Font Size

Profile

Menu Style

Cpanel

22August2017

ISO 9001:2008 Certified


Hijab o Bastobota - Prekkit Bangladesh

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বে হিজাব একটি বহুল আলোচিত বিষয়। উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সে আলোচনার পরিব্যাপ্তি।

হিজাব আলোচনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?

পশ্চিমা বিশ্ব তাদের শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম এবং মজবুত অর্থনীতির মাধ্যমে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে উন্নয়নশীল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে। তৈরি করেছে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় আধিপত্য-আগ্রাসন। পৃথিবীব্যাপী বহু দেশ, জনপদ একধরনের দাসত্ব এবং প্রচার মাধ্যমের প্রভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে নিমজ্জিত হয়েছে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সহজ শিকার উন্নয়নশীল দেশের তরুণ-তরুণীরা। পশ্চিমা সংস্কৃতিকে তারা গ্রহণ করেছে উন্নত সংস্কৃতি ভেবে। কিন্তু অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং মারণাস্ত্রের বিশাল সম্ভারে ওরা শক্তিশালী হলেও তাদের জীবনবোধ ও সংস্কৃতি যে অনুন্নত-অপসংস্কৃতিএবং পরিশীলিত-শান্তিপূর্ণজীবন গঠনে ব্যর্থ একথা উপলব্ধি করার বয়স নতুন প্রজন্মের হয়নি। অন্যদিকে সাধারণ জনগণও এ ব্যাপারে অজ্ঞ, নির্লিপ্ত এবং দিকভ্রান্ত।

নৈতিকতা- অপসারিতপাশ্চত্য সংস্কৃতি ভেঙ্গে দিচ্ছে পরিবার, বাড়িয়ে তুলছে মাদকাসক্ত, মানসিক রোগী ও ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। সামাজিক নিরাপত্তায় নেমেছে ভয়াবহ ধ্বস। উন্নত দেশের বহু এলাকায় তরুণীরা ভয়ে সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে পারেনা। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো অনেকাংশেই পরিণত হয়েছে পুলিশী রাষ্ট্রে। ৬ কোটি এইডস রোগী উপহার দেয়া এ সভ্যতা, উন্নত প্রশাসন আর শক্তিশালী অর্থনীতি দিয়ে নিজেদের সামাজিক পতন কতদিন ঠেকিয়ে রাখবে বলা মুশকিল। যদি ব্যাপক কোন নীতিগত পরিবর্তনে তাদের ভাগ্য পরিবর্তিত হয় সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আর এইডসের চেয়েও ভয়াবহ কোন প্রাকৃতিক আক্রমণ যে তাদের জন্য দ্রুতবেগে ছুটে আসছে না তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?

আমাদের তরুণ প্রজন্মের বিরাট একটা অংশ পাশ্চাত্য সমাজের বাহ্যিক চাকচিক্যের সামনে হীনমন্যতাগ্রস্থ হয়ে নিজেদের উন্নত নৈতিকতা এবং জীবনাদর্শকে পেছনে ফেলে পাশ্চাত্য জীবনাচরণ গলাধঃকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

অথচ আরাম আয়েশের চোখ ধাঁধানো প্রাচুর্য এবং পার্থিব সুখের যাবতীয় উপকরণ হাতের কাছে মজুদ থাকা সত্ত্বেও সভ্যতাগর্বী জনসমাজের অধিকাংশ নাগরিকই আজ চরম মানসিক অশান্তি অতৃপ্তিতে ভুগছে। শান্তি নেই ব্যক্তি জীবনে; শান্তি-শৃংখলা নেই সমাজ কিংবা পরিবারেও। বিশাল আকারের চৌকষ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও অপরাধ প্রবণতার হার মারাত্মক পর্যায়ে।

অন্যদিকে পাশ্চাত্য সমাজে বসবাসকারী একজন মুসলিম তরুণ যখন মদ প্রত্যাখ্যান করছে, ক্লাব- নাচও বর্জন করছে, যথাসম্ভব দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে চলা-ফেরা করছে; একইভাবে একজন মুসলিম মেয়েও যখন এই সব কিছুর পাশাপাশি চুল ঢেকে ফুল স্লীভ  ড্রেসে হিজাব করছে এতটুকুতেই তাদের অনেক বন্ধু তাদেরকে লাইক এজ এনজেলমনে করছে। প্রভাবিত এবং কৌতুহলী হচ্ছে গভীরভাবে। স্বচ্ছ আত্মজিজ্ঞাসা তাদেরকে একাত্ম করে দিচ্ছে কুরআনের সাথে। ইসলাম গ্রহণের বর্তমান হারও সেখানে আগের তুলনায় বহুগুণ বেশী।

মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কট্টরপন্থী লোক ছাড়া বিশ্বের

চিন্তাশীল মানুষ আজ হিজাবকে শ্রদ্ধার চোখে দেখছে এবং অত্যন্ত বাস্তব-সম্মত মনে করছে। আর এখানেই পাশ্চাত্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাথাব্যথা। তারা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করে হিজাবের প্রসারকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য নানা কৌশল এবং প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে।

মুখ খুলেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক, সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যাক ষ্ট্র, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট সহ বহু রাজনীতিবিদ- শিক্ষাবিদসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবিরা।

২০০২ সালে উত্তর লন্ডনের ডেনবিগ হাইস্কুল থেকে বহিস্কৃত হয়েছিল স্কুলছাত্রী সাবিনা; জার্মানিতে স্কুল শিক্ষিকা ফিরিশতা লুদিন চাকুরি হারান হিজাবের সপক্ষে কথা বলার কারণে। এমনি অনেক দেশেই আইনি লড়াইএবং বহু প্রকার প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে হিজাববারবার।

২০০৪ সালের ফেব্রয়ারী মাসে হিজাব নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেছে ফ্রান্স। সুইডেনে হিজাব সম্মত পোশাক পরার অপরাধে চাকরি হারিয়েছে অনেক মেয়ে। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে সুইডিশ টিভি হিজাব পরা এক মুসলিম উপস্থাপিকার উপস্থাপনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

বাংলাদেশেও হিজাবনানা বৈরি প্রচারণার শিকার হয়েছে। তা সত্বেও তরুণ তরুনীরা অধিকহারে হিজাবের বিধি বিধান অনুসরণ করতে শুরু করেছে বিগত দশকে। তারা বুঝতে পেরেছে প্রথাগত পর্দা ও অবরোধ প্রথার সাথে হিজাব বিধানের অনেক পার্থক্য। একই সাথে প্রথাগত পর্দাও পালন করছে অনেকেই।

তবে পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতিতে আচ্ছন্নদের সংখ্যাও কম নয়। অনেকে আবার হিজাবকে ভাল এবং বাস্তব প্রয়োজন মনে করলেও গড্ডালিকা সংস্কৃতির প্রভাব ও সংকোচের কারণে হিজাব পালনের দুর্বল ইচ্ছা মনে পোষন করলেও কাজে পরিণত করতে সক্ষম হয়না। আপন আদর্শে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারলে আশা করা যায় আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী মানুষেরা আরো অধিকহারে নিজ সংস্কৃতির অনুসরণে উদ্যোগী, মনোযোগী হবে। 

কারণ ইতোমধ্যে এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে হিজাবকারো আত্মউন্নয়ন বা অধিকারে প্রতিবন্ধকতো নয়ই বরং খুব বেশি সহায়ক। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গার্মেন্টস কর্মী কোন ধর্মীয় প্রনোদণা নয় বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হিজাবের পোশাক অংশটি বেছে নিয়েছে।

হিজাব ব্যবস্থা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।

হিজাব করব কিনা? এটা আইনি প্রশ্ন। কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশে এটা ফরয। হিজাব কিভাবে করব? এ প্রশ্নটা জড়িত ঐতিহ্য সংস্কৃতি এবং তাকওয়ার মূল্যবোধের সাথে। তবে সংক্ষেপে বলা যায় হিজাব পালন করতে হবে সার্বক্ষনিক সচেতনতা, সততা ও আন্তরিকতার সাথে।

হিজাবশুধুমাত্র কোন পোশাকের নাম নয়। হিজাবএকটি পুণর্াঙ্গ নৈতিক ব্যবস্থাপনা যা পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই অবশ্য পালনীয়।

শাহিন আখতার আঁখি

হিজাব

 

হিজাবকুরআনের একটি বিশেষ পরিভাষা। এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক নৈতিকতা সম্পর্কিত বিধি বিধানগুলোর অন্যতম। হিজাব শব্দটি কুরআনে এসেছে পাঁচবার।

আভিধানিক অর্থ- প্রতিহত করা, ফিরিয়ে রাখা, আড়াল করা।

পারিভাষিক অর্থ- সেই বিধি ব্যবস্থা ও চেতনা যার মাধ্যমে ঘর থেকে শুরু করে পথ-প্রতিষ্ঠান-সমাবেশ সহ সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণহীন কথাবার্তা, দর্শন, দৃষ্টিবিনিময়, সৌন্দর্য প্রদর্শন ও সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ করা হয়। সর্বাবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারের নিজস্বতা (চৎরাধপু) সংরক্ষণ ও এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনও এর

অন্তর্ভূক্ত।

আমাদের সমাজে হিজাবেরউর্দূ তরজমা পর্দাশব্দটি প্রচলিত রয়েছে। তবে বর্তমানে হিজাবএই মূল আরবী শব্দটি ব্যবহারের দিকেই অধিকাংশের ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটি সুস্থ সমাজ হবে কল্যাণধর্মী এবং জ্ঞানভিত্তিক। সুশিক্ষা ও পরিচ্ছন্ন বিনোদন সেখানে আদর্শ ভিত্তিক চরিত্র গঠন করবে। জনগণ হবে সৎ- নীতিনিষ্ঠ, পরিশ্রমপ্রিয়, দেশপ্রেমিক এবং সেবা পরায়ন। কিন্তু তার বিপরীতে যদি ত্রটিপূর্ণ শিক্ষা, অশ্লীল সাহিত্য ও বিনোদন এবং অশুদ্ধ সামাজিক রীতি- সংস্কৃতি জনমানসকে নীতিভ্রষ্ট, পরিশ্রমবিমুখ, ভোগস্পু স্বার্থ-সর্বস্ব, ইন্দ্রিয়পরায়ন ও পরিমিতিবোধহীন করে গড়ে তোলে, সুস্থ বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাছে তা কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে না।

হিজাব সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মধ্যে এমন একটা সংযম শালীনতার সীমা তৈরি করতে চায় যা একদিকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে কিছু অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অশালীন ও অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে রক্ষা করবে। সেই সাথে সামাজিক শৃংখলা, নৈতিক আচরণ, ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি, মানসিক সুস্থিরতা ও সময়ের যথার্থ ব্যবহারের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। দেহ ভিত্তিক ও বস্তুতাত্ত্বিক চিন্তা চেতনা ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে সমাজকে নিয়ে আসবে মেধা যোগ্যতা ভিত্তিক চিন্তা চেতনা ও কর্মতৎপরতার দিকে।

হিজাব যেহেতু বাস্তব আচরণ ও চেতনার সমম্বিত ব্যবস্থা, সেহেতু ব্যক্তি ও সমষ্টির সার্বক্ষণিক সতর্কতার সাথে সম্পৃক্ত।

আল্লাহকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্মরণের উদ্দেশ্যে বিশ্বাসী মানুষকে নামাজের জন্য তৈরি হতে হয় দিনে পাঁচবার, রোজার জন্য বছরে ১ মাস, যাকাত বছরে ১ বার, হজ্জের জন্য সময় প্রয়োজন বছরে সপ্তাহ খানেক। অপরপক্ষে ঈমান রক্ষা ও হিজাব পালনের জন্য সুস্থ ও প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিকে সচেষ্ট থাকতে হয় সার্বক্ষণিক।

একটি সমাজে বিভিন্ন মানের মানুষ বসবাস করে। নষ্ট পরিবেশকে অতিক্রম করে ভাল থাকার যোগ্যতা খুব বেশি মানুষের থাকেনা। ফলে সমাজের অধিক সংখ্যক মানুষকে ভাল রাখার জন্য অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার হয়ে পড়ে।

কোন মানুষই হঠাৎ করে পরিচ্ছন্ন, পরিশুদ্ধ, ধার্মিক হয়ে যায় না আবার কোন মানুষই আকস্মিকভাবে দুশ্চরিত্র, অধার্মিক হয়ে পড়ে না। উভয় ক্ষেত্রেই একটা ক্রমধারা এবং কিছু প্রভাবক কাজ করে। একটার পর আরেকটা তারপর অন্যটা সংঘটিত হয়।

অনৈতিকতা ও সীমালংঘন রোধ করতে চাইলে এর ক্রমধারাগুলোকে বাধাপ্রাপ্ত ও পৃথক করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ও অনৈতিক সম্পর্ক যেন পরিবেশে আনুকূল্য লাভ করতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। হিজাবের উদ্দেশ্যকে সফল করতে হলে যাবতীয় চেতনা প্রভাবক বিষয়গুলোকেও পরিশীলিত, পরিচ্ছন্ন এবং অশালীনতা মুক্ত করতে হবে।

বহুমাত্রিক সমাজ বৈচিত্রের মাঝখানে হিজাবের যথার্থ কার্যকারিতা লাভ করতে হলে এরসাথে গভীরভাবে যুক্ত করতে হবে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও ভয়কে (তাকওয়া)। অনুসরণ করতে হবে রাসূল (সা.) প্রদত্ত বিস্তারিত দিকনির্দেশনাকে। চিন্তা, দৃষ্টি, কন্ঠ, সৌন্দর্য, দেহভঙ্গী, একাকীত্ব, নিজস্বতা (চৎরাধপু) এইসব বিষয়গুলো হিজাবের অন্তর্ভূক্ত।

সামাজিক নৈতিকতায় ব্যাপক ধ্বস নামার আগে ছোট ছোট অনৈতিক আচরণের বিস্তার, অধিকতর বিপর্যয়ের পথ প্রশস্ত করে।

কুরআনে বর্ণিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি দিক বিভাগই নৈতিক উন্নয়ন, মানবতার কল্যাণ, অর্থনৈতিক মুক্তি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মিক প্রশান্তিতে সমন্বিত ভূমিকা পালন করে। একারণে ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক জীবন যাপনের জন্য কুরআনের প্রতিটি নির্দেশনাই সমান গুরুত্বের সাথে অনুসরণ করা প্রয়োজন। আর অনুসরণ করতে হবে আন্তরিকতা ও সতর্কতার সাথে। কারণ কুরআনে আল্লাহ সাবধান করে দিয়েছেন, “খেয়ানতকারী চোখগুলিকে তিনি জানেন আর জানেন বুকের মধ্যে রাখা গোপন কথাটিও।” (সূরা মুমিনঃ ১৯)

হিযাবের বিধান

(কুরআনে গ্রন্থাবদ্ধ ধারাক্রম অনুযায়ী)

 

সূরা নুর আয়াত ২-২৬ পর্যন্ত, হিজাবহীন সমাজে উদ্ভূত অপরাধের শাস্তি, সামাজিক বয়কট, বিচার প্রক্রিয়া, সাক্ষী, সাবধানতা, আপোষ, তওবা, সুধারণা লালন, শয়তানের অনুসরণ, নির্লজ্জতা- অশ্লীলতা, ক্ষমা, পুরস্কার, জবাবদিহিতা এইসব বিষয়ে আলোচনা করে বলা হয়েছে এমন সমাজে সর্বজনগ্রাহ্য পবিত্র চরিত্রের মানুষেরা পর্যন্ত অপবাদ এবং অশ্লীল আলোচনা থেকে রেহাই পায়না।

তবে আল্লাহ যেহেতু সব কথাই জানেন এবং শুনেন সেহেতু পবিত্র চরিত্রের মানুষেরা তার কাছে নিরপরাধই থাকে। তাদের জন্য আরো রয়েছে ক্ষমা এবং মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। আলোচিত এইসব সামাজিক সমস্যাকে উৎসমূলেই নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে এরপর সুরা-নূরের আয়াত ২৭ থেকে হিযাব বিধানের বর্ণনা শুরু হয়েছে। তার আগে ঊনিশ এবং একুশ আয়াতে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ঃ

اِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ اَنْ تَشِيْعَ الْفَاحِشَةُ فِى الَّذِيْنَ اَمَنُوْا لَهُمْ عَذَابٌ اَلِيْمٌ فِى الدُّنْيَا وَالاَخِرَةِ وَاللّهُ يَعْلَمُ وَاَنْتُمْ لاَ تَعْلَمُوْنَ .

যারা চায় ঈমানদারদের সমাজে নির্লজ্জতার বিস্তার ঘটুক তারা পার্থিব এবং পরকালীন দু-জীবনেই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ-ই জানেন তোমরা জান না। (নূরঃ ১৯)

ياَيُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا لاَ تَتَّبِعُوْا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَّتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَاِنَّهُ يَاْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ .

হে বিশ্বাসীরা, শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করোনা। যে তাকে অনুসরণ করবে সে তো তাকে নির্লজ্জতা ও নিষিদ্ধ কাজেরই পথ দেখাবে।’ (নূরঃ ২১)

আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি চান মানুষের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। আর শয়তান চায় মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে কলুষিত ও ধ্বংস করতে এবং মানবিক যোগ্যতা ও সম্পদের অপচয় ঘটিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে।

অনুমতি গ্রহণ

একটি পরিবার বা একজন ব্যক্তির নিজস্বতার (Privacy) প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাদের বাড়ি বা ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি নিতে ও সালাম জানাতে বলা হয়েছে। এই একান্ত পরিবেশ ও নির্জনতা ব্যক্তি ও পরিবারের বিশেষ অধিকার। এটা লংঘন করা নৈতিকতা বিরুদ্ধ কাজ। ঘরের লোকদেরকে কোন ব্যক্তিকে ভেতরে নেবার মতো বা কারো সামনে বাইরে বেরিয়ে আসার মতো প্রস্তুতির সময় দিতে হবে। কারো বাসায় বিনা অনুমতিতে প্রবেশ তাদের পছন্দ-অপছন্দ এবং নিজস্ব বাসস্থানের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ বিশেষ। আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপনকারী কোন মানুষই কারো বাড়ী বা আবাসস্থলে অনুমতি বা সম্মতি ব্যতীত প্রবেশ করতে পারেনা। এ ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশ ঃ

ياَيُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا لاَ تَدْخُلُوْا بُيُوْتًا غَيْرَ بُيُوْتِكُمْ حَتَّى تَسْتَاْنِسُوْا وَتُسَلِّمُوْا عَلى اَهْلِهَا ط ذلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ .فَاِنْ لَّمْ تَجِدُوْا فِيْهَا اَحَدًا فَلاَ تَدْخُلُوْهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ ج وَاِنْ قِيْلَ لَكُمُ ارْجِعُوْا فَارْجِعُوْا هُوَ اَزْكَى لَكُمْ ط وَاللّهُ بُمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيْمٌ .

হে বিশ্বাসীগণ! নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ পর্যন্ত গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদেরকে সালাম করো। এটিই তোমাদের জন্য ভালো নিয়ম। আশা করা যায় তোমরা এদিকে খেয়াল রাখবে। তারপর যদি সেখানে কাউকে না পাও, তাহলে তাতে প্রবেশ করোনা যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি দেয়া হয়। আর যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও তাহলে ফিরে যাবে, এটিই তোমাদের জন্য অধিকতর শালীন ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি এবং যা কিছু তোমরা করো আল্লাহ্ তা খুব ভালভাবেই জানেন। নূর ঃ ২৭-২৮

দৃষ্টি সংযম ও পোশাক নির্বাচন

মানবীয় শক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি হচ্ছে তার নৈতিক শক্তি (বিবেক), চিন্তা শক্তি ও মন। যখন ব্যক্তির নৈতিক শক্তি ব্যাধিগ্রস্থ হয়ে পড়ে তখন সে আর আসলে যথার্থ মানুষ থাকে না। মানবীয় গুণাবলী হারানো দ্বিপদ প্রাণীতে পরিণত হয় মাত্র।

মানুষের মন পৌঁছে যেতে পারে সৃষ্টি জগতের যে কোন উচ্চতায়। স্রষ্টার আসন থেকে শুরু করে অনেক অতলের কোন ব্লাক হোলের নীচ পর্যন্ত।

একজন মানুষ নিজের যাবতীয় সম্পদ- সামর্থ্য মানবতার কল্যাণে ব্যয় করে মহত্ব লাভ করতে পারে, আবার কেউ চুরির দায়ে জেলেও যেতে পারে।

আত্মশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য স্রষ্টা মানুষকে দিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, ঘ্রাণ নেয়া, কথাবলা ও চলার শক্তি।

এইসব শক্তির স্রষ্টা নির্দেশিত যথাযথ ব্যবহার যেমন কল্যাণ বয়ে আনে তেমনি শয়তানের প্ররোচনায় এর অন্যায় ব্যবহারও অবধারিত বিপর্যয় ডেকে আনে। একারণেই কুরআনে বলে দেয়া হয়েছে দৃষ্টি সংযমের কথা।

قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ط ذلِكَ اَزْكَى لَهُمْ ط اِنَّ اللّهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ .

বিশ্বাসী পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের অবশ্য আবরণীয় স্থান সমূহের হেফাজত করে। এটা তাদের জন্য  অধিক পবিত্র পদ্ধতি। যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন।  (নূর ঃ ৩০)

وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلاَ يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ اِلاَّ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوْبِهِنَّ .

এবং বিশ্বাসী নারীদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের অবশ্য আবরণযোগ্য স্থানগুলোর হেফাজত করে, আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায় যা নিজে থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া। আর তারা যেন ওড়নার আচল বুকের উপর ছড়িয়ে রাখে।” (নূরঃ ৩১)

وَلاَ يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ اِلاَّ لِبُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اَبَائِهِنَّ اَوْ اَبَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اَبْنَائِهِنَّ اَوْ اَبْنَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اِخْوَانِهَنَّ اَوْ بَنِىْ اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِىْ اَخَوَاتِهِنَّ اَوْ نِسَائِهِنَّ اَوْ مَا مَلَكَتْ اَيَمَانُهُنَّ اَوِ التَّابِعِيْنَ غَيْرِ اُوْلِى الاِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفْلِ الَّذِيْنَ لَمْ يَظْهَرِوْا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ .

তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তাদের সামনে ছাড়া স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজেদের মেলামেশার নারীদের, নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোন রকম  উদ্দেশ্য নেই এবং সেইসব বালক শিশু যারা এখনো অজ্ঞ।” (সূরা নূরঃ ৩১)

وَلاَ يَضْرِبْنَ بِاَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّ

নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্যে তারা যেন সজোরে পদক্ষেপ না করে।” (সূরা নূরঃ ৩১)

وَتُوْبُوْا اِلَى اللّهِ اَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ .

হে বিশ্বাসীরা তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।”  (সূরা নূরঃ ৩১)

এটা সর্বজনবিদিত বিষয় যে চোখ মনের প্রতিনিধিত্ব করে। চোখ আর মনের বিষয়ে কবি, গীতিকার, কথাশিল্পীদের কাছ থেকে কমবেশী সবাই যথেষ্ট ধারণা অর্জন করেছি। চোখে দেখা বিষয়ে আমরা আনন্দ-দুঃখ, বাসনা-ঘৃণা, হতাশা উৎসাহের মতো নানা রকম অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হই। একথা বহুল উচ্চারিত যে, চোখ মনের আয়না, চোখ মনের কথা বলে।

অন্যভাবে বলতে গেলে দৃষ্টি বা চোখ মনেই গিয়ে আশ্রয় লাভ করে। মনকে চালিত করে, প্রভাবিত করে। মনকে শুদ্ধ রাখতে চাইলে, ভালো চিন্তা ভাবনায় উদ্বুদ্ধ রাখতে চাইলে দৃষ্টি ও শ্রতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরী। যা কিছুই আমাদের চোখে পড়ে, মন সে সম্পর্কে কিছু না কিছু ভেবে থাকে। মানুষের মন নির্লিপ্ত পাথরখন্ড নয়। যাবতীয় আপত্তিকর অকল্যাণকর বিষয় থেকেই দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। ফিরিয়ে রাখতে হবে সেভাবে যেভাবে রাসূল (সা.) বলেছেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন সবখানেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং একই সাথে শুদ্ধতার পথকে সহজও করে দিয়েছেন।

হিজাব বিধানের লক্ষ্য পরিবারপ্রত্যেক মানুষের জন্য শান্তি সুরক্ষার দুর্গে পরিণত হোক। আর অনৈতিক  আচরণ ও সীমালংঘনের সুযোগগুলো কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকুক।

এরপর সূরা নুরের আটান্ন ও ঊনষাট নম্বর আয়াতে পরিবারের সদস্যদেরও কিছু নির্দিষ্ট সময়ে অনুমতি সাপেক্ষে একে অন্যের কাছে আসা-যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ষাট নম্বর আয়াতে বিয়ের আকাংখা থাকে না এমন বার্ধক্যে পৌঁছা বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে হিজাব কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।

কন্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ সাজসজ্জা প্রদর্শন ও পর্দার আড়াল

পরবর্তী বিধান রয়েছে সূরা আহযাবে। নবী করীম (সা.)- এর স্ত্রীদের মাধ্যমে বিশ্বাসী নারীদের বলা হয়েছে,

اِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلاَ تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِىْ فِىْ قَلْبِهِ مَرَضٌ وَّقُلْنَ قَوْلاً مَّعْرُوْفًا .

যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাকো, তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না, যাতে মনের গলদে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, বরং পরিস্কার সোজা ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।” (সূরা আহযাবঃ ৩২)

وَقَرْنَ فِىْ بُيُوْتِكُنَّ وَلاَ تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةَ الاُوْلَى .

ঘরমুখী জীবন যাপন করো। অজ্ঞতার যুগের মতো নিজেদের সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িওনা।” (সুরা আহযাব-৩৩) এ আয়াতের মূল আরবীতে ব্যবহৃত তাবাররুজশব্দটির অর্থঃ মনোরম অংগভংগী এবং সেজেগুজে চলা। আয়াতে ঘরে অবস্থানকে সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িওনা এই নির্দেশের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এতে করে ধারনা করা যায় ঘরে অবস্থানএবং সাজসজ্জা প্রদর্শন দুটোই শর্তযুক্ত এবং প্রয়োজন ও পরিবেশসাপেক্ষ।

তাছাড়া রাসূল (সা.) এর সময়ে মহিলারা ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছেন জামায়াতে নামাজ, সর্বসাধারণের জন্য আহূত সভা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জানার জন্য রাসূলের দরবারে উপস্থিত হওয়া, যুদ্ধে অংশগ্রহণ, ঈদের জামায়াতে অংশ, উপার্জন, কৃষিকাজ, চামড়া ট্যানরী, কুটিরশিল্প পরিচালনা, জ্ঞান অর্জন, শিক্ষাপ্রদান, হজ্জের আনুষ্ঠানিকতায় যৌথভাবে অংশগ্রহণ, গৃহশিক্ষকতা প্রভৃতি কাজে।

ঘরের বাইরে যাওয়া সম্পর্কিত প্রশ্নে রাসূল (সা.) এর সুস্পষ্ট উত্তর ছিল হ্যাঁ প্রয়োজনে তোমাদের বাইরে যাবার অনুমতি রয়েছে।

হিজাবএবং নারীসম্পর্কিত বহু বানোয়াট হাদীস রয়েছে। এ বিষয়ে হাদীস উদ্ধৃতিতে সতর্ক থাকতে হবে।

উমর (রা.) একজন মহিলা সাহাবীকে (শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ) বাজার পরিদর্শক নিযুক্ত করেছিলেন।

মেয়েদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয়ে অংশগ্রহণের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ওসমান (রা.) এর শাসনামলে আয়েশা (রা.) সরকারের সমালোচনা করেছেন, মুয়াবিয়া (রা.) এর শাসনামলে তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। ওসমান (রা.) এর মৃত্যুর পর খলীফা মনোনয়নে নিজস্ব অবস্থান গ্রহণ করেন আয়েশা (রা.)। কিন্তু কোন সাহাবা এমন বলেননি যে নারীরা রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে পারেনা। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে সালমা (রা.)র পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন রাসূল (সা.)। স্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক কথায় জনৈক ব্যক্তি বাধা প্রদান করায় ওসমান (রা.) বলেন, ‘তাকে বলতে দাও, সে তার উপদেশ প্রদানে তোমার চেয়ে আন্তরিক। বর্তমান পদ্ধতির জানাযার নামাজ আসমা বিনতে উমাইশের পরামর্শ অনুযায়ী গৃহীত হয়।

তিপ্পান্ন আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী, ঈমানদার নারী, পুরুষরা অনুমতি ছাড়া কারো বাড়িতে প্রবেশ করবে না। খাবারের দাওয়াত দিলে অবশ্যই যাবে কিন্তু আগে-পরে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করে গৃহবাসীদের কষ্টের কারণ হওয়া যাবে না। ... ঘরে অবস্থানকারী মহিলাদের কাছে কোন পুরুষকে কিছু চাইতে হলে পর্দার আড়াল থেকে চাইতে হবে।

ঘোষণা করা হয়েছে, “এটা মনের পবিত্রতার জন্য বেশী উপযোগী।

ঊনষাট আয়াতে বলা হয়েছে, বিশ্বাসী নারীরা যেন ঘরের বাইরে বা অনাত্মীয় কোন পুরুষের সামনে যাবার সময় জিলবাব (চাদর) দিয়ে মাথা থেকে নিজেদের আবৃত করে নেয়; যা তাদের সৌন্দর্যকে ঢেকে দেবে। এটা খুবই উত্তম নিয়ম রীতি যাতে তাদের সম্ভ্রমশীলতা চিহ্নিত করা যায় এবং তাদের উত্যক্ত করা না হয়।

সাজসজ্জা প্রদর্শন এমন একটা বিষয় যা মাদকাসক্তির মতই একটা আসক্তিকর অভ্যাস। এ আসক্তিতে যারা আক্রান্ত হয় দিনের অধিকাংশ সময়ই তাদের এ বাবদেই ব্যয় হয়।

চলমান অবাধ মেলামেশা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনীর সংস্কৃতি তরুণ-তরুণী এবং নারী পুরুষের মধ্যে এই অবাঞ্ছিত প্রতিযোগীতার জন্ম দিয়েছে।

আল্লাহ্ নিজে সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। এই দৃষ্টিনন্দন মনোহর সৃষ্টি জগত তাঁরই সৃষ্টি। কিন্তু মহান স্রষ্টা বাড়াবাড়ি, সীমালংঘন ও অপব্যবহার পছন্দ করেন না। আল্লাহর রাসূল (সা.) পুরুষদেরও পরিচ্ছন্ন পরিপাটি থাকতে, সুগন্ধী ব্যবহার করতে বলেছেন এবং মেয়েদের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সুসজ্জিত থাকতেও বলেছেন কিন্তু তা প্রদর্শন করতে এবং প্রতিযোগীতার বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।

সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়ানোনিজেই একটা বিকৃত আচরণ এবং আরো বহু বিকৃত ও অস্বাভাবিক আচরণের জন্ম দিয়ে থাকে।

সৌন্দর্য প্রদর্শনে ইচ্ছুক ব্যক্তি ঘরের বাইরে যাবার প্রস্তুতিতে অনর্থক অনেক বেশী সময় ও উপকরণ ব্যয় করে। মরিয়া হয়ে ওঠে তারা নিজেকে অপরূপ করে উপস্থাপনের জন্য। এটা সৌন্দর্য পরিমাপ এবং পছন্দের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতারণা তৈরি করে।

এর কারণ, চলমান বাণিজ্য সংস্কৃতি তাকে শিখিয়েছে কোন অনুষ্ঠান বা পার্টিতে তাকে হতে হবে নজরকাড়া সুন্দর বা সুন্দরী, উপস্থিতদের প্রধান আকর্ষণ’, চোখ ফেরানো যায়না যাতে এমন অনন্য-অনন্যা হতে সবার দৃষ্টি যেন থাকে তার দিকেই। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো অনেকাংশে এদের কল্যাণে ভ্রাতৃত্ব-সৌহার্দ ও সামাজিক মত বিনিময়ের ক্ষেত্র না হয়ে সৌন্দর্য প্রদর্শনের হাটে পরিণত হয়।

সমবয়সী এবং আত্মীয়দের মিশ্র আড্ডা গুলোও অনেকসময় মেধার আলোয় উজ্জল হওয়ার চেয়ে সাজসজ্জার ঝলকানিতেই কেবল ঝলমল করে। পারিবারিক ও সামাজিক স্বীকৃতি বিহীন সম্পর্কের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। যোগাযোগ সম্পর্ক কখনও কখনও ত্রিভুজ চতুর্ভুজ মাত্রায় গিয়ে পৌঁছায়। আবার কেবলই এক পক্ষীয় আগ্রহ-পছন্দের বিষয়টি সন্ত্রাস, এসিড, অপহরণ এবং খুনের ঘটনা পর্যন্ত গিয়ে গড়ায়। অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক স্বীকৃতি বিহীন দীর্ঘ দিনের যোগাযোগ, নীতি আদর্শহীন অশ্লীল সাহিত্য, নাটক, সংগীত চলচ্চিত্রের প্রভাবে নানা অনাচারের দিকে পা বাড়ায়। ব্যক্তি, পরিবার বা সমাজ সভ্যতা কারো জন্যই এই ধারাবাহিকতা শান্তি -স্বস্তি- কল্যাণ বা উন্নতি বয়ে আনেনা।

হিজাবঃ রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা

অনুমতি

কারো ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রেই কেবল অনুমতি নিতে হবে এমন নয়, তাকানোর ক্ষেত্রেও অনুমতি প্রয়োজন অর্থাৎ ঘরে প্রবেশের অনুমতি পেলেই কেবল ঘরের ভেতরে দৃষ্টিপাত করা যাবে তার আগে নয়।

অনুমতি বিহীন দৃষ্টিপাতের ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেন, দৃষ্টি যখন একবার প্রবেশ করেই গেছে তখন আর নিজে প্রবেশের জন্য অনুমতির দরকার কি? (আবু দাউদ)

এক ব্যক্তি রাসূল (সা.) এর কাছে এসে ঠিক তার দরজার উপর দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলেন। রাসূল (সা.) তাকে বললেন পেছনে সরে গিয়ে দাঁড়াও যাতে দৃষ্টি না পড়ে, সে জন্যইতো অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (আবু দাউদ)

অনুমতির নিয়ম

রাসূল (সা.) যখন কারো ঘর বা বাড়ীর দরজায় এসে দাঁড়াতেন তখন দরজার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে ডান দিক কিংবা বাম দিকে সরে দাঁড়াতেন এবং আসসালামু আলাইকুম বলতেন। (আবু দাউদ)

অনুমতি ঘরের বাইরে যাবার

নবী করীম (সা.)-কে ঘরের বাইরে যাবার অনুমতির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাবার অনুমতি তোমাদের (নারীদের) রয়েছে, এতে সন্দেহ নেই।” (বুখারী)

দৃষ্টি

হে আলী! হঠাৎ কোন অপরিচিত মহিলার প্রতি দৃষ্টি পড়ে গেলে তা ফিরিয়ে নেবে এবং দ্বিতীয়বার তার প্রতি আর দৃষ্টিপাত করবে না। কেননা প্রথম দৃষ্টি তোমার আর দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার নয় (বরং শয়তানের)।’ (আবু দাউদ)

কোন পুরুষ অপর পুরুষের এবং কোন নারী যেন অপর নারীর সতরের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। আর কোন পুরুষ অপর কোন পুরুষের সাথে এবং কোন মহিলা অপর কোন মহিলার সাথে একই চাদরের নীচে না শোয়।                                                                       (সহীহ মুসলিম)

যদি কোন ব্যক্তি কোন অপরিচিত নারীর প্রতি অবাঞ্ছিত দৃষ্টি দিয়ে দেখে তাহলে পরকালে তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লোহা ঢেলে দেয়া হবে। (ফাতহুল কাদীর)

যে দেখবে এবং যার দিকে দেখা হবে উভয়ের উপর আল্লাহর লানত।(বায়হাকী)

জারির ইবনে আব্দুল্লাহ্ বলেন, ‘আমি রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম, হঠাৎ চোখ পড়ে গেলে কি করব? বললেন, কালবিলম্ব না করে চোখ ফিরিয়ে নেবে। (মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ)

দৃষ্টি হচ্ছে ইবলিসের বিষাক্ত তীরগুলোর মধ্য হতে একটি তীর, যে ব্যক্তি আমার ভয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করবে আমি তার প্রতিদানে তাকে এমন ঈমান দান করব যার মিষ্টি স্বাদ সে আপন হৃদয়ে অনুভব করবে। (তবারানী)

রাসূল (সা.) একবার উপস্থিত লোকদের কাছে জানতে চাইলেন, মেয়েদের জন্য ভাল কি? সবাই চুপ করে থাকলেন, কেউ জবাব দিতে পারলেন না। আলী (রা.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘরে পৌঁছে ফাতিমা (রা.) কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সংগে সংগেই জবাব দিলেন, ‘মেয়েরা পুরুষদের দিকে তাকাবে না আর পুরুষরাও তাদের দিকে তাকাবে না।

উম্মে সালমার উদ্ধৃতির ভিত্তিতে ইমাম শাওকানী লিখেছেন পুরুষদের দেখা মেয়েদের জন্য হারাম, ঠিক যেমন হারাম পুরুষদের জন্য মেয়েদের দেখা।

তবে মেয়েদের দেখা বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা কখনও কখনও শিথিল করা হয়েছে।

হে আলী! সতর খুলোনা এবং জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তির সতরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করোনা। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)

উঁকি দেয়া

যদি কোন ব্যক্তি তোমার ঘরে অনুমতি ছাড়া উঁকি মারে এবং তুমি একটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে তার চোখ অন্ধ করে দাও তাহলে তাতে কোন গুনাহ হবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

ফিরে যাওয়া

ঘরে প্রবেশের অনুমতির জন্য রাসূল (সা.) থেমে থেমে তিনবার সালাম ও অনুমতি প্রার্থনার কথা বলেছেন। এরপরও যদি জবাব না পাওয়া যায় তবে ফিরে যেতে বলেছেন।

হিজাব

মহিলাদের সৌন্দর্য আবৃত থাকারই বিষয়। সুতরাং তারা যখন হিজাব ব্যতীত বাইরে বের হয় তখন শয়তান তাদেরকে (অন্য পুরুষের সামনে) সুসজ্জিত করে দেখায়। (তিরমিযী)

স্পর্শ

রাসূল (সা.) নারীদের নিকট হতে শুধু মৌখিক শপথ গ্রহণ করতেন। তাদের হাত নিজের হাতের মধ্যে নিতেন না। (বুখারী)

যদি কেউ কোন নারীর হাত স্পর্শ করে যার সাথে তার কোন বৈধ সম্পর্ক নেই তাহলে পরকালে তার হাতের উপর  জ্বলন্ত আগুন রাখা হবে।

তোমাদের জন্য বৈধ নয় এমন কোন মহিলাকে স্পর্শ করার চেয়ে তোমাদের মাথায় লোহার সুই বিধিয়ে দেয়া আরো উত্তম। (তবারানী, হাকেম, বায়হাকী)

সাবধানতাঃ রিক্সা, বাসে মুহরিম আত্মীয়-আত্মীয়া ছাড়া পাশাপাশি বসা পরিত্যাগ করতে হবে।

একান্ত সাক্ষাৎ

কোন পুরুষ যেন কখনও কোন অনাত্মীয় মহিলার সাথে একাকী একান্তে সাক্ষাত না করে এবং কোন মহিলাও যেন কোন মাহরাম পুরুষ সঙ্গে না নিয়ে  বের না হয়।

যখনই কোন অনাত্মীয় নারী-পুরুষ নির্জনে একত্রিত হয় তখন তৃতীয় ব্যক্তি হয় শয়তান। (তিরমিযী)

মাহরাম পুরুষ

কোন মহিলা যেন কোন মাহরাম পুরুষ সঙ্গে না নিয়ে কোন সফর বা দূর ভ্রমনে না বের হয়। এ কথা শুনে এক ব্যক্তি বলল- হে আল্লাহর রাসূল! আমি যুদ্ধে আমার নাম তালিকাভুক্ত করেছি; কিন্তু আমার স্ত্রী হজ্জে রওয়ানা হয়ে গিয়েছে।তখন রাসূল  (সা.) বললেন, ‘যাও তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ করো। (বুখারী ও মুসলিম)

পথচলা

একদিন রাসূল (সা.) মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে লোকদের পথচলা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন ভীড়ের মধ্যে পুরুষ মহিলারা পরস্পরের গা ঘেঁষে পাশাপাশি চলছে তখন মেয়েদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা একটু দেরী কর, একটু পিছিয়ে পড়।

পথের মাঝখান দিয়ে নয় বরং একপাশ দিয়ে চলা উচিত। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) পুরুষদেরকে মহিলাদের মাঝখান দিয়ে পথ চলতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ)

পোশাক

আল্লাহর অভিশাপ ঐ নারীদের উপর যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকে।

যখন কোন বালিকা বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তখন তাঁর মুখমন্ডল ও দুই হাত ব্যতীত শরীরের কোন অংশ প্রকাশ করা বৈধ নয় এ কথা বলে তিনি তার কব্জির উপরে এমন ভাবে হাত রাখলেন যে কব্জির মধ্যস্থল এবং তার হাত রাখার স্থানের মধ্যে মাত্র একমুষ্টি পরিমাণ জায়গা অবশিষ্ট থাকল। (ইবনে জারীর)  

খেলা দেখা

আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী ৭ম হিজরী সনে (পর্দার হুকুম নাযিল হওয়ার পর) হাবশীদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় এলো এবং মসজিদে নববীর চত্বরে একটি খেলার আয়োজন করলো। রাসূল (সা.) নিজে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আয়েশা (রা.) কে এই খেলা দেখালেন। (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ)

 

মেয়েরা দূর থেকে ছেলেদের খেলা দেখতে পারে।

ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুমতি

যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুমতি না নিয়ে তার চিঠিতে চোখ বুলালো সে যেন আগুনের মধ্যে দৃষ্টি দিল। (আবু দাউদ)

আকর্ষণ সৃষ্টি

প্রত্যেক চক্ষুই অনাচারী। কোন নারী যখন সুগন্ধি মেখে মজলিসকে অতিক্রম করে সে-ও এমন। (আবু দাউদ, তিরমিযী)

সুগন্ধি ব্যবহার করে নারীরা নামাযেও অংশ নিবে না।  (আবু দাউদ, তিরমিযী)

পৃথকীকরণ

রাসূল (সা.) জামায়াতে নামাজ সম্পূর্ণ করে পুরুষদের নিয়ে এতটুকু সময় অপেক্ষা করে মসজিদ থেকে বের হতেন যতটুকু সময়ের মধ্যে মেয়েরা মসজিদ থেকে বের হয়ে নিজেদের ঘরে গিয়ে পৌঁছতে পারে।

একটি বর্ণনা মতে মসজিদে নববীতে মহিলাদের যাতায়াতের জন্য পৃথক দরজা ছিল।

অভিশাপ

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন একবার রাসূল (সা.) মসজিদে অবস্থান করছিলেন, এমন সময় মুযায়না গোত্রের এক মহিলা সেজেগুজে অঙ্গভঙ্গি করতে করতে মসজিদে আসল। তখন রাসূল (সা.) লোকদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে লোক সকল! নিজেদের মহিলাদেরকে সাজসজ্জার পোশাক পরিধান করে মসজিদ ইত্যাদিতে অঙ্গভঙ্গি করা থেকে বারণ কর, কারণ বনী ইসরাঈলের উপর ততক্ষণ অভিশাপ আসেনি যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নারীরা সাজসজ্জার পোশাক পরিধান করে অঙ্গভঙ্গি শুরু না করেছে। (ইবনে মাজা)

অবৈধ সম্পর্ক

আবু দাউদ শরীফের একটি হাদীস অনুসারে বলা যায়, ‘মানুষ নানাভাবেই বৈধতাহীন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। চোখের মাধ্যমে, মনের মাধ্যমে, চলাফেরা- কথাবার্তার মাধ্যমে। সবশেষে শারিরীক সম্পর্ক তাকে সত্যে পরিণত করে অথবা মিথ্যা করে দেয়। অর্থাৎ অবৈধ সম্পর্ক চূড়ান্ত রূপ লাভ করার পূর্বে এই সব পর্যায়গুলোর মাধ্যমে অগ্রসর হয়।

ঘরের ভেতরে

সাবধান! তোমরা নারীর নিজস্ব ঘরে প্রবেশ করো না। একজন প্রশ্ন করলেন, ‘দেবর বা ভাসুর সম্পর্কে কি নির্দেশ?’ জবাবে রাসূল (সা.) বললেন, তারাতো মৃত্যুতুল্য (ভয়ানক)।

মায়ের ঘর কিংবা মুহাররামা আত্মীয়ার ঘরে প্রবেশেও অনুমতি নিতে হবে। (মুয়াত্তা)

সাবধান! কোন ব্যক্তি যেন স্বামীর অনুপস্থিতে নারীর গৃহে একই কক্ষে রাত্রি যাপন না করে। অবশ্য মাহরাম অত্মীয়ের কথা ভিন্ন। (মুসলিম)

দেখার অনুমতি

তোমাদের কেউ যখন কোন মেয়েকে বিয়ে করার ইচ্ছে করে তখন যতদূর সম্ভব তাকে দেখে নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে, মেয়েটির মধ্যে এমন কোন গুণ আছে যা তাকে বিয়ে করার প্রতি আকৃষ্ট করে।” (আহমাদ, আবু দাউদ)

তোমাদের কেউ যখন কোন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তখন তার জন্য তাকে (মেয়েটিকে) দেখা দোষণীয় নয়। কেননা সে কেবলমাত্র বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার কারণেই দেখেছে। যদিও তা মেয়েটির অজ্ঞাতসারে হয়।

ধারাবাহিকতাঃ মেয়েটির পরিবার এবং স্বয়ং পাত্রীপ্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করলেই কেবল দেখার প্রসঙ্গ আসবে।

অপ্রত্যক্ষ বিষয়ে হিজাব

এক মহিলা আরেক মহিলার সাথে দেখা-সাক্ষাতের পর স্বামীর কাছে গিয়ে তার বর্ণনা এমন ভাবে করবে না যেনো সে তাকে দেখছে। (বুখারী, মুসলিম)

যে মহিলা তীব্র সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করে ঘরের বাইরে লোকদের কাছে যাবে, উদ্দেশ্য তার সুগন্ধি যোনো তারা অনুভব করতে পারে, সে ব্যভিচারী বলে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমদ)

হিজাব কি ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধক?

মানুষের সামগ্রিক জীবনকে রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আইন করে অন্তত মানুষের সামাজিক ক্ষমতার ভাগ- বাটোয়ারা নির্ধারণ করা যায় না।

আমাদেরকে যুক্তিসিদ্ধ চিন্তা করে দেখতে হবে সমাজের তৃনমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত কি কি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে ক্ষমতায়ন সম্পন্ন হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আছেন দু যুগেরও বেশী সময় ধরে। সংসদীয় গণতন্ত্রের দীর্ঘ পনের বছরের শাসনে সংসদ নেতা এবং বিরোধী দলীয় নেতা দুজনই থাকছেন নারী। কিন্তু সাধারণ নারীর ক্ষমতায়নে এ বিষয়টি খুব সামান্য প্রভাব ফেলেছে বলেই প্রমাণিত হয়েছে। দোর্দন্ড প্রতাপশালী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ব্যাপারেও একই কথা। দেখা যাচ্ছে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব কিংবা ক্ষমতার উপর সাধারণ নারী সমাজের সামগ্রিক ক্ষমতায়ন নির্ভর করে না মোটেও। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সমাজ ও পরিবারে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনা। কিছু আনুকূল্য প্রদান করতে সক্ষম হয় মাত্র।

নারীর ক্ষমতায়নের কার্যক্রম শুরু করতে হবে তৃণমূল পর্যায় থেকে- নারীর নিজ সত্ত্বা থেকে। সমাজের সর্বস্তরে নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারীকে যোগ্য করে তুলতে হবে।

পাশাপাশি যোগ্যতা বিকাশের কার্যক্রমে নারীকে নিরাপত্তা দিতে হবে। পারিবারিক অসম আচরণ, ঈভ টিজিং, অপহরণ, এসিড সন্ত্রাস, যৌতুক, নিপীড়ন থেকে আত্মরক্ষার শক্তি, সাহস ও পদ্ধতি তার মধ্যে সঞ্চারিত করতে হবে।

ক্ষমতায়ন কোন একক বিষয়ের উপর নির্ভর করেনা এবং বাধা প্রাপ্তও হয়না। এ কথাও প্রমাণিত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারেনা পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নকে, নারীর ক্ষমতায়নকে কার্যকর করতে সমাজ মানসেও প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।

নারীর নিরাপত্তা, পারিবারিক প্রশান্তি এবং সামাজিক নৈতিকতায় শৃংখলা আনার জন্য কুরআন যেমন হিজাবের বিধান দিয়েছে তেমনি নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা উপস্থাপন করেছে। হযরত মুহম্মদ (সা.) একে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।

সমাজের সর্বস্তরে হিজাব চর্চা নারীর ক্ষমতায়নকে নিরাপদ ও কার্যকরকরণে অত্যন্ত সহায়ক থাকবে নিঃসন্দেহে। হিজাব ব্যবস্থায় নারীর সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য আড়াল হয়। মেধা-যোগ্যতা আড়াল হয় না। মনে রাখতে হবে শিক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, স্বাধীন রাজনৈতিক অধিকার বোধ এবং সুপ্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর অর্থনৈতিক শক্তি-ই পারে নারীর ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে। কুরআনের সমাজ দর্শন এই সবকিছুর পথকেই উন্মুক্ত করেছে। তবে তা পূর্ণতা পেতে পারে কেবল চরিত্রবান নারী-পুরুষ সমম্বিত একটি নীতি নৈতিকতার সমাজে। যেখানে জবাবদিহিতার ভয়ে যে কোন সামান্যতম অধিকার বিনষ্ট থেকেও বিরত থাকে একজন মানুষ। আর ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষমতায়নের সূচনা হয় আমি মানিনা কাউকে আল্লাহ ছাড়াএ বিশ্বাসের ভিত্তিমূল থেকে।

হিজাব নারী-পুরুষের উপর সমান ভাবে আরোপিত হয়েছে এবং এর সুফলও তারা সমান ভাবেই লাভ করবে।

সতর ও হিজাব

নারী ও পুরুষের শরীরের যে অংশ সব সময়ই আবৃত রাখা ফরয তাকে আরবীতে আওরাহফারসীতে সতরবলা হয়। সতর দেহের অবশ্য আবরণযোগ্য অংশ। কিন্তু পোশাক যদি এতটা আটঁসাট হয় যাতে দেহ কাঠামো খুব বেশী প্রকাশিত হয়ে পড়ে অথবা এতটা পাতলা হয় যে শরীর দৃশ্যমান হয় তাহলে সতরহেফাজত হয়েছে বলা যাবে না বরং ফরয লংঘিত হয়েছে ধরা হবে। বিষয়টি নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। কেউ ইচ্ছাকৃত সতর খুলে রাখলে গুনাহগার বিবেচিত হবে।

সতরের বিষয়টি শুধু শরীর আবৃত করার সাথে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে হিজাব সম্পর্কিত থাকে নৈতিক, সামাজিক, শারিরিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ের সাথে, ‘সতরেরউদ্দেশ্য শরীর আবৃত করা। আর হিজাবের উদ্দেশ্য সৌন্দর্য, আকর্ষণ ও সংস্পর্শ কে আড়াল ও পৃথক করা।

সতর রক্ষা করে চলতে হবে সবার সামনেই। কিন্তু হিজাব পালনের ক্ষেত্রে মুহরিম ও গায়রে মুহরিমের মধ্যে পার্থক্য টেনে দেয়া হয়েছে। নারী অন্য নারীর সামনে এবং পুরুষ অপর পুরুষের সামনে সতরখুলতে পারবে না। নারীর সামনে নারীর সতর পুরুষের সামনে পুরুষের সতরের অনুরূপ। এর অর্থ হচ্ছে এটুকু ঢেকে রাখা ফরয। আর এর অর্থ এই নয় যে কেউ অশালীন দৃষ্টিকটু ভাবে নিজেকে অন্যের সামনে উন্মুক্ত করবে। নারীদেরও নারীদের সামনে স্বাভাবিক শালীনতাবোধ এবং ঐতিহ্য বজায় রাখা উচিত।

হাদীসের আলোকে পুরুষের সতরের সীমারেখাঃ

হাঁটুর উপরে এবং নাভীর নীচে যা আছে তা ঢাকার অংশ। (দারে কুতনী, বর্ণনা আবু আইয়ুব আনসারী)

নিজের উরু কাউকে দেখাবে না এবং কোন জীবিত অথবা মৃত ব্যক্তির উরুর প্রতি দৃষ্টিপাত করোনা। [তাফসীরে কবির, বর্ণনা ঃ হযরত আলী (রা.)]

তোমাদের কেউ স্ত্রীর নিকট গমন করলে তার উচিত সতরের প্রতি লক্ষ্য রাখা। (ইবনে মাজা)

হাদীসের আলোকে নারীর সতরের সীমারেখাঃ

নারীদেরকে পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশী সৌন্দর্য সুষমা প্রদান করা হয়েছে। একারণে পুরুষের তুলনায় নারীর সতরের সীমাও প্রশস্ততর।

রাসূল (সা.) বলেছেন যে নারী আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, তার জন্য এ পরিমাণের বেশী হাত খুলে রাখা জায়েয নয় এ কথা বলে তিনি তার কব্জির উপরে এমন ভাবে হাত রাখলেন যে, কব্জির মধ্যস্থল এবং তাঁর হাত রাখার স্থানের মধ্যে মাত্র এক মুষ্টি পরিমাণ জায়গা অবশিষ্ট রইল। (ইবনে জারীর, আবু দাউদ)

রাসূল (সা.) বলেন, “হে আসমা সাবালিকা হওয়ার পর এটা এটা ব্যতীত শরীরের কোন অংশ অপরকে দেখানো কোন মেয়ের জন্য জায়েয নয়। এ কথা বলে তিনি (সা.) তাঁর মুখমন্ডল ও হাতের কব্জির দিকে ইশারা করলেন।

আল্লাহর অভিশাপ ঐ সব নারীর ওপর যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকে।

হাফসা বিনতে আবদুর রহমান একদিন পাতলা ওড়না পড়ে ফুফু আয়েশার (রা.) ঘরে এলেন। আয়েশা (রা.) তা ছিড়ে ফেলে একটি মোটা ওড়না দিয়ে তাকে ঢেকে দিলেন। (মুয়াত্তা)

নারীদের এমন আঁটসাট কাপড় পরা উচিত নয় যাতে শরীরের  গঠন পরিস্ফুট হয়ে পড়ে।

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিকের মতে মুখমন্ডল, দুই হাত ও পায়ের টাখনু, গিরার নীচের অংশ ছাড়া মেয়েদের পুরো শরীরই সতরের আওতাভুক্ত।

সতর বিশেষ অবস্থায়

সময় ও পরিবেশ ভিন্নতায় এবং ব্যক্তির অবস্থা-অবস্থানের প্রেক্ষিতে সতর পালনেও বিভিন্নতা রয়েছে। সতর ঢেকে রাখতে হবে মুহরিম আত্মীয়ের সামনে। আর হিজাব করতে হবে গায়রে মুহরিমের জন্য।

সতর ঢেকে রাখবে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে থেকে শুরু করে সব বয়সী নারীরা। নিজের রুমে তার জন্য সতর শিথিল। তবে দৃষ্টিকটু কোন পোশাক পরে থাকাও উচিত হবে না। তার ঘরে কেউ ঢুকতে চাইলে মা-বাবা, ভাই- বোন, বান্ধবী- আত্মীয়া কাজের লোক যেকোন মুহরিম আত্মীয় হোক না কেন পর্দার আড়াল থেকে, আমি কি ভেতরে আসব? বলে অনুমতি নিতে হবে। এ নির্দেশ ততক্ষনের জন্য স্পষ্ট থাকে যখন রুমের দরজার পর্দা পুরোপুরি টেনে দেয়া থাকে বা দরজাটা ভালভাবে চাপানো বা বন্ধ থাকে। দরজা খোলা এবং পর্দা সরিয়ে রাখলে সতর উন্মুক্ত বা ওড়না সরিয়ে না রাখাই ভাল। কারণ তখন অনুমতিহীন ও বাধাহীন প্রবেশের পরিবেশ তৈরি থাকে। অপরদিকে কুরআন অনুমতি সাপেক্ষে পরিবার সদস্যদের একে অন্যের ঘরে প্রবেশের তিনটি সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, এশার পরে, দুপুরের বিশ্রামের সময়ে এবং ফজরের আগে। অনুমতি গ্রহণ বিশেষ করে এ কারণেই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যে নারী-পুরুষের কেউ কাউকে যেন এমন অবস্থায় না দেখে যে অবস্থায় তাকে দেখা অনুচিত।

প্রাপ্ত বয়স্ক পুত্রদের অনুমতি গ্রহণ

সুরা নুর এর ৫৯ নং আয়াতে (সতর হেফাজতের উদ্দেশ্যে) বলা হয়েছে যখন তোমাদের পুত্রগণ সাবালক হবে, তখন অনুমতি নিয়ে তাদের ঘরে প্রবেশ করা উচিত। যেমন তাদের পূর্ববর্তীগণ অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করত।

একদিন রাসূল (সা.) তার ঘরে অবস্থান করছিলেন এমন সময় এক ব্যক্তি জানালা দিয়ে ঘরে উঁকি দিল। রাসূল (সা.) বেরিয়ে এসে বললেন, “যদি আমি জানতাম তুমি উঁকি মারবে তাহলে তোমার চোখ কিছু দিয়ে ফুটো করে দিতাম। অনুমতি গ্রহণের আদেশতো দৃষ্টি থেকে রক্ষা করার জন্যই দেয়া হয়েছিল।

এরপর রাসূল (সা.) ঘোষণা করলেন, যদি কেউ অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরের দিকে দৃষ্টি দেয় তাহলে বল প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দেয়ার অধিকার ঘরে বসবাসকারীদের থাকবে এতে যদি দৃষ্টি নিক্ষেপকারীর চোখও উঠে যায় তাতে কোন গুনাহ হবে না। এ ঘোষণা থেকে বুঝা যায় অনুমতি নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুমতি না নিয়ে তাকানো খুবই অন্যায়, গুরুতর অপরাধ। অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশের বিধানগুলো সতর সংরক্ষণ এবং ব্যক্তি ও পরিবারের নিজস্বতাকে নিরাপদ করে।

বাড়ীর বাইরে যাবার সময় বা মুহরিম পুরুষ নয় এমন কারো সামনে যাবার সময় স্বাভাবিক পোষাকের উপর একজন মেয়েকে বাড়তি আরেকটি চাদর জড়িয়ে নিতে হবে। এটাই হিজাব সহায়ক পোষাক বা আড়াল অবলম্বন।

অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে প্রত্যেক গায়রে মুহরিমকেকোন নারীর সাথে পর্দার আড়াল থেকেই কথাবর্তা বলতে বলা হয়েছে। সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াতে নির্দেশ রয়েছে তোমরা ঘরে অবস্থানরত নারীদের নিকট যখন কিছু চাইবে, তখন  পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এতে তোমাদের এবং  তাদের মনের জন্য অধিকতর পবিত্রতা রয়েছে।

একদিন রাসূল (সা.) এর ব্যক্তিগত গৃহকর্মী বিলাল (রা.) ও আনাস (রা.) ফাতিমা (রা.)র কাছ থেকে তার এক শিশু সন্তানকে নিতে চাইলেন। তখন তিনি পর্দার আড়াল থেকেই সে সন্তানকে দিলেন।’ (ফাতহুল কাদীর)

এই আড়াল থেকে যোগাযোগ, কথাবার্তা, আদান প্রদানের সংস্কৃতি মেয়েদের জন্য খুব সহায়ক। কারণ এতে করে ঘরে অবস্থানকালীন সময় মেয়েদের আর কোন বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হয়না। নিজের মতো করে থাকা অবস্থাতেই প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিতে পারে। গায়ে বড় চাদর (জিলবাব) বা বোরকা জড়ানোর প্রয়োজন হয় না।

প্রথমতঃ মুহরিম পুরুষদের সামনে শুধু সতর ঢাকতে হবে হিজাব করতে হবেনা। তাদের সামনে ঘরোয়া কাজকর্মের সময় জামার হাত কিছুটা গুটিয়ে নেয়া যাবে এবং পায়ের দিকের কাপড়ও খানিকটা টেনে নেয়া যাবে।

অন্যদিকে গায়রে মুহরিম পুরুষের সাথে পোশাকের হিজাব, দৃষ্টি, কন্ঠ এবং সংস্পর্শের হিজাব (পাশাপাশি না বসা, দূরত্ব বজায় রাখা) পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, কথাবার্তা এবং অনাত্মীয় নারী-পুরুষের টেলিফোন কথাও সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং আকর্ষণ তৈরি না করে করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ যেসব আত্মীয়ের সাথে চিরন্তন হারামের সম্পর্ক নয় (অর্থাৎ যাদের সাথে কুমারী বা বিধবার বিয়ে বৈধ) তারা মুহাররাম আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত নয়। মেয়েরা নিসংকোচ সাজসজ্জা করে তাদের সামনে আসবে না। আবার একেবারে অনাত্মীয় অপরিচিতদের মতো তাদের থেকে তেমনি পূর্ণ হিজাবও করবে না যেমন অন্য পুরুষদের থেকে করে। এ দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি কি দৃষ্টিভংগি হওয়া উচিত তা শরীয়াতে নির্ধারিত নেই। কারণ এটা নির্ধারিত হতে পারে না। এর সীমানা বিভিন্ন আত্মীয়ের ব্যাপারে তাদের আত্মীয়তা, বয়স, পারিবারিক সম্পর্ক ও সম্বন্ধ এবং উভয়পক্ষের অবস্থার (যেমন এক গৃহ বা আলাদা বাস করা) প্রেক্ষিতে অবশ্যই বিভিন্ন হবে এবং হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে রাসূল (সা.) নিজের নিয়ম ও কর্মপদ্ধতি যা কিছু ছিল তা থেকে আমরা এ দিক নির্দেশনাই পাই। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর ছিলেন রাসূল (সা.)-এর শ্যালিকা। বহু হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি রসূলের (সা.) সামনে আসতেন এবং শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর ও রাসূল (সা.)- এর মধ্যে কমপক্ষে চেহারা ও হাতের ক্ষেত্রে কোন পরদা ছিল না। বিদায় হজ্জ অনুষ্ঠিত হয় নবীর (সা.) ইন্তিকালের মাত্র কয়েক মাস আগে এবং সে সময়ও এ অবস্থা-ই বিরাজিত ছিল (দেখুন আবু দাউদ, হজ্জ অধ্যায়)। অনুরূপভাবে হযরত উম্মেহানী ছিলেন আবু তালেবের মেয়ে ও নবী (সা.) এর চাচাত  বোন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি নবী করীম (সা.) এর সামনে আসতেন এবং কমপক্ষে তার সামনে কখনো নিজের মুখ ও চেহারার পরদা করেননি। মক্কা বিজয়ের সময়ের একটি ঘটনা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। (আবু দাউদ, কিতাবুস সওম) অন্যদিকে আমরা দেখি, হযরত আব্বাস (রা.) তার ছেলে ফযলকে এবং রাবীআহ ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (নবী (সা.) এর আপন চাচাত ভাই) তাঁর ছেলে আবদুল মুত্তালিবকে নবী (সা.) এর কাছে এ বলে পাঠালেন যে তোমরা এখন যুবক হয়ে গেছো, রোজগারের ব্যবস্থা করতে না পারলে তোমাদের বিয়ে হতে পারে না, কাজেই তোমরা রাসূলের (সা.) কাছে গিয়ে কোন চাকরির দরখাস্ত কর। তারা দুজন হযরত যয়নবের গৃহে রাসূল (সা.) এর খিদমতে হাজির হলেন। হযরত যয়নব ছিলেন ফযলের আপন ফুফাত বোন আর আবদুল মুত্তালিব ইবনে রাবীআর পিতার সাথেও তার ফযলের সাথে যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তেমনি তাঁরও আত্মীয় সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি তাদের দুজনের সামনে হাযির হলেন না এবং রাসূল (সা.)- এর উপস্থিতিতে পরদার পেছনে থেকে তাদের সাথে কথা বলতে থাকলেন।                                                                          (আবু দাউদ)

তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, যেখানে আত্মীয়তা সন্দেহপূর্ণ হয়ে যায় সেখানে মুহরিম আত্মীয়দের থেকেও সতর্কতা হিসেবে হিজাব করা উচিত। (বুখারী, মুসলিম) (তাফহীমুল কুরআন, সূরা নূর)

হিজাব পালনকারী নারী পুরুষকে মুহরিম এবং  গায়রে মুহরিম আত্মীয় আত্মীয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে।

জিলবাব

জিলবাব শব্দটি আরবী একবচন শব্দ। বহুবচনে জালাবিব। অর্থ হচ্ছে যে কাপড় দিয়ে সমস্ত শরীর ঢাকা হয়।

সূরা আহযাবের ৫৯ আয়াতে জালাবিব শব্দটির উল্লেখ রয়েছে। হে নবী তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের, মুসলিম নারীদের বল, তারা যেন সকলেই ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় জিলবাব দিয়ে মাথা থেকে নিজেদের আবৃত করে নেয়, যা তাদের সৌন্দর্যকে ঢেকে দেবে। যাতে তাদের সম্ভ্রমশীলতা চিহ্নিত করা যায় এবং তাদের উত্যক্ত করা না হয়। আল্লাহ প্রকৃতই বড় ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

জিলবাব হচ্ছে কোর্তা ও ওড়না যা দিয়ে শরীর ও মাথা আবৃত করা হয়।” (রাগীব ইস্পাহানী)

ওড়নার উপর যে চাদর পরা হয় তাই জিলবাব।” (ইবনে মাসউদ, উবায়দা, কাতাদাহ, হাসান বসরী, সাঈদ ইবনে যুবাইর, ইবরাহীম নখয়ী, আতা প্রমুখ)

যে কাপড় দিয়ে উপর থেকে নিচের দিকে সমস্ত শরীর আবৃত করা হয় তাই হিজাব।

জিলবাব হচ্ছে বোরকা। (ইবনে যুবায়ের)

জিলবাব হচ্ছে এমন পোষাক যা উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ঢেকে দেয়। (মাহাসিন আত তাবিল খন্ড-১৩)

জিলবাবহচ্ছে সাধারণ পরিধেয় পোশাকের উপর একটি অতিরিক্ত বড় চাদর বা বোরকা যা যাবতীয় সৌন্দর্য ও পরিধেয় পোশাককে ঢেকে দেবে। শুধু চোখ খোলা থাকবে।

খিমার

খিমার আরবী শব্দ। অর্থ- ওড়না, দোপাট্টা।

মেয়েরা সালোয়ার কামিজ বা লং-ড্রেসের সাথে যা গায়ে জড়িয়ে রাখে তা-ই ওড়না বা খিমার। ওড়না বিহীন পোষাক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম মেয়ের জন্য অনুমোদিত নয়। তাকে প্রশস্ত ওড়না সহ পোশাক পরতে হবে।

সূরা নূরের ৩১ আয়াতে বুকের উপর ওড়না ছড়িয়ে পরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশ্বাসী নারীদের বলে দাও তারা যেন তাদের অবশ্য আবরণযোগ্য স্থানগুলোর হেফাজত করে, আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া, আর তারা যেন বুকের উপর ওড়না ছড়িয়ে রাখে।তবে কোন কোন বর্ণনা মতে খিমার বা ওড়না বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। ছোট, বড়, মাঝারি।

ওড়না বা খিমার ছোট্ট হলে তা জিলবাবের নীচে পরতে হবে। আর খিমার বা ওড়না যদি জিলবাব বা বড় চাদরের অনুরূপ হয় তাহলে তা বাইরে বের হবার সময় পরা যাবে। যা বোরকার মতই শরীর আবৃত করবে।

পাতলা ফিনফিনে ওড়না পরে ব্যক্তিগত কক্ষের বাইরে যাওয়া অনুচিত। নিজের রুমের বাইরে যেতে বা পরিবার সদস্যদের সামনে বড় ওড়নাই গায়ে রাখা ভাল।

নেকাব

নেকাব দেয়া মানে চোখ খোলা রেখে মুখমন্ডল ঢেকে নেয়া।

মুখমন্ডল ঢাকার বিষয়ে দুটি মত রয়েছে।

সুরা নূরের ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে এ মতপার্থক্য তৈরী হয়েছে।

..................................

ডক্টর মুহম্মদ তকীউদ্দিন হিলালী এবং ডক্টর মুহম্মদ মুহসিন খান কৃত ইংরেজী রূপান্তরে আছে and not to show off their abdornment except only that which is apparent (like both eyes, necessity to see the way or outer palms of hands or dress like veil, gloves, head- cover, apron etc) and to drow their veils all over juyubihinna............"

 

 তাফসীর মাআরেফুল কুরআনে এর অনুবাদ করা হয়েছে “...... যা সাধারণত প্রকাশমান তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে.....

তাফহীমুল কুরআনে “....নিজেদের সাজসজ্জা না দেখায়, কেবল সেইসব জিনিষ ছাড়া যা আপনা থেকে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে বুক ঢেকে রাখে...

Ò..... Except only that which is apparent..."

 

“... যা সাধারণত প্রকাশমান তা ছাড়া

“... সেইসব জিনিষ ছাড়া যা আপনা থেকে প্রকাশিত হয়ে পড়ে....

সাহাবী এবং তাবেয়ীদের কেউ কেউ ৩১ আয়াতের উপরোক্ত অংশের ব্যখ্যায় মুখমন্ডল এবং কব্জির বাইরের হাতের অংশকে অন্তুর্ভূক্ত করেছেন। যুক্তি হিসেবে তারা আবু দাউদশরীফের এ হাদীসটি উল্লেখ করেন ‘... আসমা, মেয়েরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয় তখন তাদের শরীরের কোন অংশ দেখা যাওয়া বৈধ নয়। তবে এ অংশের কথা আলাদাএকথা বলে তিনি নিজের মুখমন্ডল এবং দু হাতের দিকে ইঙ্গিত করেণতাদের আরেকটি যুক্তি হলো, নামাজ এবং ইহরাম অবস্থায় মেয়েদের মুখমন্ডল এবং দুহাত খোলা যেহেতু বৈধ, সুতরাং সেগুলো নারীদের গোপন অংগ নয়। কেননা গোপন অংগ,ঢেকে রাখা যেহেতু ওয়াজিব সেহেতু তা খোলা রাখলে নামাজ শুদ্ধ হতে পারে না। ফলে মুখমন্ডল খোলা রাখার অবকাশ রয়েছে।

অন্যদিকে অনেক সাহাবী এবং তাবেয়ী-

Ò.. not to show off their abdornment....

 

“.... তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে....

“... নিজেদের সাজসজ্জা না দেখায়...

এই নির্দেশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মনে করেন, মুখমন্ডলের সৌন্দর্য গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে উন্মুক্ত করা বৈধ নয়। তাদের মতে এ আয়াতাংশের নির্দেশ মুসলিম নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ করাকে হারাম করে দিয়েছে। যেহেতু মেয়েদের প্রকৃত সৌন্দর্য মুখমন্ডলেই অতএব চেহারা খোলা রাখা হিজাবের উদ্দেশ্য ব্যাহত করবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না এবং তারা টিজিং এর সম্মুখীন হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থলে কেউ যদি হিজাব করা শুরু করতে চান তিনি হয়তো প্রথমে মুখখোলা রেখে হিজাব শুরু করে তারপরে মুখ ঢাকার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করতে পারেন।

তবে সাহাবীদের হিজাব চর্চার বর্ণনা অনুসারে বলা যায় নিরাপত্তা, তাকওয়া এবং সৌন্দর্য প্রদর্শন না করার নির্দেশ অনুযায়ী চেহারা ঢেকে রাখাই অধিকতর যুক্তি সংগত।

চেহারা ঢেকে রাখার পক্ষের চিন্তাবিদরা যা নিজ থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়েএর ব্যাখ্যায় বলেছেন, জিলবাব বা বোরকা পরার পরও একজন নারীর উচ্চতা ও আকার আকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা যায় এবং জিলবাব বা বোরকার একটা নিজস্ব সৌন্দর্যও থাকে অথবা কখনও কখনও তা কোন কারণে হঠাৎ করে গা থেকে খানিকটা সরে যেতেও পারে। প্রত্যেক আগ্রহী ব্যক্তিকেই ক্ষমাশীল দয়াবান আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তওফীক দিন।

সহশিক্ষা

সহশিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। নৈতিক বিপর্যয়ের কারণে চিন্তাশীল মানুষেরা এ নিয়ে নতুন ভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রাথমিক শ্রেণীগুলোতে সহশিক্ষা ব্যবস্থা থাকতে পারে। হিজাব বা পৃথকীকরণের প্রশ্ন আসে তারপর থেকে।

কিন্তু নির্ঝঞ্চাট থাকার উদ্দেশ্যে শিক্ষা বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে চতুর্থ শ্রেণী থেকেই বয়েজ সেকশন ও গার্লস সেকশন আলাদা করে দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী দেখা যায়। এর কারণ সাংস্কৃতিক ও আচরণগত।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ার শিশু দর্শকরা শুধু কার্টুনই দেখেনা নাটক-সিনেমা সহ সব অনুষ্ঠানই দেখে থাকে। বিশেষ করে বড়দের জন্য নির্মিত নাটকগুলো নিয়মিত দেখতে দেখতে ওদের মন মানসিতায় অকালপক্কতা ভর করে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয় ফলে এদেরকে নিয়ে চতুর্থ পঞ্চম শ্রেণীতে টিচারদের কখনও কখনও কিছু বিড়ম্বনায় পড়তে আমরা দেখে থাকি।

তবে এটা অনস্বীকার্য যে মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ছেলে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি পৃথক করে দেয়াই উচিত। বিশেষায়িত এবং উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি আলাদা।

মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সহশিক্ষা অধিকতর বিপর্যয় সৃষ্টি করে। যে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার আর সুযোগ থাকেনা। নটরডেম ও ভিকারুন্নেসা কলেজে সহশিক্ষা চালু থাকলে প্রতিষ্ঠান গুলোর পক্ষে এখানকার মতো ভালো রেজাল্ট করা সম্ভব হতোনা।

শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক নৈতিক বিপর্যয়ের মুখে বিগত নব্বই দশকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চালু করেছে মেয়েদের জন্য পৃথক ১০৭টি কলেজ। এবং রাশিয়ায়ও চালু হয়েছে ১২০টি কলেজ। (আদ্দাওয়াহ, এপ্রিল ১৯৮৯)

অথচ ওদের বর্জ্য সংস্কৃতি অনুসরণ করে আমরা সহশিক্ষাকেও আরো মিক্সআপ করতে চাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে দেখলেন ছেলে-মেয়েরা পৃথক বেঞ্চে বসেছে। অনেক ছাত্রী আবার হিজাব করা। ভ্রু কুঁচকে গেল তার। উচ্চস্বরে মন্তব্য, you are friends! Why make difference?  দুহাত সামনে প্রসারিত এবং আন্দোলিত করে কড়া আবেদন রাখলেন, Mix! Just mix!  উপস্থিত ছাত্রীর বর্ণনা। (২০০৬ সাল)

অথচ ১৯৯৮ সালের ১৪ মে সংখ্যা Bangladesh Observer এ ডা: সাবরীনা রশীদ সহশিক্ষা বিষয়ক নৈতিক বিপর্যয়ের আশংকাজনক তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, “ছাত্র-ছাত্রীদের পারস্পরিক কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত সৎ (innocent) থাকেনা। এগুলি পরবর্তীতে স্পর্শ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। .....মেয়েরা ছেলেদের বন্ধু হিসেবে ভাবলেও ছেলেরা তার চাইতে অনেক বেশী ভাবে।

এ পর্যায়ে ডাঃ সাবরীনা পরামর্শ দিয়েছেন ছাত্র/ছাত্রীদের নিরাপদ দূরত্ব safe distance রক্ষা করে চলতে। সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে মেয়েদের মধ্যে হাসি ঠাট্টার (informal) সম্পর্ক হওয়া উচিত নয়। তাদের সম্পর্ক, সতর্ক এবং ফর্মাল (formal) ধরনের হওয়া উচিত।

ইচ্ছে করলে আল্লাহর নির্দেশ এবং ভয় স্মরণে রেখে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বেশ ভালভাবে হিজাব বজায় রাখা যায়। যেমন- ছেলে এবং মেয়েরা পৃথক বেঞ্চে বসা, আলাদা ক্যান্টিন ও কমন রুম থাকা। প্রয়োজন ছাড়া ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে কথা না হওয়া। দৃষ্টি ও কন্ঠ সংযম অবলম্বন। ছেলে ও মেয়েদের ল্যাব গ্রপ পৃথক হওয়া। নৈতিক সমস্যা তৈরীর ব্যাপারে সহশিক্ষার স্পর্শকাতর পরিবেশকে অগ্রহণযোগ্য আচরণের দিকে ঠেলে দেয় বস্তুবাদী অশ্লীল সাহিত্য সংস্কৃতি এবং নিয়ন্ত্রণহীন অবাধ যোগাযোগ মেলামেশা। একারণে সহশিক্ষা চালু প্রতিষ্ঠানগুলোতেই হিজাব অনুসরণের প্রয়োজন সর্বাধিক।

আমাদের দেশে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালু হবার আগ পর্যন্ত সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটা অলিখিত পৃথকীকরণ ব্যবস্থা মোটামুটি চালু ছিল। শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতাও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখত। গ্রুপ ষ্টাডি এবং ল্যাব ব্যাচ গুলোর অধিকাংশই আলাদা আলাদা হতো। অফ ফিরিয়ডের জটলায়ও এক ধরনের পৃথকীরণের ভাবধারা বজায় থাকত।

বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং টিভি চ্যানেলগুলো চালু হবার পর আমরা নৈতিকমূল্যবোধ ও পরিবেশের দ্রুত অবনতিশীল পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বিজনেস ক্লায়েন্ট মনে করে। ছাত্র-ছাত্রীরাও নিজেদের সেরকমই ভাবে।

যথেষ্ট পরিমাণ নগদ পয়সায় ওরা সেখানে শিক্ষা কেনে। নীতি-নৈতিকতা মুল্যবোধ কেনারতো কথা না, কেনেওনা। খরিদ্দারের মানসিকতায় মুখাপেক্ষী বিক্রেতাদেরআর তেমন কিছু করার থাকেনা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আমাদের মূল্যবোধের হাতকে গুটিয়ে দিয়েছে এভাবেই।

২০০৬ সালের শুরুর দিকে বেশ কজন অভিভাবক পত্রিকার পাতায় তাদের মত প্রকাশ করেছেন এভাবে যে, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সন্তানকে ভর্তি করাতে গিয়ে কিছুক্ষণের পরিবেশ দর্শনেই তারা ফিরে এসেছেন ভর্তি করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। মাঝে মাঝেই সংবাদপত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আত্মহত্যার সংবাদ ছাপা হয়। আমরা আমাদের আশে-পাশে প্রত্যক্ষ করি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক সম্পর্ক সংক্রান্ত জটিলতায় মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট, মাদকাসক্তি এবং সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা। এদের কেউ কেউ শিক্ষা জীবনও সম্পূর্ণ করতে পারেনা। লেখা-পড়ায় ইতি টানে মাঝখানে। অনেকে ব্যর্থ হয় ভাল রেজাল্ট করতে।

সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীরাই হিজাব অনুসরণ করছে। ছাত্রীদের হিজাব দৃশ্যমান হয়। ছাত্রদের দৃষ্টিসংযম এবং ছাত্রীদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলা দৃশ্যমান হয়না। তবে সহপাঠীরা কিছুটা বুঝতে পারে এবং ধারণা করে নেয় তাদের বন্ধুটি হয় ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক না হয় আদর্শবাদী কোন গ্রপ বা সংগঠনের সদস্য।

আমাদের সমাজে হিজাব সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব রয়েছে তবে বর্তমানে হিজাব একেবারে অপরিচিত কোন বিষয়ও নয়। এ ধারণাও সমাজে সঞ্চায়িত হয়েছে যে হিজাব করেই সব ধরনের লেখাপড়া, কাজ এবং উন্নতি সম্ভব।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব পালন এখন আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক সহজ। কটুক্তি বা টিজিং শয়তান যতদিন আছে কিছু না কিছু থাকবেই। যে কোন বিষয়ে বক্রোক্তি করার মজ্জাগত অভ্যাসও কারো কারো থাকে । তবে অবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে তখন যখন অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রীরা হিজাব চেতনার সাথে পরিচিত হবে, হিজাব অনুসরণের হার বাড়বে এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে, সহ শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই সীমিত করা হবে।

দৃষ্টি সংযম এবং দূরত্ব তৈরি ছেলেদের জন্যও খুব সহজ কাজ না তবে তা নিজস্ব সিদ্ধান্তেই শুরু করা সহজ। চলমান পোশাকেই তাদের হিজাব নির্দেশিত পোশাক অনুসরণ হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েদের যেহেতু সৌন্দর্য আড়ালের জন্য জিলবাব, বোরকা, বড় চাদর বা ওড়না পড়তে হয় সেজন্য সংঘবদ্ধ সাহচর্য পেলে তার জন্য হিজাব সম্মত পোশাক গ্রহণ বা শুরু করা সহজ হয়। এজন্য গ্রপ স্টাডি বা স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। হিজাবধারী মেয়েদেরও দায়িত্ব ভাল রেজাল্ট করে প্রমাণ করা হিজাব আত্মউন্নয়নে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না।

হিজাবহীনতার যা কিছু সমস্যা আলোচনা করা হয়েছে। সহশিক্ষা ব্যবস্থায় সে সমস্যা গুলির সবকটাই তৈরি হয়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হবার মতো অনেক ঘটনা ঘটে। একটি পরিবারের সুখ, শান্তি, স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিনের জন্য হারিয়ে যায়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে মফস্বল শহরের একটি কলেজের ঘটনা। প্রথম বর্ষের ছাত্রী উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তার কন্যা তার গ্রপের বন্ধুদের বলল তাদের ক্লাশেরই একটা সুদর্শন ছাত্রের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে দিতে।

বন্ধুরা উৎসাহের সাথেই দায়িত্বটা পালন করল। ছেলেটির বাবা মেয়ের বাবারই অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। ছেলে- মেয়ে দুজনেরই বয়স ১৭। কেবলই এইচ,এস,সি প্রথম বর্ষের ছাত্র। এমন অসম অনিশ্চয়তার সম্পর্ক কোন পরিবারের পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব হয়না। মেয়ের বেপরোয়া আচরণ, বন্ধুর সাথে ঘোরাঘুরি- উচ্ছৃংখলতা লেখাপড়ায় অমনোযোগীতা মেনে নিতে না পেরে মেয়ের বাবা মেয়েকে ঢাকায় রাখার জন্য মেয়েটির কলেজ এবং ছোট দুই বোনের স্কুল চেঞ্জ করে ঢাকায় বাসা নিলেন। ঢাকায় বদলি হয়ে আসাতো খুব সহজ না ফলে ওই পরিবারে এখন দুটি বাসা একটি মফস্বলে একটি ঢাকায়। মেয়েটিকে নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে হয়। লেখা-পড়া কতদূর হবে বোঝা মুশকিল।

এখানে একটি দীর্ঘ দুঃখ ও যন্ত্রনাদায়ক ঘটনার সংক্ষিপ্ত শালীন বর্ণনা দেয়া হলো। এমনি আরো হাজারো ঘটনা শত শত কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর জীবনের সুন্দর সম্ভাবনা ও মেধা-যোগ্যতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। শুধুমাত্র সহশিক্ষা জনিত সমস্যার কারণে এইচ, এস, সি পর্যায়ে বহু ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় খারাপ করে। অনার্স লেভেলে কাংখিত বিষয়ে পড়ার সুযোগ হারায়। প্রসঙ্গত প্রাইভেট টিউটরের বিষয়টিও এসে পড়ে। মেয়েদের জন্য মেয়ে টিচার এবং ছেলেদের জন্য ছেলে টিচার বাস্তবতা  এবং হিজাব সম্মত। এই সমাজে সহশিক্ষার আরো হাজারো যন্ত্রনা অসহনীয় কষ্ট ও নৈতিক অপরাধ এবং মেধা অপচয়ের কথা আমরা সবাই যথেষ্ট অবহিত। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা সে বর্ণনা তুলে ধরে লেখাটাকে ভারাক্রান্ত করে তুলতে চাইনা।

পরিচ্ছন্ন নৈতিকতা নির্মাণ, লেখা- পড়ার কাংখিত পরিবেশ নিশ্চিত এবং যাবতীয় জ্ঞান ও অজানা বিষয়ের মালিক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালনের জন্যই আমাদেরকে সহশিক্ষা ব্যবস্থা সীমিত ও গুটিয়ে আনতে হবে। নৈতিক মান সংরক্ষণে যত্নবান থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার মতো পোশাক ও আচরণ বিধি চালু করা যায়।

অধিকার, উত্তরাধিকার ও হিজাব

ইসলামে নারী অধিকারকে দুটি প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হয়। উত্তরাধিকার এবং হিজাব।

হিজাব সম্পর্কে যারা কম জেনে কথা বলেন বিভ্রান্তি তারাই ছড়িয়ে থাকেন। হিজাব ইসলামী সমাজে একটি নৈতিক ব্যবস্থাপনা যা নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই অবশ্যপালনীয়। এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনাগত বিষয়ও রয়েছে। নারী পুরুষের সৃষ্টিগত পার্থক্যের জন্যই মানুষের স্রষ্টা হিজাব ব্যবস্থায় দুই ধরনের পোশাকের ব্যবস্থা রেখেছেন। এতে সমস্যা অনুভবের কোন যুক্তি নেই। কেউ যদি একে সমালোচনা করতে চান তার আগে মানুষকে কেন নারী ও পুরুষ এই দুই প্রকৃতিতে সৃষ্টি করা হলো তার সমালোচনা করুন।

এরপর আসে উত্তরাধিকার প্রসঙ্গ। কর্মক্ষম এবং যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের জন্য উত্তরাধিকার খুব বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না কখনই। মানুষ সাধারণত উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ লাভ করে থাকে চল্লিশ পরবর্তী বয়সে। কেউ কেউতো উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে থাকে ভালো অংকের পৈত্রিক ঋণ। আর এই ঋনের বিষয়টা সামাজিকভাবে পরিবারের পুরুষ সদস্যের উপরই বর্তায়।

ব্যক্তির লেখা-পড়া ও কর্মক্ষম হয়ে উঠার সময়কাল যদি ধরা হয় ৩০ বৎসর পর্যন্ত তাহলে ঐ সময়ের মধ্যে উত্তরাধিকার সম্পদের কোন ভূমিকা তার জীবনে থাকে না। মানুষের অধিকার প্রাপ্তির বয়সকাল ত্রিশ হলে এর পরের সময়টা হয় অন্যকে অধিকার প্রদানের বয়স। আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই উত্তরাধিকার সূত্রে এমন পরিমাণ সম্পদ লাভ করে না যা তার জন্য খুব বেশী কিছু হয়।

তবু আমরা উত্তাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদকে গুরুত্বপূর্ণ ধরেই আলোচনা করব। অধিকার এবং উত্তরাধিকার দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।

অধিকার জড়িত জীবিত পিতা-মাতার সাথে। উত্তরাধিকার তৈরি হয় পিতা-মাতার মৃত্যুর পর। প্রথমে আমরা দেখব কন্যাসন্তানের প্রতি জীবিত পিতা-মাতার ভূমিকা কি?

রাসূল (সা.) এর বক্তব্য, ‘তোমরা যখন কোন উপহার, খাদ্য বা খেলনা নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে, তা প্রদান শুরু করবে কন্যা থেকে। রাসূল (সা.) এর আর একটি বক্তব্যঃ যে ব্যক্তি কন্যাদের প্রতিপালন করবে এবং তাদের উপর পুত্রকে অগ্রাধিকার দিবেনা, সে ব্যক্তির জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিপালনের সময়কালে ইসলামী আইন শুধু সমতা বিধানই নয় কন্যা সন্তানকে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে।

পিতা- মাতার কাছে পুত্র এবং কন্যা সন্তান সমান গুরুত্বেরই হয়ে থাকে। তবে নির্মম আর্থিক টানা পোড়ানের সমাজে পুত্রকে দ্রুত উপার্জনক্ষম করতে গিয়ে পারিবারগুলো যে অসমতা তৈরি করে তার দায় ইসলামী আইনের উপর বর্তায়না। এবং এইসব অসমতা ইসলামী মূল্যবোধ অনুসরণে করা হয়না। এটা বরং রাসূল (সা.) এর নয়, শিক্ষার বিপরীত আচরণ। স্বচ্ছল পরিবারে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্তমানে আর অসমতা তৈরির প্রবণতা দেখা যায়না। অসমতা তৈরির প্রবণতাটি মোটেই আদর্শ ভিত্তিক নয় পুরোপুরিই অর্থনৈতিক।

অধিকারের পরে আসে উত্তরাধিকার প্রসঙ্গ।

কুরআনে সুরা নিসায় মহাজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্, উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তার আগে সম্পদ প্রাপ্তি, দায়িত্ব ও অধিকারের একটা তুলনামুলক বিশ্লেষণ দেখা যাক।

1নারীর জন্য উপার্জন এবং সংসার ব্যয় নির্বাহ বাধ্যতামূলক নয়।

 

1পক্ষান্তরে পুরুষের জন্য সংসার ব্যয় নির্বাহ বাধ্যতামূলক।

1বিয়ের সময়ে মেয়েরা মোহরানা লাভ করে। সংসার জীবনের সূচনায় স্বর্ণ বা নগদ টাকায় এর পরিমাণ খুব খারাপ থাকে না। এ অর্থ সহ নিজস্ব যে কোন সম্পদ ব্যবহারে নারী সম্পূর্ণ স্বাধীন।

 

1 একটা ছেলেকে মোহরানা প্রদানের সক্ষমতা প্রমাণ করে তবেই বিয়ে করতে হয়। বিয়ে অনুষ্ঠানের যাবতীয় খরচ সাধারণত তাকেই বহন করতে হয়। মোহরানার মত কোন অনায়াস প্রাপ্তির ব্যবস্থা পুরুষদের জন্য নেই।

1সংসারে ব্যয় নির্বাহ নারীর জন্য কখনই অত্যাবশ্যক করা হয়নি।

 

 

1 যেকোন উপায়েই হোক পুরুষ আইনগত ভাবেই সংসার ব্যয় নির্বাহে বাধ্য। প্রয়োজনে পুরুষের কাছ থেকে আদালত নারীকে ব্যয়ের অর্থ আদায় করে দেবে।

1নিজস্ব ব্যয় নির্বাহকেও নারীর জন্য কখনই অত্যাবশ্যক করা হয়নি।

 

1কর্মক্ষম সময়ে নিজের ব্যয় নিজেই বহন পুরুষের জন্য বাধ্যতামুলক।

1 বোন তালাক প্রাপ্ত বা বিধবা হলে (নিজস্ব সম্পদ না থাকলে) তার ব্যয় নির্বাহ কোন মেয়ের জন্য অত্যাবশ্যক করা হয়নি।

 

 1বোন তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা হলে (বোনের নিজস্ব সম্পদ না থাকলে) তাঁর ব্যয় নির্বাহ ভাইয়ের জন্য অত্যাবশ্যক।

  1. 1স্ত্রী- স্বামীর সম্পদে উত্তরাধিকার লাভ করে।

 

1 স্বামী- স্ত্রীর সম্পদে উত্তরাধিকার লাভ করে।

 

দেখা যাচ্ছে কোন ধরনের আর্থিক ব্যয়ভার বহনকেই নারীর জন্য সূক্ষদর্শী ও পরাক্রমশালী আল্লাহ বাধ্যতামূলক করেননি। কারণ নারী পৃথিবীর সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করে বলে তাকে উপার্জনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে আগ্রহী এবং সক্ষম নারীদের জন্য উপার্জনে কোন বাধা নিষেধও নেই। পাশাপাশি ঘরকে উপেক্ষা না করতে এবং মানব সম্পদ পরিচর্যা ও উন্নয়নের প্রতি তাকে দায়িত্বশীল থাকতে এবং এজন্য তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানব সম্পদ যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে থাকে তাহলে সে সম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদন ও পরিচর্যার প্রধান দায়িত্বশীল হচ্ছে নারী। আর প্রতিটি ঘর হচ্ছে পৃথিবীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রোডাকশন হাউজ। পাথর- মানুষ কিংবা শুধু রক্ত মাংসের প্রাণী নয় তৈরি করতে হবে উন্নত নীতি- নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ। মানুষ তৈরীর সুনিপূন কারিগর নারী।

এভাবে অর্থব্যয়ে বাধ্য না হয়েও নারীর অর্থ ও সম্পদ প্রাপ্তির উৎসগুলি হচ্ছে (১) মোহরানা (২) নিজস্ব উপার্জন অথবা স্বামীর নিকট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রাপ্তি। (৩) পৈত্রিক সম্পদ প্রাপ্তি (কন্যা যা পাবে পুত্র পাবে তার দ্বিগুন)

(৪) স্বামীর সম্পদে উত্তরাধিকার। এ ছাড়া কুরআনে যে ১২ জন প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারী স্পষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে তার মধ্যে ৮ জনই নারী।

এভাবে অর্থনৈতিক দায় দায়িত্বমুক্ত থেকে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ-সম্পদ প্রাপ্তিতে নারীর ব্যক্তিগতভাবে স্বচ্ছল থাকার নিরাপদ সুযোগ রয়েছে।

আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে দেখা যায় পরিবারের পুরুষটির কাছে এমন কোন অর্থ সম্পদ থাকে না যে তাকে যাকাত দিতে হবে। পক্ষান্তরে গহনা ও নগদ সঞ্চয় মিলিয়ে বহু পরিবারের নারীকে যাকাত প্রদান করতে হয় বা অন্যভাবে বলা যায় তার হাতে যাকাত যোগ্য সম্পদ জমা থাকে।

এ বিষয়ে আমাদের শেষ ভাবনা ভাবতে হবে সুরা আলে ইমরানের ১৯৫ আয়াত অনুসারে নারী হও কি পুরুষ তোমরা সবাই সমজাতের লোক।

বলা যায়- নিশ্চয়ই অধিকার, দায়িত্ব, এবং উত্তরাধিকার ও হিজাব বিষয়ে আল্লাহ সমতার ভারসাম্য স্থাপন করেছেন।

হিজাবহীন সমাজের অপরিহার্য পরিণতি

হিজাবহীন সমাজে নৈতিক অপরাধের পথ প্রশস্ত থাকে। নারী পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কে বিশৃংখলা তৈরী হয়। অসংযমী ও অনৈতিক জীবন যাপনের ফলে সমাজ ও ব্যক্তির জীবনে অস্থিরতা বিরাজ করে এবং বহু অপরাধ ও বিবাদ বিসম্বাদের জন্ম হয়। পারিবারিক শান্তি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। পারিবারের শিশুরা বেড়ে উঠার স্বাভাবিক পরিবেশ হারায়। একটু স্বস্তি- একটু শান্তি খুঁজতে নারী পুরুষ তখন ঘরের বাইরে পা বাড়ায়। নেশা, মাদকদ্রব্য, ক্লাব, বারের আশ্রয় নেয়। হত্যা কিংবা আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। ঘটে মানসিক বিকৃতিও। কেউ কেউ নিয়মিত গ্রহণ করে কড়া ঘুমের ঔষধ। নড়বড়ে বা ভেঙ্গে যাওয়া পরিবারের শিশুরাও হয়  অপরাধ প্রবণ এবং অসুস্থ মানসিকতার।

আমাদের সমাজে এখনও যথেষ্ট পরিমাণে নৈতিক মূল্যবোধ কার্যকর রয়েছে। অধিকাংশ পরিবারে হিজাবের বিভিন্ন পরিমাণের প্রভাব রয়েছে। পরিবারগুলো সন্তানদের নীতি- নৈতিকতার ব্যাপারে খুবই সচেতন এবং তাদের নৈতিক সুরক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

কিন্তু তারপরও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। সাহিত্য, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, মোবাইল সার্ভিস এবং বেসরকারী কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের সমস্ত আকুল প্রয়াসকে ভন্ডুল করে দিচ্ছে। অধিকাংশ অভিভাবকদের এই সচেতনতার পাশাপাশি গুটিকয় অভিভাবক পাশ্চাত্য ধাঁচের জীবনধারাকে স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই ধরনের অসচেতন পরিবারগুলো হিজাবহীন পরিবেশের কুফল গুলো ধারণ করছে এবং সমাজে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম পারিবারিক সংস্কৃতি ধারণ করার চাইতে মিডিয়া সংস্কৃতিকেই ধারণ করছে বেশী। হিজাবহীন পরিবেশের ভয়াবহ বিপদ ও চরম অশান্তি সম্পর্কে সবারই ধারণা থাকা প্রয়োজন। এবং আমাদের সমাজটা যেন সেই সব অনিবার্য বিপদ ও পচন থেকে রক্ষা পায় প্রতিটি সচেতন নাগরিককেই এ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত। হিজাবহীনতায় আমরা যতটুকু আক্রান্ত হয়েছি এর কুফলও আমাদের উপর ততটুকু আপতিত হয়েছে।

হিজাবহীন সমাজের কিছু চিত্রঃ

(পাশ্চাত্যে)

লন্ডনে প্রতিবছর ৭৪ হাজার নারী পারিবারিক নির্যাতনের কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। (জাতিসংঘ রিপোর্ট )

নিউইয়র্কের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে ১৭শ মেয়ের মধ্যে ১৪ বছরের একজন মেয়ে কেবল কুমারী (জনকন্ঠ- ১৯ আগষ্ট ০৩)

১৯৯৩ সালে আমেরিকায় দেড় লাখের বেশী নারী সম্ভ্রমহানীর শিকার হয়েছে। এর প্রায় ৫% ঘনিষ্ঠ রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় কর্তৃক।

১৯৯৭ সালের ট ঘ ও ঝ ঊ ঋ এর একটি রিপোর্টে বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি নয় সেকেন্ডে একজন নারী তার ঘনিষ্ট সঙ্গীর হাতে দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়।

মার্কিন পুলিশের হিসেব মতে ১৯৯২ সালে সেখানে ১ কোটি ৪ লাখ নারী সংক্রান্ত অপরাধের ঘটনা ঘটে।

জীবন সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ইটালীতে প্রতিবছর প্রায় ছয় হাজার নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুমারী মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছে ৩৩ লক্ষ শিশু। এদের অধিকাংশই পিতৃপরিচয় নিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে থাকে।

সংবাদ সংস্থা ইরতাস জানিয়েছে রাশিয়ায় প্রতি ১০০টি শিশু জন্মগ্রহণের পাশাপাশি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে ২১৭টি। বছরের তালিকাভুক্ত ৩০ লাখ গর্ভপাতের ঘটনার মধ্যে ৩,০০০ বালিকার বয়স ১৫ বছরের নীচে। (ইনকিলাব ১৭ অক্টোবর ৯৫)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর বয়ফ্রেন্ডদের দ্বারা এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয় প্রায় ৪০ লাখ নারী। এর মধ্যে ১৭,০০০ গুরুতর আহত হয় এবং ১৪০০ জন মৃত্যুবরণ করে। প্রতিবছর ১৫ লক্ষ বিয়ের মধ্যে ৩ লাখ বিয়েরই প্রথম ৩ মাসের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। ৭৫% স্বামী- স্ত্রী পরস্পরের প্রতি অবিশ্বস্ত থাকে ও প্রতারণা করে, প্রতি ২২৫ জনের একজন এইডস জীবানু বহন করছে।

অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে সন্তান সম্ভবা হয়ে অধিকাংশই লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। আইন করা হয়েছে যেসব বাবা-মা রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সতের ও তার কম বয়সী সন্তানদের বাড়ীতে আটকে রাখবে না তাদের জরিমানা ও কারাভোগ করতে হবে।  [তথ্যঃ ১৯৯৫]

বাংলাদেশের চিত্র

শক্তিশালী এক ধর্মীয় মূল্যবোধের অধিকারী আমাদের এই দেশ, সমাজ। সমাজের যে অংশটি পাশ্চাত্য জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে হিজাব বর্জন করেছে তারাও কিছু ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে। কিন্তু পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজে  পরিণত হয়েছে। এক প্রান্তের একটি  ঘটনা মুহুর্তেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তকেও নাড়া দেয়। নেতৃত্বের ব্যর্থতায় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কবলিত হয়ে পড়ে দেশ ও জাতি।

আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতাহীন ভোগবাদী সংস্কৃতিরও বিশ্বায়ন ঘটেছে। ফলে চটকদার বাণিজ্য- সংস্কৃতির দাপটে মূল্যবোধের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অদূরদর্শী নতুন প্রজন্মের চেতনায় অনেকাংশেই ম্লান হয়ে উঠেছে। ইতিবাচক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দূর্বলতায় তরুণ প্রজন্ম মেতে উঠেছে শেকড়হীন কিছু পরগাছা সংস্কৃতির চর্চায়। এইসব অনুষ্ঠানগুলোতে হিজাবের পরিচ্ছন্ন চেতনা, আভিজাত্য ও সুস্থ রুচীবোধতো বহু দূরের বিষয় বরং নর্তক-নর্তকী, রাধাকৃষ্ণ হয়ে দৃষ্টিকটু পোষাক ঘুরে বেড়ায় ছেলে-মেয়েরা। ন্যুনতম শালীনতাবোধও তারা বিসর্জন দিয়ে বসে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় কিছু বয়সী নারী পুরুষকেও দেখা যায় সেখানে বাণিজ্য চক্রের ফাঁদা এই অনুষ্ঠানগুলোতে। দেশীয় মূল্যবোধ নিয়ে কোন মাথা ব্যথা থাকেনা আমাদের।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণে নারীত্বকে সব জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে বাণিজ্যিক পণ্যে, উপেক্ষিত এবং অবমূল্যায়িত হচ্ছে নারীর মানবিক সত্ত্বা ও মূল্যবোধ। সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তারকা পণ্য তৈরী করা হচ্ছে।

সবখানেই মূল্যবোধ উপেক্ষিত। প্রাধান্য পাচ্ছে বাণিজ্য।

স্রেফ লাভজনক করার চিন্তায় চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা মেশানো হচ্ছে। যাত্রা এবং নাটকের ব্যাপারেও একই কথা। ইন্টারনেট চ্যাটিং এ ঘন্টার পর ঘন্টা বুঁদ হয়ে থাকে ছেলে-মেয়েরা লেখা-পড়া ফেলে। ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফীর বিস্তার স্পর্শ করে আমাদের তরুণ প্রজন্মকেও। ২০০৫ সালের এক জরীপে দেখা যায় পর্নো ওয়েবসাইটের সংখ্যা এক কোটি একত্রিশ লাখ। ইন্টারনেট পর্নো বাণিজ্যকে শিশু কিশোর তরুণ-তরুণীদের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দিয়েছে। পিতা-মাতার অজান্তে আজকাল শিশু- কিশোররা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের পর্নো সমূদ্রের সংস্পর্শে আসছে। ঢাকা শহরের সাইবার ক্যাফেগুলোতে যাতায়াতকারী শতকরা নব্বইভাগই উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়ে।  পর্নো সিডি হাতের কাছে পাওয়া যায়। এই যে অরাজকতা অশ্লীলতার থাবা এর থেকে মুক্ত নয় ক্রীড়াঙ্গনও।

অথচ খেলাধুলাকে বিবেচনা করা হয় নির্মল বিনোদন ও স্বাস্থ্য চর্চার প্রধান মাধ্যম হিসেবে। দৌড়, সাঁতার, বক্সিং, রেসলিং, টেনিস, ফুটবল, ক্রিকেট সব খেলাতেই অর্থহীন ভাবেই সংক্ষিপ্ত পোশাক ও নারী পুরুষের অবাধ মিশ্রণ ঘটানো হচ্ছে। আর ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পোশাকই থাকছে বেশী সংক্ষিপ্ত। দর্শকদের পোশাক চেতনাও এতে আক্রান্ত হয়।

হিজাব ব্যবস্থা সমাজে যে শুদ্ধ নৈতিকতা, পবিত্র চরিত্র সৃষ্টি করতে চায়, প্রচার মাধ্যম ও পাশ্চত্য সাংস্কৃতিক ধারা তার একেবারে বিপরিতধর্মী চরিত্র ও সামাজিক পরিবেশ তৈরির কাজ করে। হিজাব চেতনার সমাজকে এইসব সাংস্কৃতিক ক্যান্সার নির্মূলে সচেতন হতে হবে।

হিজাবহীন পরিবেশের যন্ত্রণা আমাদের সমাজও কিছু কিছু ভোগ করতে শুরু করেছে। পাশ্চাত্যের তুলনায় এখনও তার পরিমাণ কম হলেও সাবধান হতে হবে এখনই।

অশ্লীলতা, অনৈতিকতা রোধে আমাদের দুরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তিশালী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ও জনমত গঠনের অভাব রয়েছে।

যে বিশ্বাস আমরা পোষণ করি না, যে অভ্যাস, যে আচরণকে আমরা চাইনা তা-ই আমাদেরকে চলচ্চিত্রে, নিয়ন্ত্রণহীন বিদেশী টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে দেখানো শেখানো হচ্ছে, দিনের পর দিন। নিয়ন্ত্রণহীন সহশিক্ষা বিশেষ করে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র-ছাত্রী সন্তুষ্ট রাখার বাণিজ্যিক পরিবেশ তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। অশ্লীল রুচী ও মানসিকতার অনুপ্রবেশ ঘটছে কার্টুন-মুভি, চিত্রশিল্পের মাধ্যমেও। হিজাব চেতনা নির্বাসিত যাবতীয় রাষ্ট্রীয় ও সাধারণ অনুষ্ঠান মালা থেকে। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। এগুলোর ক্ষতি থেকে মুক্ত হবার প্রধান পদক্ষেপ হচ্ছে আদর্শ চিন্তার বিস্তার, সুস্থ চিন্তার সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলকে জোরদার করা। ব্যক্তির মধ্যে নৈতিক চেতনার সঞ্চার। তা না হলে সামাজিক সহিংসতা ও গৃহসহিংসতা, হত্যা-আত্মহত্যার দুর্ঘটনা, বাল্যবিবাহ, অসম প্রেম, অনৈতিক সম্পর্ক, সম্ভ্রমহানী, অপহরণ, এসিড, ঈভটিজিং সন্ত্রাস থেকে মুক্তির অন্য কোন পথ নেই। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এন.জি.ও এবং পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায় ২০০২ সালে আমাদের দেশে সম্ভ্রমহানীর ঘটনা ঘটেছে ৬৩৫টি, এসিড দগ্ধ হয়েছে- ১৪৩টি মেয়ে, হত্যা-আত্মহত্যা, নির্যাতন হয়রানির ঘটনাও ঘটেছে অনেক। ঢাকা সিটি করপোরেশনের দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০৪ সালে তালাকের নোটিশ জমা পড়েছে ৩৩৩৮টি, এর মধ্যে ৮৪ ভাগ তালাকই কার্যকর হয়েছে। ২০০৩ সালে তালাক কার্যকর হয়েছে ৩২০২ টি।

আমাদের সমাজের এই চিত্র পাশ্চাত্য সমাজের তুলনায় অনেক কমহলেও তাদের সংস্কৃতির অনুগামী হতে থাকলে তাদের অংকে পৌছে যেতে বেশী সময় লাগবেনা। অন্যদিকে মুসলমানদের সমাজে, চরিত্রবান মানুষদের সমাজে বর্তমান মাত্রার অপরাধ প্রবণতা এবং ভাঙ্গনও অনাকাংখিত, দুঃখজনক। খুব সহজেই এ অধঃপতন থেকে পরিত্রাণ সম্ভব। প্রয়োজন শুধু আপন আদর্শে একনিষ্ঠ হওয়া।

হিজাব- বিভ্রান্তি

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর হিজাব চর্চা আঞ্চলিক অবরোধ প্রথার সংস্পর্শে আসার ফলে বিভিন্ন এলাকায় নানা সময়ে এর বৈশিষ্ট্যের রকমফের ঘটেছে।

হিজাবের সহজ পন্থার উপরে অবরোধ প্রথার কাঠিন্য আরোপ করে একে অতি ধার্মিকতা হিসেবে ভাবা হয়েছে। অথচ আল্লাহর বিধানে হ্রাস বৃদ্ধি করার কোন সুযোগ নেই।

পুরুষদের বাদ দিয়ে হিজাবকে নারীদের উপর একতরফা ঠেলে দেয়া হয়েছে। ঘরের অভ্যন্তরে হিজাব চর্চায় এসেছে বিভ্রান্তি ও শিথিলতা।

কুরআন হাদীস জানার দূর্বলতার কারণে হিজাব সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নানা অদ্ভুত সব ধারনা এবং অজ্ঞতা। অশিক্ষা, দারিদ্র, নারী নির্যাতন এবং কুসংস্কার বিষয়টিকে আরো বেশি প্রশ্নবোধক এবং গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় আরো বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন সেইসব লোক যারা অতি সামান্য মেধা ব্যয় করে সমাজ দেহের প্রতিটি অনুকনার সাথে মিশে থাকা এ সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি করে ফেলতে চেয়েছেন। এ হাতুড়ে চিকিৎসায় সমস্যার সমাধানতো হয়ই নি বরং তৈরি হয়েছে আরো সমস্যা।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শক্তিতে বা ক্ষমতায় নয়। তার শ্রেষ্ঠত্ব সততা, ন্যায়পরায়নতা, বিচক্ষনতা, দয়া, ক্ষমা, অনুতাপ, ভালবাসা, বিনয়, সৎকাজ এইসব গুনাবলীতে।

দৈহিক বা বস্তুগত শক্তির প্রাধান্য মানবীয় শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হতে পারেনা। শক্তিতো বহু প্রাণীরই আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে যোগ্য ক্ষমতাধর পুরুষলোকটিরও সাধ্য নেই নিজের যাবতীয় ক্ষমতা, যোগ্যতা, মেধা, সম্পদ একত্রিত করেও একটা শিশু গর্ভে ধারন করতে পারে। এটা সৃষ্টিগতভাবেই পুরুষদের সীমাবদ্ধতা। পুরুষদের জন্য এ সীমাবদ্ধতা বা বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছেন মহাজগত সৃষ্টির একক পরিকল্পনাকারী আল্লাহ।

আল্লাহর নিরংকুশ শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী মানুষেরা একান্ত বিশ্বাস করে তাঁর কোন বিধানেই কোন দুর্বলতা বা পক্ষপাতিত্ব নেই।

সূরা আলে ইমরানের ১৯৫ নম্বর আয়াতে নারী-পুরুষ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘পুরুষ হও কি নারী তোমরা সবাই সমজাতের লোক।হিজাব বিধান কারো দুর্বলতা প্রকাশ করেনা বরং সামষ্টিক কল্যাণ ও মর্যাদাকে নিশ্চিত করে মাত্র।

ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে সঠিক ভাবে না জেনে এবং না মেনেও স্বার্থ হাসিলের জন্য কখনও কখনও কেউ মেয়েদের নানা মনগড়া ধর্মীয় অনুশাসনের কথা; পর্দায় থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে বিশেষ ভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে অধার্মিক লোকের মুখে ধর্মের কথা শুনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

 

বিচ্ছিন্নভাবে নয় ইসলামের অন্যান্য অনুশাসনের পাশাপাশি হিজাব পালন করতে হবে। হিজাব সচেতন থাকতে হবে নারী-পুরুষ উভয়কেই।

হ্রাস-বৃদ্ধি পরিহার করে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত হিজাব নির্দেশনার সঠিক অনুসরণের মাধ্যমে বিভ্রান্তি নিরসন হতে পারে। 

 

হিজাব যাদের হৃদয় জয় করেছে

কমলা দাস, বর্তমান নাম কমলা সুরাইয়া

বিশ্ববিখ্যাত মালয়লাম লেখক। তার সুবিখ্যাত আত্মজীবনী মূলক বই গু ংঃড়ৎুএক অসাধারণ উপন্যাস। বইটি সম্পর্কে একজন সমালোচকের মন্তব্য- ঞযরং নড়ড়শ রং ঃযব ইরনষব ড়ভ ঋবসরহরংস ঃড় সব১৯৯৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের অনেক আগে থেকেই কমলা সুরাইয়া মাঝে মাঝেই হিজাব করতেন।

তার একটি সাক্ষাৎকারের প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো।

আমি মুসলিম মেয়েদের শালীন জীবনযাত্রা ভীষণ পছন্দ করি। ইসলামের হিজাবব্যবস্থার সৌন্দর্য আমাকে মুসলমান হতে আকৃষ্ট করে।

অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার বহু ধাক্কা আমাকে সামলাতে হয়েছে। বল্গাহীন স্বাধীনতা এখন আমার কাছে একটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আমার জীবনকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য কিছু বিশেষ নীতি ও নিয়মানুবর্তিতা পালন করতে চাই। আমাকে রক্ষা করার মত একজন প্রভুকে চাই। তাই আমি আল্লাহর অনুগত থাকতে চাই। গত ২৪ বছর ধরে আমি মাঝে মাঝেই হিজাব পরি। এটি পরে আমি বাজার, ম্যাটিনি শোর অনুষ্ঠান এবং বিদেশেও গিয়েছি। আমার অনেকগুলি হিজাব আছে। পর্দার মাধ্যমে একজন নারীকে সম্মানিত করা হয়। এতে কেউ নারীকে টিজ করার সাহস পায় না। মেয়েরা এতে প্রচুর সুরক্ষা পায়।

আনুষ্ঠানিক ভাবে ইসলাম গ্রহণের আগেই তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং হিজাব করা শুরু করে দেন। তাঁর বক্তব্য অতিমাত্রায় স্বাধীনতা ভোগ করে ক্লান্ত আমি এখন আল্লাহর গোলাম হয়ে শান্তি পেয়েছি।

নিকিতা বর্তমান নাম খাওলা

একজন জাপানী তরুণী। তিনি তার হিজাব সম্পর্কিত অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন একটি দীর্ঘ বক্তৃতায়। এখানে তার সংক্ষেপিত অংশ উদ্ধৃত করা হলোঃ

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অধিকাংশ জাপানীর ন্যায় আমিও কোন ধর্মের অনুসারী ছিলাম না। ফ্রান্সে আমি ফরাসী সাহিত্যের উপরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লেখাপড়ার জন্য এসেছিলাম। আমার প্রিয় লেখক ও চিন্তাবিদ ছিলেন সাঁর্তে, নিৎশে ও কামাস। এদের সবার চিন্তাধারাই নাস্তিকতাভিত্তিক।

 

ধর্মহীন ও নাস্তিকতা প্রভাবিত হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। আমার অভ্যন্তরীণ কোন প্রয়োজন নয়, শুধুমাত্র জানার আগ্রহই আমাকে ধর্ম সম্পর্কে উৎসাহী করে তোলে। মৃত্যুর পরে আমার কী হবে তা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা ছিল না, বরং কিভাবে জীবন কাটাব এটাই ছিল আমার আগ্রহের বিষয়।

দীর্ঘদিন ধরে মনে হচ্ছিল আমি আমার সময় নষ্ট করে চলেছি, যা করার তার কিছুই করছি না। ঈশ্বরের বা স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকা বা না থাকা আমার কাছে সমান ছিল। আমি শুধু সত্যকে জানতে চাইছিলাম। যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকে তাহলে তাঁর সাথে জীবন যাপন করব, আর যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব খুঁজে না পাই তাহলে নাস্তিকতার জীবন বেছে নেব এটাই আমার উদ্দেশ্য।

ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে আমি পড়াশুনা করতে থাকি। ইসলাম ধর্মকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি। আমি কখনো চিন্তা করিনি যে এটা পড়াশুনার যোগ্য কোন ধর্ম। আমার বদ্ধমুল ধারণা ছিল যে, ইসলাম ধর্ম হল মূর্খ ও সাধারণ মানুষদের এক ধরনের মূর্তিপূজার ধর্ম। কত অজ্ঞই না আমি ছিলাম! আমি কিছু খৃষ্টানের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করি। তাদের সাথে আমি বাইবেল অধ্যয়ন করতাম। বেশ কিছুদিন গত হবার পর আমি স্রষ্টার অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমি এক নতুন সমস্যার মধ্যে পড়লাম। আমি কিছুতেই আমার অন্তরে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছিলাম না, যদিও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে। আমি গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বৃথা-ই চেষ্টা, আমি স্রষ্টার অনুপস্থিতিই অনুভব করতে লাগলাম। অনেক বিষয় আমি বুঝতে বা গ্রহণ করতে পারলাম না। আমার ধারনা ছিল, ঈশ্বর বা স্রষ্টা যদি থাকেন তাহলে তিনি হবেন সকল মানুষের জন্য এবং সত্য ধর্ম অবশ্যই সবার জন্য সহজ ও বোধগম্য হবে। আমি বুঝতে পারলাম না, ঈশ্বরকে পেতে হলে কেন মানুষকে স্বাভাবিক জীবন পরিত্যাগ করতে হবে। আমি এক অসহায় অবস্থায় নিপতিত হলাম। ঈশ্বরের সন্ধানে আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা কোন সমাধানে আসতে পারলো না। এমতাবস্থায় আমি একজন আলজেরীয় মুসলিম মহিলার সাথে পরিচিত হলাম। তিনি ফ্রান্সেই জন্মেছেন, সেখানেই বড় হয়েছেন। তিনি নামাজ পড়তেও জানতেন না। তার জীবনযাত্রা ছিল একজন সত্যিকার মুসলিমের জীবনযাত্রা থেকে অনেক দূরে। কিন্তু আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাস ছিল খুবই দৃঢ়। তার জ্ঞানহীন বিশ্বাস আমাকে বিরক্ত ও উত্তেজিত করে তোলে। আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। শুরুতেই আমি পবিত্র কুরআনের এক কপি ফরাসী অনুবাদ কিনে আনি। কিন্তু আমি ২পৃষ্ঠাও পড়তে পারলাম না, কারণ আমার কাছে তা খুবই অদ্ভূত মনে হচ্ছিল।

আমি একা একা ইসলামকে বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিলাম এবং প্যারিস মসজিদে গেলাম। আশা করছিলাম সেখানে কাউকে পাব যিনি আমাকে সাহায্য করবেন।

সেদিন ছিল রবিবার এবং মসজিদে মহিলাদের একটি আলোচনা চলছিল। উপস্থিত বোনেরা আমাকে আন্তরিকতার সাথে স্বাগত জানালেন। আমার জীবনে এই প্রথম আমি ধর্মপালনকারী মুসলিমদের সাথে পরিচিত হলাম। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, নিজেকে তাদের মধ্যে অনেক সহজ ও আপন বলে অনুভব করতে লাগলাম।

প্রত্যেক রবিবারে আমি আলোচনায় উপস্থিত হতে লাগলাম, সাথে সাথে মুসলিম বোনদের দেওয়া বইপত্র পড়তে লাগলাম। এসকল আলোচনার প্রতিটি মুহূর্ত এবং বই-এর প্রতি পৃষ্ঠা আমার কাছে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশের মত মনে হতে লাগল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি সত্যের সন্ধান পেয়েছি। সবচেয়ে অদ্ভূত ব্যাপার হলো, সিজদায় রত অবস্থায় স্রষ্টাকে আমার অত্যন্ত নিকটে বলে অনুভব করতাম।

দু বছর আগে যখন ফ্রান্সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি তখন মুসলিম স্কুলছাত্রীদের ওড়না বা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢাকা নিয়ে ফরাসীদের বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। অধিকাংশ ফরাসী নাগরিকের ধারণা ছিল, ছাত্রীদের মাথা ঢাকার অনুমতি দান সরকারি স্কুলগুলোকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখার নীতির বিরোধী। আমি তখনো ইসলাম গ্রহণ করিনি। তবে আমার বুঝতে খুব কষ্ট হত, মুসলিম ছাত্রীদের মাথায় ওড়না বা স্কার্ফ রাখার মত সামান্য একটি বিষয় নিয়ে ফরাসীরা এত অস্থির কেন? মানুষ সাধারণ ভালমন্দ বিবেচনা না করেই যে কোন নতুন বা অপরিচিত বিষয়ের বিরোধিতা করে থাকে। কেউ কেউ মনে করেন যে, হিজাব বা পর্দা হচ্ছে মেয়েদের নিপীড়নের একটি প্রতীক। তারা মনে করেন, যে সকল মহিলা পর্দা মেনে চলে বা চলতে আগ্রহী তারা মূলত প্রচলিত প্রথার দাসত্ব করেন। তাদের বিশ্বাস, এ সকল মহিলাকে যদি তাদের ন্যাক্কারজনক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা যায় এবং তাদের মধ্যে নারীমুক্তি আন্দোলন ও স্বাধীন চিন্তার আহবান সঞ্চারিত করা যায় তাহলে তারা পর্দাপ্রথা পরিত্যাগ করবে।

এ ধরনের উদ্ভট বাজে চিন্তা শুধু তারাই করেন যাদের ইসলাম সম্পর্কে ধারণা খুবই সীমাবদ্ধ। ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মবিরোধী চিন্তাধারা তাদের মনমগজ এমনভাবে অধিকার করে নিয়েছে যে তারা ইসলামের সার্বজনীনতা ও সর্বকালিনতা বুঝতে একেবারেই অক্ষম। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বের সর্বত্র অগনিত অমুসলিম মহিলা ইসলাম গ্রহণ করছেন, যাদের মধ্যে আমিও রয়েছি। এ দ্বারা আমরা ইসলামকে সর্বজনীন বলে বুঝতে পারি।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইসলামী হিজাব বা পর্দা অমুসলিমদের জন্য একটি অদ্ভূত ও বিস্ময়কর ব্যাপার। পর্দা শুধু নারীর মাথার চুলই ঢেকে রাখে না, উপরন্তু আরো এমন কিছু আবৃত করে রাখে যেখানে তাদের কোন প্রবেশাধিকার নেই, আর এজন্যই তারা খুব অস্বস্তি বোধ করেন। বস্তুত পর্দার অভ্যন্তরে কি আছে বাইরে থেকে তারা তা মোটেও জানতে পারেন না।

প্যারিসে অবস্থান কালেই ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি হিজাব বা পর্দা মেনে চলতাম। আমি একটা স্কার্ফ দিয়ে আমার মাথা ঢেকে নিতাম। পোশাকের সংগে মিলিয়ে একই রঙের স্কার্ফ ব্যবহার করতাম।

যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামায) আদায় করতে পারব কিনা, অথবা পর্দা করতে পারব কিনা তা নিয়ে আমি গভীরভাবে ভেবে দেখিনি। আসলে আমি নিজেকে এ নিয়ে প্রশ্ন করতে চাইনি; কারণ আমার ভয় হত, হয়ত উত্তর হবে না সূচক এবং তাতে আমার ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত বিঘ্নিত হবে। প্যারিসের মসজিদে যাওয়ার আগের মুহুর্ত পর্যন্ত আমি এমন এক জগতে বাস করেছি যার সাথে ইসলামের সামান্যতম সম্পর্ক ছিল না। নামাজ, পর্দা কিছুই আমি চিনতাম না। আমার জন্য একথা কল্পনা করাও কষ্টকর ছিল যে, আমি নামায আদায় করছি বা পর্দা পালন করে চলছি। তবে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা আমার এত গভীর ও প্রবল ছিল যে ইসলাম গ্রহণের পরে আমার কি হবে তা নিয়ে আমি ভাবিনি। বস্তুত আমার ইসলাম গ্রহণ ছিল আল্লাহর অলৌকিক দান। আল্লাহু আকবার!

ইসলামী পোশাক বা হিজাবে আমি নিজেকে নতুন ব্যক্তিত্বে অনুভব করলাম। আমি অনুভব করলাম যে আমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়েছি, আমি সংরক্ষিত হয়েছি। আমি অনুভব করতে লাগলাম আল্লাহ আমার সঙ্গে রয়েছেন।

একজন বিদেশিনী হিসাবে অনেক সময় আমি লোকের দৃষ্টির সামনে বিব্রত বোধ করতাম। হিজাব ব্যবহারে এ অবস্থা কেটে গেল। পর্দা আমাকে এ ধরনের অভদ্র দৃষ্টি থেকে রক্ষা করল।

পর্দার মধ্যে আমি আনন্দ ও গৌরব বোধ করতে লাগলাম, কারণ পর্দা শুধু আল্লাহর প্রতি আমার আনুগত্যের প্রতীকই নয়, উপরন্তু তা মুসলিম নারীদের মাঝে আন্তরিকতার বাঁধন। পর্দার মাধ্যমে আমরা ইসলাম পালনকারী মহিলারা একে অপরকে চিনতে পারি এবং আন্তরিকতা অনুভব করি। সর্বোপরি, পর্দা আমার চারপাশের সবাইকে মনে করিয়ে দেয় আল্লাহর কথা, আর আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ আমার সাথে রয়েছেন।

একজন পুলিশ যেমন ইউনিফরম পরিহিত অবস্থায় তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন, তেমনি পর্দার মধ্যে আমি একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে বেশি করে অনুভব করতে লাগলাম। আমি যখনই মসজিদে যেতাম তখনই হিজাব ব্যবহার করতাম। এটা ছিল আমার সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ব্যাপার। কেউ আমাকে পর্দা করতে চাপ দেয়নি।

ইসলাম গ্রহণের দুই সপ্তাহ পরে আমি আমার এক বোনের বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য জাপানে যাই। সেখানে যাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই, ফ্রান্সে আর ফিরে যাব না। কারণ ইসলাম গ্রহণের পর ফরাসী সাহিত্যের প্রতি আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। উপরন্তু আরবি ভাষা শেখার প্রতি আমি আগ্রহ অনুভব করতে লাগলাম।

মুসলিম পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে একাকী জাপানের একটি ছোট্ট শহরে বসবাস করা আমার জন্য একটা বড় ধরনের পরীক্ষা ছিল। তবে এই একাকিত্ব আমার মধ্যে মুসলমানিত্বের অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর করে তোলে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জন্য শরীর দেখানো পোশাক পরা নিষিদ্ধ। কাজেই আমার আগের মিনি-স্কার্ট, হাফহাতা ব্লাউজ ইত্যাদি অনেক পোশাকই আমাকে পরিত্যাগ করতে হল। এছাড়া পাশ্চাত্য ফ্যাশন ইসলামী হিজাব বা পর্দার পরিপন্থী। এজন্য আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে নিজের পোশাক নিজেই তৈরি করে নেব। পোশাকটি ছিল অনেকটা পাকিস্তানি সেলোয়ার-কামিজের মত। আমার এই অদ্ভুত পোশাক দেখে কে কি ভাবল তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই নি।

জাপানে ফেরার পর ছমাস এভাবে কেটে গেল। কোন মুসলিম দেশে গিয়ে আরবি ভাষা ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা করার আগ্রহ আমার মধ্যে খুবই প্রবল হয়ে উঠল। এ আগ্রহ বাস্তবায়িত করতে সচেষ্ট হলাম। অবশেষে মিসরের রাজধানী কায়রোতে পাড়ি জমালাম। ....

খিমার বা ওড়না পরা বোনদেরকে সত্যিই অপূর্ব সুন্দর দেখাতো। তাদের চেহারায় এক ধরনের পবিত্রতা ও সাধুতা ফুটে উঠত। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মুসলিম নারী বা পুরুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর নির্দেশাবলি পালন করে এবং সেজন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে। আমি ঐ সকল মানুষের মানসিকতা মোটেও বুঝতে পারিনা, যাঁরা ক্যাথলিক সিস্টারদের ঘোমটা দেখলে কিছ্ ুবলেন না, অথচ মুসলিম মহিলাদের ঘোমটা বা পর্দার সমালোচনায় তাঁরা পঞ্চমুখ, কারণ এটা নাকি নিপীড়ন ও সন্ত্রাসের প্রতীক।

আমার এক মিসরীয় বোন আমাকে বলেন, আমি যেন জাপানে ফিরে গিয়েও এই পোশাক ব্যবহার করি। এতে আমি অসম্মতি জানাই। আমার ধারণা ছিল, আমি যদি এ ধরনের পোশাক পরে জাপানের রাস্তায় বেরোই তাহলে মানুষ আমাকে অভদ্র ও অস্বাভাবিক ভাববে। পোশাকের কারণে তারা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। আমার কোন কথাই তারা শুনবে না। আমার বাইরে দেখেই তারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যন করবে। ইসলামের মহান শিক্ষা ও বিধানাবলি জানতে চাইবে না।

আমার মিসরীয় বোনকে আমি এ যুক্তিই দেখিয়েছিলাম। কিন্তু দুমাসের মধ্যে আমি আমার নতুন পোশাককে ভালবেসে ফেললাম। তখন আমি ভাবতে লাগলাম, জাপানে গিয়েও আমি এ পোশাকই পরব। এ উদ্দেশ্যে আমি জাপানে ফেরার কয়েকদিন আগে হালকা রঙের ঐ জাতীয় কিছু পোশাক এবং কিছু সাদা খিমার (বড় চাদর জাতীয় ওড়না) তৈরি করলাম। আমার ধারণা ছিল, কালোর চেয়ে এগুলো বেশি গ্রহণযোগ্য হবে সাধারণ জাপানীদের দৃষ্টিতে।

আমার সাদা খিমার বা ওড়নার ব্যাপারে জাপানীদের প্রতিক্রিয়া ছিল আমার ধারণার চেয়ে অনেক ভাল। মূলত আমি কোন রকম প্রত্যাখ্যান বা উপহাসের সম্মুখীন হইনি। মনে হচ্ছিল, জাপানীরা আমার পোশাক দেখে আমি কোন ধর্মাবলম্বী তা না বুঝলেও আমার ধর্মানুরাগ বুঝে নিচ্ছিল। একবার আমি শুনলাম, আমার পিছনে এক মেয়ে তার বান্ধবীকে আস্তে আস্তে বলছে, দেখ একজন বৌদ্ধ ধর্মযাজিকা।

একবার ট্রেনে যেতে আমার পাশে বসলেন এক আধবয়সী ভদ্রলোক। কেন আমি এরকম অদ্ভূত ফ্যাশনের পোশাক পরেছি তা তিনি জানতে চাইলেন। আমি তাকে বললাম, আমি একজন মুসলিম। ইসলাম ধর্মে মেয়েদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন তাদের দেহ ও সৌন্দর্য আবৃত করে রাখে। কারণ তাদের অনাবৃত সাজ-সজ্জা ও সৌন্দর্য পুরুষের জন্য সমস্যা তৈরী করে। তাই নারীদের উচিত নয় দেহ ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে তাদেরকে বিরক্ত করা বা সমস্যায় ফেলা।

মনে হল আমার ব্যাখ্যায় তিনি অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। ভদ্রলোক সম্ভবত আজকালকার মেয়েদের উত্তেজক ফ্যাশন মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁর নামার সময় হয়েছিল। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে গেলেন এবং বলে গেলেন তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল ইসলাম সম্পর্কে আরো জানার, কিন্তু সময়ের অভাবে পারলেন না।

গরমকালের রৌদ্রতপ্ত দিনেও আমি পুরো শরীর ঢাকা লম্বা পোশাক পরে এবং খিমার দিয়ে মাথা ঢেকে বাইরে যেতাম। এতে আমার আব্বা দুঃখ পেতেন, ভাবতেন আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি দেখলাম রৌদ্রের মধ্যে আমার এ পোশাক খুবই উপযোগী, কারণ এতে মাথা, ঘাড় ও গলা সরাসরি রোদের তাপ থেকে রক্ষা পেত। উপরন্তু আমার বোনেরা যখন হাফপ্যান্ট পরে চলাফেরা করত, তখন ওদের সাদা উরু দেখে আমি অস্বস্তি বোধ করতাম।

অনেক মহিলা এমন পোশাক পরেন যাতে তাদের বুক ও নিতম্বের আকৃতি পরিস্কার ফুটে ওঠে। ইসলাম গ্রহণের আগেও আমি এ ধরনের পোশাক দেখলে অস্বস্তি বোধ করতাম। আমার মনে হত এমন কিছু অঙ্গ প্রদর্শন করা হচ্ছে যা ঢেকে রাখা উচিত, বের করা উচিত নয়। একজন মেয়ের মনে যদি এসকল পোশাক এ ধরনের অস্বস্তিবোধ এনে দেয় তাহলে একজন পুরুষ এ পোশাক পরা মেয়েদেরকে দেখলে কিভাবে প্রভাবিত হবেন তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আপনারা হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন, শরীরের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক আকৃতি ঢেকে রাখার কি দরকার? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আসুন একটু ভেবে দেখি। আজ থেকে ৫০ বৎসর আগে জাপানে মেয়েদের জন্য সুইমিং স্যুট পরে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা অশ্লীলতা ও অন্যায় বলে মনে করা হত। অথচ আজকাল আমরা বিকিনি পরে সাঁতার কাটতে লজ্জাবোধ করি না। তবে যদি কোন মহিলা জাপানের কোথাও টপলেস প্যান্ট পরে শরীরের উর্ধভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত করে সাঁতার কাটেন তাহলে লোকে তাকে নির্লজ্জ বলবে।

আবার দক্ষিণ ফ্রান্সের সমুদ্র সৈকতে যান, দেখতে পাবেন সেখানে সকল বয়সের অসংখ্য নারী শরীরের উর্ধভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত করে টপলেস পরে সানবাথ বা রৌদ্রস্নান করছে। আরেকটু এগিয়ে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে যান, সেখানে অনেকে সৈকতে ন্যুডিস্ট নগ্নবাদীদেরকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে রৌদ্রস্নানে রত দেখতে পাবেন।

যদি একটু পিছনে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন মধ্যযুগের একজন ব্রিটিশ নাইট তার প্রিয়তমার জুতার দৃশ্যতে প্রকম্পিত হয়ে উঠতেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, নারীদের গোপন অংশ বা ঢেকে রাখার মত অংশ কি সে ব্যাপারে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনশীল।

আমরা মুসলিম নারীরা মুখমন্ডল ও হাত ছাড়া পুরো শরীরকে আবৃত করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করি, কারণ মহান স্রষ্টা আল্লাহ এভাবেই আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর এজন্যই নিকটাত্মীয় (মাহরাম) ছাড়া অন্যান্য পুরুষদের থেকে মুখ ও হাত ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর আবৃত করে রাখি।

আপনি যদি কোন কিছু লুকিয়ে রাখেন তাহলে তার মূল্য বেড়ে যাবে। নারীর শরীর আবৃত রাখলে তার মর্যাদা বেড়ে যায়, এমনকি অন্য নারীর চোখেও তা অধিকতর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। যখন কোন মানুষ লজ্জার অনুভূতি হারিয়ে নগ্ন হয়ে রাস্তাঘাটে চলতে থাকেন, প্রকাশ্য জনসমক্ষে পেশাব, পায়খানা ও প্রেম করতে থাকেন, তখন তিনি পশুর সমান হয়ে যান। তাকে আর কোনভাবেই পশু থেকে পৃথক করা যায় না। আমার ধারণা, লজ্জার অনুভূতি থেকেই সভ্যতার শুরু।

কেবলমাত্র পুরুষদের প্রতি মানবিক আবেদন জানিয়ে এবং তাদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রনের আহবান জানিয়ে আমরা সম্ভ্রমহানী ও অত্যাচারের এ সমস্যার সমাধানের আশা করতে পারিনা। তা ছাড়া এগুলো রোধের কোন উপায় নেই। একজন পুরুষের কাছে নারীর পরিধানের মিনি-স্কার্টের অর্থ এরূপ করতে পারেন ঃ তুমি চাইলে আমাকে পেতে পারঅপরদিকে ইসলামী হিজাব পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেয়ঃ আমি তোমার জন্য নিষিদ্ধ।

জয়নাব কারীন

নওমুসলিম জয়নাব কারীনজার্মানীর মনস্টারের অধিাবাসী। তেহরান থেকে প্রকাশিত পয়ামে যানকে প্রদত্ত তার সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো।

শৈশব থেকেই বিশ্ব জগতের সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলাম। অনেক সময়ই আমি আমার সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে চিন্তা করতাম এবং তাঁর ও আমার মধ্যে এক বিস্ময়কর সম্পর্ক অনুভব করতাম। ঐ বয়স থেকেই অনেকগুলো বিষয়ে আমি সমবয়সীদের থেকে আলাদা ছিলাম। তারা যেসব কাজ করত তার অনেক কিছুই আমি করতাম না। আমার স্কুলে সাঁতার ছিল বাধ্যতামুলক। কিন্তু আমি সব সময়ই আমার সহপাঠীদের সাথে সাঁতার কাটতে এবং ঐ অবস্থায় সহপাঠী ছেলেদের দর্শনের বস্তুতে পরিণত হতে লজ্জাবোধ করতাম। এ কারণে সব সময়ই সাঁতারে যোগদান না করার জন্য কোন না কোন বাহানার আশ্রয় নিতাম। আর আমার শিক্ষিকাও অগত্যা সাঁতার থেকে আমাকে রেহাই দিতেন।

ইসলাম গ্রহণের দুবছর আগে থেকে অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স থেকে আমি ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে শুরু করি। আমি যত বেশি সম্ভব অধ্যয়ন করতে লাগলাম। আমি আমার পঠিত বিষয়সমূহের বেশিরভাগকেই আমার মনমগজের সাথে সামঞ্জস্যশীলরূপে পেলাম। আমার মন খুব তীব্রভাবে চাচ্ছিল যে, দ্বীন ইসলামের বিধি-বিধান আমল করতে শুরু করি। কিন্তু জানতাম না যে, কোথা থেকে কিভাবে শুরু করব।

ইতোমধ্যে রমযান মাসের দিনগুলোতে মুসলমানদের মধ্যে যে সংহতি ও ঐক্যের অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তা আমার মনকে দারুণভাবে নাড়া দেয় এবং আমাকে খুবই আকৃষ্ট করে। ফলে আমার মধ্যেও অভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি হল। অন্যদিকে আল্লাহর ইবাদত করতে পেরে এবং আমার খোদার সাথে ঘনিষ্টতা সৃষ্টি করতে পেরে আমার মধ্যে এমনই আবেগ-উত্তেজনা সৃষ্টি হল যে, আমার কাছে গ্রীষ্মকালের গরম কিছুই মনে হচ্ছিল না।

আমার একজন মুসলিম বান্ধবী আমাকে বলল ঃ তুমি তো এখনো মুসলমান হওনি, তাই তোমার এ রোযা কবুল হবে না। কিন্তু আমি অন্তর থেকে এ মর্মে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ততা অনুভব করছিলাম যে, আল্লাহ আমার রোযা কবুল করেছেন। কেননা আমি আমার সমগ্র সত্তা দ্বারা তা অনুভব করতাম।

যে সব মুসলিম পরিবারের সাথে আমার যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল তারা ছিল গতানুগতিক ধরনের মুসলমান। তারা ইসলাম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী ছিল না এবং এ কারণে ইসলাম সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দানে সক্ষম ছিল না। ফলে আমি ইসলাম নির্দেশিত ধর্মীয় কার্যাবলীর অন্তরালে নিহিত দর্শন সম্বন্ধে অনুসন্ধান চালাতে বাধ্য হই। উদাহরস্বরূপ আমি একবার এক মুসলিম মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তিনি ওড়না দ্বারা মাথা ঢাকছেন কেন? জবাবে তিনি বললেন যে, একজন মুসলিম নারীকে ভাল মুসলমান হতে হলে তাকে অবশ্যই মাথা ঢাকতে হবে। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই তার এ জবাব আমার নিকট সন্তোষজনক ছিল না। অগত্যা আমি বিভিন্ন বই পুস্তক পড়ে হিজাবের দর্শন সম্পর্কে জানতে পারি। এ অধ্যয়ন থেকে আমি বুঝতে পারলাম যে, হিজাবের পেছনে নারীর নিরাপত্তার দর্শন নিহিত রয়েছে। কেননা হিজাবের কারণে নারী সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে অধিকতর উপস্থিতির স্বাধীনতা লাভ করে এবং খুব সহজেই স্বীয় সামাজিক তৎপরতা চালাতে সক্ষম হয়, অথচ বাহ্যিক মূল্যবোধসমূহ সেক্ষেত্রে কোনই ভূমিকা পালনে সক্ষম হয় না। নারী হিজাবের কারণে যে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হয় আমি স্বীয় কর্মস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তা পুরোপুরি অনুভব করি। আমি প্রতিদিনই দেখতে পাই, যেসব নারী বাহ্যিক সাাজগোজের ব্যাপারে চাপের মুখে থাকে তারা কিভাবে অসুবিধা ও কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে এবং লাঞ্ছিত হচ্ছে। বিভিন্ন পত্রিকা সাময়িকী সব সময় তাদেরকে উপদেশ বিলায়- তোমাকে এভাবে বা ঐভাবে পোশাক পরতে হবে এবং এভাবে বা ওভাবে সাজগোজ করতে হবে।

মোদ্দাকথা, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও মনোহারিত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করার ফলে নারীদের ওপরে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এর পেছনে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয় সে কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু মানসিক ও আত্মিক দিক থেকে তারা কোনরূপ নিরাপত্তাই অনুভব করে না, এমন কি কেউ যদি এর বিরোধী হয়, তথাপি পরোক্ষ চাপের মাধ্যমে তাকেও এতে শামিল হতে বাধ্য করা হয়। কেননা অন্যথায় তাকে বিচ্ছিন্ন ও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়।

অবশ্য আমার নিকট সব সময়ই এই ফ্যাশন পূজা একটা দুঃসহ বোঝা বলে মনে হত। আমি সব সময়ই নিজেকে এ জিঞ্জির থেকে মুক্ত করার পথ খুঁজছিলাম। অবশ্য ইতোমধ্যেই যেসব সমস্যার কথা উল্লেখ করেছি, সেসব কারণে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত আমিও সমাজের এ চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হতাম, কিন্তু এ কারণে আমার খুবই খারাপ লাগত।

শেষ পর্যন্ত এসব কারণে আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। ২০ বছর বয়সে আমি আনুষ্ঠানিকভাবেই ইসলাম গ্রহণ করলাম। অবশ্য ইসলাম গ্রহণের ফলে আমার অনেক আত্মিক, মনস্তাত্বিক সমস্যা ও মানসিক শূন্যতা দূর হল। কিন্তু একই সাথে আমি কতগুলো নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে লাগলাম। কেবল ঈমানের বদৌলতেই আমি এসব সমস্যার মোকাবিলায় টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছি। অবশ্য সমস্যাবলীর বিরুদ্ধে আমার মধ্যে যে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে উঠেছিল তা ছিল খোদাপ্রেমের ফসল মাত্র। ফলে এতে না আমি কোন চাপ অনুভব করেছি, না আমার কাছে তা কঠিন মনে হয়েছে।

আমার জন্য প্রথম সমস্যা ছিল আমার পরিবারের প্রতিক্রিয়া। অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না।

তাই আমি এ ধরনের নওমুসলিমদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলাম এবং সহজেই তাদেরকে পেয়ে গেলাম। আমি জার্মানভাষী মুসলিম মহিলাদের সাথে পরিচিত হলাম। বিভিন্ন দ্বীনি বিষয়ে তারা আমাকে সাহায্য করলেন, বিশেষ করে হিজাব কিভাবে পরিধান করতে হবে, এর ফলে ঘরে বাইরে কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারি এবং তা কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে সে সম্পর্কে আমাকে ধারণা দিলেন।

লোকেরা আমার সাথে কি ধরনের আচরণ করবে আমি সে ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। কেননা জার্মানীতে হিজাবের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চলছিল। ফলে সমাজে হিজাব পরিহিতা মহিলাদের সম্পর্কে নেতিবাচক অবস্থা বিরাজ করছিল, বিশেষ করে সংবাদপত্র ও সাময়িকীসমূহে বিষাক্ত প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। এর ফলে আমাদের মত মানুষের জন্য প্রথমবারের মত হিজাব পরিধান শুরু করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

যা-ই হোক, সব দিক বিবেচনা করে তাঁরা এক চমৎকার পন্থা উদ্ভাবন করলেন। বোনেরা প্রস্তাব করলেন যে, তারা একদিন আমাদের বাড়িতে আসবেন, এরপর সবাই মাথায় ওড়না পরিধান করে একযোগে রাস্তায় নেমে আসব যাতে লোকেরা বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারে এবং আমাকে হিজাবসহ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। তদনুযায়ী আমরা পর পর কয়েকদিন এভাবে আমার বাড়ি থেকে হিজাব পরে বাইরে এলাম। এতে কাজ হল। আশপাশে সবাই বুঝতে পারল যে, এরপর থেকে তারা আমাকে এ পোশাকেই দেখতে পাবে।

আমি হিজাবকে আমার জীবনের অগ্রগতি বলে মনে করতাম। এ কারণেই আগেই যেমন বলেছি, আমার অনেক অসুবিধাই সমাজে দূরীভুত হয়ে যায়। হিজাব আমাকে সামাজিক তৎপরতা পরিচালনার জন্য অধিকতর স্বাধীনতা প্রদান করে। কিন্তু আমার আশপাশে যারা বসবাস করত তারা আমার হিজাব পরিধানকে পেছনের দিকে বা অতীতে প্রত্যাবর্তন বলে মনে করতে লাগল। তাদের মতে হিজাব মানে মধ্যযুগে চলে যাওয়া, বন্দীত্ব এবং মুক্তি ও স্বাধীনতা হাতছাড়াকরণ। বলা বাহুল্য, তাদের এসব ধারণার সবটাই মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরিধানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বব্যাপী নেতিবাচক প্রচারণার ফল ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।

পাশ্চাত্যে মুক্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের যে শ্লোগান দেয়া হয় প্রকৃত অবস্থা তার বিপরীত। আমরা জার্মান, ইউরোপিয়রা পশ্চিমা মুসলমান হিসেবে নিজ নিজ দেশে পুরোপুরি চাপের মুখে আছি। এসব চাপের মধ্যে প্রধান হচ্ছে উপযুক্ত পেশা অবলম্বন এবং বসবাসের উপযোগী বাসস্থানের সমস্যা। এছাড়া সমাজে আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের অপমান- গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পেশায় আছি মুসলমান হওয়ার পূর্ব থেকেই তাতে আছি। তাই যেদিন আমি আমার বিভাগীয় প্রধানকে বললাম, আমি আগামীকাল থেকে মাথায় ওড়না পরে আসব, তখন তিনি আমার সাথে কোন খারাপ আচরণ করেননি। কিন্তু মাথায় ওড়না পরেই যদি চাকরি চাইতে যেতাম তাহলে নিঃসন্দেহে না জবাব দেয়া হত। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়েই লোকদের আচরণ অপমানজনক। তাদের আচরণ এমন যে, তারা আমার অস্তিত্বেকই উপেক্ষা করছে যেন আমাকে দেখতেই  পায়নি। তারা মনে করে যে, যেহেতু আমি মাথায় ওড়না পরি সেহেতু নিঃসন্দেহে আমার মধ্যে জ্ঞানের কোন বালাই নেই । একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে এক ব্যক্তি আমাকে দেখে তার বন্ধুদের বললঃ কাজের মেয়েরাও এখানে খাবার খায় নাকি? এতে আমি মনে খুব কষ্ট পাই এবং আমার গলা পর্যন্ত কান্না উঠে আসে। কিন্তু ঈমানের কারণে আমার মধ্যে যে শক্তি  সৃষ্টি হয়েছিল তার ফলে আমি আনন্দিত হই। কেননা অতীতে এ ধরনের ঘটনা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না।

মিউনিখের মসজিদের সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। সে সূত্রে আমি হজ্বে গেলাম। তারা নও-মুসলিমদের জন্য এক সফর কর্মসূচী নিলেন। এতে মাথাপিছু ব্যয় ছিল মাত্র ৫০০ মার্ক। এতে আমার যে অনুভূতি হয় তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমি এ সমষ্টির অন্তর্ভূক্ত হতে পেরে এক বিস্ময়কর আগ্রহ-উদ্দীপনা অনুভব করলাম।

ইতোমধ্যে আমি আমার জার্মান বান্ধবীদের মাধ্যমে আমার স্বামীর সাথে পরিচিত হলাম। তিনি ছিলেন ইরিত্রিয়ার লোক। আমি মনে করলাম যে, তাঁকে বিয়ে করলে আমার অসুবিধাসমূহ দূরীভুত হবে এবং আমরা ইসলামী জীবন                   ধারার অধিকারী হতে পারব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, ধর্মের নামে অধিকাংশ মুসলমানের মধ্যেই যেসব ভ্রান্ত রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রচলিত হয়েছে তার ফলে আমরা আমাদের জীবনে বহু সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি। আমিও অনুরূপ সমস্যার সম্মুখীন হলাম। কেননা নারীদের সম্পর্কে আফ্রিকায় প্রচলিত সমস্ত রসম-রেওয়াজকেই ও মেনে নিয়েছিল এবং  এসব রসম-রেওয়াজকে সে ইসলামী বলে মনে করত। ফলে এসব বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে নিয়মিত তর্ক হত।

আমার কোন অধিকার আছে এটা সে মোটেই মানতে রাজি ছিলনা। একদিন ও আমার ওপর ফুলদানি ছুঁড়ে মারে এবং আমার দিকে এগিয়ে আসে। মারধোর করে আমাকে পশুর মত মাটির ওপর দিয়ে টানাহেঁচড়া করে নেয়।

এ ঘটনা আমার ভেতরটাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। আমার মধ্যে ঈমানী শক্তি না থাকলে নিঃসন্দেহে এ ঘটনা আমার জীবনকে বদলে দিত। কারণ আমার পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না যে, আমি আমার ইসলামী জীবনে এ ধরনের আচরণের সম্মুখীন হব। অবশ্য আমি জানতাম যে, এটা ওরই দুর্বলতা ইসলামের দুর্বলতা নয়। এ কারণে আমি ওর থেকে পৃথক হয়ে গেলাম।

বস্তুত আমার মত যারা অধ্যয়ন, অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণ করেই ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের জন্য দুই সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে চলা যেমন কঠিন ব্যাপার, তেমনি অনেক মুসলমান যেভাবে ভ্রান্ত সংস্কৃতির অনুসরণ করছে তাও আমাদের জন্য বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টিকারী, বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে এ সমস্যা সর্বাধিক প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

এ বিষয়টা উল্লেখ করার পেছনে আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটাই বোঝানো যে, আমাদেরকে এমন কতক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যার অবশ্যই সমাধান করতে হবে। আমাদেরকে একদিকে কতগুলো সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, অন্যদিকে পারিবারিক সমস্যাবলীও সহ্য করতে হয় তেমনি আমার মত কেউ যদি এমন লোকের মুখোমুখি হয় যে ইসলামী রীতিনীতির তুলনায় গোত্রীয় রীতিনীতি অনুসরণের ওপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে, তখন তা সহ্য করা সম্ভব নয়। এ কারণেই এ ধরনের অনেক বিয়েই শেষ পর্যন্ত টেকে না এবং বিচ্ছিন্নতায় পর্যবসিত হয়।

আশা করা যায় যে, এমন এক সময় আসবে যখন মুসলমানরা ইসলামের প্রকৃত রূপের সাথে পরিচিত হতে সক্ষম হবে এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও গোত্রীয় ও গতানুগতিক ভ্রান্ত সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের জিঞ্জিরকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে সক্ষম হবে।

আমিনা আসলামী

এই মার্কিন নারী ১৯৭৭ সালে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি ছিলেন একজন গোঁড়া খ্রীষ্টান। রেডিও টিভিতে শিশু কিশোরদের বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন।

আল মুজতামায় প্রকাশিত তার সাক্ষাৎকারের একাংশ-

মুসলমানদের মধ্যে খৃষ্টের বাণী প্রচারের সেই সময়টিতে আমি ইসলামের সাথে পরিচিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করি, যখন কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশুনার জন্যে আমি আমেরিকার একটি ভালো কম্পিউটার সেন্টারে এডমিশন নেই। আমি যে সেকশনে ভর্তি হয়েছিলাম সেখানে আমার সহপাঠীদের মধ্যে কজন আরবীয় ছাত্রও ছিল। আমি ওদেরকে স্রেফ এ জন্যে ঘৃণা করতাম যে, ওরা ছিল মুসলমান। আমার বিদ্বেষী মানসিকতা আমাকে এতই পীড়া দিচ্ছিল যে, আমি সেকশন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বসি। তবে এ ব্যাপারে স্বামীর মতামত জানতে চাইলে তিনি বললেন, এতো তাড়াহুড়ো করছো কেন? কটা দিন কাটিয়েই দেখনা ওদের সাথে। খারাপ লাগলে তো সেকশন পরিবর্তন কোন ব্যাপারই নয়। স্বামীর কথা মনে ধরল। আরো ভাবলাম হয়ত সৃষ্টিকর্তা আমার মাধ্যমে ওদেরকে হিদায়াত দান করতে পারেন, অতএব চেষ্টা করে দেখা মন্দ না।

আমি তাদেরকে প্রায়ই বলতাম, তোমরা জাহান্নামে যাবে কেননা তোমাদের জন্যেই ঈসা (আ.) কে ক্রুশ বিদ্ধ হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। এরপর আমি তাদেরকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে এক কপি কুরআন কিনে আনি এবং অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তা অধ্যয়ন করে যেতে থাকি। আমার উদ্দেশ্য ছিল কুরআন পাঠ করে তাদের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে আঘাত হানব।

ইত্যবসরে এক আরব প্রতিনিধি দলের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। হঠাৎ করেই একদিন তারা আমার দরজায় এসে করাঘাত করেন। আমি দরজা খুলে তাদেরকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি চাই আপনাদের? তাদের একজন বললেন, শুনলাম আপনি ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তাই আপনার সাথে দুটো কথা বলার জন্যেই এসেছি। আমি কিছুটা উষ্ণ ও দৃঢ় কন্ঠে বললাম, কে বলছে আপনাদের? আমি তো আমার ধর্মে অবিচল বিশ্বাসী। খৃষ্টের বাণী প্রচার করতঃ গুমরাহদের পথে আনাই আমার জীবনের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। এরপর আমি ইসলাম ধর্মের উপর কিছু অভিযোগ উত্থাপন করে আমার মানসিকতার জানান দেই। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন একজন সৌম্যদর্শন বুযর্গ ব্যক্তিত্ব। তার নাম ছিল শায়খ আব্দুল আজীজ। তিনি আমার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিস্তারিতভাবে আকর্ষণীয় আঙ্গিকে ইসলামের মাহাত্ম তুলে ধরেন। আমার কলিজার বোঁটা ছোড়া কথাগুলিকে তারা ধৈর্য্যরে চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলে এমন দরদ মাখা ভাষা ও  ভাব দ্বারা  নিজেদের কথা বলে গেলেন যা আমার অন্তরে বিস্ময়ের ঝড় তুলে দেয়। তাদের ভাব ছিল শালীন, ভাষা ছিল নরম ও আবেদনময়ী, চরিত্র ছিল অনুপম। অপর দিকে কুরআন অধ্যয়নের ফলে আমি আপনা থেকে মদ এবং শুকরের মাংস ভক্ষণ ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও ইসলামের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারছিলাম না।

পশ্চিমা নারীদের জীবন হচ্ছে কাজের ভারে নুয়ে পড়া এক কঠিন ও চ্যালেঞ্জমুখর জীবন। এখানকার সকলেই চায় নারী হবে একজন আধুনিকা মা, উত্তম চাকুরে, উত্তম অফিসার। এক কথায় একজন আধুনিকা নারী। এরা হবে স্বাধীন। তারা কি ধরনের স্বাধীন হবে তা শিখানোর উদ্দেশ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত স্কুল কলেজ। প্রতিটি স্কুল কলেজই স্ব স্ব আঙ্গিকে নারীদের স্বাধীনতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। যেগুলোর মধ্যে থাকে উৎকট স্ববিরোধিতা। চতুর্মুখী আবেদনের শিকার নারীরা দিশেহারা হয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত তারা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে এসব আবেদনের বাইরে নারীর স্বকীয় সত্তা, স্বকীয় আশা আকাঙ্খা ইচ্ছা অনিচ্ছা কিছুই নেই। এমতাবস্থায় যখন তারা কুরআন অধ্যয়ন করে ইসলামে দেয়া নারীর অধিকার সম্পর্কে অবহিত হয়, তখন তাদের কাছে এ বিষয়টি বর্তমান পাশ্চাত্য জগতের নারীরা মিডিয়ার তৈরি অদ্ভুত নারীবাদী মানসিকতার শিকার। অথচ এ মানসিকতা বাস্তবের ঘোর বিরোধী। এ মানসিকতা নারীত্বের সাথেও প্রবল সাংঘর্ষিক। কিন্তু স্বাধীনতার অক্টোপাসে বন্দী নারীদের জন্যে পিছনে ফেরারও অবকাশ নেই। ফলে তারা অসহায়ভাবে নিজেদেরকে মিডিয়ার তৈরি নারীর আদলে গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। কিন্তু এটাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। কেননা মিডিয়ার তৈরি হচ্ছে রক্ত-মাংস মেদ-মজ্জাহীন কল্পনার ঔরসে ভুমিষ্ঠ অদৃশ্য আকৃতির নারী। আর বাস্তবের নারীর মধ্যে রয়েছে রক্ত-মাংস মেদ মজ্জার পাশাপাশি একটা খেয়ালী মন, একটা শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তি। এটা পৃথক চাওয়া পাওয়া। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তারা অধৈর্য হয়ে ওঠে এবং প্রকৃত স্বাধীনতাকে উন্মুক্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি করে।

দিবালোকের ন্যায় প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, ইসলামই নারী জাতিকে দিয়েছে সত্যিকার স্বাধীনতা। আর তা দিয়ে রেখেছে আজ থেকে প্রায় সুদীর্ঘ দেড় হাজার বছর আগে। যখন নারীরা এ ব্যাপারে কোন ধারণাও রাখতো না। আজ পাশ্চাত্য জগতের নারীরা সমাজে নারীদের অধিকার কতটুকু, পরিবার পরিচালনায় তাদের ভূমিকা কি, মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েদের উপর কি অধিকার তাদের উপরই বা ওদের অধিকার কি প্রভৃতি জটিল ও কঠিন প্রশ্নসমূহের উত্তর খুঁজছে। কিন্তু তাদের ধর্ম, তাদের সমাজ, তাদের বিজ্ঞান এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে পারছেনা। অপরদিকে তারা ইসলামে এসব প্রশ্নের সুন্দর ও সঠিক উত্তর পেয়ে যাচ্ছে। আর এ জন্যই তারা চিরন্তন সুখের অন্বেষায় আপন ধর্ম ও পরিবার ফেলে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিতে দ্বিধা করছে না।

পশ্চিমা নারীরা আদৌ স্বাধীন নয়। বরং তারা স্বাধীনতার নামে তৈরি প্রতারণার একশ একটা শিকল দিয়ে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে বাঁধা। তারা স্বাধীনতার ছদ্মাবরণে এমন সব বিধানের তারে শৃংখলিত, যেসব বিধানে রয়েছে পুরুষদের এক তরফা প্রাধান্য। এবং তারা প্রকারান্তরে পুরুষের অধীনস্থ দাস। কেননা বিধান তাদেরকে বাধ্য করছে পুরুষের অধীনে থেকে নারী স্বাধীনতা অণ্বেষণ করতে এবং নারীর জীবনকে পুরুষের জীবনের ছাঁচে গড়ে তুলতে। বলুন এটা কি নারী স্বাধীনতা হতে পারে? এহেন স্বাধীনতার ফলাফল হচ্ছে নারীরা পুরুষের কর্মক্ষেত্রে চলে যাবার দরুন প্রাণ প্রতিম বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছে না। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলো- স্নেহবঞ্চিত এই বালকেরা খুব ছোটবেলা থেকেই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠছে এবং পরিণত বয়সে পৌঁছার আগেই অপরাধ প্রবনতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অপর প্রতিক্রিয়া হলো- মায়েরা সন্তানের এহেন পদস্খলন দৃষ্টে অন্তরে অন্তরে আহত হচ্ছে। তাদের মানসিক শান্তি তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। নিজেদেরকে তারা অপরাধী ভেবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এরপরও তাদের করার কিছু নেই। কেননা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বাইরে এসে যদি কোন নারী তার সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়, তাহলে সমাজ তাকে নিয়ে উপহাসে মেতে উঠে।

হিজাব অনুসারী সমাজের কাংখিত পরিবেশ

একটি সমাজ হিজাব অনুসরণ করলে বা সেখানে হিজাব চেতনা ও আচরণের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে কিছু শান্তি ও প্রশান্তির প্রাধান্য স্পষ্ট চোখে পড়বে।

অসংখ্য সেমিনার, টকশো এবং বহু আইন করেও আধুনিক সমাজ যা নির্মূল করতে পারেনি সেই ঈভ টিজিং পরিপূর্ণ ভাবে নির্মূল হবে হিজাব দ্বারা।

এটা হিজাব চেতনার- ই অংশ পরিবার থেকেই একটি তরুণ আল্লাহকে স্মরণ এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার শিক্ষার পাশাপাশি এ ধারনাও পাবে যে, ছেলেদের বড় হলে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া (মুহরিম) ছাড়া অন্য মেয়েদের কাছ থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কথা বলতে হলে সরাসরি না তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি একটু অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে কথা বলতে হবে। পরিবার সদস্যদের (মা, খালা, ফুফু, চাচা, মামা, দাদা, দাদী নানা, নানী) দেয়া এ শিক্ষা ও তত্ত্বাবধান এবং আল্লাহর ভয় থাকার পর একটা সমাজে আর কয়টা বখাটে তৈরি হওয়া সম্ভব?

দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ নানা কারণেই হয়ে থাকে। তবে সন্দেহ সংশয়, আকর্ষণ হ্রাস ও পরকীয়ার কারণেই অধিকাংশ অঘটন ঘটে। হিজাব চালু সমাজে উপরোক্ত সমস্যা উদ্ভব হওয়ার সুযোগ থাকেনা বলে কলহ-বিচ্ছেদও বিরাট সংখ্যায় হ্রাস পাবে। শিশুদের বেড়ে উঠার জন্য একটা সুস্থির পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করবে। সৌন্দর্য প্রদর্শন ও সামাজিক স্বীকৃতিহীন ঘনিষ্ঠতা তৈরির পরিবেশ থাকবে না বলে হ্রাস পাবে অপহরণ, এসিড-সন্ত্রাস, অনৈতিক সম্পর্ক হত্যা, সম্ভ্রমহানীর ঘটনাও।

তরুণ-তরুনী এবং নারী পুরুষের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা অধিকতর হারে কেন্দ্রীভূত হবে মেধাবিকাশ ও সৃজনশীল কাজে, পরিচ্ছন্ন বিনোদন ও সমাজ সেবায়। অনৈতিকতা ও পছন্দের জটিলতার আবর্তে বিয়ের বয়সী নারী পুরুষের বিয়ে বিলম্বিত হবে না। মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট এবং মাদকাসক্তির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

হিজাব সম্ভ্রমবোধকে সংরক্ষণ করে। নৈতিক চরিত্রকে পরিচ্ছন্ন রাখতে কার্যকর সহায়ক ভূমিকা পালন করে মানবিক মর্যাদা ও আভিজাত্যবোধের স্ফুরন ঘটায়।

শান্তির জন্য

মানুষের জীবনে দুটি অংশ ক্ষনস্থায়ী ইহকাল, চিরস্থায়ী পরকাল। জন্ম-মৃত্যুর উদ্ভাবক আল্লাহ চান আমরা তার ক্ষমা ও আপন কৃতিত্বের অর্জন হিসেবে দু জীবনেই শান্তিতে থাকি।

প্রতিনিয়ত মানুষ পৃথিবীতে আসছে পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা শেষে প্রাপ্য অর্জন সহ আবার তাকে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে দ্বিতীয় জীবনে।

প্রতিটি ঐশী প্রত্যাদেশ-ই পরম সুখের জন্য। হিজাব পক্ষপাতিত্বমুক্ত ঐশী প্রত্যাদেশ। মহাজগতের অভিভাবক আল্লাহর প্রতিটি আদেশই ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে সময়- উপাদান ও মানুষের মধ্যে। হাজার হাজার বছর পৃথিবীতে বসবাস করেও মানব সভ্যতার পক্ষে প্রকৃতির নিয়মকে বদলানো সম্ভব হয়নি বিন্দু পরিমাণও। সে মানুষের জন্য ঐশী প্রত্যাদেশের বিরুদ্ধাচরণ বুদ্ধি বিবেকের বন্ধ্যাত্ব ছাড়া আর কিছুই না।

হিজাব ব্যক্তি স্বাধীনতা ও পরিচ্ছন্ন নৈতিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়। শত চোখের পছন্দ অপছন্দের আনুগত্য করেই নারী-পুরুষেরা নিজেদের সজ্জিত ও প্রদর্শন করে। শুধু নারীদের নয় জেন্টস প্রসাধনী সামগ্রীরও কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা চলছে সারা দুনিয়া জুড়ে।

আর প্রদর্শন মানসিকতা যাদের থাকেনা আপন পছন্দে তারা স্বাধীন এবং স্বচ্ছন্দ। এভাবে হিজাব চর্চা ব্যক্তির নিজস্ব অভিরুচীর স্বাধীনতা ও সহজতা এনে দেয়।

ফ্যাশন পাগলামী এবং অনাচার মুক্ত মেধা, যোগ্যতা, নীতি নৈতিকতা ও সহমর্র্মিতার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত সামাজিক পরিবেশ আমাদের সবার আকাংখা। আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও নির্ভূল প্রজ্ঞায় বিশ্বাস স্থাপনকারী প্রতিটি মানুষকে এজন্য সক্রিয় ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

- তাফহীমুল কুরআন, মূল সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী, অনুবাদ আবদুল মান্নান তালিব, সম্পাদনা আকরাম ফারুক, আধুনিক প্রকাশনী।

- তাফসীর মারিফুল কুরআন

- তাফসীর ইবনে কাসীর

- সহীহ বুখারী

- সহীহ মুসলিম

- জামে তিরমিযী

- সুনানে আবু দাউদ

- সুনানে নাসাঈ

- সুনানে ইবনে মাজা

- মুয়াত্তা মালেক

- মিশকাত শরীফ

- রসুলের যুগে নারী স্বাধীনতা, আব্দুল হালীম আবু শুককাহ

- প্রবন্ধঃ শাহ আবদুল হান্নান।

- কেন মুসলমান হলাম, আবদুল্লাহ মামুন আরিফ আল মান্নান

- পর্দা ও ইসলাম, সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী

- পর্দার বিধান

- মানবতার বন্ধু, নঈম সিদ্দিকী

- জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন স্মারক ২০০৪

- Infinite variety (women in society and literature)

- Edited by- Firdous Azim; Niaz Zaman

- ইসলাম ও পাশ্চাত্য সমাজে নারী, ড. মুসতাফা আস সিবায়ী

- পরিবার ও পারিবারিক জীবন, মাওলানা আবদুর রহীম

- ইসলামের দৃষ্টিতে নিকাব, মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

- পত্রিকাঃ দৈনিক ইত্তেফাক, সংগ্রাম, জনকন্ঠ, প্রথম আলো, ইনকিলাব, ঙনংবৎাবৎ

- ইসলামের দৃষ্টিতে নারী, ফরিদ বেজদী আফেন্দী