একটি ভেড়াও যদি কারো নেয়ার সামর্থ না থাকে, তাহলে একটি গরু কিংবা একটি উট সাত ভাগেও করা যায়। এটা কিন্তু একটা সুযোগ। বাধ্যতামূলক বা সাধারণ কোন নিয়ম নয়। সাধারণত কুরবানীর নিয়ম হলো ছাগল বা গরু একাই একটি করা। একা একটি কুরবানী করতে না পারলে ভাগে কুরবানী করার সুযোগ গ্রহণ করা যায়। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

 

একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি উটও সাতজনের পক্ষ থেকে (ভাগে) কুরবানী করা যেতে পারে। (আবু দাউদ: হাদীস নং ২৮০৮)।

 

আবু দাউদের অপর বর্ণনা সূত্রে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ায় আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে এক একটি উট সাতজনে এবং এক একটি

 

গরুও সাতজনে অংশীদার হয়ে কুরবানী করেছি। (হাদীস নং ২৮০৯)।

 

এ সুযোগ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের অনুমোদিত। অতএব প্রয়োজন পড়লে এ সুয়োগ গ্রহণ করে কুরবানীতে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কারো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। তবে একটি কুরবানীই নিজের ও পরিবারের সবার পক্ষ থেকে করা যথেষ্ট ।

 

 

 

 

 

কুরবানী দাতার চুল ও নখ কাটার মাসআলা

 

জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে ১০ই জিলহজ্জ তারিখে কুরবানী করা পর্যন্ত কোন প্রকার ক্ষৌরকর্ম না করা, চুল ও নখ না কাটার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন।

 

হযরত উম্মু সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

 

من راى هلال ذى الحجة و اراد ان يضحى فلاياخذن من شعره  و لامن اظفاره.

 

যে ব্যক্তি জিলহজ্জ মাসের নতুন চাঁদ দেখেছে এবং কুরবানী দেয়ার নিয়ত করেছে সে যেন নিজের চুল ও নখ (কুরবানী করার পূর্ব পর্যন্ত) না কাটে।

 

(মুসলিম: হাদীস নং ৪৯৬৫, তিরমিযী: হাদীস নং ১৪৬৫)।

 

 

 

কুরবানীর সময় তাকবীর পাঠ করা

 

জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখের আছর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর তাকবীর পাঠ করা ওয়াজিব। আর তাকবীর হল:

 

الله أكبر الله أكبر لا إله الا الله و الله أكبر الله أكبر و لله الحمد

 

)আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ )

 

 

 

কুরবানীর দিন ঈদের নামাযের আগে কিছু না খাওয়া

 

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি (বুরাইদা) বলেছেন:

 

كان النبي صلى الله عليه وسلم لايخرج يوم الفطر حتى يطعم ولا يطعم يو م الأضهى حتى يصلى

 

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খাওয়া পর্যন্ত নামাযের জন্য বের হতেন না এবং ঈদুল আযহার দিনে নামায না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না।

 

(তিরমিযী: হাদীস নং ৫০৮, আহমদ)।

 

 

 

 

 

ঈদের নামাযের আগে কুরবানী না করা

 

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

 

من ذبح قبل الصلوة  فإئما يذبح لنفسه ومن ذبح بعد الصلوة فقد تم نسكه وأصاب سنة المسلمين.

 

যে লোক ঈদের নামাযের আগে কুরবানীর পশু জবেহ করলো, সে নিজের জন্য জবেহ করলো। আর যে ব্যক্তি নামাযের পরে জবেহ করলো, তার কুরবানীই পূর্ণ হলো এবং সে মুসলমানের রীতিনীতি অনুযায়ী কাজ করলো। (বুখারী হা: নং ৫১৩৯)।

 

ইবনে মাজাহর বর্ণনাসূত্রে হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি কুরবানীর ঈদের দিন ঈদের নামাযের পূর্বেই কুরবানী করলো। তখন করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পুনরায় কুরবানী করার নির্দেশ দিলেন।

 

 

 

কিভাবে কুরবানী করতে হবে

 

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবী বাকরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত:

 

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِى بَكْرَةَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- خَطَبَ ثُمَّ نَزَلَ فَدَعَا بِكَبْشَيْنِ فَذَبَحَهُمَا.ترمذي

 

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ঈদের নামাযের পর) ভাষণ দিলেন। অতঃপর মিম্বর থেকে অবতরণ করে দুটি মেষ নিয়ে আসতে বললেন। তারপর এ দুটোকে তিনি জবেহ করলেন। (তিরমিযী: হাদীস নং ১৪৬২)।

 

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:

 

ضحى النبي صلى الله عليه وسلم بكبشين أملحين فرايته واضعا قدمه على صفاحهما يسمى و يكبر فذبحهما بيده.

 

 

 

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই শিংওয়ালা দুম্বা তাঁর পা দিয়ে চেপে ধরে বিসমিল্লাহ এবং তাকবীর বলে নিজ হাতে জবেহ করেছেন। (বুখারী: হাদীস নং ৫১৫১)।

 

অন্য এক হাদিসে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

 

إن الله عزوجل كتب الاحسان على كل شئ فاذا قتلتم فاحسنوا القتلة و اذا ذبحتم فاحسنوا الذبح و ليحد احدكم سفرته و ليرح ذبيحته.

 

মহান আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য দয়া ও অনুগ্রহ নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যখন তোমরা যুদ্ধ করো তা উত্তম পন্থায় করো, যখন কোন পশু যবেহ করো তাও উত্তম পন্থায় করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজ নিজ চুরি ধারালো করে নেয় এবং নিজের জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।

 

 (ইবনে মাজাহ্: হাদীস নং ৩১৭০)।

 

 

 

কুরবানীর সময় সামনে উপস্থিত থাকা

 

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহকে লক্ষ্য করে বলেন:

 

قومي إلى اضحيتك فاشهديها فإن لك بكل قطرة تقطر من دمها ان يغفرلك ماسلف من ذنوبك قالت يارسول الله الناخاصة اهل البيت اولنا و للمسلمين قال بلى لنا و للمسلمين.

 

তুমি উঠো, তোমার কুরবানীর কাছে যাও এবং তা দেখ। কেননা, কুরবানীর যে রক্ত প্রবাহিত হয় তার প্রতি বিন্দুর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমার অতীত গুনাহ মাফ করে দেবেন। হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার ও আপনার পরিবারবর্গের লোকদের জন্যই কি এই বিশেষ ব্যবস্থা, না নাকি সব মুসলমানের জন্য? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: হ্যাঁ, আমাদের ও সব মুসলমানের জন্যই এ ব্যবস্থা। (বায্যার)।

 

কুরবানীর গোশত ও চামড়ার বিধি-বিধান

 

হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:

 

ان رسول الله صلى الله عليه وسلم امره ان يقسم بدنه كلها لحومها وجلودها وجلافها للمساكين.

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে (আলীকে) তার কুরবানীর উটের গোশত, চামড়া ও খুর সবকিছু গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। (ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩১৫৭)।

 

হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন:

 

عَنْ جَابِرٍ عَنِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- أَنَّهُ نَهَى عَنْ أَكْلِ لُحُومِ الضَّحَايَا بَعْدَ ثَلاَثٍ ثُمَّ قَالَ بَعْدُ ্র كُلُوا وَتَزَوَّدُوا وَادَّخِرُوا গ্ধ. مسلم

 

নবীজী ঈদের তিন দিনের পর কুরবানী গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বলেছেন: তোমরা তা (তিন দিনের পরও) খেতে পারো এবং জমা করে রাখতে পার। (মুসলিম: হাদীস নং ৪৯৪৮)।

 

বুখারীর বর্ণনা সূত্রে হযরত সালাম ইবনুল আক্ওয়া রাদিয়াল্লাহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরবানী করে সে যেন তৃতীয় দিনের পর এমন অবস্থায় সকাল না করে যে, তার ঘরে কুরবানীর গোশতের কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে। পরবর্তী বৎসর এলে লোকেরা বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা গত বছর গোশত যেমন করেছিলাম এ বছরও কি তেমনটি করবো? তিনি বললেন: এখন নিজোরা খাও, অন্যকে খেতে দাও এং জমা রাখ। যেহেতু ঐ বছর মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম এ অবস্থায় তোমরা তাদের সাহায্য করো। (হাদীস নং ৫১৬২)।

 

মান্নতের কুরবানী

 

কোন ব্যক্তি যদি কুরবানীর মান্নত করে এবং যে উদ্দেশ্যে মান্নত করেছে তা যদি পূর্ণ হয় তবে সে গরীব হোক, ধনী হোক তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যায়। কুরবানীর পশুর জন্য যে সব গুণ নির্ধারণ করা হয়েছে মান্নতের কুরবানীর ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। একইভাবে মান্নতের কুরবানীও কুরবানীর জন্য নির্ধারিত দিন সমূহের মধ্যেই দিতে হবে।

 

মান্নতের কুরবানীর পশুর সমস্ত গোশত ও চামড়া গরীব মিসকিনের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া ওয়াজিব। মান্নতের কুরবানী দাতা এর গোশত নিজে খেতে পারবে না এবং ধনী ও সচ্ছল ব্যক্তিদেরও খাওয়াতে পারবে না।

 

যদি কেউ নিজে তা খেয়ে ফেলে বা ধনী ব্যক্তিকে খাওয়ায় বা হাদিয়া দেয় তবে সেই পরিমাণ গোশত পূনরায় কিনে গরীব মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। মান্নতের কুরবানী দাতাকে এসব বিষয়ে কড়া খেয়াল রাখতে হবে। তেমনি ভাবে মৃত ব্যাক্তির নামে কুরবানী দিলে সে গোশ্ত ও সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিতে হবে।

 

 

 

অসিয়তের কুরবানী

 

যদি পিতার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয় কিন্তু কোন কারণে তিনি কুরবানী করতে না পারেন তবে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার জন্য সন্তানদেরকে অসিয়ত করা জরুরী। অসিয়ত করার পর যদি তিনি মারা যান তবে তার সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকে কুরবানী করতে হবে।

 

 

 

কুরবানী ও পরিবেশ চেতনা

 

ইসলাম সকল কাজই সুন্দর ও সুশৃঙ্খলাভাবে সম্পন্ন করার তাগাদা দেয়। কুরবানী যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়ে থাকে তাই এই কাজটিও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হওয়া দরকার। বিশেষ করে কুরবানীর পরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া দরকার। ঘনবসিতপূর্ণ এলাকায় যদি কুরবানীর বর্জ্য যথাযথভাবে পরিষ্কার করা না হয় তাহলে তা পরিবেশ দূষিত করে। এ জন্য কুরবানীর রক্ত, হাড়, নাড়ি-ভূঁড়ি, মল ইত্যাদি যথাযথভাবে পরিষ্কার করা দরকার এবং তা যেন পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে না তোলে সেদিকে সকলের নজর দেওয়া উচিত।

 

কুরবানী দেওয়ার আগে তাই স্থান নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাাধারণত বসতবাড়ি থেকে কুরবানীর জায়গাটা দূরে হলে ভাল হয়। কুরবানীর রক্ত, হাড়, নাড়ি-ভূঁড়ি ও মল গর্ত করে পুঁতে ফেললে তা আর পরিবেশ দূষণ করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, কুরবানী দেওয়া হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। সে কাজ করতে গিয়ে আমাদের তৎপরতার জন্য পরিবেশ ও মানুষের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকেও নজর দেওয়া একজন মুমিনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

কুরবানী ও ঈদ

 

ঈদ মানে আনন্দ। কুরবানী মানে ত্যাগ স্বীকার করা। কুরবানীর ঈদ মানে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকারের মধ্য দিয়ে নিজের মনে আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করা। নিজের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে আনন্দ অনুভব করা। আনন্দ ও বিনোদন মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। এ প্রবৃত্তি আল্লাহই মানুষকে দিয়েছেন মানুষ যেন এর মধ্য দিয়ে প্রফুল্ল জীবন লাভ করতে পারে এবং নিজের অবসাদ অলসতা দূর করে আল্লাহর বন্দেগীতে আরো বেশি করে আত্মনিবেদিত হতে পারে। মুসলমানরা যেন আনন্দ বিনোদন বিমুখ না হয় যে জন্যই আল্লাহ বছরে দুই ঈদ মুসলিম মিল্লাতকে উপহার দিয়ে তাদেরকে বিনোদনমুখী করার ব্যবস্থা করেছেন।

 

 

 

ঈদের দিনের করণীয়

 

ঈদুল আজহার দিনে যেসব সুন্নত পালন করা জরুরী:

 

১.       খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা এবং ফজরের নামায আদায় করা।

 

২.       মিসওয়াক করা বা দাঁত মাজা।

 

৩.       ঈদের নামাজের আগে গোসল করা।

 

৪.       সুগন্ধি আতর বা সেন্ট ব্যবহার করা।

 

৫.       চোখে সুরমা লাগানো।

 

৬.       পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র পোশাক পরা।

 

৭.       জামায়াতের সময় হওয়ার আগেই ঈদগাহ মাঠে হাজির হওয়া।

 

৮.       যে পথে ঈদগাহ মাঠে যাবে সম্ভব হলে অন্য পথে ঘরে ফেরা।

 

৯.       পরিবারের সবাই দল বেঁধে একসাথে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া।

 

১০.     ঈদের নামায শেষে দ্রুত কোরবানী করা।

 

১১.     তাকবীর পাঠ করা।

 

কুরবানীর কতিপয় গুরুতপূর্ণ মাসআলা

 

১.       সচ্ছল ও সামর্থবান পূর্ণবয়ষ্ক মুসলিমের উপর একটি কুরবানী করা ওয়াজিব। একাধিক কুরবানী করা ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাত। যদিও সে অধিক সম্পদের মালিক হোক না কেন। তবে কেউ যদি একাধিক কুরবানী করে তাহলে সে জন্য সে সওয়াব পাবে।

 

২.       কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য সচ্ছল ও সামর্থবান হওয়ার মানে হল যাকাতের নেসাব সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। তবে যাকাতের জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের এক বৎসর অতিবাহিত হওয়া জরুরী হলেও কুরবানীর জন্য ঐ সম্পদের এক বৎসর অতিবাহিত হওয়া জরুরী নয়। ১০ই জিলহজ্জের ফজর হতে ১২ই জিলহজ্জের সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যাকাতের নেসাব সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই তার ওপর ঐ সময়ের মধ্যে যে কোন দিন কুরবানী করা ওয়াজিব।

 

৩.       সামর্থের অভাবে কুরবানী করা সম্ভব না হলে ঋণ করে কুরবানী করে পরিবার কিংবা ছেলে-মেয়েদের খুশী করা ও আত্মতৃপ্তি লাভ করার মধ্যে কোন ফায়দা নেই। যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়  অন্য কারো কাছ থেকে ধার নিয়ে কুরবানী করার কোন প্রয়োজন নেই তার। কারণ কুরবানী শুধু কোন তৃপ্তিবোধের বিষয় নয়। বরং এটি একটি ইবাদত। যে ইবাদত আল্লাহ তার কোন বান্দার ওপর ওয়াজিব করেননি সেই ওয়াজিব পালনে তার পেরেশান হওয়া উচিত নয়।

 

৪.       ঋণী ব্যক্তি কুরবানী না করে ঋণ পরিশোধ করাই তার কর্তব্য। ঋণী ব্যক্তির কুরবানী করার অর্থ ফরজ নামাজ না পড়ে নফল নামাজ পড়ার জন্য ব্যস্ত হওয়া, যার কোন প্রয়োজন নেই।

 

৫.       কুরবানী করার সুন্নাত পদ্ধতি হলো, যে কুরবানী করবে সে তার নিজের পক্ষ থেকে এবং তার পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কুরবানী করবে। কুরবানীর পশু একটি হোক কিংবা একাধিক হোক অথবা ভাগে করলে তা একভাগ হোক কিংবা একাধিক ভাগ হোক, একটি পশু বা একভাগ কুরবানী নিজের ও নিজের পরিবারের সবার জন্য যথেষ্ট।

 

৬.       যে ব্যাক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব সে কোন বিশেষ কারণে ১০ই জিলহজ্জ থেকে ১২ই জিলহজ্জ পর্যন্ত কুরবানী করতে পারলো না। এ অবস্থায় যদি সে পূর্বেই কুরবানীর উদ্দেশ্যে কোনো পশু খরিদ করে থাকে, তাহলে সেই পশু জীবিত অবস্থায় কাউকে দান করে দেবে। আর কুরবানীর উদ্দেশ্যে কোন পশু খরিদ করে না থাকলে তার কুরবানীর বিনিময়ে একটি ছাগলের মূল্য ছদকা করে দেবে।

 

৭.       গরু-মহিষ-উট, দুম্বা-ছাগল-ভেড়া ইত্যাদি ব্যতীত অন্য কোন পশু দিয়ে কুরবানী করা জায়েয নয়।

 

৮.       উট, গরু, মহিষের মধ্যে প্রত্যেকটিতে সাতভাগ দিতে হবে এমন কোন শর্ত নেই। বরং কুরবানী দাতা একাই একটি বা একাধিক গরু, উট মহিষ নিজের ও তার পবিারের সবার পক্ষ থেকে কুরবানী করতে পারবে।

 

৯.       দুম্বা, ছাগল ও ভেড়া এসব পশুতে অন্য কোন পৃথক ওয়াজিব কুরবানী দাতা কুরবানীর অংশীদার হতে পারবে না।

 

১০.     দুম্বা, ছাগল ও ভেড়া কুরবানীর জন্য পূর্ণ এক বৎসর বয়সের হতে হবে। তবে এসব পশু এক বৎসর বয়সের আদৌ পাওয়া না গেলে দেখতে এক বৎসর বয়সের মত লাগে এমন ছয়মাস বয়সের পশু দিয়েও কুরবানী করা যাবে।

 

১১.     গরু ও মহিষ পূর্ণ দুবছর বয়সের হতে হবে এবং উট হতে হবে পাঁচ বছর বয়সের। তার কম বয়সের হলে কোনটির কুরবানী জায়েয হবে না।

 

১২.     কোন ব্যক্তি এ নিয়তেই গরু, মহিষ বা উট ক্রয় করল যে, সুবিধা পেলে অন্যজনকে অংশীদার করবে। এভাবে অংশীদার নিয়ে কুরবানী করলে তা নাজায়েয হবে না। যদি ক্রয় করার সময় একা নিজের জন্যে ক্রয় করে পরে অন্যজনকে অংশীদার করায় তাহলে তাও জায়েয হবে। অবশ্য এমনটি না করাই উত্তম। আর কাউকে অংশীদার করতে চাইলে এমন ব্যক্তিকে করতে হবে যার উপর কুরবানী ওয়াজিব, অন্যথায় কারো কুরবানী হবে না।

 

১৩.     যে পশুর শিং জন্ম থেকে উঠেনি অথবা উঠার পর কিছু অংশ ভেঙ্গে গেছে তা কুরবানী করা জায়েয হবে। তবে শিং যদি গোড়া থেকেই ভেঙ্গে যায় তাহলে তা দিয়ে কুরবানী করা জায়েয হবে না।

 

১৪.     অন্ধ বা কানা পশু দিয়েও কুরবানী করা জায়েয নয়। যে পশু তিন পায়ের উপর ভর দিয়ে চলে এমন ল্যাংড়া পশু দিয়ে কুরবানী করাও জায়েয নয়। তবে চতুর্থ পা যদি মাটিতে রাখে কিন্তু খুঁড়িয়ে চলে তাহলে তা নাজায়েয হবে না।

 

১৫.     যে পশুর কান এক তৃতীয়াংশের বেশি কাটা অথবা লেজ এক তৃতীয়াংশের বেশি কাটা তা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না।

 

১৬.     যে পশু এমন দুর্বল ও জীর্ণশীর্ণ যে, তার হাড় একেবারে মজ্জাহীন হয়ে পড়েছে। তাহলে তা দিয়েও কুরবানী জায়েয হবে না।

 

১৭.     দূর্বল বা কৃষকায় পশু কুরবানী করা জায়েয হলেও মোটা তাজা এবং সুন্দর পশু দিয়েই কুরবানী করা উত্তম।

 

১৮.     যে পশুর দাঁত মোটেই নেই তা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না, তবে কিছু দাঁত পড়ে গিয়ে যদি অধিকাংশ দাঁত থাকে তাহলে জায়েয হবে।

 

১৯.     পশুর মধ্যে খাসি বা পাঁঠা দিয়ে কুরবানী করতে কোন দোষ নেই।

 

২০.     কুরবানীর পশু খরিদ করার পর যদি এমন কোন ত্রটি পাওয়া যায় যা দিয়ে কুরবানী জায়েয নয় তাহলে কুরবানী দাতা সচ্ছল ও সামর্থবান হলে অন্য একটি ভাল পশু খরিদ করে কুরবানী করবে। আর যদি কুরবানী দাতা অন্য একটি ভাল পশু খরিদ করতে সামর্থবান না হয় তাহলে তার জন্যে ঐ পশু দিয়ে কুরবানী করা জায়েয হবে।

 

২১.     যদি কুরবানীর পশু খরিদ করার পর কোন রোগের আক্রান্ত হয় তাহলে ঐ আক্রান্ত পশু দিয়েই কুরবানী জায়েয হবে।

 

২২.     গর্ভবতী কোন পশু কুরবানী করা হয়ে থাকলে এবং তাতে জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে তাও জবেহ করতে হবে এতে কুরবানী হয়ে যাবে।

 

২৩.     কুরবানীর চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর পশু জবেহ করা পর্যন্ত কুরবানী দাতার চুল, গোঁফ, দাড়ি, বগল, নখ ও নাভীর নিচের চুল না কাটা মুস্তাহাব বা উত্তম। তবে প্রয়োজনে তা কাটলে কোন ক্ষতি নেই।

 

২৪.     কুরবানীর সময় জিলহজ্জের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীর বলা ওয়াজিব। এর মধ্যবর্তী সময়ে তাকবীর বলা সুন্নাত। এ তাকবীরকে সাধারণত বলা হয় তাকবীরে তাশরীক।

 

২৫.     কুরবানীর পশু জবেহ করার সময় কুরবানী দাতা ও তার পরিবারবর্গ (সম্ভব হলে) সবাই উপস্থিত থেকে তা প্রত্যক্ষ করবে।

 

২৬.     নিজের কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবেহ করবে। এটাই উত্তম। তবে সম্ভব না হলে অন্য কারো মাধ্যমে জবেহ করাবে। এতে জবেহকারী মজুরী দাবী করলে তার মজুরী দিয়ে দিতে হবে।

 

২৭.     পশু জবেহ করার সময় পশুকে এমনভাবে শোয়াতে হবে যেন তা কেবলামুখীহয়। জবেহ করার ছুরি খুব ধারালো হওয়া বাঞ্ছনীয়।

 

২৮.     পশু জবেহ করার পূর্বে ছুরি পশুর আড়াল করে রাখবে।

 

২৯.     কুরবানীর চামড়া সরাসরি গরীব-মিসকীনদের সদকা করে দেয়া যায় কিংবা বিক্রয় করে তার মূল্যও খয়রাত করে দেয়া যায়।

 

৩০.     কয়েকজনে মিলে ভাগে কুরবানী করলে সবাই মিলে চামড়া কোন একজনকে সদকা করে দিতে পারে কিংবা তা বিক্রয় করে তার মূল্যও সবাই মিলে কাউকে খয়রাত করে দিতে পারে অথবা তার মূল্য কুরবানীর ভাগ অনুসারে ভাগ করে নিয়ে প্রত্যেকে নিজে নিজেও সদকা করে দিতে পারে।

 

৩১.     কুরবানীর পশুর চামড়া ব্যবহারের উপযোগী করে নিজেরাও ব্যবহার করা জায়েয আছে।

 

৩২.     কুরবানীর পশুর চামড়া, রশি ইত্যাদি গোশত বানাবার মজুরী স্বরূপ দেয়া জায়েয নেই। মজুরী পৃথবভাবে দিয়ে চামড়া বা রশি দান খয়রাত করে দেয়া যায।

 

৩৩.     যেসব পশু কয়েকজন মিলে ভাগে কুরবানী করা হবে তার গোশত অনুমান করে ভাগ করলে হবে না। বরং তা পাল্লায় মেপে ভাগ করতে হবে যাতে কারো ভাগ কম-বেশি না হয়।

 

৩৪.     কুরবানীর গোশত নিজেরা খাবে এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে বন্টন করবে। এক তৃতীয়াংশ গরীব মিসকিনদেরকে বন্টন করে দিয়ে বাকিটুকু নিজেদের জন্য ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বন্টন করা উত্তম। কিন্তু এটা অপরিহার্য নয় যে, এক তৃতীয়াংশ গরীবদের মধ্যে বন্টন করতেই হবে। তার কম গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করলেও কোন দোষ নেই।

 

৩৫.     কুরবানীর গোশত কাউকে মজুরী বাবদ দেয়া জায়েয নেই। তবে মজুরী পৃথকভাবে দিয়ে গোশত দেয়া ভাল।

 

৩৬.     কুরবানীর গোশত অমুসলিমদেরকেও দেয়া জায়েয এবং রান্না করে খাওয়ানোও জায়েয।

 

কুরবানীর গোশত তিন দিনের চেয়ে বেশি খাওয়া কিংবা জমা করে রাখা জায়েয। তবে যে পাড়ায় বা যে এলাকায় কুরবানী দাতার সংখ্যা কম হওয়ার কারণে গরীব-মিসকীনরা কুরবানীর গোশত পাবে না বলে আশংকা হয়, সেখানে কুরবানীর গোশত তিন দিনের চেয়ে বেশি দিন জমা করে রাখা কুরবানী দাতার জন্য উচিত নয়।