Font Size

Profile

Menu Style

Cpanel

23June2017

ISO 9001:2008 Certified


Hijab

ভূমিকা

প্রশংসা সেই মহান রব্বুল আলামীনের যিনি অসীম জ্ঞান ও বিচক্ষনতার অধিকারী, যার হাতে রয়েছে তামাম জাহানের চাবিকাঠি। সালাত ও সালাম মুহাম্মদুর রাসূল (সা) এর প্রতি যিনি বিশ্বমানবতার জন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র।

নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় গঠিত হয় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি। পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে আবার নারীকে অবহেলিত করে কোন আদর্শ সমাজ গড়ে উঠে না। নারী পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ সহজাত কিন্তু এর রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা এবং নির্ধারিত সীমারেখা। সীমা অতিক্রম না করেও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দেশ ও জাতি গঠনে বিরাট অবদান রাখতে পারে নারী-পুরুষ। আরব বিশ্বের খ্যাতিমান গবেষক যথাক্রমে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ), সেীদি আরবের গ্রান্ড মুফ্তি আব্দুল আজিজ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বাজ (রহঃ), ড. মোহাম্মদ তকী উদ্দিন আল হেলালী ও শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ উসাইমিন তাদের ক্ষুরধার লিখনীর মাধ্যমে নারী পুরুষের পবিত্রতম সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।

World Assembly of Muslim Youth (WAMY) বাংলাদেশ অফিস এদেশের বিশাল জনগোষ্ঠির জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে উক্ত লেখক ও গবেষকদের প্রবন্ধগুলো বাংলায় অনুবাদ করে হিজাবঃ নির্বাচিত প্রবন্ধ শীর্ষক বই প্রকাশ করতে যাচ্ছে। আশাকরি এই বই দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বইটি প্রকাশের সাথে সম্পৃক্ত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সর্বশেষ আল্লাহর কাছে বিনীত প্রার্থনা, ‘হে রব্বুল আলামীন আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে তোমার সন্তুষ্টির জন্য কবুল করে নাও। আমীন।

ডাঃ মোহাম্মদ রেদওয়ানুর রহমান

ডাইরেক্টর

ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামী)

বাংলাদেশ অফিস

প্রকাশকের কথা

নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিনির্মাণ হতে পারে একটি আদর্শ জাতি ও সমাজ। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অঙ্গনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু স্বাধীনতার নামে অবাধ মেলামেশা ও সমানাধিকারের নামে পুরুষদের সাথে একান্তে অবস্থান ইত্যাদির ফলে নারী তার মর্যাদাকে চরমভাবে ভূলন্ঠিত করেছে। নারী-পুরুষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সীমারেখা ও নারীর মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণ করে নারীর অবস্থান সমুন্নত করেছে ইসলাম। আরব বিশ্বের প্রতিথযশা পাঁচজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকের প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে এই সত্যটি।

হিজাবঃ নির্বাচিত প্রবন্ধ বইটি মূলত হিজাব ও সালাতে নারীর পোষাক পরিচ্ছদ, পর্দা ও বেপর্দা, গায়ের মুহরিম এর সাথে মুসলিম নারীর করমর্দনের বিধাান, আল হিজাব এবং গায়ের মুসলিম নারীর সাথে একান্ত অবস্থান ও অবাধ মেলামেশা, এ পাঁচটি বিখ্যাত ও অতি প্রয়োজনীয় প্রবন্ধের সংকলন।

World Assembly of Muslim Youth (WAMY) বিশ্বব্যাপী আদর্শ সমাজ ও জাতি গঠনের নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অফিস এই কাজের অংশ হিসাবে প্রকাশ করে যাচ্ছে ডঅগণ ইড়ড়শ ঝবৎরবং হিজাবঃ নির্বাচিত প্রবন্ধ ২ম অনুবাদকৃত বই। ওয়ামীর অন্যান্য বইয়ের মত এই বই ও জ্ঞানপিপাসু ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কিছুটা হলেও জ্ঞানের পরিধিকে বিস্তৃত করবে ইনশাআল্লাহ। বইটির অনুবাদ ও প্রকাশে যারা মেধা, শ্রম ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তাদেরকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মূল প্রবন্ধের সাথে মিল রেখে যথার্থ অনুবাদ ও নির্ভূল মুদ্রনের চেষ্টা করা হয়েছে। তথাপিও অনুসন্ধিৎসু পাঠকের পরামর্শ পরবর্তী সংস্করণে নির্ভূল ও ত্রটিমুক্ত করতে সহায়ক হবে।

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে তার সন্তুষ্টির জন্য কবুল করুন। আমীন।

আলমগীর মোহাম্মদ ইউছুফ

ইনচার্জ

দাওয়াহ এন্ড এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট

ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামী)

বাংলাদেশ অফিস

অনুবাদকের কথা

একটি আদর্শ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক ভিত নারী-পুরুষ উভয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায়-ই হয়ে থাকে। নারীকে বাদ দিয়ে আদর্শ পরিবার ও সমাজ গঠন কোনভাবেই সম্ভব নয়। পুরুষের ভূমিকার পাশাপাশি নারীরও সেখানে মূখ্য ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ছলছাতুরীর অন্তরালে তাদের মধ্যকার অবাধ মেলামেশাকে ইসলাম কখনই সমর্থন করে না। তাইতো ইসলাম পর্দার বিধান ফরজ করে দিয়েছে। নারী-পুরুষ প্রত্যেকেরই নিজস্ব অঙ্গনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইসলাম নারীর যথার্থ অধিকার সংরক্ষণ করেছে। তাকে বানিয়েছে গৃহের রাণী। রাসূল (সা) বলেছেন, “নারী তার ঘরের দায়িত্বশীল, নিজ গৃহ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। তাই বলে ইসলাম নারীকে গৃহের আসবাবপত্রের ন্যায় সার্বক্ষণিক সেখানে অবস্থানের নির্দেশ দেয়নি বরং প্রয়োজনের তাগিদে হিজাব পরিধান করে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

আজকাল নারীর সমানাধিকারের নামে, তার শান্তি ও প্রগতির নামে নানা সংস্থা ক্লাব, সমিতি ও সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এসব সভা-সমিতি নারীদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে যে তথাকথিত ভূমিকা রাখছে তা নগ্নতা অশ্লীলতা ও পাপ-পংকিলতা নিমজ্জিত এ ধরাপৃষ্ঠের দিকে তাকালে সহজেই অনুমিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানগুলো সমান অধিকারের নানা বুলি ছড়িয়ে নারীকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনায় লিপ্ত করছে। পারিবারিক ও সামাজিক সুখ-শান্তি দূর করে নিয়ে চলছে নিত্য অশান্তির এক অজানা পথে। মূলতঃ এসব সভা-সমিতির হর্তাকর্তারা নারীর চারিত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ ও শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা দাবী তুলে পুরুষদের সাথে তাদের একান্তে অবস্থান ও পাপপূর্ণ অবাধ মেলামেশাকে বৈধ করে দিয়েছে।

যাহোক আলোচ্য হিজাবঃ নির্বাচিত প্রবন্ধ শীর্ষক গ্রন্থটি মূলতঃ আরব বিশ্বের অন্যতম প্রতিথযশা পাঁচজন ইসলামী ব্যক্তিত্বের পাঁচটি প্রবন্ধের বাংলা অনুবাদ। প্রথম প্রবন্ধটিতে শায়খুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া (রহ) হিজাব ও সালাতে নারীর পোশাক-পরিচ্ছদবিষয়ে আলোচনা পেশ করেছেন। পর্দা ও বেপর্দা শিরোনামে দ্বিতীয় প্রবন্ধটি লিখেছেন সৌদী আরবের গ্রান্ড মুফতি আব্দুল আজীজ ইব্ন আব্দুল্লাহ ইব্ন বায (রহ)। তৃতীয় প্রবন্ধটিতে ড. মুহাম্মদ তকীউদ্দীন আল-হেলালী অপরিচিত (গায়ের মুহরিম) পুরুষদের সাথে মুসলিম নারীর করর্মদনের বিধান তুলে ধরেছেন। চতুর্থ প্রবন্ধটিতে শায়েখ মুহাম্মদ ইব্ন সালিহ উসাইমীন আল-হিজাবশিরোনামে পর্দার খুটিনাটি বিষয় কুরআন-সুন্নাহ ও বাস্তব যুক্তি-প্রমাণের আলোকে অতি মনোজ্ঞভাবে উপস্থাপন করেছেন। সর্বশেষ প্রবন্ধটির শিরোনাম হলো গায়ের মুহরিম নারীর সাথে একান্তে অবস্থান ও অবাধ মেলামেশা। এতে প্রবন্ধকার কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি নানা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে একটি তথ্যবহুল আলোচনা পেশ করেছেন। প্রবন্ধগুলোর আরবী মূল টেক্সটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বঙ্গানুবাদ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরেও পাঠকমহলে ভাষা ও অর্থগতভাবে কোন ভুল দৃষ্টিগোচর হলে আমাদেরকে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব। বই পাঠে বাংলা ভাষাভাষি মুসলমানগণ হিজাব সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাবে বলে আশা রাখছি। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন। আমীন।

অনুবাদক

মুহাম্মদ নূরে আলম

হিজাব ও সালাতে নারীর পোশাক পরিচ্ছদ

শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (রহ)

ইসলামী আইনশাস্ত্র বিশারদগণ সালাতে সতর ঢাকা অধ্যায়ে সালাতের সাজ-সজ্জা গ্রহণ সম্পর্কিত আলোচনা পেশ করেছেন। তাঁদের এক দলের মত যে সালাতের মধ্যে সতর ঢেকে রাখে সে যেন লোকচক্ষুর দৃষ্টি থেকে তা ঢেকে রাখে। সালাতে সতর ঢাকার ব্যাপারে তারা নিন্মোক্ত আয়াত দলীল হিসেবে পেশ করেছেন।

আল্লাহর বাণী-

তারা যেন যা সাধারণ প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। তারা নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না (এখানে গোপন সৌন্দর্য উদ্দেশ্য) তবে স্বামীদের কাছে প্রদর্শন করতে পারবে। (সূরা আন্ নূর -৩১)

ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণ বলেন- নারী সালাতে, বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারবে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের সংজ্ঞাদানে সাহাবায়ে কিরাম দুটি ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। হযরত ইব্ন মাসউদ (রা) ও তার অনুসারীদের মতে বাহ্যিক সৌন্দর্য হলো  পোশাক-পরিচ্ছদ। হযরত ইব্ন আব্বাস ও তাঁর অনুসারীদের মতে মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ের সৌন্দর্য যেমন- সুরমা ও আংটি।

উল্লেখিত মতদ্বয়ের ভিত্তিতে ফকীহ্গণ গায়র মুহরিম নারীর চেহারার দিকে নজর দেওয়ার ব্যাপারে মত পার্থক্য করেছেন। 

ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইব্ন হাম্বল (রহ) এর এক বর্ণনা অনুসারে যৌন লালসা ছাড়া নারীর চেহারা ও হস্তদ্বয়ের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টি দেওয়া বৈধ।

ইমাম আহমদ ইব্ন হাম্বল (রহ:) এর মতে কুনজর ছাড়া নারীর চেহারা ও হস্তদ্বয়ের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টি দেওয়াও জায়েয নয়। তিনি বলেন- নখ থেকে শুরু করে নারীর সবকিছু পর্দার অন্তর্ভূক্ত। আর এটাই ইমাম মালিকের মত।

এ কথা সত্য যে, আল্লাহ তায়ালা সৌন্দর্যকে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দুভাগে ভাগ করেছেন। স্বামী ও মুহরিম পুরুষ ছাড়া অন্যদের সামনে বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশ করাকে জায়েয করেছেন। আর আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য প্রকাশ কেবল স্বামী ও মুহরিম পুরুষদের সাথে নির্দিষ্ট করেছেন।

হিজাবের আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে নারীরা বড় চাদর পরিধান না করে চলাফেরা করত। পুরুষেরা তাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় দেখতে পেত। সে সময় চেহারা ও হস্থদ্বয় প্রদর্শন জায়েয থাকার কারণে উক্ত অঙ্গদ্বয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া বৈধ ছিল।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা হিজাবের নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন-

হে নবী আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিন নারীগণকে বলুন তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেয়। (আল আহযাব-৫৯)

এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নারীগণ পুরুষদের থেকে পর্দা করে চলাফেরা করতে শুরু করেন।

নবী করিম (সা) এর সাথে যায়নাব বিনত জাহাশ (রা)এর বিবাহের সময় তিনি গৃহের অভ্যন্তরে পর্দা ঝুলিয়ে দেন এবং হযরত আনাস (রা) কে ভিতরের দিকে দৃষ্টি দিতে নিষেধ করেন। খাইবার বিজয়ের পর তিনি সাফিয়াহ বিনত হোয়াইকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। লোকেরা বলাবলি করল, উম্মুল মুমিনীন হওয়ার সম্মানে তাঁর ওপর পর্দার বিধান আরোপিত হয়েছে। নচেৎ তিনি দাসী থেকে যেতেন। আর দাসীর তো পর্দার প্রয়োজন হয় না। আল্লাহ তায়ালা নারীদেরকে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া কিংবা জিজ্ঞাসা করার আদেশ দানের পর রাসূল (সা) স্বীয় স্ত্রী কন্যা ও মুমীন নারীদেরকে চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

হযরত ইব্ন মাসউদ (রা) বলেন, জিলবাব হলো বড় চাদর এর সাধারণ নাম ইযার, এমন বড় চাদর যার দ্বারা মাথাসহ সমস্ত শরীর ঢাকা যায়।

হযরত উবাইদা (রা) ও অন্যরা বর্ণনা করেন, নারী চাদর দ্বারা মাথার উপর দিয়ে শরীরকে এমনভাবে ঢেকে দিবে যে চক্ষুদ্বয় ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। নিকাব বা মুখাবরণ এ জাতীয় পোশাক। তাই নারীরা নিকাব বা মুখাবরণ পরিধান করবে।

মুহরিম নারী নিকাব বা মুখাবরণ ও হাত মোজা পরিধান করবে না। (সহীহ আল-বুখারী)

নারীদেরকে যাতে চেনা না যায় এ কারণে তাদেরকে বড় চাদর পরিধান করতে বলা হয়েছে। নিকাব দ্বারা মুখমন্ডল ঢেকে রাখায় নারীকে চেনা যায় না। সে সময় চেহারা ও হস্তদ্বয় বাহ্যিক সৌন্দর্যের অংশ হওয়ার কারণেই নারীকে তা অপরিচিত (গায়র মুহরিম) পুরুষের  সামনে প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই সঙ্গত কারণেই অপরিচিত পুরুষের জন্য নারীর বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়া অন্য কিছুর দিকে দৃষ্টি দেওয়া বৈধ নয়। উল্লেখিত মত দুটির প্রথমটি ইব্ন আব্বাস ও দ্বিতীয়টি ইব্ন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালার বাণী-

স্ত্রীলোক ও অধিকারভুক্ত দাসী এই  আয়াতাংশ প্রমাণ করে যে, দাসী তার মালিকদের সামনে আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে দুটি মত রয়েছে

১। সাঈদ ইব্ন- মসাইয়্যার ও ইমাম আহমদ (রহ) এর মতে অধিকারভুক্ত এ আয়াতাংশ দ্বারা দাসী কিংবা কিতাবী দাসী উদ্দেশ্য।

২। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে ক্রীতদাস উদ্দেশ্য, ইমাম শাফেয়ীও এমত পোষণ করেছেন। এটি ইমাম আহমদ (রহ) এর আরেকটি মত। এ মতের ভিত্তিতে দাসের  জন্যে তার মুনীবার দিকে দৃষ্টি দেওয়া বৈধ।

এ সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে-কেবল প্রয়োজনের তাগিদে ইসলামী শরীআত এ দৃষ্টি দেওয়াকে বৈধ করেছে। কারণ তিনি (মুনীব) সাক্ষী, শ্রমিক ও সম্বোধিত ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকে স্বীয় দাস কে সম্বোধন করার ব্যাপারে অধিক মুখাপেক্ষী।

যখন এ সকল লোকদের দৃষ্টি দেওয়াকে বৈধ করা হয়েছে তখন সর্ব সম্মতভাবে তার (মুনিবা) প্রতি দাসের দৃষ্টি দেওয়া বৈধ। এ কথার দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে সে মুহরিম হয়ে গেছে, সে তার সাথে সফর করতে পারবে। কারণ তাদের পরস্পরের প্রতি দৃষ্টি দেওয়াকে বৈধ করা হয়েছে।

যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া বৈধ তার সাথে সফর কিংবা নির্জনে বাস করা বৈধ, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়, বরং দাস প্রয়োজনের তাগিদেই তার দিকে দৃষ্টি  দিয়ে থাকে। রাসূল (সা) নারীর মুসাফির অবস্থায় সফর সঙ্গী হওয়ার ব্যাপারে যে কজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন, দাস তাদের মধ্যে পড়ে না। রাসূল (সা) বলেছেন- নারী তার স্বামী কিংবা মুহরিম ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে সাথে নিয়ে সফর করবে না, এর কারণ হলো দাস দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তার সাবেক মুনীবকে বিবাহ করতে পারবে। যেভাবে এক বোনকে তালাক দেওয়ার পর অপর বোনকে বিবাহ করা জায়েয।

চিরদিনের জন্য যার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ তাকে মুহরিম বলা হয়। একারণে হযরত ইবন উমার (রাঃ) বলেছেন, স্বীয় দাসের সাথে কোন নারীর সফর করা ধ্বংসের শামিল।

সৌন্দর্য প্রকাশের আয়াতটি মুহরিম, গায়র মুহরিম সকলের ক্ষেত্রে শিথিল যোগ্য। আর সফরের হাদিসটি কেবল মুহরিমদের সাথে সম্পৃক্ত। আর আয়াতটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, স্ত্রীলোক বা অধিকারভুক্ত দাস-দাসী এরং হাবাগোবা যৌন কামনামুক্ত পুরুষ (সূরা নূর: ৩১) এদের সাথে নারী সফর করবে না।

আল্লাহর বাণী তাদের নারীগণ এর মধ্যস্থিত নারীদের সম্পর্কে ফকীহগণ বলেন, এখানে মুশরিক নারীদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ মুশরিক নারী একজন মুসলিম নারীর সমকক্ষ হতে পারে না, এবং মুসলিম নারীদের সাথে গোসল খানায় প্রবেশ করতে পারে না।

কখনো কখনো ইহুদী নারীরা নবীপতœী হযরত আয়েশা (রা) ও অন্যান্য মুসলিম নারীদের কাছে আসত। তাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় দেখত (যা পুরুষের জন্য দেখা জায়েয নয়)  জবাব হলো জিম্মী নারীরা বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখতে পারে। আর আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য দেখা বা অবগত হওয়ার অধিকার তাদের নেই। অবস্থা ভেদে বাহ্যিক ও গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করা জায়েয। আর এ কারণেই তিনি আত্মীয়-স্বজনদের সামনে আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য প্রকাশ করতেন। বিশেষত স্বামীর কাছে এমন সৌন্দর্য প্রকাশ করতেন যা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সামনে প্রকাশ করা যায় না। আল্লাহর বাণী-    

তারা যেন মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। নারী তার গ্রীবা ঢেকে রাখবে। এটা বাহ্যিক নয় বরং গ্রীবা ও তার মধ্যে (হার ইত্যাদি) যা পরিধান করা হয় এসব আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা উক্ত বাণী সেদিকেই ইঙ্গিত করে।

এ অধ্যায় পুরুষ থেকে নারী ও পুরুষ থেকে পুরুষ এবং নারী থেকে নারীর বিশেষ পর্দার বিধান আলোচনা করা হবে। রাসূল (সা) বলেছেন: পুরুষ অন্য পুরুষের লজ্জাস্থান, নারী অন্য নারীর লজ্জাস্থানের দিকে নজর দিবে না। রাসূল (সা) বলেছেন- তুমি তোমার স্ত্রী ও অধীনস্থ দাসী ছাড়া অন্য ক্ষেত্র থেকে লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে। তাঁকে (সা) বলা হয়, হে আল্লাহর রাসূল ! লোকেরা তো একে অপরের সাথে মিলে মিশে বাস করে, এর সমাধান কি ? রাসূল (সা) বললেন, যদি কেউ কারো লজ্জাস্থান দেখতে না পায়, তবে তা অন্যকে দেখানো যাবে না। বলা হলো, আমাদের  কেউ যদি উলঙ্গ থাকে ? রাসূল (সা) বললেন আল্লাহ তায়ালাকে তার অধিক লজ্জা করা উচিত। এক কাপড়ের নীচে এক পুরুষ অন্য পুরুষের সাথে এবং এক নারী অন্য নারীর সাথে শোয়ার ব্যাপারে রাসূল (সা) নিষেধ করেছেন।

তিনি সন্তানদের সম্পর্কে বলেছেন, তোমরা তাদেরকে সাত বছর বয়সে সালাতের আদেশ কর, দশ বছর বয়সে নামাযে না গেলে প্রহার কর এবং তাদের শয্যা আলাদা করে দাও।

অশ্লীলতা ও কদর্যতার কারণে রাসুল (সা) একই লিঙ্গের অর্থাৎ পুরুষ অন্য পুরুষের লজ্জাস্থান এবং নারী অন্য নারীর লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া কিংবা স্পর্শ করাকে হারাম করেছেন। আর নারী পুরুষের দিকে কিংবা পুরুষ নারীর লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত

বৈবাহিক মিলন কামনার কারণে হয়ে থাকে। যা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

নামাযের অভ্যন্তরের বিষয়টি হলো তৃতীয় প্রকারের। নারী যদি একাকী নামায পড়ে তখন তাকে ওড়না পরতে বলা হয়েছে। নামাযের বাইরে নিজ গৃহে মাথা খোলা রাখা তার জন্য বৈধ। নামাযের মধ্যে সাজগোজ করা সেটা আল্লাহর অধিকার। আর এ কারণে রাতের বেলা সম্পূর্ণ একাকী হলেও উলঙ্গ অবস্থায় কেউ যেমন কাবার তাওয়াফ করতে পারবে না, তেমনি রাতের অন্ধকারে একাকী উলঙ্গ হয়ে নামাযও পড়তে পারবে না। এ থেকে জানা গেল যে, সালাতের সাজ-সজ্জা গ্রহণ মানুষের থেকে পর্দা করার জন্য হয় না। বরং এটা এক দৃষ্টিকোণ আর ওটা আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে হয়েছে।

তাই সালাতে মুসল্লীদের জন্য যা ঢেকে রাখা আবশ্যক, সালাতের বাইরে তা প্রকাশ করা বৈধ। আবার সালাতে অবস্থা-ভেদে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খোলা রাখাও হয়, যা মানুষের সামনে প্রকাশ করা জায়েয নয়।

প্রথম কথার দৃষ্টান্ত হলো দুই কাধে রাসূল (সা) পুরুষদেরকে এমন এক কাপড় পরে সালাতে দাঁড়াতে নিষেধ করেছেন, যা দ্বারা শরীরের নিম্নাংশ ঢাকতে গেলে স্কন্ধদ্বয় প্রকাশ হয়ে যায়। এ নিষেধ সালাতের সম্মানের কারণেই করেছেন। কিন্তু সালাতের বাহিরে পুরুষের জন্য স্কন্ধদ্বয় প্রদর্শন জায়েয।

অনুরূপভাবে স্বাধীনা নারী সালাতে ওড়না পরিধান করবে। রাসূল (সা) বলেছেন- যে প্রাপ্ত বয়স্কা নারী সালাতে ওড়না পরিধান করে না আল্লাহ তার সালাত কবুল করেন না। অথচ স্বামী ও মুহরিম ব্যক্তিদের সামনে ওড়না পরিধান না করার ব্যাপারে শরীআত কর্তৃক কোন বিধি নিষেধ আসেনি। বরং শরীআত  এ সকল লোকের সামনে তার আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য প্রকাশ করাকে জায়েয করে দিয়েছেন। সালাতের মধ্যে এ সকল ব্যক্তি কিংবা অন্য কারো সামনে  নারীর জন্য তার মাথা উন্মোচন করা জায়েয নেই।  তবে সালাত অবস্থায় মুখমন্ডল, হস্তদ্বয়  এবং পদযুগল প্রকাশ করতে পারবে। এ অঙ্গগুলো অপরিচিত কারো সামনে প্রকাশ করা যাবেনা। এটাই বিশুদ্ধ মত। তাদের সামনে শুধু বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ প্রকাশ করা যাবে।

উল্লেখিত অঙ্গগুলি সালাতে ঢাকার বিষয়টি মুসলমানদের ঐকমত্যের ভিত্তিতেও ওয়াজিব হবে না। বরং সর্বসম্মতভাবে সালাতে নারীর মুখমন্ডল খোলা রাখা জায়েয। যদিও তা আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের অংশ।

অনুরূপভাবে জমহুর ওলামায়ে কেরামের (অধিকাংশ ওলামায়ে কিরাম) মতে সালাতে নারীর হস্তদ্বয় প্রকাশ করা জায়েয। এমনকি ইমাম আবু হানিফা (রহ) এর মতে নারী তার হাত-পাও প্রকাশ করতে পারবে। এটাই শক্তিশালী মত। কারণ হযরত আয়েশা (রা) এটাকে বাহ্যিক সৌন্দর্য বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি তারা যেন যা সাধারণ প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন (আলফাতখু) অর্থাৎ দুপায়ের আঙ্গুল সমূহে পরিহিত রৌপ্যের আংটি।

এ কথার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, নারীরা প্রথম অবস্থায় হাত ও মুখমণ্ডলের ন্যায় পদযুগল প্রকাশ করত। তারা আঁচল ঝুলিয়ে দিত। কারণ হাঁটার সময় কখনো কখনো তাদের পা প্রকাশ পেত। তারা মোজা ও জুতা পরিধান করে হাঁটতনা। সালাতে তা ঢেকে রাখা একটা বড় সমস্যা। হযরত উম্মে সালমা (রা) বলেন, পদযুগলের উপরি ভাগ ঢেকে যায় এমন দীর্ঘ এক কাপড়ে নারী সালাত আদায় করার সময় যখন সে সিজদায় যায় তখন পায়ের আভ্যন্তরীণ অংশ প্রকাশ হয়ে পড়ে।

মোদ্দাকথা হলো- কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হলো নারী সালাতের মধ্যে জিলবাব বা বড় চাদর পরিধান না করলে ক্ষতি নেই। সে কেবল তা ঘরের বাহিরে পরিধান করবে। আর গৃহে সালাতের অবস্থায় যদিও তার চেহারা হস্তদ্বয় ও পদযুগল খোলা থাকে তাতে সমস্যা নেই। যেমন হিজাবের আয়াত নাযিলের পূর্বে তারা করত। সালাতের মধ্যস্থিত পর্দা আর চোখের পর্দা কোন অবস্থাতেই এক হুকুমের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে না।

ইব্ন মাসউদ (রা) বাহ্যিক সৌন্দর্য বলতে পোশাক-পরিচ্ছদকে বুঝিয়েছেন। নখ থেকে শুরু করে প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নারীর জন্য সালাতে রত অবস্থায় পর্দার  কথা বলেননি। এটি ইমাম আহমাদ (রহ) এর উক্তি। ফকিহগণ এ বিষয়টিকে সতর ঢাকা অধ্যায় নামে নামকরণ করেছেন। এটা না রাসূলের বাণী, না কুরআনের কোথাও এ কথা উল্লেখ আছে যে মুসল্লী সালাতের অবস্থায় যা ঢেকে রাখবে তা পর্দার শামিল। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা প্রত্যেক সালাতে সাজ সজ্জা গ্রহণ কর। (আল-আরাফ-৩১)

নবী (সা) উলঙ্গ হয়ে কাবায় তাওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং সালাতে এ নিষেধাজ্ঞা আরো বেশি যুক্তিসঙ্গত। এক কাপড় পরিধান করে সালাত আদায় করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে রাসূল (সা) বলেন  তোমাদের প্রত্যেকের কি দু কাপড় নেই ? এক কাপড়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, যদি কাপড় বড় ও প্রশস্ত হয় তবে তা দ্বারা নিজের শরীর আচ্ছাদিত করবে। আর ছোট হলে সেটাকে ইজার বা লুঙ্গি বানিয়ে পরিধান করবে। তিনি (সা) এমন একখণ্ড কাপড় পরে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন যার দ্বারা স্কন্ধ ঢাকা যায় না। সালাতে লজ্জাস্থান উরু ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখতে হবে, রাসূল (সা) এর উপরিউক্তি বাণী তারই প্রমাণ বহন করে।

ইমাম আহমাদ (রহ) এর এক কাওলের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, সতর হলো নারী পুরুষের লজ্জাস্থান। পুরুষের উরুর দিকে তার দৃষ্টি দেয়া জায়েয হওয়ার কারণে তা সতরের আওতাভুক্ত নয়।  তবে সালাত ও তাওয়াফরত অবস্থা ছাড়া। উরু সতরের আওতাভূক্ত হউক আর না হউক, কোন অবস্থাই সালাতে পুরুষের জন্য তা প্রকাশ করা এবং নগ্ন শরীরে তাওয়াফ করা জায়েয নেই। বরং প্রয়োজনে এক কাপড়কে লুঙ্গি বানিয়ে সালাত আদায় করবে। কাপড় বড় হলে তা দ্বারা সারা শরীর ঢেকে সালাত আদায় করবে। গৃহে একাকী সালাত আদায় করার সময়ও সতর ঢাকা ওয়াজিব। এ ব্যাপারে আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে একাত্মতা জ্ঞাপন করেছেন।

পুরুষের ইজার বা লুঙ্গি পরিধান করার সামর্থ্য থাকলে উরুদ্বয় নগ্ন অবস্থায় সালাত আদায় করা জায়েয হবে না। এ বিষয়ে মত পার্থক্য করা উচিত হবে না। যারা এতে মতানৈক্য করেছেন তারা ভুলের মধ্যে রয়েছেন। ইমাম আহমাদ (রহ) ও অন্যান্য ইমামদের কেউ এ অবস্থায় সালাত আদায় জায়েয হওয়ার কথা বলেননি। কারণ তিনি নিজেই যখন স্কন্ধদ্বয় ঢাকার নির্দেশ দিয়েছেন তখন উরু নগ্ন রাখার অনুমতি দিতে পারেন কিভাবে ? তাই কোন মুসল্লীর  উরুদ্বয় নগ্ন রেখে সালাত আদায় জায়েয হবে না।

পুরুষের একাকী অবস্থায় লজ্জাস্থান ঢাকা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মতপাথর্ক্য রয়েছে। তবে সালাতরত অবস্থায় পোশাক পরিধান করতে এতে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। পোশাক পরার সামর্থ থাকার পরও নগ্ন শরীরে সালাত আদায় জায়েয না হওয়ার ব্যাপারে আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। আর এ কারণেই ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য ইমামগণ উলঙ্গ ব্যক্তিদের সালাত বসা অবস্থায় আদায় করা জায়েয বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাদের সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে ইমাম মাঝ বরাবর থাকবে। সালাতের সম্মানার্থেই তাদের এ সতর ঢাকা। দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলে তাদের দিকে অন্যরা দৃষ্টি দিবে সে কারণে নয়। হযরত বাহায ইবনে হাকীম তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন  আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা) যখন আমাদের কেউ নগ্ন থাকে ? তিনি বললেন  মানুষের উচিত আল্লাহকে অধিক লজ্জা করা।  এ হলো সালাতের বাইরের অবস্থা। তাই সালাত রত অবস্থায় অধিক লজ্জাশীল ও মহা পবিত্র সত্তা রাব্বুল ইজ্জত ওয়াল জালালের সাথে চুপিসারে কথা বলার জন্যে সাজ ও সজ্জা গ্রহণ করতে হবে। হযরত ইব্ন উমার তার গোলাম নাফে (রহ) কে নগ্ন দেহে সালাত আদায় করতে দেখে বললেন  তুমি যে অবস্থায় সালাতে দণ্ডায়মান হলে, এ অবস্থায় কি মানুষের সামনে বের হওয়ার ইচ্ছা করতে ? জবাবে তিনি না বললেন। ইব্ন  উমার বললেন অন্য কারো চাইতে আল্লাহ তায়ালা-ই অধিক হকদার যে তুমি তার সামনে সালাতে সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়াবে।

সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) কে বলা হলো  কারো পোশাক পরিচ্ছদ ও জুতা সুন্দর থাকুক, কোন ব্যক্তির কি এরূপ কামনা করা ঠিক হবে ? রাসূল (সা)  বললেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন।

একইভাবে রাসূল (সা) মুসল্লীদেরকে সুগন্ধি ব্যবহার ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতা অর্জনের নির্দেশ দেন। রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা গৃহগুলোকে মসজিদ বানাও অর্থাৎ গৃহে নফল সালাত আদায় কর ও গৃহকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখ এবং সুগন্ধি ব্যবহার কর। সালাতের এ গুরুত্বের কারণেই পুরুষ অন্য পুরুষ থেকে, নারী অন্য নারী থেকে সতর ঢাকা অন্য সময় অপেক্ষা সালাতে সতর ঢাকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

নারীকে সালাতে ওড়না পরিধান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারীর চেহারা, হাত-পা অপরিচিত (গায়র মুহরিম) ব্যক্তিদের সামনে প্রদর্শনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কিন্তু মুহরিম ব্যক্তিবর্গ  এবং নারীর সামনে নারীর সৌন্দর্য প্রকাশের ব্যাপারে শরীয়াত কর্তৃক কোন প্রকার নিষেধাজ্ঞা আসেনি। জ্ঞাতব্য যে পুরুষের সামনে অন্য পুরুষ এবং নারীর সামনে অন্য নারীর লজ্জাস্থান প্রদর্শনের নিষেধাজ্ঞা অশ্লীলতা ও লজ্জাস্থান প্রকাশের কার্যতার কারণে নয়। বরং এ অপকর্ম অশ্লীলতার পটভূমি হওয়ার কারণেই নিষেধাজ্ঞা  এসেছে।  আল্লাহ তায়ালা বলেন এটা তাদের জন্য  অধিকতর পবিত্র। পর্দা সম্পর্কিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, এটা তোমাদের ও তাদের (নারী) অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্র। তাই এরূপ অপকর্ম মৌলিকভাবে বিনাস সাধনের জন্যেই নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সালাতের ভিতরে কিংবা বাহিরে অন্য কোথাও পুরোপুরি সতরের কারণে নয়।

হস্তদ্বয়, মুখমণ্ডলের ন্যায় সিজদা করার কারণে সালাতে নারীর হস্তদ্বয় ভালভাবে ঢেকে রাখার ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। নবী করীম (সা) এর জামানায় মহিলারা গাউন পরিধান করত। গাউন পরেই কাজকর্ম করত। গম, ভুট্টা, যব ইত্যাদি চুর্ণ করা ও ময়দার খামির করা এবং রুটি বানানোর সময় তাদের হাত দেখা যেত। সালাতে হস্তদ্বয় ঢাকা ওয়াজীব হলে রাসূল (সা) অবশ্যই তা বর্ণনা করতেন এবং তাঁর পরবর্তীতে ইসলামী আইন বিশারদগণও এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিতেন। রাসূল (সা) শুধু গাউনের সাথে ওড়না পরার নির্দেশ দেন। তাই তারা গাউন ও ওড়না পরে সালাত আদায় করত। পায়ের দিকে কাপড় ঝুলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে রাসূল (সা) বললেন, এক বিঘত। নারীরা বললেন, যদি পায়ের নলা দেখা যায় ? রাসূল (সা) বললেন- তাহলে এক হাত, তার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে আরবের বিখ্যাত কবি উমার বিন আবু রাবীআর কবিতার চরণটি উল্লেখযোগ্যঃ যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে। যুদ্ধ আমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে। আর আঁচল ঝুলিয়ে চলা সুন্দরী নারীর উপর ফরজ করা হয়েছে

গৃহের বাহিরে যাওয়ার সময় নারীরা আঁচল ঝুলিয়ে বের হতো। একারণে ময়লাস্থানের উপর দিয়ে কাপড় ঝুলিয়ে চলাফেরা কারী নারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে রাসূল (সা) বলেন, ময়লার পরবর্তী স্থান এটাকে পবিত্র করে দিবে। আর গৃহের অভ্যন্তরে নারীরা কাপড় ঝুলিয়ে পরত না। অনুরূপভাবে গৃহের বাহিরে কোথাও গেলে পায়ের নলা ঢাকতে তারা মোজা পরিধান করত। কিন্তু গৃহের অভ্যন্তরে পরত না। একারণেই তারা বলেছিল যদি তাদের পায়ের নলা দেখা যায় ? যেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পায়ের নলা ঢাকা। কারণ হাটার সময় কাপড় টাকনুর উপরে থাকলে পায়ের নলা দেখা যায়।

হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, নারীর গৃহের বাহিরে বের হওয়ার উপযুক্ত পোশাক না থাকলে সে গৃহেই অবস্থান করবে।

মুসলিম নারীরা গৃহের অভ্যন্তরের সালাত আদায় করতেন। রাসূল (সা) বলেছেন  তোমরা আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসা থেকে নিষেধ করো না। তবে ঘর তাদের জন্য উত্তম। সালাতে নারীদেরকে গাউনের সাথে শুধু ওড়না পরিধান করতে বলা হয়েছে। হাত-পা ও হাতের তালু কিংবা অন্য কোন অঙ্গ ঢাকার ব্যাপারে কোন নির্দেশ দেওয়া  হয়নি। চাই তা মোজা বা জাওরাব কিংবা অন্য কিছু দিয়ে হউক। তাই বুঝা যায় যে, নারী সালাতে অপরিচিত ব্যক্তির (গায়র মুহরিম) অনুপস্থিতিতে এসব অঙ্গ ঢেকে রাখা আবশ্যক নয়।

বর্ণিত আছে যে, ফিরিস্তাগণ আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দেয় না। নারী ওড়না কিংবা গাউন খুলে ফেললে ফিরিশতা সেদিকে তাকায় না। হযরত খাজিদা (রা)  থেকে এব্যাপারে হাদিস বর্ণিত আছে। সালাতের ক্ষেত্রে নারী এ গাউন ও ওড়না পরিধানের ব্যাপারে আদিষ্ট। যেভাবে পুরুষ সালাত আদায়ে এমন এক  কাপড় পরিধান করার ব্যাপারে আদিষ্ট, যাতে তার লজ্জাস্থান ও স্কন্ধদ্বয় সহ সারা শরীর ঢাকা যায়।

পুরুষের ক্ষেত্রে দুস্কন্ধ ঢাকা, নারীর ক্ষেত্রে মাথা ঢাকার ন্যায়। কারণ সে শার্ট বা শার্টের মত অন্যকিছু পরিধান করে সালাত আদায় করে। অথচ ইহরাম অবস্থায় তার শরীরে  কামিজ/শার্ট কিংবা জুব্বা পরিধান করে না। যেভাবে নারী এ অবস্থায় নিকাব কিংবা হাতের মোজা পরিধান করে না।

হাম্বলী ও অন্যান্য মাজহাবে নারীমুখমণ্ডলের ব্যাপারে দুটি বক্তব্য রয়েছে

ক) নারীর মুখমন্ডল  হুকুমের দিক থেকে পুরুষের মাথার ন্যায় ঢাকা যাবে না।     

খ) তাঁর মুখমন্ডল পুরুষের হস্তদ্বয়ের মত। তাই নিকাব, বোরখা, কিংবা এ জাতীয় অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা যাবে না। এটাই বিশুদ্ধ মতামত। কারণ রাসূল (সা) হাতমোজা ও নিকাব পরিধান করা থেকে নিষেধ করেছেন।

নারীরা মাথার উপর দিয়ে মুখমণ্ডের উপর কাপড়ের আঁচল টেনে দিত। এর দ্বারা তারা পুরুষদের থেকে পর্দা করত কিন্তু তাদের মুখমণ্ডল খোলা থাকত। এ থেকে জানা গেল যে, নারীর মুখমণ্ডল শরয়ী হুকুমের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের হস্তদ্বয় ও তাদের (নারীদের) নিজেদের হস্তদ্বয়ের অনুরূপ। তা একারণে যে, নারীর সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্দা যা পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। তাই তার মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ঢেকে রাখা আবশ্যক। তবে অঙ্গ অনুপাতে যে অতিরিক্ত  পোশাক পরিধান করা হয় তা ব্যতীত। আল্লাহ এ বিষয়ে অধিক ভালো জানেন।

সুরা আন-নূরের আলোকে শায়খ ইবন তাইমিয়া এ বিষয়ে যে উত্তর দিয়েছেন এবং মাসয়ালা  উদ্ভাবন করেছেন তার কতিপয় নিম্নরূপ  নারী নিজেকে হেফাজত করবে, যেমনটা পুরুষের বেলায় আবশ্যক নয়। আর এ কারণেই পর্দাকে নারীর সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তার সাথে সাথে সৌন্দর্যের প্রকাশ ও অবাধ চলাফেরা পরিহার করতে বলা হয়েছে।

শরীরকে পোশাক দ্বারা ঢেকে রাখা এবং স্বাভাবিকভাবে গৃহে অবস্থান করা নারীর দায়িত্ব । নারীর খোলামেলা চলাফেরার কারণে ফিতনা বা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তাদের পরিচালক হলো পুরুষ জাতি। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন

হে রাসূল (সা) আপনি মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের চক্ষুদ্বয়কে অবনমিত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। এটা তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র --- হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সকলে আল্লাহ তায়ালার কাছে তওবা কর। তোমরা অবশ্যই সফলকাম হবে। ( সূরা নূর - ৩০-৩১)

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম নারী-পুরুষ সকলকে তাঁর কাছে তওবা করার নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে চক্ষুদ্বয়কে অবনমিত এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজতের নির্দেশ দান করেছেন।

নারীদেরকে বিশেষভাবে পর্দার আদেশ দিয়ে বলা হয়েছে যে তারা স্বীয় সৌন্দর্যকে কেবল তাদের স্বামী এবং আয়াতে বর্ণিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য কারো  সামনে প্রকাশ করবে না। আর বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে যা কিছু প্রকাশ করা হবে তাতে কোন অপরাধ নেই। এ ব্যাপারে অন্য কোন  নিষেধাজ্ঞা না আসার কারণে তা প্রকাশ করতে কোন অসুবিধা নেই। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা) উক্ত মত প্রকাশ করেছেন। এটি ইমাম আহমাদ (রহ) এর প্রসিদ্ধ মাজহাব।

হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় বাহ্যিক সৌন্দর্যের আওতাভুক্ত। এটি ইমাম আহমাদ (রহ) এর দ্বিতীয় মত। ইমাম শাফেয়ী (রহ) সহ অন্যান্য ইমামগণ এ মতের অনুসারী।

আল্লাহতায়ালা নারীদেরকে তাদের দেহাবয়বের উপর চাদর ঝুলিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশের হিকমত হলো  চাদর ঝুলিয়ে দিলে তাদেরকে কেউ চিনতে পারে না এবং কেউ কষ্টও দিতে পারে না। একথা উপরে প্রদত্ত প্রথম মতের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ। হযরত উবাইদা আল-সালমানী বলেন  মুসলিম নারীরা মাথার উপর দিয়ে তাদের শরীরের উপর চাদর এমনভাবে ঝুলিয়ে দিত যে পথ চলার রাস্তা দেখার জন্য চোখ ছাড়া অন্য কিছু দেখা যেত না।

সহীহ আল-বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, মুহরিম নারীকে হাতমোজা ও নিকাব পরিধান করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। একথা প্রমাণ করে যে, হাত মোজা ও নিকাব কেবল গায়র মুহরিম নারীরা-ই পরিধান করত। যার কারণে তাদের মুখমণ্ডল ও হাতের পর্দা করতে হতো।

আল্লাহতায়ালা নারীদেরকে এমনভাবে পথ চলতে নিষেধ করেছেন, যাতে পথ চলার আওয়াজে কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে তাদের গোপন সৌন্দর্য সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। আল্লাহ বলেন  তাঁরা যেন নিজেদের গোপন সাজ-স্বজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। তারা যেন নিজেদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। (সুরা আন-নুর)

উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মুসলিম নারীরা ওড়না পরতে শুরু করেন। তারা ওড়নাকে দুভাগে ভাঁজ করে গলার দুদিকে ঝুলিয়ে দেন। তারপর নারীদেরকে ঘর থেকে বাহিরে যাওয়ার সময় বড় চাদর পরিধান করার আদেশ দেওয়া হয়। ঘরের অভ্যন্তরে অবস্থানকালে এরূপ বড় চাদর পরিধান করার ব্যাপারে শরয়ী কোন নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) হযরত সাফিয়্যাহ (রা) কে নিজ গৃহে তুলে আনার পর সাহাবীগণ বললেন  যদি তাঁর উপর পর্দা ফরজ করা হয় তবে উম্মুল মুমনীন হওয়ার সম্মানার্থে করা হবে। আর না করা হলে তিনি মালিকানাধীন  দাসী হিসেবে থাকবেন। অতঃপর তাঁর উপর পর্দা ফরজ করা হয়।

নারীর মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় যাতে দেখা না যায়, একারণেই পর্দার বিধান ফরজ করা হয়েছে।

পর্দা স্বাধীনা বালেগ নারীর উপর ফরজ। দাসীর উপর ফরজ নয়। রাসূল (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের জমানায় এ রীতি ও নীতিই জারি ছিল। স্বাধীনা নারীরা পর্দা করত আর দাসীরা পর্দা না করে চলাফেরা করত। একজন দাসীকে ওড়না পরা অবস্থায় দেখে হযরত উমার (রা) প্রহার করেন এবং বলেন  আরে গাধী! তুই কি স্বাধীনা নারীদের অনুরূপ হতে চাস ? তাই দাসীর মাথা, মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় উন্মুক্ত থাকবে।

আল্লাহ বলেন   বৃদ্ধ নারী যারা বিবাহের আসা রাখে না যদি  তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের বস্ত্র খুলে রাখে, তবে তাদের জন্যে দোষ নেই, তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্যে উত্তম । ( সূরা আন- নুর-৬০)

তাই যে সকল বৃদ্ধ নারী বিবাহের আশা রাখে না তাদের বস্ত্র খুলে রাখার ব্যাপারে শিথিলতা আরোপ করা হয়েছে। তারা নিজেদের উপর বড় চাদর পরিয়ে দিবে না এবং       পর্দাও করবে না। তাদের থেকে ফিতনার আশংকা দূরীভূত হওয়ার কারণে তারা স্বাধীনা নারী থেকে ব্যতিক্রম, যা তাদের ভিন্ন অন্য নারীদের মাঝে বিদ্যমান। অনুরূপভাবে  হাবাগোবা ব্যক্তিদের সামনেও সৌন্দর্য প্রকাশ এর ব্যতিক্রম।

তবে মুসলমানগণ তাদের থেকে ফিতনার আশংকা করলে তাদের বড় চাদর পরিধান ও পর্দা করা আবশ্যক। তার সাথে সাথে তাদের থেকে চোখকে অবনমিত করতে হবে।

দাসদাসীর দিকে দৃষ্টিদানের বৈধতা, তাদের পর্দা না করা এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কুরআন- সুন্নাহর কোথাও উল্লেখ নেই। তবে কুরআনে স্বাধীনা নারীর ব্যাপারে যে নির্দেশ এসেছে দাসীর ক্ষেত্রে তা আসেনি। আর হাদিসে রাসূল (সা) স্বাধীনা নারী ও তাদের মাঝে কিছু কাজের মাধ্যমে পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। তবে সাধারণভাবে তাদের ও স্বাধীনা নারীদের মাঝে পার্থক্য করা হয়নি। মুসলিম পুরুষদের থেকে দাসীরা নয় বরং স্বাধীনা নারীরা পর্দা করবে, এটা ছিল তাদের রীতি ও নীতি অভ্যাস।

আল-কুরআন বৃদ্ধ স্বাধীনা নারীদেরকে এ হুকুম থেকে বাদ দিয়েছে। তাই তাদের উপর পর্দার বিধান আবশ্যক করেনি। তার পাশাপাশি হাবাগোবা নির্বোধ ব্যক্তিদেরকে এ হুকুম থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এদের ও তাদের মধ্যে যৌন কামনার অনুপস্থিতির কারণে তাদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের ব্যাপারে শরয়ী কোন বিধি- নিষেধ নেই। এ দুশ্রেণীর লোকদের হুকুম থেকে এমন কতক দাসীকে বাদ দেয়া শ্রেয়, যাদের পর্দা না করা এবং সৌন্দর্য প্রকাশের কারণে ফেতনার প্রবল আশংকা রয়েছে। অনুরূপভাবে নারীদের স্বামীদের সন্তান ও সন্তানতুল্য যাদের মধ্যে যৌন কামনা ও প্রেমানুভূতি রয়েছে, তাদের সামনেও গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করা জায়েয হবে না। হযরত উমার (রা) দাসীর ব্যাপারে যা বলেছেন তা তৎসময়ের রীতিনীতি ও অভ্যাসের উপর ভিত্তি করে বলেছেন। আর যখন কোন কিছু তার স্বভাব ও রীতি নীতি থেকে বের হয়ে যায় তখন তা তার মতাদর্শ নিয়ে বের হয়ে যায়। দাসীর খোলামেলা চলাফেরা ও তার দিকে দৃষ্টি দেয়ার কারণে ফিতনার উদ্রেক হলে তার অবাধ চলাফেরা ও তার দিকে দৃষ্টি দেয়া নিষিদ্ধ।

এমনিভাবে যদি কোন পুরুষ অন্য পুরুষের দিকে কিংবা কোন নারী অন্য নারীর  দিকে দৃষ্টি দিলে ফিতনার আশংকা দেখা দেয় তবে তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া আবশ্যক। সুদর্শন বালক ও সুন্দরী দাসীর দিকে  দৃষ্টি দিলে ফিতনার আশংকা থাকলে তাদের ব্যাপারেও পূর্বের ন্যায় একই হুকুম বর্তাবে।

ইমাম-আল মারুজী আহমদ ইব্ন হাম্বল (রহ) কে বললেন  কোন মনিব তার গোলামের দিকে তাকালে কি কোন অপরাধ হবে ? ইব্ন হাম্বল বললেনঃ ফিতনার আশংকা দেখা দিলে তার দিকে তাকানো যাবে না। এমন  অনেক দৃষ্টি আছে যা দৃষ্টিপাতকারীর হৃদয়ে ফিতনার উদ্রেক করে।

ইমাম আল মারুজী পুনরায় ইব্ন হাম্বলকে বললেন  এক ব্যক্তি তওবা করে বললো পিঠে চাবুক মেরে আমাকে কেউ অপরাধে বাধ্য করতে চাইলেও আমি অপরাধে লিপ্ত হব না। তবে আমি অন্যের দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারব না। ইব্ন হাম্বল বললেন  এটা কোন ধরনের তওবা? হযরত জারীর (রা) বলেনঃ আমি রাসূল (সা) কে আকস্মিক দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। রাসূল (সা) বললেন  তোমার দৃষ্টিকে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিবে।

হযরত ইবন আবু দুনিয়া বলেন  আমার বাবা ও সুওয়াইদ, ইব্রাহিম ইবন হিরাছাহ থেকে, তিনি উসমান ইব্ন সালিহ থেকে, তিনি হাসান ইব্ন যাকওয়ান থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন  তোমরা বিত্তবানদের বালক সন্তানদের সাথে উঠাবসা করিও না। কারণ তাদের চেহারা নারীদের চেহারা সদৃশ। তারা কুমারী মেয়ের থেকেও অধিক ভয়ানক। এই যুক্তি-প্রমাণ ও হুশিয়ারী সংকেত ক্রমান্বয়ে নীচু শ্রেণী থেকে উঁচু শ্রেণীর মানুষের দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তারপর বলেন  নারী অন্য নারী থেকে এবং একইভাবে নারী তার মুহরিম ব্যক্তিদের থেকে যেমন  তার স্বামীর পুত্র সন্তান, নিজের ছেলে, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে এবং তার অধিনস্ত দাস থেকে পর্দা করবে, যখন তাদের থেকে তার কিংবা তার থেকে তাদের ফিতনার আশংকা দেখা দেয়। এ অবস্থায় পরস্পর পরস্পর থেকে পর্দা করা ওয়াজিব।

আল্লাহ তায়ালা এসকল অবস্থায় ফিতনার সম্ভাবনা থাকার কারণে পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন  এটা (পর্দা করা) তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র। কাদাচিৎ এটা ছাড়াও পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জিত হতে পারে। তবে এটা অতিপবিত্র।

অন্যের প্রতি দৃষ্টিপাত ও খোলামেলা চলাফেরার কারণে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতায় বিঘœতা ঘটে। নারীর খোলামেলা চলাফেরার কারণে অন্তরের মধ্যে কামনা বাসনা জাগ্রত হয়। অন্যদিকে দৃষ্টিপাতে রয়েছে জৈবিক স্বাদ। তাই অন্যের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে পর্দার বিধান মেনে নেয়া আবশ্যকীয়ভাবে উত্তম কাজ। ইমাম মুসলিম (রহ) ছাড়া অন্যান্য হাদিসবিশারদদের থেকে বর্ণিত, নবী (সা) নারী সুলভ পুরুষ এবং পুরুষের ন্যায় আচরণকারী নারীকে অভিসম্পাত দিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেন  তাদেরকে তোমাদের গৃহ থেকে বের করে দাও এবং অমুক অমুককে বের করে দাও। অর্থাৎ নারী স্বভাবের পুরুষদেরকে। কারো মতে, রাসূল (সা) এর জমানায় বাঈম, হাইত এবং সতি নামক তিন শ্রেণীর মুখান্নাস ছিল। তবে তাদের প্রতি মারাত্মক অশ্লীলতার অপবাদ দেয়া হয়নি। তাদেরকে কয়েকটি কারণে নারীসুলভ পুরুষ ও স্ত্রী লিঙ্গরূপে ব্যবহার করা হয়।

প্রথমতঃ তারা নারী কণ্ঠী। তাদের কথা নারীর কথার ন্যায় কোমল।

দ্বিতীয়তঃ নারীর ন্যায় তারা হাতে পায়ে রঙ লাগায়।

তৃতীয়ত  তাদের স্তন নারীর স্তনের ন্যায়।

হযরত ইয়াসার আল কোরাশী আবু হাশিমের বরাত দিয়ে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেন হাতে পায়ে মেহেদী রং মাখা এক মুখান্নাসকে রাসূল (সা) এর দরবারে আনা হলো। তিনি বললেন, এই লোকটির কি হয়েছে ? বলা হলো  হে আল্লাহর  রাসূল!  সে তো নারী সদৃশ। তারপর রাসূল (সা) তাকে নাকী নামক স্থানে নির্বাসনের নির্দেশ দেন। বলা হলো  হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাকে হত্যা করব ? রাসূল (সা) বললেন  আমি মুসল্লীদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছি।

রাসূল (সা) এমন সব লোকদেরকে বাড়ী থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ এই প্রকৃতির লোকেরা পুরুষদেরকে তাদের সাথে যৌন সম্ভোগের অনুমতি দেয়। তারা তাদের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে এবং তাদের সাথে মারাত্মক অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই মুসলিম সমাজ থেকে এসকল লোকদের বের করে দেওয়া এবং তাদেরকে নির্বাসিত করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই মুখান্নাস ক্ষতিকর। তারা নারী-পুরুষের মাঝে গোলযোগ সৃষ্টি করে। কারণ তারা দেখতে নারী আকৃতির। নারীরা তাদের সাথে মেলামেশা ও উঠাবসা করে তার থেকে অনেক কিছু শিখে। এই নারী বেশী পুরুষরা নারীদের চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে পুরুষদের তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে তারা নারীদের থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। এ সকল মুখান্নাসরা কোন নারীকে দেখলে পুরুষ সেজে বসে। কারণ তাদের চেহারার সাথে পুরুষদের চেহারার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। এভাবে তারা দুশ্রেণীর লোকদের সাথে উঠা-বসা, চলাফেরা ও মেলামেশা করে এবং নারী-পুরুষ উভয়ের সাথে যৌন মিলনের কামনা করে।

আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা চোখকে অবনমিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।                                                                                                                                                                                                                                          দৃষ্টি দুধরনের  লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টি দেয়া থেকে চোখকে হেফাজত করা। দ্বিতীয়ত  কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তির স্থানসমূহ থেকে দৃষ্টি অবনমিত রাখা।      

প্রথম অবস্থাঃ কোন ব্যক্তির দৃষ্টিকে অপর ব্যক্তির লজ্জাস্থানের দিকে দেওয়া থেকে অবনমিত রাখা। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেনঃ পুরুষ অন্য পুরুষ কিংবা নারী অন্য নারীর লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টি দিবে না।

লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা ফরজ। রাসূল (সা) মুয়াবিয়া ইবন হাইদাহ (রা) কে বলেন  তুমি তোমার স্ত্রী ও তোমার অধিনস্ত দাসী ছাড়া অন্যদের থেকে লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে। বললাম  যখন আমাদের কেউ তার সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে থাকে? তিনি (সা) বললেন  যদি কেউ কারো লজ্জাস্থান দেখতে না পায় তবে তা কাউকে দেখানো যাবে না।

আমি বললাম  যখন আমাদের কেহ নগ্ন থাকে ? রাসূল (সা) বললেন, মানুষের চাইতে তার উচিত আল্লাহকে অধিক লজ্জা করা। প্রয়োজনে লজ্জাস্থান প্রকাশ করা জায়েয। মলমূত্র ত্যাগের সময় যেমনটা করা হয়। আর এ কারণে যখন কেউ একাকী গোসল করবে এবং শরীর ঢাকার মতো কাপড়-চোপড় থাকবে, তারপরও সে ইচ্ছা করলে নগ্ন হয়ে গোসল করতে পারবে। যেভাবে মুসা ও আইয়ুব (রা) উলঙ্গ হয়ে গোসল করেছিলেন। অনুরূপভাবে মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (সা) এর গোসল এবং হযরত মাইমুনা (রা) এর হাদিসে বর্ণিত রাসূল (সা) এর গোসল।

আর দ্বিতীয় প্রকারের নজর যেমন-গায়র মুহরিম নারীর গোপন সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টিপাত। এতে রয়েছে প্রথমটির থেকেও মারাতœক অপরাধ। যেভাবে মদ্যপান করা, মৃৃতুপ্রাণী, রক্ত এবং শুকরের মাংস খাওয়া থেকে মারাত্মক। আর একারণে মদ পানকারীর জন্য শরীয়াত নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে।

উল্লেখিত হারাম বস্তুসমূহ কেউ হালাল মনে করে ভক্ষণ করলে তার জন্য শরীয়তে তামীর বা  নিবর্তন মূলক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ মানুষের প্রবৃত্তি যেভাবে মদ পান করতে চায় সেভাবে উক্ত বস্তুগুলোর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। তেমনি ভাবে নারীর দিকে যেভাবে দৃষ্টিপাত করতে চায় সেভাবে পুরুষের সতরের দিকে করতে চায় না। উল্লেখ্য শ্মশ্রবিহীন পুরুষের দিকে যৌনতার দৃষ্টিতে তাকানো এরই অন্তর্গত।

আলিমগণ উক্ত কাজ হারাম হবার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। যেমন তারা একমত হয়েছেন দূর সম্পর্কের ও মুহরিম নারীর দিকে যৌনতার দৃষ্টিতে তাকানো হারাম হবার ব্যাপারে। তারা বলেছেন, এ ধরনের দৃষ্টি কয়েক প্রকারঃ

একঃ যৌনতার দৃষ্টি যা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম

দুইঃ যেখানে যৌনতার কোন রকম সম্ভাবনা নেই। যেমন আল্লাহ ভীরু ব্যক্তির তার সুদর্শন পুত্র কন্যা ও সুন্দরী মায়ের দিকে তাকানো। একমাত্র জঘন্য প্রকৃতির পাপাচারী ছাড়া এক্ষেত্রে যৌনতা থাকতে পারে না। যদি যৌনতার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে তাকানো হারাম হবে।

তবে এমন অনেক লোক রয়েছেন যারা শ্মশ্রবিহীন পুরুষের দিকে নজর দিলে হৃদয়ে কৃপ্রবৃত্তি জাগ্রত হয় না। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম। অনুরূপভাবে ঐ সকল লোক যারা এ কুকর্ম সম্পর্কে অবগত নয়। কারণ এই সকল ব্যক্তির কেউই তার ছেলে ও পাড়া-পড়শীর ছেলে কিংবা অপরিচিত বালকের দিকে তার দৃষ্টি দেয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার তারতম্য করে না। তার হৃদয়ে সামান্যতম খারাপ কামনা -বাসনা জাগ্রত হয় না। কারণ সে এতে অভ্যস্ত নয়। এ দিক থেকে সে স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী।

সাহাবায়ে কেরামের যুগে দাসীরা মাথা উন্মুক্ত রেখে পথ চলত এবং স্বচ্ছ হৃদয় নিয়েই পুরুষদের সেবা-যতেœ রত থাকত। তুর্কী সুন্দরী দাসীরা যদি বর্তমান যুগে পূর্ববর্তী যুগের দাসীদের ন্যায় পুরুষদের মাঝে রাস্তায় চলাফেরা করত, তবে নিশ্চিতভাবে তাতে ফিতনার সৃষ্টি হত।

অনুরূপভাবে শ্মশ্রহীন সুদর্শন পুরুষেরা প্রয়োজন ছাড়া এমন স্থান বা অলি-গলি দিয়ে চলাফেরা করবে না যাতে তাদের কারণে ফিতনার আশংকা দেখা দেয়। তাই শ্মশ্রহীন সুদর্শন পুরুষ খোলামেলা চলাফেরা, অপরিচিত বা গায়র মুহরিমের সাথে গোসল খানায়

অবস্থান, পুরুষদের সাথে নাচের আসরে উপবেশন এবং এমন সব কাজে জড়িয়ে পড়বে না, যাতে সে মানুষের জন্য ফিতনা হয়ে দাড়ায়।

এই হারাম বস্তুগুলোকে হালাল মনে করে ভক্ষণ করলে তার উপর শরয়ী শাস্তি আরোপিত হবে। মদের ন্যায় এই বস্তুগুলো ভক্ষণ মানুষের কামনা-বাসনা জাগ্রত হয় না। একইভাবে পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে কামুক দৃষ্টি নারীর এবং শ্মশ্রহীন সুদর্শন পুরুষের দিকে কামুকদৃষ্টি দেওয়া থেকে মারাত্মক নয়।

আলেমগণের সর্বসম্মতক্রমে এসকল কার্মকাণ্ড হারাম। গায়র মুহরিম নারীর দিকে কামুক দৃষ্টির পাশাপাশি মুহরিম নারীর দিকে কামুক দৃষ্টিপাতকেও হারাম সাব্যস্ত করেছেন। তবে তারা শ্মশ্রহীন সুদর্শন পুরুষের দিকে দৃষ্টিদানের ব্যাপারে তিন ধরনের শরয়ী বিধানের কথা উল্লেখ করেছেনঃ

প্রথমতঃ কামনা-বাসনার সাথে তার দিকে দৃষ্টি দেয়া সর্বসম্মতক্রমে হারাম।

দ্বিতীয়তঃ এমন দৃষ্টি যা নিশ্চিতভাবে কোন কামনা-বাসনাকে জাগ্রত করে না। যেমন-সুদর্শন ছেলে-মেয়ে ও মায়ের প্রতি আল্লাহভীরু ব্যক্তির দৃষ্টিপাত। এ ধরণের দৃষ্টিতে কোন প্রকার কামনা-বাসনাকে জাগ্রত করে না, যদি না দৃষ্টিদাতা অত্যধিক পাপী না হয়। তবে এরূপ দৃষ্টির ক্ষেত্রে কামনা-বাসনা সৃষ্টি হলে তাও হারাম হয়ে যাবে।

দৃষ্টিপাত বিষয়ক তৃতীয় প্রকার সম্পর্কে আলেমদের মাঝে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। আর তা হলো, কু-প্রবৃত্তি বা কামনা-বাসনা ব্যতীত তার দিকে নজর দেওয়া। যদি দৃষ্টিপাতের মধ্যে (জৈবিক) উত্তেজনার সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে, তবে সে ব্যাপারে হাম্বলী মাজহাবে দুটি বক্তব্য রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত, যা ইমাম শাফেয়ী ও অন্যান্য ইমামদের থেকে বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো  এরূপ দৃষ্টি দেওয়া জায়েয নেই। আর দ্বিতীয় বক্তব্য হলোঃ এরূপ অবস্থায় দৃষ্টি দেওয়া জায়েয। কারণ মৌলিকভাবে এ দৃষ্টিদানের মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় না। তাই সন্দেহের দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয় না। তবে কখনো কখনো এরূপ দৃষ্টি নিন্দনীয় হতে পারে।

অনুরূপভাবে প্রয়োজন ছাড়া অপরিচিত বা গায়র মুহরিম ব্যক্তির দিকে তাকানো জায়েয নেই। এটি শাফেরী ও হাম্বলী মাজহাবের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত। যদিও তাতে কামনা-বাসনা অনুপস্থিত। তবে কু-প্রবৃত্তি জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে গায়র মুহরিম বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে নির্জন বাসকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। কারণ এটা ফিতনার স্থান। মোদ্দাকথা  হলো যা ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাই নাজায়েয। ফিতনার পথ অবলম্বনের মধ্যে যদি কোন গ্রহণযোগ্য কল্যাণ না থাকে তবে তাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ওয়াজিব।

এই কারণে যেই দৃষ্টি মানুষকে ফিতনার দিকে ধাবিত করে সেটাকেও হারাম করা হয়েছে। তবে বিশেষ প্রয়োজনের তাগিদে তা জায়েয। যেমন-বিয়ের প্রস্তাবকারী কর্তৃক প্রস্তাবকারিনী ও ডাক্তার কর্তৃক রোগীদের দিকে দৃষ্টিপাত, প্রয়োজনের তাগিদেই তাদের  নজর দেওয়া শরীয়াত সম্মত। তবে কামনা-বাসনা ব্যতীত। ফিতনার সৃষ্টি হয় এমন স্থানের দিকে প্রয়োজন ছাড়া তাকানো জায়েয নেই।

মানুষ আবশ্যকীয়ভাবে চোখ খুলে রাখে এবং তা দ্বারা দৃষ্টি দেয়। কখনো কখনো মানুষ আকস্মিক ভাবে উদ্দেশ্য ছাড়া এমন কিছুর দিকে দৃষ্টি দেয় যার থেকে দৃষ্টিকে স্বাভাবিকভাবে অবনমিত করা যায় না। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে দৃষ্টি অবনমিত রাখার

আদেশ দেন। এমনিভাবে হযরত লোকমান তদ্বীয় পুত্রকে কণ্ঠস্বর নিচু করার আদেশ দিয়েছিলেন।

আর আল্লাহর বাণী নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে তাদের কণ্ঠস্বরকে নিচু রাখে (আল-হুজুরাত-৩), উক্ত আয়াতে রাসূল (সা) এর সামনে কণ্ঠস্বর নিচু করার কারণে স্বাভাবিক ভাবে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। তারা এরূপ করার ব্যাপারে আদিষ্টও ছিল। কারণ তাঁর সামনে কণ্ঠস্বর উচু করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। রাসূল (সা) এর সামনে কণ্ঠস্বর নিচু করে কথা বলাটা ছিল বিশেষ ধরণের অবনমিতকরণ, যা প্রশংসার দাবী রাখে। স্বাভাবিকভাবে মানুষ সব সময় কণ্ঠস্বরকে নিচু করে কথা বলতে পারে। যদিও তারা এ বিষয়ে আদিষ্ট নয়। বরং কিছু স্থানে কণ্ঠস্বরকে উঁচু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ কারণে তিনি বলেছেন, “তোমার কণ্ঠস্বরকে নিচু কর (লুকমান-১৯)।

হৃদয়ের মধ্যে যা প্রবেশ করে আর যা বের হয়ে আসে তার সমন্বয়কারী হলো দৃষ্টি ও কণ্ঠস্বর। শ্রবণের মাধ্যমে তা হৃদয়ে প্রবেশ করে এবং ধ্বনির মাধ্যমে যেখান থেকে বের হয়ে আসে। উক্ত অঙ্গ দুটির কথা মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যে একসাথে তুলে ধরা হয়েছে। আমি কি তার জন্য দুটি চোখ, জিহবা, এবং দুটি ঠোঁট তৈরি করিনি। (আল-বালাদ ৮,৯)। চোখ ও দৃষ্টির মাধ্যমে হৃদয় যাবতীয় বস্তুর পরিচয় লাভ করে। জিহবা ও ধ্বনি হৃদয়ে গচ্ছিত সবকিছু বের করে নিয়ে আসে। দৃষ্টি হলো হৃদয়ের পরিচালক, তার সংবাদবাহক ও গোয়েন্দা। অন্যদিকে কণ্ঠস্বর হলো হৃদয়ের ভাষ্যকার।

অতঃপর আল্লাহ বলেন  এটা (পর্দা বিধান) তোমাদের জন্য অতি পবিত্র (সূরা আন নূর-৩০)। আপনি তাদের থেকে জাকাত গ্রহণ করতঃ তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন (সূরা আত তাওবা-১০৩)। আল্লাহ কেবল  চাচ্ছেন তোমরা আহলে বাইতের থেকে পংকিলতাকে দূর করতে এবং তোমাদেরকে উত্তমরূপে পবিত্র করতে (সূরা আল-আহযাব-৩৩)। অনুমতি প্রার্থনা সংক্রান্ত আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমাদেরকে (পুরুষদেরকে)  ফিরে যেতে বলা হয় তবে ফিরে যাও। এটাই তোমাদের জন্য অধিক পবিত্রতম কাজ (সূরা-আন নূর-২৮)। অতঃপর পর্দার আড়াল থেকে তোমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর। এটা তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র (সূরা আল আহযাব-৫৩)। তোমরা রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলতে চাইলে তার পূর্বে তাঁকে সাদকা প্রদান কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর ও অধিক পবিত্র।   (সূরা আল মুযাদালা-১২)

রাসূল (সা) বলেছেন  হে আল্লাহ ! তুমি আমার হৃদয় থেকে যাবতীয় পাপ পানি, বরফ ও ঠাণ্ডা দ্বারা পবিত্র করে দাও। তিনি (সা) জানাযার দোআয় বলেছেনঃ তুমি তাকে পানি বরফ এবং ঠান্ডা দ্বারা গোসল দিয়ে দাও এবং তাকে পাপরাশি  থেকে পরিশুদ্ধ কর। যেভাবে সাদা কাপড়কে ধুলা-ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়।

অতএব তাহারাত হলো যাবতীয় পাপ-পংকিলতা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা।  অন্যদিকে যাকাত একাধিক অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে। যথাঃ তাহারাত, যার মানে হলো পাপ না থাকা।  সৎ কার্যাদি সম্পাদন অর্থে-বৃদ্ধি যেমনঃ ক্ষমা, রহমত ও শাস্তি থেকে মুক্তি, প্রতিদান প্রাপ্তির মাধ্যমে সফলকাম এবং কল্যাণকর কার্য সম্পাদন ও অকল্যাণকর কার্য পরিহার।

আর আকস্মিক দৃষ্টির অপরাধ ক্ষমাযোগ্য, যখন দৃষ্টিপাতকারী দৃষ্টিকে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে নিবে। হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা) কে আকস্মিক দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, দৃষ্টিকে ফিরিয়ে নিবে। আবুদাউদ শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) হযরত আলী (রা) কে বলেছেন  হে আলী! তুমি একবার দৃষ্টি দেওয়ার পর পুনরায় দৃষ্টি দিবে না। শুধু প্রথমবার দৃষ্টি দিতে পারবে। দ্বিতীয় বার দৃষ্টি দেওয়ার অধিকার তোমার নাই। মুসনাদে ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থ সমূহে বর্ণিত আছে  নজর দেওয়া হলো শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের একটি তীর। উক্ত গ্রন্থে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কোন নারীর সৌন্দর্যের দিকে তাকানোর পরপরই চোখকে অন্যদিকে ফিরিয়ে নিবে, আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরে ইবাদাতের স্বাদ পয়দা করে দিবেন। উক্ত স্বাদ সে কিয়ামত পর্যন্ত আস্বাদন করবে।

একারণে বলা হয়  নিষিদ্ধ দৃশ্যবালী থেকে চোখকে অবনমিত রাখলে, যেমন নারী ও শ্মশ্রবিহীন সুদর্শন পুরুষের দিকে নজর দেওয়া থেকে দৃষ্টিকে অবনমিত রাখলে তিন প্রকারের অতি মার্যাদাপূর্ণ ফায়দা পাওয়া যায়। সেগুলো হলো

প্রথমত  ঈমানের সুখ-স্বাদ আস্বাদন করা। যা আল্লাহ প্রদত্ত যাবতীয় নিয়ামতের মধ্যে অধিক সুস্বাদু ও পূত-পবিত্র। যে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য কিছু বর্জন করে আল্লাহ তাকে অতি উত্তম বিনিময় দ্বারা তার প্রতিদান দেন।

দ্বিতীয় উপকারিতা  নিষিদ্ধ দৃশ্যাবলী থেকে চোখকে অবনমিতকারী আত্মিক নূর ও অর্ন্তদৃষ্টির আলোর অধিকারী হয়। আল্লাহপাক কাওমে লুত সম্পর্কে বলেন  

আপনার জীবনের শপথ! নিশ্চয়ই তারা তাদের নেশাগস্ততার মধ্যে অস্থির হয়ে  বিচরণ করছে (আল-হিজর)। ছবি সংশ্লিষ্ট যা কিছু আছে তা মানুষের বিবেক-বুদ্ধিতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, দৃষ্টিকে করে অন্ধ এবং আত্মাকে করে নেশাগ্রস্ত। শুধু তাই নয়, এমনকি পাগল বানিয়ে ছাড়ে। আল্লাহ তায়ালা চক্ষু অবনমিত সংক্রান্ত আয়াতের পরে নূরের আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন  আল্লাহ আকাশসমূহ ও জমীনের জ্যোতি (সূরা আল- নূর)। হযরত শাহ শুযা আল কারমানী নামক জনৈক ব্যক্তি ছিলেন, যার অর্ন্তদৃষ্টি ভুল করত না। তিনি বলতেন - যার বাহ্যিক কাজ-কর্ম সুন্নতের অনুসরণ এবং আভ্যন্তরীণ কার্যাবলী সার্বক্ষণিক মুরাকাবা-মুশাহাদার মাধ্যমে পুর্ণতা লাভ করেছে। যে চোখকে অবনমিত রেখেছে ও নিজেকে কু-প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বিরত রেখেছে এবং হালাল খাবার ভক্ষণ করেছে (লেখকের প্রবল ধারণা মতে এটি পঞ্চম) তার অর্ন্তদৃষ্টিতে ভুল হয় না।      

আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তার কাজের ধরণ অনুযায়ী প্রতিদান দেন। তার দৃষ্টিকে করেন জ্যোতির্ময়। তার  সামনে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কাশ্ফের দ্বারকে উন্মুক্ত করে দেন। এছাড়া আরো অনেক কিছু যা তিনি অর্ন্তদৃষ্টির মাধ্যমে অর্জন করতে পারেন।

তৃতীয় উপকারিতাঃ 

আতিœক শক্তি, দৃঢ়তা ও সাহসিকতা অর্জন। আল্লাহতায়ালা তার মধ্যে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের যোগ্যতা প্রদানের সাথে সাথে দৃষ্টি ক্ষমতা ও দান করেন। কারণ যে ব্যক্তি তার নফসের বিপরীত কাজ করে শয়তান তার ছায়া থেকে বেরিয়ে পড়ে। এ কারণে ক-ুপ্রবৃত্তির অনুসারীরা আতিœক লাঞ্চনা, অপমান ও দুর্বলতায় ভোগে। আল্লাহ তায়ালা তার অবাধ্য ব্যক্তিদেরকে এরূপ অবস্থায় ফেলে দেন।

আল্লাহ তাঁর অনুগত বান্দাকে  সম্মানিত এবং অবাধ্য বান্দাকে লাঞ্চিত ও অপমানিত করেন। আল্লাহ বলেন  তারা বলে আমরা শহরে ফিরে গেলে সম্মানিত ব্যক্তিবর্গরা অপদস্থ নিচু ব্যক্তিদেরকে যেখান থেকে করে দিবে। অথচ মান-সম্মান ইজ্জত কেবল আল্লাহ, তার রাসুল ও মুমিনদের জন্যে (সুরা-মুনাফিকুন)। তিনি আরো বলেন  তোমরা দুর্বল ও চিন্তিত হয়ে পড়োনা। মুমিন হয়ে থাকলে তোমরাই শ্রেষ্ঠ ( সূরা আলে ইমরান)

তাই বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন  মানুষ রাজা বাদশাদের দারস্থ হয়ে মান-সম্মান-ইজ্জত অন্বেষণ করে। তবে তারা এ সম্মান কেবল আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের মধ্যেই খুজে পায়।

হযরত হাসান আল-বাসরী বলতেনঃ তাদেরকে গাধাগুলো ঠকঠক আওয়াজে এবং সুঠামধারী অশ্বগুলো দ্রুতবহন করে নিয়ে চলে। তা সত্ত্বে তাদের স্কদ্ধে বয়ে যায় জিল্লতীর বোঝা। আল্লাহর আবাধ্যকারীকে তিনি অপমাণিত-অপদস্থ করেন। আর আনুগত্যকারীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন।

দোয়ায় কুনুতে বলা হয়েছে: নিশ্চয়ই তুমি যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর তাকে লাঞ্চিত অপদস্থ কর না, আর যাকে শত্র হিসেবে চিহ্নিত কর তাকে সম্মানিত কর না। আর যে পাপীরা দৃষ্টিকে অবনমিত এবং স্বীয় লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে না, আল্লাহ তাদেরকে নেশাগ্রস্থ, অজ্ঞ-জাহেল, বে-আকল, পথহারা, ঘৃণিত ও হতবুদ্ধি এবং অন্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সাথে সাথে তাদেরকে দুস্কর্মা, ফাসেক , সীমালঙ্ঘনকারী, অপচয়কারী, অনিষ্টকারী, নির্লজ্জ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি কাওমে লুত সম্পর্কে বলেন  বরং তারা অজ্ঞ সম্প্রদায় (নমল-৫৫)। তিনি এদেরকে অজ্ঞতার বদগুণে বিশেষায়িত করে বলেন, আপনার জীবনের শপথ! নিশ্চয়ই তারা তাদের নেশাগ্রস্থতার মাঝে অস্থির হয়ে বিচরণ করছে। (আল-হিজর-৭২)।

তিনি বলেন  তোমাদের মধ্যে কি পথ প্রদর্শনকারী কেউ নেই ? (সূরা হুদ -৭৬)। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আমি তাদের চক্ষুসমূহকে মুছে দিয়েছি (সুরা ইয়াসিন-৬৬)। তিনি বলেন, বরং তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় (ইয়াসীন-১৯)। তিনি বলেন, অতঃপর পাপীষ্ঠদের পরিণতি কি হয়েছিল আপনি তা লক্ষ্য করুন (আরাফ-৮৪)। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই তারা ছিল অনিষ্টকারী পাপী সম্প্রদায় (আম্বিয়া-৭৬)। তিনি বলেন, তোমরা কি জৈবিক কামনা-বাসনা চরিতার্থে পুরুষদের নিকট গমন করছ, (শরীআত সম্মত) পথকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করছ এবং তোমাদের ঘৃণ্য আহবানে সাড়া দিয়েছ।

তুমি আমাকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের উপর বিজয় দান কর--তারা যে পাপাচার করত (আন-কাবুত ২৯-৩৪)। আল্লাহ বলেন, তোমাদের রবের নিকট সীমালংঘণকারীরা চিহ্নিত (আল যারিয়াত-৩৪)

শুধু এখানেই শেষ নয়। অন্যের প্রতি দৃষ্টিপাত এবং পুরুষের সাথে পুরুষের মেলামেশা কখনো কখনো মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করে। আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করে, তারা এদেরকে আল্লাহর ন্যায় ভালবাসে। (আল-বাকারা-১৬৫)

তাই বিভিন্ন অশ্লীল ছবি-দৃশ্যাবলীর প্রতি আসক্তি কেবল আল্লাহ প্রেম ও ঈমানের দুর্বলতার কারণেই হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে আজীজ মিসরের মুশরিকা স্ত্রী, মুশরিক লুত সম্প্রদায় এবং দৃঢ় সংকল্প প্রেমিক  (যে তার মাশুকের গোলাম, তার অনুগত এবং যার বাহুবন্ধনে তার হৃদয়বন্দী) সম্পর্কে এ কথা উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ তায়ালাই সর্বজ্ঞ। দরুদ ও সালাম নবী মুহাম্মদ (সা) এর উপর।

পর্দা ও বেপর্দার বিধান

আব্দুল আযীয ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন বায (রহঃ)

হে মুসলিম জাতি! তোমাদের নিকট অস্পষ্ট নয়, বর্তমান নারীদের অনেকেই সৌন্দর্য প্রদর্শন, বেপর্দা ও পুরুষদের সাথে খোলামেলা চলাফেরা এবং আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ তাদের সৌন্দর্যকে তাদের অধিকাংশই প্রকাশ করে চলছে। এই এক মহা মসীবত যা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে মহামারীর ন্যায় ব্যাপকতা লাভ করেছে।

নিঃসন্দেহে এটা এক অতি ঘৃণ্য কর্ম ও বাহ্যিক অপরাধ এবং আল্লাহর তরফ থেকে আজাব ও গজব অবতীর্ণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচ্য। কারণ এই বেপর্দা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনের কারণে একের পর এক বিভিন্ন অশ্লীলতা, অপরাধ, লজ্জাহীনতা ও ব্যাপক ফিতনা ফেসাদের সৃষ্টি হয়।

হে মুসলমানগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমাদের নির্বোধকে পাকড়াও কর এবং নারীদেরকে আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত কার্যাবলী থেকে বারণ কর। তাদের উপর পর্দাকে আবশ্যক কর এবং তাদেরকে আল্লাহর ক্রোধ ও মহা শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক কর। রাসূল (সা) বলেছেন: নিশ্চয়ই মানুষ কোন অন্যায় গর্হিত কাজ দেখে তাহার প্রতিকার না করলে আম-খাস নির্বিশেষে তাদের সকলের উপর আল্লাহর তরফ থেকে আজাব অবতীর্ণ হওয়ার আশংকা থাকে।

আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এরশাদ করেন  বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও ঈসা ইব্ন মরিয়মের মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালংঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা অবশ্যই মন্দ ছিল।       

(মায়েদা ৭৮-৭৯)

আল মুসনাদ ও অন্যান্য হাদিসের গ্রন্থসমূহে হযরত ইব্ন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) উক্ত আয়াত তিলাওয়াত শেষে বলেছেন, সেই সত্ত্বার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ। তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ দিবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, নির্বোধকে তার কার্য থেকে ফিরিয়ে রাখবে এবং সত্যের  সামনে মাথাকে সম্পূর্ণরূপে নোয়াবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের কতকের দ্বারা অপর কতককে কষ্ট দিবেন। অতঃপর তোমাদেরকে তাদের মত অভিসম্পাত দিবেন।

সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) বলেছেন  তোমাদের কেহ অন্যায় কাজ হতে দেখলে হাত দ্বারা প্রতিহত করবে। হাত দ্বারা সক্ষম না হলে মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে। মুখ দ্বারা সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে প্রতিহত করবে। অর্থাৎ কাজটিকে অন্তর থেকে ঘৃণা করবে।

আর এটি হলো সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।

আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে নারীদেরকে পর্দা ও গৃহে অবস্থানের নির্দেশ দেন এবং বিশৃঙ্খলা ও ফিতনার উপায় উপকরণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করণার্থে সৌন্দর্য প্রদর্শন ও পর পুরুষদের সাথে কোমল স্বরে কথা বলার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেন  হে নবী পতœীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে অন্য পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, সেই ব্যক্তি কু-বাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে। তোমরা গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থান করবে, মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করবে।  

(সুরা আল আহযাব ৩২-৩৩)

উল্লেখিত আয়াত দুটিতে নবীপতœী উম্মুহাতুল মুমিনীন নারী জাতির মধ্যে অতি উত্তম ও পূত পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে পরপুরুষদের সাথে নরমস্বরে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। যাতে করে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তাদের ব্যাপারে যেন তার মধ্যে জিনার কামনা-বাসনা জাগ্রত না হয়, এবং যাতে সেও এ ধারণা না করে বসে যে এ ব্যাপারে তারা তার সাথে একাত্বতা প্রকাশ করেছে। তিনি তাদেরকে গৃহে অবস্থানের নির্দেশ দেন এবং  জাহেলী যুগের ন্যায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করা থেকে নিষেধ করেন। সৌন্দর্য প্রদর্শন  মানে হলো, দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সৌন্দর্যাবলী প্রকাশ করা। যেমনঃ মাথামুখমন্ডল, গ্রীবা, বক্ষ, বাহু ও পায়ের নালা ইত্যাদি শরীরের মোহনীয় স্থানসমূহ। এতে মহাভ্রান্তি ও ব্যাপক ফিতনা-বিশৃংখলা এবং জিনার উপকরণ অনুশীলনের দিকে পুরুষদের হৃদয়কে আন্দোলিত করার কারণে আল্লাহ তায়ালা এরূপ সৌন্দর্য প্রকাশ করে চলাফেরা করতে নিষেধ করেছেন। নবীপতœীগণ উম্মুহাতুল মুমিনীন পরিপূর্ণ ঈমান ও পবিত্রতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এ সব ঘৃণ্য বিষয় থেকে সাবধান করেছেন। তাই তাদের ভিন্ন অন্য নারীদের বেলায় এই সাবধান বাণী এবং তাদের উপর ফিতনার কারণসমূহের আশংকা করা অতি উত্তমভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই ফিতনা থেকে হেফাজত করুন।

নিুোক্ত আয়াতটি নবীপতœীগণ ও অন্যান্য সকল নারীদের বেলায় সার্বিক বিধানের দিকে নির্দেশ করে। তা হলোঃ তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর। উল্লেখিত আয়াতের বিধানগুলো হলো নবীপতœী ও অন্যান্য সব নারীদের জন্য সার্বিক বিধান। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যখন তোমরা তাদের (নারী) কাছ থেকে কোন কিছু চাও তখন পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। এই আয়াতটি পুরুষদের থেকে নারীদের পর্দার আবশ্যকতার স্পষ্ট দলীল। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পর্দাকে নারী পুরুষ সকলের হৃদয়ের জন্যে অতি পবিত্রতার কারণ বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করেছেন। পর্দা অশ্লীলতা, নোংরামী ও তার উপায় উপকরণ থেকে মানুষদেরকে অনেক দূরে  রাখে। বেপর্দা ও অবাধ চলাফেরা করাকে ময়লা-আবর্জনা ও নাপাক বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে পর্দা মানে হলো শান্তি ও পবিত্রতা।

 

হে মুসলিম জাতি! তোমরা আল্লাহর শিষ্টাচারে শিষ্টাচারিত হও। তাঁর আদেশ পালন কর এবং তোমাদের স্ত্রীদের উপর হিজাবের বিধানকে আরোপ কর। এটা পালনের মধ্যেই রয়েছে পবিত্রতার উপায় উপকরণ এবং  মুক্তি ও শান্তির উছিলা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে নবী! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কণ্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে খুব কমই চেনা যাবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না । আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু -(সূরা আল-আহযাব-৫৯)।

 

আল্লাহ তায়ালা সকল মুমিন নারীদেরকে তাদের কেশরাজি ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে সকল সৌন্দর্য্যরে উপর চাদর ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এতে তারা সচ্চরিত্রবান হিসেবে পরিচয় লাভ করবে। ফলে তারা কাউকে ফিতনায় ফেলবে না এবং তারা নিজেরাও অন্যের দ্বারা ফিতনায় জড়িয়ে পড়বে না।

 

হযরত আলী ইব্ন আবি তালহা, ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন আল্লাহ তায়ালা প্রয়োজনের তাগিদেই মুমিন নারীদেরকে মাথার উপর দিয়ে বড় চাদর দ্বারা মুখমণ্ডল ঢেকে এক চোখ খোলা রেখে গৃহ থেকে বের হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

মুহাম্মদ ইব্ন শিরীন বলেন আমি আল্লাহর বাণী: তারা যেন নিজেদের উপর চাদরের এক অংশ টেনে নেয় এ সম্পর্কে উবাইদা আস সালমানীকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি স্বীয় মুখমণ্ডল ও মাথা ঢাকেন এবং বাম চোখ খোলা রাখেন।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কিত বিধি-বিধান ও সতর্ক বাণী উচ্চারণের পূর্বে যে সকল ভুল-ক্রটি হয়ে গেছে সে ব্যাপারে তার দয়া ও ক্ষমার ঘোষণা দেন।

আল্লাহ বলেন, বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের বস্ত্র খুলে রাখে, তাদের জন্যে দোষ নেই। তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বাজ্ঞ। (সূরা আন-নূর-৬০)

যে সকল বৃদ্ধা নারীরা বিবাহের কামনা করে না, এমন সব নারী সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত করেন যে, তারা সৌন্দর্য প্রদর্শন না করার শর্তে স্বীয় মুখণ্ডল ও হস্তদ্বয়ে পোশাক পরিধান না করলে পাপ হবে না। এই থেকে জানা গেল সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিণী স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়সহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে পোশাক খুলতে পারবে না যদিও সে বৃদ্ধা হউক না কেন। খুলে ফেললে গুনাহগার হবে। কারণ প্রতিটি বস্তুর সংগ্রাহক রয়েছে। যেহেতু সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিণী কর্তৃক সৌন্দর্য প্রদর্শন ফিতনার দিকে ধাবিত করে, চাই সে বৃদ্ধা হউক। এই যদি হয় বৃদ্ধা নারীর অবস্থা, তাহলে সুন্দরী-কামিনী, সম্মোহনী তরুণীর অবস্থা কিরূপ হবে, যদি সে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে চলাফেরা করে। নিঃসন্দেহে এটা একটি বড় পাপ, জঘণ্যতম্য অপরাধ এবং এর ফলে সৃষ্ট ফিতনা অত্যাধিক মারাত্মক। তবে আল্লাহ তায়ালা বৃদ্ধ নারীর ক্ষেত্রে  (পোশাক খোলার ব্যাপারে) এ শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যে, তারা অন্যান্য নারীদের মত হবে না, যারা বিবাহের কামনা  করে। নারীর বিবাহ কামনা যেহেতু তাকে সাজ-সজ্জা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনের দিকে আহ্বান করে। তাই নিজে ও অন্যকে ফিতনার কবল থেকে রক্ষা করণার্থে তার সৌন্দর্যের স্থানাবলী থেকে পোষাক খুলে ফেলার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আয়াতের শেষ দিকে এসে বৃদ্ধা নারীদেরকে মুখ ও হস্তদ্বয়ের কাপড় খোলা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এটাকে তাদের জন্যে কল্যাণকর বলে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণনা করেছেন। মহান  আল্লাহর এ বাণীর মাধ্যমে কাপড় দ্বারা পর্দা করার

ফযিলত স্পষ্টতঃই প্রতিভাত হয়েছে। এমনভাবে বৃদ্ধা নারীর জন্য হাত ও মুখমণ্ডলে পোশাক পরিধান করা কল্যাণকর। এ যদি হয় বৃদ্ধা নারীর অবস্থা, তাহলে যুবতী মেয়েদের উপর পর্দা করা এবং সৌন্দর্য প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকা অতি উত্তমভাবেই ওয়াজিব। পর্দা তাদেরকে ফিতনার উপায় উপকরণ থেকে অনেক দূরে রাখে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন  মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জ্বা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।                                              (সূরা আন নূর ৩০-৩১)

উপরোক্ত আয়াত দুটিতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম নর-নারীদেরকে চক্ষু অবনমিত ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের নির্দেশ দেন। এই নিষেধাজ্ঞা না জারি (চক্ষু অবনমিত ও লজ্জাস্থানের হেফাজত) করা হলে যিনার অশ্লীলতা ব্যাপক আকার ধারণ করত এবং এর ফলে মুসলমানদের মাঝে এক বিরাট ফাসাদ সৃষ্টি হত। কারণ দৃষ্টিপাত হলো অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হওয়া ও অন্তরের রোগব্যাধি সৃষ্টির অন্যতম একটি মাধ্যম। আর দৃষ্টি অবনমিত রাখা হলো এ সকল অপকর্ম থেকে নিরাপদের অন্যতম একটি হাতিয়ার। তাই আল্লাহ বলেছেনঃ মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।

তাই দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে একজন মুমিনের জন্য চক্ষুকে অবনমিত এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করা হলো সবচেয়ে পবিত্র বিষয়। অন্যদিকে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে চক্ষু ও লজ্জাস্থানের হেফাজত না করা হলো ধ্বংস ও আল্লাহ প্রদত্ত আজাব গযবের সম্মুখীন হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এরূপ কাজ থেকে আমরা আল্লাহর কাছে মুক্তি কামনা করছি। আল্লাহ বলেছেন মুমিনদেরকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। আল্লাহ জাল্লাহ শানুহ একথা জানিয়ে  দেন যে, মানুষ যা কিছু করছে, সে সম্পর্কে তিনি অবহিত। তাঁর কাছে বান্দার কোন কিছুই গোপন নেই। তার শরীআত থেকে বিমুখতা এবং হারাম কার্যাবলী সংঘটিত করার ব্যাপারে মুসলমানদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তিনি তাদেরকে দেখেন এবং তাদের ভালো, মন্দ সকল কর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত। আল্লাহ বলেন, চক্ষুসমূহ যা খিয়ানত করে এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তার সবকিছুই তিনি জানেন ( গাফির-১৯)। তিনি আরো বলেন, বস্তুতঃ যে কোন অবস্থাতেই তুমি থাক এবং কুরআনের যে কোন অংশ থেকেই পাঠ কর কিংবা যে কোন কাজই তোমরা কর অথচ আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ কর।             (ইউনুস: ৬১)

তাই বান্দা তার রবকে ভয় করবে। তিনি যে তার অপরাধসমূহ দেখছেন সে ব্যাপারে লজ্জিত হবে। অন্য কথায় তার উপর বর্তিত আবশ্যকীয় আনুগত্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে সে ব্যাপারে লজ্জিত হবে। অতঃপর আল্লাহ বলেন, “ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তিনি মুসলমান পুরুষদের ন্যায় নারীদেরকেও ফিতনার উপায় উপকরণ থেকে রক্ষা এবং তাদেরকে নিরাপত্তা ও সচ্চরিত্রতার উপায় অবলম্বনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশ দেন।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বলেন তাঁরা যেন যা সাধারণ ও প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। হযরত ইবন মাসউদ (রা) বলেন : পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে যা কিছু প্রকাশ পায়, এটা ক্ষমাযোগ্য । তিনি এর দ্বারা এমন পোশাক বুঝিয়েছেন যাতে কোন সৌন্দর্য প্রদর্শন ও ফিতনার আশংকা নেই।  আর ইব্ন আব্বাস (রা) এর ব্যাখ্যায় মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যাখ্যাটি পর্দার আয়াত অবতীর্ণ পূর্ববর্তী নারীদের উপর প্রযোজ্য ।

তারপর আল্লাহ তাদেরকে সমস্ত শরীর আবৃত করার নির্দেশ দেন। এ সম্পর্কিত আলোচনা সূরা আল-আহযাব ও অন্যান্য সূরার আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কথা প্রমাণিত যে আলী ইব্ন আবি তালহা, ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে যা বর্ণনা করেছেন এখানে ইব্ন আব্বাস (রা) তাই উদ্দেশ্য নিয়েছেন। ইব্ন আব্বাস বলেন : আল্লাহ তায়ালা প্রয়োজনের তাগিদেই মুসলিম নারীদেরকে মাথার উপর দিয়ে বড় চাদর দ্বারা মুখমন্ডল ঢেকে এক চোখ খোলা রেখে গৃহের বাহিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইব্ন তাইমিয়া (রহ) ও অন্যান্য সত্যানুসন্ধিৎসু এবং বিজ্ঞজনেরা এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাই সন্দেহাতীতভাবে এটাই সত্য। আর হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন  একদা হযরত আসমা বিনত আবু বকর পাতলা কাপড় পরিধান করে রাসূল (সা) এর কাছে আসলেন। রাসুল (সা) তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ও হে আসমা বিনত আবু বকর! নারী প্রাপ্ত বয়স্কা হওয়ার পর তার এই এই অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছাড়া আর কিছুই দেখা শুদ্ধ নয়। এই বলে তিনি স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ের দিকে ইংগিত করলেন। আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হযরত আয়েশা (রা)-এর উক্ত হাদিসের সনদে দুর্বলতা রয়েছে। নবী (সা) থেকে বর্ণিত হওয়ার ব্যাপারে কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই। কারণ হযরত আয়েশা থেকে খালিদ ইব্ন দুরাইক হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। অথচ দুরাইক তার থেকে হাদিসটি শুনেননি। তাই এটি মুনকাতি হাদিসের পর্যায়ভূক্ত। ইমাম আবু দাউদ (রহ) হাদীসটি বর্ণনা করে এটিকে হাদিসে মুরসাল বলেছেন। খালিদ হযরত আয়েশা (রা) এর সাক্ষাত পাননি। অন্যদিকে হাদিসটির সনদে সাঈদ ইব্ন বশীর নামক এক ব্যক্তি রয়েছে, যাকে হাদিস শাস্ত্রবিশারদগণ দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার বর্ণনাকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা যায় না। হাদিসটি দলীল হিসেবে উপস্থাপন না করার তৃতীয় কারণ হলোঃ হাদিসটি মুআন আনা সনদে কাতাদা, খালিদ ইবন দুরাইক থেকে বর্ণনা করেছেন। যা হাদীসে মুরসালের পর্যায়ে পড়ে।

জ্ঞাতব্য  মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় প্রকাশের কারণেই ফেতনা ফেসাদ সৃষ্টি হয়। আর পূর্ব উল্লেখিত আল্লাহর এই বাণীতে যখন তোমরা তাদের থেকে কোন সামগ্রী পেতে চাইলে পর্দার আড়াল থেকেই চাইবে নারীর কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পর্দার বিধান বহির্ভূত রাখা হয়নি। উক্ত আয়াতটি মুহকামাত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। তাই আয়াতটি গ্রহণ, তার উপর নির্ভর এবং এটি ভিন্ন অন্য আয়াতের বিধান রহিত করা ওয়াজিব। এই আয়াতের বিধান সাধারণভাবে নবী (সা) ও সকল মুসলিম নর-নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সূরা আন্ নূরে বৃদ্ধা নারী এবং তাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় থেকে পোশাক খোলা হারাম হওয়ার ব্যাপারে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা এদিকেই ইংগিত করে। তবে দুটি শর্তে তারা পোশাক খুলতে পারবে। শর্ত দুটি হলোঃ-

১. তাদের বিবাহের কামনা না করা

২. সৌন্দর্য প্রদর্শন না করা।

এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। উল্লেখিত আয়াতটি নারীদের বেপর্দা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন হারাম সাব্যস্তকরণের উপর একটি সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ।

এ কথা কারো অজানা নয় বর্তমান কালে নারীরা ব্যাপকভাবে সৌন্দর্য প্রদর্শন ও প্রকাশে নিবিষ্ট হচ্ছে। তাই বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও ফিতনা-ফাসাদের দিকে ধাবমান সকল প্রকারের উপায়- উপকরণের মুলোৎপাটন একান্ত জরুরী।

নারীদের সাথে পুরুষদের একাকীত্বে অবস্থান এবং মুহরিম ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্যদের সামনে বেপর্দা হয়ে চলাফেরাকে ফাসাদ সৃষ্টির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে। রাসুল (সা) বলেছেনঃ কোন পুরুষ নারীর সাথে তার (নারী) কোন মুহরিম ব্যক্তি ছাড়া একান্তে অবস্থান করবে না। রাসুল (সা) আরো বলেছেনঃ যখন কেউ কোন নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করে তখন শয়তান সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে  অবস্থান করে। রাসুল (সা) বলেছেনঃ সাবধান! সাবধান! বিবাহিত কিংবা মুহরিম ছাড়া অন্য কেউ বিবাহিত নারীর সাথে রাত যাপন করবে না। (সহীহ মুসলিম)

হে মুসলামানগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমাদের স্ত্রীদেরকে বেপর্দা, সৌন্দর্য প্রদর্শন ও প্রকাশ এবং আল্লাহর দুশমন ইয়াহুদ, নাসারা ও সকল কাফিরদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কার্যকলাপ থেকে নিষেধ কর। এগুলো আল্লাহ তাদের উপর হারাম করেছেন।

জেনে রাখ! নারীদের এ সকল কর্মকাণ্ড থেকে চুপ থাকা তাদের সাথে গুণাহে সমভাগী এবং আল্লাহর আজাব-গজবের সম্মুখীন করে দেয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই অনিষ্ট কর্ম থেকে হেফাজত করুণ।

নারীদের সাথে নির্জনে অবস্থান, তাদের কাছে গমনাগমন এবং মুহরিম না হয়ে তাদের সাথে ভ্রমনে যাওয়ার বাপারে পুরুষদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম একটি দায়িত্ব। কারণ এগুলোকেই ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টির অন্যতম উপায়-উপকরণ হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে। রাসুল (সা) বলেছেন আমার ইন্তেকালের পর আমি পুরুষদের জন্য নারী অপেক্ষা মারাত্মক কোন ফিতনা রেখে যাইনি। রাসুল (সা) বলেছেনঃ দুনিয়া সবুজ, শ্যামল ও সুস্বাদুময়। আল্লাহ তোমাদেরকে তার এ দুনিয়ার খলিফা নিয়োজিত করেছেন। তিনি তোমাদের কার্যাবলী অবলোকন করবেন। তোমরা দুনিয়া ও নারীর মোহ থেকে বেঁচে থাক। কারণ বনী ইসরাইলের মাঝে সর্বপ্রথম যে ফিতনার সৃষ্টি হয় তা নারীদের কারণেই ঘটেছিল। রাসুল (সা) বলেছেন, দুনিয়ায় অনেক পোশাক পরিহিতা নারী পরকালে উলঙ্গ অবস্থায় থাকবে। নবী করীম (সা)  বলেছেনঃ দুই শ্রেণীর জাহান্নামী, যাদেরকে কখনও আর আমাকে দেখানো হয়নিঃ পোষাক পরিহিতা উলঙ্গ নারী, যারা অন্যের কাছে গমন করে এবং যাদের কাছে অন্যেরা গমন করে --- তারা জান্নাত দেখতে পাবে না এবং জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। দ্বিতীয় হলো এমন সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় লম্বা চাবুক রয়েছে (অর্থাৎ জালিম শাসক) যারা এ চাবুক দ্বারা মানুষকে অন্যায়ভাবে প্রহার করে।

উল্লেখিত হাদিসে বেপর্দা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন, পাতলা ও ছোট্ট কাপড় পরিধান, সত্য ও স্বচ্চরিত্রতা থেকে বিচ্যুতি এবং মিথ্যা ও গর্হিত কাজের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করার ব্যাপারে চরমভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। তার সাথে সাথে মানুষ নির্যাতনকারী, জুলুমকারী ব্যক্তিদেরও ভীষণভাবে সর্তক করে দেওয়া হয়েছে। এ সকল কর্ম সম্পাদনকারীদের জান্নাত হারামের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। আমরা আল্লাহর কাছে এই গর্হিত কার্যাবলী থেকে আশ্রয় চাই।

ইহুদী, খৃষ্টান, কাফের এক কথায় অমুসলিম নারীদের সাথে অনেক মুসলিম নারীদের সাদৃশ্যতা রয়েছে। যা মুসলিম সমাজের অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। যে সকল মুসলিম নারী তাদের ন্যায় পাতলা ও শর্ট-কার্ট ড্রেস পরিধান এবং কেশরাজি ও সৌন্দর্য প্রকাশে তাদের অনুকরণ করে, তাদের সম্পর্কে রাসুল (সা) বলেছেনঃ ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের আদর্শনুরূপ কাজ করলে তাদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যায়

জ্ঞাতব্য  এই অনুকরণ, অর্ধনগ্ন শর্ট-কার্ট ড্রেস পরিধানের কারণে ফিতনা - ফ্যাসাদ ও ধর্মীয় শিথিলতা এবং নিলজ্জতার সৃষ্টি হয়।

তাই এ সকল কর্মকাণ্ড থেকে পরিপূর্ণভাবে সতর্ক থাকতে হবে। মুসলিম নারীদেরও এর থেকে কঠিনভাবে নিষেধ করতে হবে। কারণ এর পরিণতি হলো অত্যন্ত অশুভ এবং ফাসাদ হলো চরম ভয়াবহ। তাই ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের সাথে কোমল আচরণ করাও জায়েয নেই। কারণ তাদের শিক্ষা তাদের অভ্যাসের দিকে ধাবিত করে। বড় হওয়ার পর তারা সে অভ্যাস ছাড়া অন্য সব কিছুকে ঘৃণা করে। ফলে তা ভয়ানক ফিতনা-ফাসাদ ও ভয়-ভীতি ডেকে আনে, যাতে প্রাপ্ত বয়স্কা নারীরাও পতিত হয়।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় কর। তোমাদের উপর যা হারাম করা হয়েছে সে ব্যাপারে সতর্ক থাক। সততা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা কর। সত্যের ব্যাপারে পরস্পরে সদুপদেশ দাও এবং এতে ধৈর্যধারণ কর। জেনে রাখ! আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন এবং তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান দিবেন। তিনি ধৈর্যশীল, খোদাভীরু-মুত্তাকী, সৎকর্মপরায়নদের সাথে রয়েছেন। তাই তোমরা ধৈর্যধারণ কর, বিপদে-আপদে ধৈর্যশীল থাক, আল্লাহকে ভয় কর এবং সৎকর্ম সম্পাদন কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথে রয়েছেন।

নিঃসন্দেহে আমীর-ওমরাহ মন্ত্রী-মিনিষ্টার, বিচারক, জ্ঞানী-গুণী এবং বিভিন্ন সভা-সমিতি সংস্থার সদস্য ও প্রধানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অন্যদের থেকে অনেক বেশী। দেশ ও জাতির প্রতি তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য যেমন বিরাট তেমনি তাদের সত্যের ব্যাপারে চুপ থাকার কারণে যে ফিতনার সৃষ্টি হয় সেটাও মারাত্মক। তবে অন্যায় ও গর্হিত কার্যাবলী ঘৃণা করার দায়িত্ব কেবল তাদের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ দায়িত্ব সকল মুসলিম উম্মাহর। বিশেষত: তাদের নেতৃস্থানীয় ও প্রবীণ ব্যক্তিবর্গের এতে বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আরো খাস করে বলতে পারি যে, এক্ষেত্রে নারীদের অভিভাবক ও স্বামীদের রয়েছে অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারা এই সকল গর্হিত কার্যাবলীকে প্রত্যাখান করবে, এতে কঠোর হবে এবং যে এতে সহনশীলতা দেখাতে আসে তার প্রতি ইস্পাত কঠিন আচার করবে। আশা করতে পারি এই উসিলায় আল্লাহ আমাদের উপর আপিতত বালা মুছিবত উঠিয়ে নিবেন এবং আমাদেরকে ও আমাদের নারী সমাজকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।

রাসুল (সা) বলেনঃ আমার পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীর সাহায্যকারী ও সঙ্গী সাথী ছিল যারা তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করত, তাঁর নির্দেশিত পথে চলার মাধ্যমে হেদায়াত প্রাপ্ত হত। অতঃপর পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো । তারা যা বলত তা করত না এবং যা তাদেরকে করতে বলা হয়নি তা তারা করত। যারা হাত দ্বারা তাদের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে তারা মুমিন। যারা তাদের সাথে মুখ দ্বারা সংগ্রামে লিপ্ত হবে তারা মুমিন। যারা অন্তর দিয়ে তাদের সাথে সংগ্রাম করবে তারা মুমিন। তারপর সরিষাদানা পরিমাণ ঈমাণ বাকী থাকে না।

হে আল্লাহ! তুমি তোমার দ্বীনকে বিজয় কর। তোমার  কালেমাকে বুলন্দ কর। আমাদের নেতৃবৃন্দকে পরিশুদ্ধ কর। তাদের দ্বারা ফিতনা-ফাসাদ-বিশৃঙ্খলার মূল্যেৎপাটন কর। তাদের দ্বারা সত্যের বিজয় দাও। তাদের আত্মিক অবস্থাকে পরিশুদ্ধ কর। যাতে দেশ ও জাতির ইহ ও পারলৌকিক কল্যাণ নিহিত। আমাদের সবাইকে-সকল মুসলমানকে সে কাজ করার তাওফীক দাও। তুমি তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান । তুমি আমাদের প্রার্থনায় সাড়া দাও, আমাদের জন্যে তুমিই যথেষ্ট। অভিভাবক হিসেবে তুমি কতই না উত্তম। সকল শক্তি সামর্থের তুমিই আধার। তুমি সুউচ্চ, তুমিই সুমহান, এই মোর প্রার্থনা।

দরুদ ও সালাম তোমার পেয়ারা বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ (সা), তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কিরাম এবং কিয়ামত অবধি যারা সু-সম্পাদনের মাধ্যমে তাঁর দ্বীনের অনুসরণ করবে তাদের সকলের প্রতি।

অপরিচিত (গায়ের মুহরিম) পুরুষদের সাথে

মুসলিম নারীর করমর্দনের বিধান

ডঃ মুহাম্মদ তাকীউদ্দীন আল-হেলালী আল-হোসাইনী

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার, যিনি হালাল-হারাম সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। যার প্রতি রয়েছে মানুষের আসক্তি কামনা। তিনি হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম সাব্যস্ত করেছেন। তিনি হারামকৃত বস্তুকে স্থায়ীভাবেই হারাম করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ আর তোমরা এমন সব কথা বলবে না যা তোমাদের রসনা মিথ্যা বর্ণনা করে বলে এটা হালাল, এটা হারাম যাতে তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করতে পার, নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে তারা সফলকাম হয় না। স্বল্প ভোগের সামগ্রী, আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সুরা আন-নাহল ১১৬-১১৭)। দরুদ ও সালাম তোমার প্রিয় বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি যার মাধ্যমে তুমি মানব জাতিকে কুফরীর জুলমত থেকে ঈমানের আলোর দিকে নিয়ে এসেছো। তাদেরকে হালালের উপর সন্তুষ্ট থাকার নির্দেশ দিয়েছো, হালাল পথে চলার প্রতিদানের বর্ণনা  দিয়েছো। দরুদ ও সালাম তাঁর (সা) পরিবার-পরিজন ও সাহাবীদের উপর যারা সকল কর্মকাণ্ডে আমাদের আদর্শের মূর্তপ্রতীক।

অতঃপর কথা হলো, লেখক মুহাম্মদ তাকীউদ্দিন আল-হোসাইনী আল-হেলালী নিজেকে মহীয়ান গরিয়ান আল্লাহর একজন অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে উপস্থাপন করে বলেনঃ সত্য পথের লড়াকু সৈনিক, রাসূল প্রেমিক জনৈক এক ভাই আমাকে গায়র মুহরিম পুরুষদের সাথে মুসলিম নারীর করমর্দনের বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, সাধারণভাবে যাদের সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন বৈধ। তার সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আল্লাহর তাওফীক কামনা করে লেখক আলোচনা শুরু করেন।

গায়র মুহরিম নারীর শরীরের যে কোন স্থান স্পর্শ করা হারাম। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী পরবর্তী সকল উলামায়ে কেরাম একমত। এ সম্পর্কে ভারত বর্ষের এক বিষ্ময়কর কাহিনীর কথা মনে পড়ল। শেখ আব্দুল বারী আল-জাওয়াবী নামক আমার একজন ছাত্র ছিল। সে আম্মানের রাজধানী মাস্কটের অধিবাসী। হিন্দুস্থানের নদওয়াতুল ওলামা লেখনীতে আরবী সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালীন  সময়ে সে আমাকে বললো: আমার এক ভাই করাচিতে থাকেন। তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। কখনো করাচী গেলে আপনি তার বাড়ীতে থাকবেন। হোটেলে থাকার প্রয়োজন নেই। তার ভাইয়ের ঠিকানা আমাকে দিল। ঠিকানা অনুযায়ী  তাকে খুজে বের করলাম। তাকে সালাত আদায়ে যতœশীল মনে হলো। বিষয়টি আমার বেশ ভালো লাগল। তারপর গাড়ীতে চড়ে তার বাড়ীতে গেলাম। বাড়িটি ছিল বাগান বেষ্টিত এক বিশাল প্রাসাদ। বাগানে চেয়ারে বসে একাকী পত্রিকা পড়ছিলাম। অনুভব করলাম আমার সামনে কে যেন দাড়িয়ে আছে। চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম একজন পুরুষের পার্শ্বে একজন নারী বক্ষ, গ্রীবা, মাথা, বাহুদ্বয় ও পায়ের নালা উন্মুক্ত করে দাড়িয়ে আছে। করমর্দনের জন্যে মেয়ে লোকটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমার শরীরে পরিহিত লম্বা চাদরের পার্শ্বকে একহাত দ্বারা পেচিয়ে ধরে অন্য হাতটি প্রসারিত করে তার হাত মুঠ করে ধরলাম। মেয়ে লোকটি রাগান্বিত হয়ে চলে গেল। তার স্বামী আমাকে বললো: কিভাবে আপনি আমার স্ত্রীকে অপদস্থ করতে পারলেন ?

আমি বললামঃ যদি এতে অপমানের কিছু থেকে থাকে, তবে আপনিই তাকে অপমাণিত করেছেন। লোকটি বললোঃ কেন আপনি তাকে করমর্দন করা থেকে তাকে বাধা দিলেন, তার হাতে কি খোস-পাঁচড়া আছে ? বললাম: বিষয়টি  বাড়াবাড়ি করা ঠিক হবে না। গায়র মুহরিম ব্যক্তির জন্য নারীর শরীরের যে কোন স্থান স্পর্শ করা হারাম। নারীর দেহটা এমন নয় যে, তার কিছু অঙ্গ স্পর্শ করা জায়েয আর কিছু স্পর্শ করা নাজায়েয । এ নিয়ে সে আমার সাথে বাক বিতন্ডতা শুরু করে দিল। আমি সেখান থেকে চলে আসলাম।

আমার মতামতের স্বপক্ষে দলীল প্রমাণ পেশ করার আবশ্যকতা মনে করছি। এর মাধ্যমে সত্যের বিজয় এবং বাতিলের পরাজয় দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হবে।

ইমাম হাফেজ ইব্ন কাছীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে সুরা আল-মুমতাহিনা এর উল্লেখিত আয়াতের: হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তার ভাষ্য নিম্নরূপঃ সহীহ আল বুখারীতে হযরত উরওয়া হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন: রাসুল (সা) এর কাছে যে সব নারী আসতেন, তাদেরকে তিনি নিমোক্ত আয়াত দ্বারা পরীক্ষা করতেন। আয়াতটি হলোঃ- হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবেনা, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর উৎস থেকে আপন সভজাত সন্তান বলে মিথ্যাদাবী করবোনা এবং ভালো কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রাথর্না করুন। সূরা আল-মুমতাহিনা-১২    

উরওয়া হযরত আয়েশা (রা) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ নারীদের থেকে যারা এ শর্ত মেনে নিত কেবল তাদের ব্যাপারে রাসুল (সা) বলতেন, “আমি তোমার বাইআত গ্রহণ করলাম। আল্লাহর কমস! বাইআত গ্রহণ কালে কখনও তার হাত কোন নারীর হাতকে স্পর্শ করেনি। তিনি কেবল তাদের থেকে এ কথায় উপর বাইয়াত  নিতেন যে আমি এ কথার উপর তোমার কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করলাম। (সহীহ আল-বুখারী)

হযরত উমাইয়া বিনত রাক্বিক্বাহ (রা) বলেন  আনুগত্যের শপথ (বাইআত) করার জন্য আমরা কয়েকজন নারী রাসূল (সা) এর কাছে আসলাম। তিনি আমাদের বাইআত আল-কুরআনের এই আয়াত দ্বারা গ্রহণ করলেন: আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করব না। কিসের কারণে তোমরা (বাইআতে) সক্ষম হলে। আমরা বললাম: আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা) আমাদের চেয়েও অধিক দয়ালু। আমরা আরো বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আপনার সাথে করমর্দন করব না? রাসূল (সা) বললেনঃ আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না। একজন নারীর প্রতি আমার যেই কথা, একশত জন নারীর প্রতি আমার সেই কথাই।

 

হযরত সালমা বিন্ত কায়েস (রা) (রাসূল (সা) এর খালা তিনি রাসূল (সা) এর সাথে কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করেছিলেন) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি কয়েকজন আনসারী মহিলার সাথে রাসূল (সা) এর কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ (বাইআত) নেয়ার জন্য গমন করলাম। আনুগত্যের শপথ গ্রহণের জন্যে তিনি আমাদের উপর কতিপয় শর্ত জুড়ে দিলেন। তা হলো আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করব না, চুরি করব না, যিনা-ব্যভিচার করব না, সন্তান হত্যা করব না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিব না এবং ভালো কাজে তার অবাধ্য হব না। তারপর রাসূল (সা) বললেন: এবং তোমরা তোমাদের স্বীমাদের সাথে প্রতারণা করবে না। তিনি (সালমা বিনত কায়েস) বললেনঃ আমরা এ কথার উপর তার কাছে বাইআত নিলাম। অতঃপর স্ব-স্ব আবাসস্থলে নিয়ে গেলাম। আমি তাদের একজনকে বললাম: রাসূল (সা) কে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর, আমরা স্বামীদের সাথে প্রতারণা করি এ কথার মানে কি ? সালমা (রা) বললেন: সে গিয়ে রাসূল (সা) কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন: তুমি তার সম্পদ গ্রহণ কর এবং তার বিনিময়ে তাকে ছাড়া অন্যকে ভালবাস।

ইমাম আহমদ (রহ) বলেন:- আয়েশা বিনত কুদামাহ বলেন: আমি আমার মা রায়েতা বিনত সুফিয়ান আল খুযাঈয়্যা (র:) এর সাথে ছিলাম, তখন নবী (সা) মহিলাদের নিকট থেকে আনুগত্যের (বাইআত) শপথ নিচ্ছিলেন। তিনি বললেন: আমি কি তোমাদের নিকট থেকে এ বাইআত নিতে পারি না যে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, সন্তানদের হত্যা করবে না, কাউকে অপবাদ দিবে না এবং সৎকাজে অবাধ্য হবে না। তিনি (আয়েশা বিনত কুদমা) বলেন: তারা সবাই চুপ রহিল অতঃপর রাসূল (সা) বললেন: যা করতে সক্ষম তোমরা তাতে হাঁ বল। তাঁরা সবাই হাঁ বললো, আমিও তাদের সাথে হাঁ বললাম। আর মা আমাকে তালকীন দিচ্ছেন; আরে বেটি বল: যে কাজে আমার সক্ষমতা আছে তাতে হাঁ বলছি। কিন্তু অন্যান্য নারীরা যা বলছিল আমি তাই বলছিলাম। উম্মু, আতিয়্যা (রা) বলেন: আমরা রাসূল (সা) এর কাছে আনুগত্যের শপথ নিলাম। তিনি আমাদের কাছে নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন: আর তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেনা ......এবং বিলাপ করে কাঁদতে নিষেধ করলেন। আমি জনৈকা নারীর হাত ধরে (কান্না থেকে নিষেধ করলাম)। সে বলল: আমাকে অমুক সৌভাগ্যবতী করেছে। আমি তাকে প্রতিদান দিতে চাই। রাসূল (সা) তাকে কিছু বললেন না। সে বাড়ী ফিরে গেল। তারপর ফিরে এসে আনুগত্যের শপথ নিল। (সহীহ আল-বুখারী)

রাসূল (সা) ঈদের দিন নারীদের থেকে এই আনুগত্যের (বাইআত) শপথ নিতেন। সহীহ আল বুখারীতে ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি ঈদুল ফিতরের দিন রাসূল (সা), আবুবকর, মার ও উসমান (রা) এর সাথে সালাতে অংশগ্রহণ করেছি। তাদের প্রত্যেকেই খুতবার পূর্বে সালাত আদায় করেছেন। সালাত শেষে খুতবা দিতেন। খুতবা সমাপনান্তে আল্লাহর নবী মিম্বর থেকে নামলেন। তিনি স্বীয় হস্ত মোবারক দ্বারা লোকদেরকে বসাচ্ছেন আর আমি তা দেখছি। তারপর লোকদেরকে ফাঁক করে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন।             

অবশেষে বেলালকে সাথে নিয়ে নারীদের নিকট আসলেন। তারপর এই আয়াত পাঠ করলেন:

হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করবে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি  করবে না, ব্যভিচার করবে না, সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবী করবে না এবং ভালো কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু। ( সুরা আল- মুমতাহিনা -১২)

অতঃপর আয়াত পাঠ শেষে বললেন  তোমরা কি এর উপর আছ ? তাদের একজন উত্তর দিল হাঁ! হে আল্লাহর রাসূল। কিন্তু অন্যরা উত্তর দিল না। তাদের মধ্যে কে উত্তম বুঝা গেল না। রাসূল (সা) বললেন: তোমরা দান-সাদকাহ কর। রাবী বলেন: বেলাল কাপড় বিছালো আর নারীরা তাদের হাতের আংটিগুলি তাতে ফেলতে শুরু করল।

উবাদাহ ইবন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: কোন এক মজলিসে আমরা রাসূল (সা) এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন: তোমরা আমার নিকট এ কথার উপর বাইআত গ্রহণ কর যে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যিনা-ব্যভিচার করবে না, চুরি করবে না, সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। তারপর নারীদের বাইআত সম্পর্কিত আয়াতটি পাঠ করলেন। তারপর বললেন: তোমাদের যে কেউ বাইআতের অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করবে, সে আল্লাহর নিকট তার প্রতিদান পাবে। যে এর থেকে (উল্লেখিত নিষিদ্ধ কর্মকান্ড) কোন একটি করে ফেলবে, তার জন্যে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। এ শাস্তি তার কৃতকর্মের কাফফারা হবে। আর যে কেউ এসব নিষিদ্ধ কর্মকান্ড থেকে কিছু একটা করার পর আল্লাহ তা গোপন রেখেছেন, তার ফায়সালা আল্লাহর উপর ন্যাস্ত। ইচ্ছা করলে তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন। আবার শাস্তিও দিতে পারেন।

ইব্ন জারীর ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) উমার ইবন খাত্ত্বাবকে নির্দেশ দিয়ে বললেন: তুমি নারীদেরকে বলে দাও আল্লাহর রাসূল (সা) তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করার শর্তে বাইআত গ্রহণ করবেন। ছদ্মবেশে সেই নারী মজলিসে ছিল সাইয়্যেদুস সুহাদা আমীরে হামজা (রাঃ) এর বক্ষবিদীর্ণকারিনী উতবা ইবন বাবীআর কন্যা হিন্দা। সে নিজের পরিচয় গোপন করে বললো : পুরুষদের থেকে আপনি যা গ্রহণ করেননি, কিভাবে নারীদের থেকে তা গ্রহণ করবেন? রাসূল (সা) তার দিকে তাকালেন এবং উমারকে বললেন: হে উমার! তুমি তাদেরকে বলে দাও, তারা যেন চুরি না করে। হিন্দা বললো: আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই আমি আবু সুফিয়ানের সম্পদ থেকে কিছু তার অনুমতি ব্যতিত গ্রহণ করি। এ সম্পদ কি আমার জন্যে হালাল না হারাম তা আমার জানা নেই। আবু সুফিয়ান বললো: আমার সম্পদ থেকে তুমি যা খরচ করেছ আর যা বাকী আছে সবই তোমার জন্যে হালাল। একথা শুনে রাসূল (সা) হাসলেন এবং তাকে চিনে ফেললেন। অতঃপর বললেন: তারা যিনা ব্যভিচার করবে না। হিন্দা বললো: হে আল্লাহর রাসূল! স্বাধীন নারী কি নিা ব্যভিচার করতে পারে?

তিনি বললেনঃ না, আল্লাহর কসম! কখনো স্বাধীন নারী যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারেনা। রাসূল (সা) বললেনঃ তোমরা সন্তানদেরকে হত্যা করবেনা। হিন্দা বললো  আপনিতো তাদেরকে বদর যুদ্ধে হত্যা করেছেন। তাই আপনি স্পষ্ট চিন্তার মধ্যে আছেন। তিনি বললেন  তারা কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিবেনা এবং ভালো কাজে বিরোধিতা করবেনা। রাবী বলেনঃ রাসূল (সা) তাদেরকে মৃত ব্যক্তির বিভিন্ন ভালো দিকের কথা স্মরণ করে বিলাপ করে কাঁদতে নিষেধ করেছেন। জাহেলী যুগে নারীরা কাপড়-চোপড় ছিড়ে ফেলত, নখ দিয়ে মুখমণ্ডল আচড়াতো, চুল ছিড়ে ফেলত এবং নিজেদের ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করত।

ইমাম মুহাম্মদ তকী উদ্দীন (রহ) বলেনঃ এ কথা সকলের জানা যে নবী (সা) নিষ্পাপ। বাইআত হলো এক ধরনের চুক্তি। পূরুষরা নারীদের উপস্থিতিতেই রাসূল (সা) এর সাথে করমর্দন করত। রাসূল (সা) নারীদেরকে মুসাফা করা থেকে নিষেধ করেছেন। তাই পূরুষদের সাথে নারীদের (করমর্দন) করা হারাম। এমনকি রাসূল (সা) এর ইন্তেকালের পরবর্তী খলিফাগণও এ হারাম কাজের অনুসরণ করেন নাই। অতঃপর গায়র মুহরিম নারীদের সাথে পূরুষদের করমর্দন ইউরোপীয় খৃষ্টানদের থেকে আমদানি করা হয়। আর ইসলামী শরীয়ত আমাদেরকে তাদের বিরোধীতা করার নির্দেশ দিয়েছে। তারা শুধু মোসাফাহা করেই ক্ষান্ত থাকেনি বরং পেটের সাথে পেট লাগিয়ে নারী-পূরুষ নর্তন-কুর্দনে মত্ত থাকে। তাই যারা তাদের অনুসরণ করবে, তারা তাদের দলভূক্ত। রাসূল (সা) তাই বলেছেন।

অতএব মুসলিম নারী গায়র মুহরিম কোন পুরুষকে তার শরীরের কোন অঙ্গপ্রতঙ্গ স্পর্শ করার অনুমতি দিবে না। না হাত না অন্য কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এটা তার আবশ্যকীয়  দায়িত্ব। তবে সে যদি অসুস্থ হয় এবং নারী ডাক্তার না পাওয়া গেলে চিকিৎসার খাতিরে  পুরুষ ডাক্তার তার শরীর স্পর্শ  করতে পারবে। দুলাভাই, দেবর, চাচাতো মামাতো, ফুফাতো, ও খালাতো ভায়েরা গায়র মুহরিমের পর্যায়ভূক্ত।

আল্লাহ আমাদেরকে তার নির্দেশ মোতাবেক কাজ করা এবং তিনি ও তাঁর  রাসুল মুহাম্মদ (সা) যা থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করার তাওফীক দান করুন। বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর জন্যেই সকল প্রশংসা।

আল হিজাব

শায়েখ মুহাম্মদ ইবন সালিহ ইব্ন উসাইমীন

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর। আমরা তার প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি কাজ কর্ম ও অন্তরের অনিষ্টতা থেকে তাঁর আশ্রয় চাই। তিনি যাকে হেদায়েত দেন তাকে কেউ পথহারা করতে পারে না। আর যাকে গোমরাহী করেন তাকে কেউ সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে না। সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তিনি ছাড়া কোন বিধান দাতা নেই, তার কোন  অংশীদার নেই, মুহাম্মদ (সা) তার প্রিয় বান্দা ও রাসূল, লাখো-কোটি দুরুদ ও সালাম মানবতার মুক্তির দূত মহানবী (সা), তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরাম এবং যারা উত্তমভাবে তার আনীত বিধানের পাবন্দি করেন তাদের প্রতি। অতঃপর কথা হলো  

আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ (সা) কে হেদায়েত ও সত্য দীন সহকার প্রেরণ করেছেন। তিনি মানব জাতিকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনবেন-প্রশংসিত, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর পথে বের করে আনবেন। আল্লাহ তাকে তাঁর দাসত্বের বাস্তবায়নের জন্যে প্রেরণ করেছেন। আর দাসত্ব হলো তার আদেশাবলী পালন ও নির্দেশাবলী বর্জন করতঃ পরিপূর্ণভাবে তার আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করা এবং এসব কিছুকে কুপ্রবৃত্তির কামনা-বাসনার উপর প্রাধান্য দেওয়া।

মহান আল্লাহ তাকে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলীর পূর্ণতাদানকারী, সকল প্রকার উপায়-উপকরণ প্রয়োগের মাধ্যমে এ পথে আহবানকারী, খারাপ চরিত্র বিনাশ সাধনকারী ও তার থেকে ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাই তাঁর আনীত শরীআত সার্বিকভাবে পূর্ণতা লাভ করেছে। এই শরীআতের পূর্ণতা ও সুবিন্যস্তকরণের জন্যে কোন মানুষের প্রয়োজন নেই। এই শরীআত সর্বজ্ঞাত, প্রজ্ঞাময়-আল্লাহর পক্ষ থেকে আনীত। বান্দার জন্যে যা কল্যাণকর সে ব্যাপারে তিনি সর্বাধিক অবগত এবং তাদের প্রতি পরম দয়ালু।

যে মহৎ গুনাবলী নিয়ে রাসুল (সা) এ ধরাধামে আগমন করেছেন লজ্জাশীলতা তন্মধ্যে অন্যতম একটি। রাসুল (সা) লজ্জাশীলতাকে ঈমানের শাখা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শরয়ী ও প্রথাগতভাবে আদিষ্ট লজ্জাশীলতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে নারীর লজ্জাশীলতা এবং জন্মগত স্বভাব চরিত্র তাকে ফিতনা ও সন্দেহের স্থান থেকে দুরে রাখে। একজন নারীর মুখমন্ডল ও শরীরের অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থানসমূহ ঢাকার মাধ্যমে পর্দা করা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় লজ্জাশীলতার পরিচায়ক। তাই নারী তা পালন করা এবং এ ভূষণে নিজেকে ভূষিত করবে। এর মাধ্যমে সে নিজের সতীত্ব রক্ষা করতে পারবে। পারবে ফিতনার স্থান থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে।

ওহী-রিসালাত নাযিলের দেশে, শালীনতা ও  লজ্জালীতার এই পূর্ণভূমিতে লোকজন এ সকল বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। নারীরা বড় চাদর কিংবা এজাতীয় পোশক পরিধান করে ঘর থেকে পর্দাসহকারে বের হতো। তারা গায়ের মুহরিম পুরুষদের সাথে মিশত না। আল হামদুলিল্লাহ, সৌদি আরবের প্রায় সকল শহরে-নগরে বর্তমানে সেই একই অবস্থা বিরাজ করছে। তবে যারা পর্দা করেনা, বেপর্দা যাদের কাছে কোন সমস্যা বলে মনে হয় না, তারা এ বিষয়ে অনেক কথা, অনেক দর্শন দিয়েছেন, ফলে কতক লোকজন হিজাব ও মুখমন্ডল

ঢেকে রাখার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে বলতে শুরু করেছে যে পর্দা করা কি ওয়াজিব না  মুস্তাহাব? নাকি ঐতিহ্য ও প্রথাগতভাবে অনুসৃত কোন কিছু, যার উপর সত্ত্বাগতভাবে না ওয়াজিব, না মুস্তাহাবের হুকুম বর্তায়? এই সন্দেহ সংশয়ের নিরসন ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনের লক্ষ্যে কলম ধরতে যাচ্ছি, যাতে উপরোক্ত বিষয়ে বিধান দেওয়া সহজ হয়। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যেন তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দেন এবং আমাদেরকে ঐ সকল হাদী ও হেদায়তপ্রাপ্তদের কাতারে শামিল করেন যারা সত্যকে সত্য জেনে অনুসরণ করার ও মিথ্যাকে মিথ্যা জেনে বর্জন করেছেন। একথা বলে আল্লাহর তাওফীক কামনা করে আমার আলোচনা শুরু করছি

প্রথমঃ পর্দা (হিজাব) ওয়াজিব সম্পর্কিত প্রমাণাদি

মুসলমানদের একথা জানা দরকার যে, গায়র মুহরিম পুরুষদের থেকে নারীর পর্দা ও মুখমন্ডল ঢেকে রাখা ফরজ। কুরআন, সুন্নাহ, বিশুদ্ধ বিবেচনা ও কিয়াস দ্বারা এর আবশ্যকতা প্রমাণিত।

পর্দা সর্ম্পকিত আল কুরানের দলিল

আল্লাহ বলেনঃ হে রাসূল (সা), মুমিনদেরকে বলুন- তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জ্বা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সূরা আন্ নূর ৩০-৩১)

উল্লেখিত আয়াত দুটিতে গায়র মুহরিম পুরুষ থেকে নারীর পর্দা ফরজ হওয়া বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে প্রমাণিত  

১। আল্লাহ মুমিন নারীদের লজ্জাস্থান হিফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। লজ্জাস্থান সংরক্ষণ সম্পর্কিত নির্দেশটি লজ্জাস্থান হেফাজতের উপায় উপকরণকেও শামিল করে। মুখমন্ডল ঢেকে রাখা লজ্জাস্থান হেফাজতের অন্যতম একটি উপায়। এ ব্যাপারে কোন বিবেকবান ব্যক্তির সন্দেহ থাকতে পারেনা। কারণ মুখ খোলা রাখলে তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি চলে যায়, তার সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে এবং এর মাধ্যমে স্বাদ আস্বাদন করে। অতঃপর সে তার কাছে যায়, তার সাথে মিলিত হয়। হাদীস শরীফে এসেছেঃ দুচোখ যিনা করে। তাদের যিনা হলো নজর দেওয়া। আর লজ্জাস্থান একে হয় সত্য বলে গ্রহণ করে, নয় মিথ্যা বলে বর্জন করে। তাই মুখমন্ডল ঢাকা লজ্জাস্থান হেফাজতের অন্যতম মাধ্যম হওয়ার কারণে এ অঙ্গটি ঢেকে রাখা ফরজ।

২। আল্লাহর বাণী আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে খিমার বা ওড়না হলো যার দ্বারা নারী তার মাথা এবং মুখ ঢেকে রাখে যেমন ঘোমটা। সে যেভাবে ওড়না দ্বারা বক্ষ ঢাকার ব্যাপারে আদিষ্ট, তেমনি মুখমণ্ডল ঢাকার ব্যাপারেও আদিষ্ট। কারণ নারীর যখন বক্ষ ও গলা ঢাকা ফরজ, তখন মুখ ঢাকার বিষয়টি অতিউত্তম ভাবেই ফরজ সাব্যস্ত হয়। কারণ চেহারা হলো সম্মোহন ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি। মানুষ কারো সৌন্দর্য জানতে চাইলে তার চেহারা সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করে। চেহারা সুন্দর হলে তারা অন্যকিছুর দিকে গুরুত্বের সাথে তাকায় না। তারা বলে  অমুকের বেটী  সুন্দরী। একথার দ্বারা তারা কেবল চেহারা সুন্দর হওয়ার কথাই বুঝায়। তাই চেহারা হলো দেখাশুনাসহ সবদিক বিবেচনায় সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু। বিষয়টি যদি তাই হয়ে থাকে তবে ইসলামী শরীআত বক্ষ ও গলা ঢাকার নির্দেশ দিবে আর মুখমন্ডল উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করবে এরূপ বুঝা কি সঠিক হবে?

৩। আল্লাহ তায়ালা সাধারণভাবে সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। তবে যা সাধারণত প্রকাশমান, সে সৌন্দর্য ব্যতীত। পরিধেয় বস্ত্রের সৌন্দর্যের ন্যায় এ সৌন্দর্য অত্যাবশ্যকীয়ভাবে প্রকাশ পায়। একারণেই আল্লাহ বলেছেন, “তবে যা সাধারণত প্রকাশমান তা ব্যতীত আল্লাহতায়ালা এভাবে বলেননি যে, অর্থৎ তারা সৌন্দর্য থেকে যা প্রকাশ করে। অতঃপর দ্বিতীয় ধাপে কতিপয় নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্যের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। একথা প্রমাণ করে যে দ্বিতীয় সৌন্দর্য প্রথম সৌন্দর্য নয়। অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকারের সৌন্দর্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রথম প্রকারের সৌন্দর্য হলো এমন বাহ্যিক সৌন্দর্য যা সকলের সামনে প্রকাশ পায়, যা গোপন করা সম্ভব হয় না। আর দ্বিতীয় প্রকারের সৌন্দর্য হলো এমন গোপন সৌন্দর্য যা বিশেষ কতিপয় ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের সামনে প্রকাশ করা জায়েয নয়। এই প্রকার সৌন্দর্যের স্রষ্টা আল্লাহ হতে পারেন। যেমন মানুষের চেহারা, কিংবা মানুষও হতে পারে যেমন আভ্যন্তরীণ পোশাকের সৌন্দর্য, যা দ্বারা নারী নিজেকে সজ্জিত করে। যদি এই সৌন্দর্য প্রদর্শন সবার সামনে জায়েয হতো তবে এব্যাপারে প্রথমে সাধারণ হুকুম এবং দ্বিতীয় বার বিশেষ হুকুম আরোপ করা হতো না।

৪। কতিপয় ব্যক্তির সামনে নারীর গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে শিথিলতা প্রদর্শন করা হয়েছে। তারা হলো যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, তারা শুধু খেদমতে রত থাকে, নারীর গোপন সৌন্দর্যের ব্যাপারে কিছুই অবগত নয় এবং এমন বালক যার মধ্যে এখনও কুপ্রবৃত্তির তাড়না, কামনা-বাসনা জাগ্রত হয় না এবং নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ।

উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা নিম্নোক্ত দুটি বিষয় প্রমাণিত হয়। তাহলো  

প্রথমতঃ গোপন সৌন্দর্য উল্লেখিত দুই শ্রেণীর লোক ব্যতীত অন্য কারো সামনে প্রকাশ করা বৈধ নয়।

দ্বিতীয়তঃ এ বিধান আরোপের কারণ ও ভিত্তি হলো নারী ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফিতনার আশংকা। এতে কারো সন্দেহ নেই যে চেহারা হলো সৌন্দর্যের মোহনা এবং ফিতনার কেন্দ্রবিন্দু। তাই তা ঢেকে রাখা ফরজ। মুখমন্ডল ঢেকে চলাফেরা করলে চালাক চতুর, বুদ্ধিমান লোকেরা তাদের প্রতি যৌন লোলুপতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে না।

৫। আল্লাহর বাণী তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্যে জোরে পদচারণা না করে। অর্থাৎ নারী এমনভাবে হাটবে না যাতে তার পায়ের মল বা পায়ে পরিহিত অন্যান্য গহনারাজি সম্পর্কে মানুষ জেনে ফেলে। নারীর পায়ে পরিহিত মল, নূপুর ইত্যাদি গহনার আওয়াজে পুরুষের ফিতনার ভয়ে তাকে স্বজোরে পা ফেলে চলতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে কিরূপে মুখ খোলা রাখা তার জন্য জায়েয হবে?

পুরুষ এমন কোন নারীর পায়ের মল বা নূপুরের আওয়াজ শুনলো যার সম্পর্কে, যার সৌন্দর্য সম্পর্কে সে কিছুই ভাবে না। সে কি ষোড়শী যুবতী না অতিশয় বৃদ্ধা, নাকি সুন্দরী রমণী না কুৎসিত-কদাকার তার কিছুই জানে না। অন্যদিকে সে একজন সুন্দরী নারীর দিকে দৃষ্টি দিল, যার চেহারায় তারুণ্য, সজীবতা, সৌন্দর্যতা ও কমনীয়তা টগবগ করছে-এ যেন এক অস্পরা। যে তাকে ফিতনার দিকে তাড়িত করে এবং তার দিকে আবার দৃষ্টি দিতে আহ্বান করে। এই দুটি ফিতনার মধ্যে কোনটি অতি মারাত্মক? যে সকল পুরুষের নারী সম্পর্কিত বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রয়েছে তারা অবশ্যই জানেন যে উল্লেখিত দুটি ফিতনার মধ্যে কোনটি মারাত্মক এবং কোন অঙ্গটি সর্বাগ্রে ঢেকে রাখার দাবিদার।

দ্বিতীয় প্রমাণ

বৃদ্ধ নারী যারা বিবাহের আশা রাখেনা, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের বস্ত্র খুলে রাখে। তাদের জন্য দোষ নেই, তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সবর্জ্ঞ।        (সূরা আন নূর-৬০)।

আল কুরআনুল কারীমের উল্লেখিত আয়াতে যুক্তির দিকটি হলো  যে সকল বৃদ্ধানারী বয়সের আধিক্যতা ও তাদের প্রতি পুরুষদের আকর্ষণ না থাকার কারণে বিবাহের ইচ্ছা করে না। আল্লাহ তায়ালা ঐ সকল বৃদ্ধার কাপড় খুলে রাখার ব্যাপারে গুনাহ না হওয়ার কথা বলেছেন। তবে এশর্তে যে তারা এর মাধ্যমে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না। এখানে জানা আবশ্যক যে কাপড় খুলে রাখার অর্থ এই নয় যে তারা একবারে উলঙ্গ হয়ে থাকবে। বরং এখানে কাপড় খুলে রাখা দ্বারা এমন কাপড় খোলা উদ্দেশ্য যা তনুত্রাণ এবং এ ধরনের অন্যান্য বস্তুর উপর থাকে, যা অধিকাংশ সময় উন্মুক্ত রাখা হয়। যেমনঃ মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয়। বৃদ্ধা নারীদেরকে যে পোষাক খোলার ব্যাপারে শিথিলতার হুকুম আরোপ করা হয়েছে, তা হলো এমন বড় পোশাক যা দ্বারা সারা শরীর ঢেকে যায়। এসকল বৃদ্ধা নারীর সাথে উল্লেখিত হুকুম নির্দিষ্টকরণ প্রমাণ করে যে, যে সকল যুবতী নারীরা বিবাহের কামনা করে তারা এবিধানের ক্ষেত্রে তাদের বিপরীত করবে। যদি এ হুকুমটি কাপড় খোলা ও তনুত্রাণ বা এজাতীয় অন্য কিছু পরিধান জায়েযের ব্যাপারে সকলকে শামিল করত তাহলে উল্লেখিত হুকুমটি বৃদ্ধানারীদের সাথে খাস করা অসার ও অযৌক্তিক হতো।

যে যুবতী মেয়েরা বিবাহের কামনা করে তাদের উপর হিজাব ফরজ হওয়ার আরেকটি দলীল হলো, আল্লাহ তায়ালার এই বাণী। নারীর রূপসজ্জা, তার সৌন্দর্যের প্রকাশ, তার সৌন্দর্যে ব্যাপারে পর পুরুষদেরকে অবহিতকরণ এবং সৌন্দর্যের প্রশংসা ইত্যাদি আরো অনেক কিছু মুখমন্ডল উন্মুক্ত রেখে চলাফেরার কারণেই সে ইচ্ছা করে থাকে। অধিকাংশ সময় তাদের থেকে এটাই ঘটে থাকে। কতেকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। কিন্তু ব্যতিক্রম অবস্থা দ্বারা হুকুম সাব্যস্ত করা যায় না।

তৃতীয় প্রমাণঃ

আল্লাহর বাণীঃ হে নবী! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিন স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে খুব কমই চেনা যাবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দায়ালু। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন  আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারীদেরকে প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মাথার উপর দিয়ে বড় চাদর দ্বারা মুখমন্ডল ঢেকে এক চোখ খুলে রাখার নির্দেশ দেন। সাহাবায়ে কেরামের তাফসীর হুজ্জাত বা দলীল। কতেক ওলামায়ে কিরামের মতে সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্য মারুফ হাদিসের হুকুমের আওতাধীন।

আর ইবনে আব্বাসের বাণী এক চোখ খোলা রাখবে। পথ চলার রাস্তা দেখার প্রয়োজনে এই শিথিলতার হুকুম দেওয়া হয়েছে। বিনা প্রয়োজনে চোখ খোলার দরকার নেই।

জিলবাব  জিলবাব হলো ওড়নার চেয়ে বড় এক ধরনের চাদর। পুরুষদের পোশাক আবা (এক ধরনের ঢিলে-ঢালা পোশাক) এর মত। হযরত উম্মেু সালামা (রা) বলেন, জিলবাব সংক্রান্ত উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আনসারী মহিলাগণ কালো কাপড় পরিধান করে এত ধীরস্থির ও নীরবে বাড়ি থেকে বের হতো যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে। উবাইদা আস-সালমানী ও অন্যান্যদের থেকে বর্ণিত  মুমিন নারীগণ মাথার উপর দিয়ে বড় চাদর দেহের উপর এমনভাবে ঝুলিয়ে দিত যে পথ চলার রাস্তা দেখার  জন্য চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না।

চতুর্থ প্রমাণ

আল্লাহর বাণীঃ নবী-পতœীগণের জন্যে তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, নারী এবং অধিকারভুক্ত দাসদাসীগণের সামনে যাওয়ার ব্যাপারে গুনাহ নেই। নবী-পতœীগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয় প্রত্যক্ষ করেন।   (আল আহযাব - ৫৫)

ইমাম ইব্ন কাসীর (রহ) বলেন আল্লাহ তায়ালা গায়র মুহরিম পুরুষ থেকে নারীদেরকে পর্দার আদেশ দেওয়ার পর বললেন এ সকল আতœীয়-স্বজনদের (আয়াতেবর্ণিত) থেকে পর্দা আবশ্যক নয়। যেভাবে সূরা আননূরের নিম্নোক্ত আয়াত এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র ....তাদের ব্যতীত ও অন্য কারো কাছে সৌন্দর্য প্রকাশ না করে দ্বারা তাদের (আত্মীয়-স্বজন) থেকে পর্দা আবশ্যক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-কুরআনের উল্লেখিত চারটি যুক্তিপ্রমাণ দ্বারা গায়র মুহরিম পুরুষদের থেকে নারীর পর্দার আবশ্যকীয়তা জানা যায়। প্রথম আয়াতটি পাঁচ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা ফরজের যুক্তিপ্রমাণকে শামিল করেছে।

সুন্নাহ ভিত্তিক দলীল রাসূল (সা) থেকে পর্দা ফরজ সম্পর্কিত একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হাদিস নিন্মে তুলে ধরা হলো

প্রথমঃ  রাসূল (সা) বলেছেন

কোন নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে তার দিকে দৃষ্টি দিলে তোমরা গুনাহগার হবে না। সে তো কেবল তার দিকে বিবাহের প্রস্তাবের কারণেই দৃষ্টি দিয়েছে। যদিও মেয়েটি তা জানে না। হাদিসটি ইমাম আহমাদ (রহ) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন  এ হাদিসের বর্ণনাকারীগণ সবাই সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য।  হাদীস থেকে উদ্ভূত প্রমাণের দিক  রাসূল (সা) বিবাহের প্রস্তাবের নিয়তে বর কর্তৃক কনের দিকে দৃষ্টি দেওয়াতে গুনাহ হবে না বলে উল্লেখ করেছেন। একথা প্রমাণ করে যে বাগদত্ত ব্যতীত অন্য কেউ গায়র মুহরিম নারীর দিকে দৃষ্টি দিলে সর্বাবস্থায় গুনাহগার হবে। অনুরূপভাবে বাগদত্ত যদি বিবাহের প্রস্তাব ব্যতীত অন্য উদ্দেশ্যে কোন মেয়ের দিকে তাকায়, যেমন দৃষ্টিদানের মাধ্যমে জৈবিক স্বাদ উপভোগ করা। তাহলে বাগদত্তও গুণাহগার হবে।

যদি বলা হয়  বাগদত্ত কিসের দিকে দৃষ্টি দিবে হাদীস শরীফে তা উল্লেখ নেই। তাই বাগদত্তার বক্ষ ও গলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া উদ্দেশ্য হতে পারে।

উস্থাপিত প্রশ্নের জবাব  একথা সর্বজনবিদিত যে সৌন্দর্যের পূজারী বাগদত্তের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্যের লীলাভূমি মুখমন্ডলের সৌন্দর্য। অন্যসব সৌন্দর্য চেহারার অনুগামী। অধিকাংশ সময় এসব সৌন্দর্যের ইচ্ছা করা হয়না। বাগদত্ত কেবল কনের চেহারার দিকে তাকান। নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যের পূজারী হওয়ার কারণে এটাই সত্ত্বাগত উদ্দেশ্য।

দ্বিতীয়  রাসূল (সা) নারীদেরকে ঈদগাহে যেতে আদেশ দেন। তারা বললো, হে আল্লাহর রাসূল আমাদের একজনের জিলবাব (বড় চাদর) নেই। তার কি উপায় হবে? রাসূল (সা) বললেন  সে যেন তার বোন থেকে জিলবাব ধার নিয়ে পরিধান করে (বুখারী, মুসলিম)।

উল্লেখিত হাদিসটি প্রমাণ করে যে, মহিলা সাহাবীগণ জিলবাব পরিধান করা ছাড়া ঘর থেকে বের হতেন না। এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তাই জিলবাব না থাকার কারণে গৃহ থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। এ কারনে রাসূল (সা) তাদেরকে ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর তারা এ সমস্যার কথা ঊল্লেখ করলো। যার জিলবাব নেই সে তার বোন থেকে জিলবাব ধার নিয়ে ঈদগাহে আসবে। এ কথার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান দেন। নারী-পুরুষ সবাই ঈদগাহে যাওয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি নারীদেরকে জিলবাব পরিধান না করে ঈদগাহে আসার অনুমতি দেননি। তাহলে জিলবাব পরিধান না করে অনাদিষ্ট নিষিদ্ধ ও অপ্রয়োজনীয় কাজে উপরন্তু বাজারে গমন, গায়র মুহরিম পুরুষদের সাথে মাখামাখি ও খোশগল্পে মেতে উঠা ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যাপারে কিভাবে তাদেরকে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে? জিলবাব পরিধান সম্বলিত নির্দেশ দ্বারা পর্দার আবশ্যকীয়তা প্রমাণিত হয়। (আল্লাহ অধিক অবগত)।

তৃতীয়   হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন  রাসূল ফজরের সালাত আদায় করতেন। মুসলিম নারীরা নিজেদের চাদরাবৃত করে তার সাথে সালাতে অংশগ্রহণ করত। সালাত শেষে তারা বাড়ি ফিরে যেত। অন্ধকারের কারণে কেউ তাদেরকে চিনত না। আয়েশা (রা) বলেন, আমরা নারীদের যে অবস্থা দেখছি যদি রাসূল (সা) তা দেখতেন তবে অবশ্যই নারীদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন। যেভাবে বনি ইসরাঈলের মহিলাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। (বুখারী, মুসলিম)।

হাদিস থেকে গৃহীত যুত্তি প্রমাণ

১। পর্দার বিধান মেনে চলা মহিলা সাহাবীদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তারা কল্যাণ ও সম্মানিত যুগের অধিবাসী ছিলেন। সে যুগ ছিল আদব-আখলাকে সুউচ্চ, ঈমান ও সৎকর্মে পরিপূর্ণ। তারা আমাদের আদর্শ যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং সন্তুষ্ট হয়েছেন ঐ সকল লোকের প্রতি যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন  আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এরং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন কাননকুঞ্জ যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। তাই মহিলা সাহাবীদের অনুসৃত পথ পরিত্যাগ করে অন্যপথ গ্রহণ করা কি আমাদের জন্যে সমীচীন হবে? অথচ সে পথের অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন।

আর আল্লাহ তো বলেছেন  যে কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার কাছে সরল-সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কতইনা নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল।

১। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) (তারা আল্লাহর দীনের জ্ঞান-বুদ্ধি ও দূরদর্শিতায় এবং মানুষকে উপদেশদানে কতইনা চমৎকার ছিলেন) বর্ণনা করেন, নারীদের যে অবস্থা আমরা দেখছি, যদি রাসূল তা দেখতেন, তাহলে অবশ্যই নারীদেরকে মসজিদে আসা থেকে নিষেধ করতেন। সেই সম্মানিত জামানায় নারীদের অবস্থা রাসূল (সা) এর যুগ অপেক্ষা এত বেশি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল যার কারণে তাদেরকে মসজিদে আসা থেকে নিষেধ করার দাবি উঠেছিল। তাহলে তের শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার পর আমাদের এ যুগে নারীর অবস্থা কি হবে, যেখানে কাজের পরিধি ব্যাপকতা লাভ করেছে, লজ্জা-শরম হ্রাস পেয়েছে এবং অধিকাংশ মানুষের হৃদয়ে ধর্মীয় দুর্বলতা দেখা দিয়েছে?

হযরত আয়েশা ও ইবনে মাসউদ (রা) পরিপূর্ণভাবে শরয়ী রচনাবলী অনুধাবন করেছিলেন। তাদের মতে যে কারণে ভয়ের সৃষ্টি হয় তা নিষিদ্ধ।

৩। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে অহংকারের বশীভূত হয়ে টাকনুর নিচে কাপড় পরিধান করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তারদিকে (রহমতের) দৃষ্টি দিবেন না। হযরত উম্মেু সালামা (রাঃ) বললেন নারীরা তাদের আঁচলকে কিরূপে রাখবে? রাসূল (সা) বললেন এক বিঘত পরিমাণ ঝুলিয়ে দিবে। তিনি বললেন  তাহলে তো তাদের পা দেখা যাবে। রাসূল (সা) বললেন তারা এক হাত ঝুলিয়ে দিবে। এর চেয়ে বেশি করা যাবে না।

উক্ত হাদিস দ্বারা পা ঢাকা ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। হাদিসটি প্রমাণ করে যে পা ঢাকা ওয়াজিব। মহিলা সাহাবীগণের নিকট ও বিষয়টি জ্ঞাত ছিল। নিঃসন্দেহে পা, মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় অপেক্ষা কম ফিতনা সৃষ্টিকারী অঙ্গ। তাই সামান্য জিনিস দিয়ে সতর্ক করা ইহার উপর বস্তু এবং যা হুকুমের দিক থেকে তার থেকে শ্রেয় এমন বিষয়কে সতর্কতার নামান্তর। যে অঙ্গ কম ফেতনার উদ্রেক করে তা খোলা রাখাকে শরয়ী হুকুম অনুমোদন করে না। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর হিকমত ও শরীআতের সাথে অসম্ভব অসঙ্গতিপূর্ণ।

৫। রাসূল (সা) বলেছেন  যখন তোমাদের (নারী) কারো নিকট এমন মুকাতিব দাস থাকে যে তার নিকট পাওনা আদায় করে দিবে। সে যেন তার থেকে পর্দা করে। ইমাম তিরমিযী (রহ) হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন।

হাদিস থেকে উদ্ভূত যুত্তি প্রমাণ  এরূপ দাবী করা যায় যে দাসের সামনে মুনীবার চেহারা খোলা জায়েয, যতদিন পর্যন্ত দাস তার মালিকানাধীন থাকবে। কিন্তু সে তার মালিকানা থেকে মুক্ত হওয়ার পর তার থেকে মুনীবার পর্দা করা ফরজ। কারণ এখন সে গায়র মুহরিম হয়ে গেছে। এ কথা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, গায়র মুহরিম পুরুষদের থেকে নারীর পর্দা করা ফরজ।

৬। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন  আমরা ইহরাম অবস্থায় রাসূল (সা) এর সাথে ছিলাম, তখন যাত্রীদল আমাদের পার্শ¦ দিয়ে যাওয়া-আসা করত। যখন তারা আমাদের নিকবতী হত তখন আমাদের একজন মাথা ও চেহারায় বড় চাদর ঝুলিয়ে দিত। তারা চলে যাওয়ার পর আমরা মুখমন্ডলের চাদর খুলে ফেলতাম। (আহমদ, আবুদাউদ ও ইব্ন মাজাহ)

যখন তারা (যাত্রীদল) আমাদের নিকটবতী হত, তখন আমাদের একজন মাথা ও চেহারায় বড় চাদর ঝুলিয়ে দিত। আয়েশা (রা) এর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, মুখমন্ডল ঢাকা ওয়াজিব। কারণ ইহরাম অবস্থায় মুখমন্ডল খোলা রাখা শরীআত সম্মত। যদি সে সময় মুখমন্ডল খোলার পিছনে শক্তিশালী কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তবে তা অবশ্যই খোলা থাকত এমনকি যাত্রীদলের সামনেও।

পূর্ব বক্তব্যের পর্যালোচনা  অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে ইহরাম অবস্থায় নারীর মুখ খোলা রাখা ওয়াজিব। ওয়াজিবের বিরোধী কেবল আরেকটি ওয়াজিব হতে পারে। যদি গায়র মুহরিম পুরুষ থেকে পর্দা করা ও মুখ ঢাকা ওয়াজিব না হত তাহলে ইহরাম অবস্থায় মুখ খোলা রাখা, এ ওয়াজিব কাজটি ত্যাগ করা সহজ সাধ্য হত না, অথচ, বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদিসগ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে মুহরিম নারীকে (ইহরাম) নিকাব ও হাত মোজা পরতে নিষেধ করা হয়েছে। ইবন তাইমিয়া (রহ) বলেন  এ কথা থেকে প্রমাণিত হয় যে ইহরাম বাঁধে নাই এমন নারীদের মধ্যে নিকাব (ঘোমটা) ও হাত মোজা পরিধান প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তাই তাদের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় ঢেকে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভাব করা হয়।

গায়র মুহরিম পুরুষদের থেকে নারীর মুখমন্ডল ঢেকে রাখা ও হিজাব ফরজ হওয়ার ব্যাপারে হাদীস শরীফ থেকে ছয়টি দলিল পেশ করা হলো। তার সাথে আল কুরআন থেকে চারটি, মোট দশটি দলীল উপস্থাপিত হলো।

৩। কিয়াস ভিত্তিক দলীল

পরিপূর্ণ শরীআত কর্তৃক আনীত সুবিবেচনা ও প্রবল ধারণা। আর তাহলো কল্যাণ ও তার উপায় উপকরণের স্বীকৃতি, এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ এবং অকল্যাণ ও তার উপায় উপকরণসমূহের অস্বীকৃতি ও তার প্রতি ধিক্কার। তা যে সকল কাজ মৌলিকভাবে কল্যাণকর কিংবা তার অকল্যাণের উপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তা করার ব্যাপারে মানুষ আদিষ্ট, চাই তা হাঁসূচক হোক কিংবা পছন্দনীয় কাজ হোক। আর যে সকল কাজে মৌলিকভাবে অশুভ অকল্যাণকর কিংবা তার কল্যাণের উপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, এমন কাজ থেকে মানুষকে নিষেধ করা হয়েছে। চাই সে নিষেধাজ্ঞা তাহরীমা হোক আর তানবীহী হোক।

গায়র মুহরিম পুরুষদের সামনে নারীর মুখ খোলা ও বেপর্দা বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে দেখতে পাব যে, এর মধ্যে অসংখ্য-অগনিত অনিষ্টতা শিকড় গেড়ে বসে আছে। যদি তাতে কোন কল্যাণ অনুমান হয় তবে তা একেবারেই যৎসামান্য, যা অকল্যাণ ও অনিষ্টতার সাগরে নিমজ্জিত। বেপর্দা ও মুখ খোলা রাখার কতিপয় অকল্যাণকর দিক নিম্নে তুলে ধরা হলো  

১। ফিতনা: নারী তার চেহারাকে সুসজ্জিত ও মনোরম করার মাধ্যমে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলে এবং মনোমুগ্ধকর মুখাবয়বে নিজেকে প্রকাশ করে। একাজটি ফিতনা-ফাসাদ ও অনিষ্টতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

২। নারী থেকে লজ্জার বিলোপ: লজ্জা ঈমানের অঙ্গ এবং নারী স্বভাবের দাবী। লজ্জার ক্ষেত্রে নারীকে অনুপম দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বলা হয়  লোকটি অন্তঃপূরের কুমারীর চেয়ে অধিক লজ্জাশীল। লজ্জা বিলোপের কারণে নারীর ঈমাণে ঘাটতি দেখা দেয় এবং সে তার সৃষ্টিগত স্বভাব থেকে বেরিয়ে পড়ে।

৩। নারী কর্তৃক পুরুষ সম্মোহিত হওয়া  বিশেষ করে নারী যদি সুন্দরী-কামিনী, চটকদার, হাস্য-রসিক ও খেলতামাশা প্রিয় হয় তবে পুরুষ জাতি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। যেমনটি অধিকাংশ বেপর্দা নারীর মাঝে লক্ষণীয় বলা হয়

প্রথমে নজর তারপর মুচকি হাসি তারপর সালাম

অতঃপর কালাম, তারপর প্রমিজ অতঃপর মোলাকাত

শয়তান বনি আদমের রক্ত প্রবাহে চলাচল করে। এমন অনেক কথা, অনেক হাসি, অনেক আনন্দ যার দ্বারা পুরষ নারীর হৃদয়ে  এবং নারী পুরুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এই বন্ধনের মাধ্যমে এমন অনিষ্টতার জন্ম হয়েছে যার থেকে ফিরে আসা সম্ভব হয় না। এই অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা দরকার।

৪। পুরুষের সাথে নারীর মাখামাখি-দহরম-মহরম সম্পর্ক  নারী যখন মুখ খোলা ও বেপর্দা হয়ে চলাফেরার ক্ষেত্রে নিজেকে পুরুষদের সমকক্ষ মনে করে তখন তার মধ্যে লজ্জা-শরম থাকে না। সে পুরুষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হতে লজ্জাবোধ করে না। যার ফলশ্রতিতে অনেক মারাত্মক ফিতনা-ফাসাদের সূত্রপাত ঘটে।

একদা রাসূল (সা) মসজিদে যাচ্ছেন। পথিমধ্যে দেখলেন নারীরা পুরুষদের সাথে মিশে চলছে। অতঃপর রাসূল (সা) বললেন হে নারীরা তোমরা দেরী কর। তোমাদের রাস্তাকে কোলে নেয়ার দরকার নেই। রাস্তার পার্শ্বদেশ দিয়ে হেঁটে চলো। তারপর নারীরা দেয়াল ঘেঁষে এমনভাবে হাটত যে তাদের পোশাক দেওয়ালের প্লাষ্টারের সাথে লেগে যেত। ইমাম ইব্ন কাছীর ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে .....এ আয়াতের তাফসীরে উল্লেখিত হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।

শাইখুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া গায়র মুহরিম পুরুষদের থেকে নারীর পর্দা ফরজ হওয়ার ব্যাপারে তার আল ফাতাওয়া নামক গ্রন্থে বলেন  প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা সৌন্দর্যকে দুভাগে ভাগ করেছেন  বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং গোপন সৌন্দর্য। স্বামী ও মুহরিম পুরুষ ছাড়া ও অন্যদের সামনে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশ করা জায়েয। পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে নারীরা জিলবাব (বড় চাদর) পরিধান না করে গৃহ থেকে বের হতো। পুরুষরা তাদের চেহারা ও হস্তদ্বয় দেখত। সেই সময় তার জন্য মুখ ও হস্তদয় প্রকাশ করা জায়েয ছিল। হস্তদ্বয় ও মুখমন্ডল প্রকাশ করা জায়েয হওয়ার কারণে সে সময় তার দিকে দৃষ্টি দেওয়াও জায়েয ছিল।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা পর্দার নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন হে নবী! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয় (আল আহযাব-৫৯)। উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নারীরা পুরুষদের থেকে পর্দা করতে শুরু করে।

অতঃপর ইব্ন তাইমিয়া (রহ) বলেন  জিলবাব অর্থ হলো অবগুন্ঠন, বোরকা, নেকাব, চাদর। ইব্ন মাসউদ (রা) ও অন্যান্যরা একে চাদর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর সাধারণ নাম ইযার, এমন বড় চাদর যার দ্বারা মাথা সহকারে সারা শরীর ঢাকা যায়। তারপর বলেন তাদেরকে যাতে না চিনা যায় এ কারণেই জিলবাব পরিধান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর মুখমন্ডলের পর্দা করলে কিংবা নিকাব দ্বারা মুখ ঢেকে রাখলে তার চেহারা চিনা যায় না। মুখ ও হস্তদ্বয় গোপন সৌন্দর্যের পর্যায়ে পড়ার কারণে গায়র মুহরিম পুরুষদের সামনে তা প্রকাশ করা জায়েয হবে না। ফলে গায়র মুহরিম পরুষদের জন্যে নারীর বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়া অন্য কিছুর দিকে দৃষ্টি দেওয়া বৈধ রহিল না। দ্বিতীয় মতটি ইব্ন মাসউদ এবং প্রথম মতটি ইব্ন আব্বাস (রা) উল্লেখ করেছেন। তারপর বলেন  উল্লেখিত দুটি মতের বিশুদ্ধ মতে গায়র মুহরিম পুরুষদের সামনে তার হাত-পা ও মুখমন্ডল প্রকাশ করার অধিকার নেই। এটি এ সম্পর্কিত নসখের পরবর্তী বিধান দ্বারা সাব্যস্ত। উপরন্তু সে শরীরের পোশাক ছাড়া কিছুই প্রকাশ করতে পারবে না (আল ফাতাওয়া সর্বশেষ মুদ্রণ, পৃ. ১১০, খন্ড-২, মোট রচনাবলীর ২৩ তম খন্ড)।

উল্লেখিত খন্ডের (আল ফাতাওয়া) ১১৭ ও ১১৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে  গায়র মুহরিম পুরুষদের সামনে নারীর হাত-পা ও মুখমন্ডল প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে অন্যান্য নারী ও মুহরিম পুরুষদের সামনে প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়নি।

একই খন্ডের ১৫২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে  এ সম্পর্কিত বিধানের মৌলিকত্ব জানা দরকার। শরীআত প্রবক্তার এ বিষয়ে দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এক, নারী ও পুরুষের মাঝে পার্থক্য- করণ, দুই, নারীর পর্দা। এই হলো শায়খ ইব্ন তাইমিয়া (রহ) এর বক্তব্য নিুে চলমান বিষয়ে হাম্বলী মাজহাবের পরবতী ফোকাহায়ে কেরামের

মতামত পেশ করা হলো

আল মুন্তাহা গ্রন্থে বলা হয়েছে  গায়র মুহরিম নারীর দিকে নপুংসক, মাজবুব ও চোখমোদে যাওয়া ব্যক্তির দৃষ্টি দেওয়া হারাম। আল ইকনা গ্রন্থে বলা হয়েছে  পুরুষের ন্যায় নপুংসক বা খোজা ও মাজবুব ব্যক্তির গায়র মুহরিম নারীর দিকে তাকানো হারাম। উক্ত গ্রন্থের অন্য স্থানে বলা হয়েছে  ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাধীন গায়র মুহরিম নারীর দিকে নজর দেয়া জায়েয নেই। তার চুলের দিকে দৃষ্টি দেওয়াও হারাম।

মাতান আল দালীল গ্রন্থে বলা হয়েছে  নজর আট প্রকারের হয়ে থাকে।

প্রথমত  প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের প্রয়োজন ব্যতীত (যদিও সে মাজবুব হউক) প্রাপ্ত বয়স্কা স্বাধীনা গায়র মুহরিম নারীর দিকে দৃষ্টি। তার জন্য নারীর কোন কিছুর দিকে এমনকি তার চুলের দিকে দৃষ্টি দেওয়াও জায়েয নেই।

শাফেয়ী মাজহাবের ফোকাহায়ে কেরামের মতে  কুদৃষ্টিতে তাকালে কিংবা দৃষ্টিদানের মধ্যে ফিতনার আশংকা থাকলে সর্বসম্মতভাবে এ দৃষ্টি হারাম। কুদৃষ্টিতে না তাকালে কিংবা তাতে ফিতনার আশংকা না থাকলে এ ব্যাপারে শরহ আল ইকনা গ্রন্থে তাদের থেকে দুধরনের বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। বিশুদ্ধ মতে, এ অবস্থায়ও দৃষ্টি দেওয়া হারাম। (মিনহাজ) গ্রন্থে তাই উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইমাম শাফেয়ী মুখ খুলে গৃহের বাহিরে না যাওয়ার ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। কারণ নজর হলো ফিতনার সম্ভাব্য স্থান এবং কুপ্রবৃত্তির উত্তেজক।

আল্লাহ তায়ালা বলেন  মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে। ফিতনার দরজা বন্ধ করে দেওয়া এবং অবস্থার ব্যাপকতাকে পরিহার করা শরয়ী সৌন্দর্যাবলীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

নাইলুল আওতার (মুনতাকা আল আখবার গ্রন্থের ব্যাখ্যা গ্রন্থ) গ্রন্থে মুখ খোলা নারীদের গৃহের বাহিরে না যাওয়ার ব্যাপারে মুসলমানদের ঐক্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত পাপিষ্ঠদের সংখ্যা বেশি হলে মুখ খুলে গৃহের বাহিরে চলাফেরা করা যাবে না। তৃতীয়  মুখ খোলা রাখার পক্ষে মতামত প্রদানকারীগণের যুক্তি

যারা গায়ের মুহরিম নারীর মুখ ও হস্তদ্বয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া বৈধ মনে করেন, আমার জানা মতে তাদের মতের স্বপক্ষে কুরআন সুন্নাহের নিুোক্ত উদ্বৃতসমূহ দলীল হিসেবে পেশ করেছেন।

১। আল্লাহর বাণী  তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। এ বিষয়ে ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন  নারী যা প্রকাশ করতে পারবে তা হলো  মুখাবয়ব, হস্তদয় এবং আংটি। ইবনে আব্বাসের উক্ত বাণীটি আমাস, সাঈদ ইবন যুবাইর (রা) এর মাধ্যমে বর্ণনা করেন। আর সাহাবীদের তাফসীর হুজুত যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

২। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন  হযরত আসমা বিনত আবু বকর পাতলা কাপড় পরিধান করে রাসুলের কাছে আসলেন, রাসূল (সা) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে বললেন  হে আসমা! নারী প্রাপ্ত বয়স্কা হওয়ার পর তার এই অঙ্গ ছাড়া আর কিছু দেখা জায়েয নেই। এই বলে তিনি নিজের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয়ের দিকে ইংঙ্গিত করলেন। (সুনানে আবু দাউদ)।

৩। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন  তার ভাই ফজল বিদায় হজ্বের দিন রাসূল (সা) এর উটনীর পিছনে বসা ছিলেন। তখন বনি খাশআম গোত্রের একজন মহিলা আসল। ফজল তার দিকে তাকালেন, মহিলাটিও তার দিকে তাকালো। রাসূল (সা) ফজলের চেহারাকে অন্য দিকে ফিরিয়ে দিলেন। উক্ত হাদিস প্রমাণ করে যে, মহিলাটি মুখ খোলা অবস্থায় ছিল। (সহীহ আল বুখারী)

৪। হযরত জাবির ইব্ন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত ঈদের সালাত সংক্রান্ত রাসূল (সা) এর হাদিস। হাদিসটি নিম্নরূপঃ সালাত সমাপনান্তে রাসূল (সা) লোকদেরকে লক্ষ্য করে ওয়াজ নসীহত করলেন । অতঃপর মহিলাদের কাছে আসলেন। তাদেরকে লক্ষ্য করে ওয়াজ নসীহত করলেন। বললেন  হে নারী সম্প্রদায়! তোমরা সদকা কর। কারণ তোমাদের অধিকাংশই হলো জাহান্নামের ইন্ধন। তাদের মধ্য থেকে গাঢ় তামাটে রঙের কপোল বিশিষ্ট একজন নারী দাঁড়ালো ........... (বুখারী)। যদি তার চেহারা খোলা না থাকত তবে জানা সম্ভব হত না যে তার কপোল তামাটে রঙের। আমার জানা মতে উল্লেখিত দলীল কটিকেও গায়র মুহরিম নারীর মুখমন্ডল খোলা জায়েযের পক্ষে পেশ করা হয়।

মুখ খোলার পক্ষে পেশকৃত দলীলগুলোর প্রতিউত্তর  উল্লেখিত দলীলগুলো পূর্ব উল্লেখিত পর্দা ফরজ সংক্রান্ত দলীল গুলোর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তা দুভাবে হতে পারে  

১। মুখ ঢাকা সম্পর্কিত দলিল মূলকে বহন করে আর মুখ খোলা সম্পর্কিত দলীল সমূহ মূলকে হেফাজত করে। এক্ষেত্রে উসূল শাস্ত্রবিশারদদের নিকট মূলকে বহনকারী দলীল অগ্রগণ্য। কারণ আসল মানে হলো কোন বস্তু তার মূলের উপর অবশিষ্ট থাকে। তাই মূলকে বহনকারী দলীল মূলের উপর হুকুম আপতিত হওয়া ও পরিবর্তন হওয়া এতদুভয়ের প্রমাণ করে। এ কারণে আমরা বলতে পারি যে বহনকারীর সাথে অতিরিক্ত জ্ঞান থাকে। আর তাহলো মৌলিক হুকুম পরিবর্তন সাব্যস্তকারী। তাছাড়া হাঁবাচক বক্তব্য না বাচক বক্তব্যের উপর অগ্রগণ্য। এমনকি উল্লেখিত দৃষ্টিভঙ্গি সামগ্রিক ভাবে দলীল সমূহের সামঞ্জস্যতা মূল্যায়নেও সক্ষম হয়েছে।  ২। মূখ খোলা জায়েয সংক্রান্ত দলিল সমূহের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করলে দেখা যাবে যে সেগুলো নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত দলীলের সাথে সামঞ্জস্য রাখে না। নিম্নোক্ত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার আশা করা যায়।

প্রথমত ইবন আব্বাসের তাফসীরটিকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

ক) ইবন আব্বাস (রা) এর পেশ করা প্রথম তাফসীরটির উদ্দেশ্য পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ববতী অবস্থার উপর প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমনটা উল্লেখ করেছেন শায়খুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া। ইতোপূর্বে তাঁর কথা আলোচনা করা হয়েছে।

খ) এমন সৌন্দর্য উদ্দেশ্য হতে পারে যা প্রকাশ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। যেমনটা ইব্ন কাছীর স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এই দুধরনের সম্ভাবনাকে ইব্ন আব্বাস (রা) কর্তৃক পেশকৃত তাফসীর নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা সুদৃঢ় করে। আয়াতটি হলো  হে নবী! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিন স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। উল্লেখ্য, উক্ত আয়াতটি পর্দা ফরজ সংক্রান্ত তৃতীয় দলীল হিসেবে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ) যদি তার (ইবন আব্বাস) তাফসীরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উপরিউক্ত দুটি সম্ভাবনার কোনটিই না মানা হয় তবে তার তাফসীর আবশ্যকীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য দলীল হিসেবে পেশ করা যাবে না। হা,ঁ যদি অন্য কোন সাহাবী তার তাফসীরের বিরোধিতা না করেন, সে ক্ষেত্রে দলীল হওয়ার যোগ্যতা রাখে। যদি অন্য কোন সাহাবী তার বিরোধিতা করেন তবে দু সাহাবীর দলীলের মধ্যে সেটাই গ্রহণ করা হবে যেটাকে অন্য দলীল প্রাধান্য দেয়। ইব্ন মাসউদ (রা) ইব্ন আব্বাস (রা) কর্তৃক পেশকৃত তাফসীরের বিরোধিতা করেছেন। যেমন  ইবনে মাসউদ (রা) উক্ত আয়াতের তাফসীর করেছেন চাদর ও পোশাক দ্বারা। আর এগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। তাই দুজন সাহাবীর তাফসীরের মধ্যে অগ্রাধিকারের দিক খুঁজে এতদুভয়ের মধ্যে যেটি অগ্রাধিকার প্রাপ্ত সেটির উপর আমল করতে হবে আর হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসটি দুভাবে দুর্বল (জয়ীফ)।

১। খালিদ ইবনে দুরাইক হযরত আয়েশা (রা) থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, অথচ হযরত আয়েশার সাথে তার সাক্ষাত হয়নি। যেমনঃ ইমাম আবু দাউদ স্বয়ং হাদিসটির শেষে বর্ণনা করে বলেন  খালিদ ইবনে দুরাইক আয়েশা (রা) থেকে হাদিসটি শুনেননি। অনুরূপভাবে আবু হাতিম আল রাজি হাদিসটি রোগাক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

২। উক্ত হাদিসের সনদে দামেস্কের অধিবাসী সাঈদ ইব্ন বাশীর আন নাসরী নামক এক ব্যক্তি রয়েছেযাকে ইবন মাহদী মাতরুক বা পরিত্যক্ত বলেছেন। ইমাম আহমাদ, ইবনে মুঈন, ইবন আল মাদানী এবং ইমাম নাসায়ী তাকে দুর্বল বলেছেন। এ কথা প্রমাণ করে যে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসটি দুর্বল যা পর্দা ফরজ সংক্রান্ত সহীহ হাদিস সমূহের সমকক্ষ হতে পারে না।

তাছাড়া নবী (সা)-এর হিজরতের সময় আসমা বিনত আবুবকর (রা) এর বয়স ছিল সাতশ বছর। এই পরিণত বয়সে পাতলা কাপড় পরিধান করে মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় খোলা অবস্থায় রাসূল (সা)-এর নিকট এসেছিলেন যা সুদূর পরাহত ব্যাপার। এ ব্যাপারে আল্লাহ অধিক ভালো জানেন। যদি এ ঘটনাটিকে সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তবে তা অবশ্যই পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেকার। কারণ পর্দা ফরজ সংক্রান্ত দলীলসমূহ মূল বহনকারী। তাই তা অগ্রগণ্য।

৩। ইব্ন আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদিস একথা প্রমাণ করে না যে গায়ের মুহরিম নারীর দিকে দৃষ্টি দেয়া জায়েজ। কারণ রাসূল (সা) ফযল (রা)-এর কাজকে স্বীকৃতি দেননি। উপরন্তু তার চেহারাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাই ইমাম নববী (রা) সহীহ মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন  আমরা এ হাদিস থেকে যে ফায়দা পাই তাহলো গায়র মুহরিম নারীর দিকে দৃষ্টি দেওয়া হারাম।

হাফেজ ইব্ন হজর ফাতহুল-বারী গ্রন্থে উক্ত হাদিসের ফায়দা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন  এই হাদিস গায়র মুহরিম নারীদের দিকে দৃষ্টিপাত না করা এবং চক্ষুকে অবনমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইমাম আইয়্যাছ (রহ) বলেন  কেহ কেহ মনে করেন যে ফিতনার আশংকা না থাকলে নজর না দেওয়া ওয়াজিব নয়। তিনি আরো বলেন  রাসূল (সা) ফযল (রা) এর চেহারাকে ঢেকে দিয়েছিলেন। রাসূল (সা) এর এ কাজটি আমার কাছে তার কথা অপেক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তার দৃষ্টিকে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ করেছেন।

আর জাবীর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে ঘটনাটি কখন ঘটেছিল সে সময়ের উল্লেখ করা হয়নি। হতে পারে সেই মহিলাটি এমন বৃদ্ধা ছিল যে বিবাহের কামনা করে না। আর এমন মহিলার মুখ খোলা রাখা বৈধ। তাই এটা অন্যান্য নারীদের উপর পর্দার আবশ্যকতাকে নিষেধ করে না। কিংবা উক্ত ঘটনাটি পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার আগের। কারণ পর্দার বিধান সম্বলিত সূরা আল আহযাবের আয়াতসমূহ হিজরী ৫ম ও ৬ষ্ঠ বর্ষে অবতীর্ণ হয়। আর ঈদের সালাত প্রবর্তিত হয় ২য় হিজরীতে।

এখানে জেনে রাখা আবশ্যক যে আমরা হিজাবের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ের বিধান জানাতে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই আলোচনা দীর্ঘ করেছি। এ বিষয়ে বেপর্দার পক্ষাবলম্বনকারীগণ অনেক কথাই বলেছেন। তারা চিন্তা ও গবেষণার আলোকে এ বিষয়ের হক আদায়ে সচেষ্ট হননি। ন্যায়-ইনসাফের অন্বেষণে রত থাকা, কথা বলার পূর্বে সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, বিরোধপূর্ণ প্রমাণাদির ব্যাপারে বিচারকের আসনে আসীন হওয়া, ইনসাফের দৃষ্টিতে দৃষ্টি দেওয়া, জ্ঞানের আলোকে রায় দেওয়া, অগ্রাধিকারযোগ্য হওয়ার পরই কেবল দুপক্ষের যে কোন এক পক্ষকে প্রাধান্য দেওয়া, উপরন্তু সার্বিকভাবে হস্তগত প্রমাণাদির ব্যাপারে চিন্তা করা এবং দুমতের বক্তব্যের কোন একটির প্রতি বিশ্বাসী হয়ে উহার প্রমাণাদি সাব্যস্তকরণ ও অন্য মতের বক্তব্যটির দলীলকে ছোট ও হেয় জ্ঞান করার ক্ষেত্রে অতিশয্য ও বাড়াবাড়ি না করা একজন গবেষকের আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কারণেই জ্ঞানী-গুণীরা বলেছেন  কোন বিষয়ে বিশ্বাস যাতে অনুসৃত না হয়ে যুক্তিপ্রমাণের অনুগামী হয়, সে জন্যে বিশ্বাসের পূর্বে সে বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া জরুরী। কারণ কোন বিষয় অবহিত হওয়ার পূর্বে উক্ত বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন কখনো কখনো বিশ্বাসস্থাপনকারীকে তার বিশ্বাস বিরোধী কুরআন ও হাদিসের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান কিংবা প্রত্যাখ্যান সম্ভব না হলেও তাতে পরিবর্তন পরিবর্ধন সাধনে উদ্বুদ্ধ করে।

কতেক এমন আছে, যারা অনেক দুর্বল হাদিসকে সহীহ হাদিস এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার কারণে দলীল হিসেবে পেশ করা যায় না এমন অনেক সহীহ কুরআন- হাদিসের উদ্ধৃতিকে নিজেদের বক্তব্য প্রমাণিত করতে এবং বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ চাপিয়ে দেয়। এই নিজস্ব আকীদা-বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তিপ্রমাণ অনুসরণের অনিষ্টতা আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করছি।

হিজাব ফরজ নয়, এ সংক্রান্ত বিষয়ে জনৈক লেখকের একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম। তিনি তার মতের স্বপক্ষে রাসূল (সা) এর কাছে হযরত আসমা বিনত আবু বকর (রা)-এর আগমনের ঘটনা, যা সুনানে আবু দাউদে হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত হয়েছে তা দলীল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সেখানে আসমাকে লক্ষ্যকরে রাসূল (সা) বলেছিলেন  নারী প্রাপ্ত বয়স্কা হওয়ার পর তার শরীরের এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছাড়া আর কিছুই দেখানো জায়েয নয়। এই কথা বলে রাসূল (সা) নিজের হস্তদ্বয় ও চেহারা মোবারকের দিকে ইংঙ্গিত করেন। প্রবন্ধের লেখক হাদিসটি সঙ্গীহ

বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত বলে উল্লেখ করেছেন।

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি কিভাবে হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলে মতামত ব্যক্ত করলেন। অথচ হাদিসটি জয়ীফ (দুর্বল)। ইমাম আবু দাউদ হাদীসটিকে মুরসাল ও মুনকাতি দোষে দুষ্ট বলে বর্ণনা করেছেন। এতে সাঈদ ইবন বশীর আন নাসরী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। যার সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাহলে লক্ষ্য করুণ কিভাবে তিনি হাদিসটিকে মুতাফাকুন আলাইহি বললেন?। আসলে ব্যাপরটি এরূপ নয়। হয়তো তিনি মুত্তাকাফুন আলাইহি দ্বারা প্রসিদ্ধ পরিভাষা, যে হাদিস বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন তা বুঝাতে পারেন। কিন্তু তাঁদের দুজনের কেহই হাদিসটি বর্ণনা করেন নি। আর যদি তিনি মুত্তাকাফুন আলাইহি দ্বারা একথা বুঝাতে চান যে হাদিসটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে আলেমগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন, তবে বিষয়টি এরূপও নয়। কিভাবে তারা হাদিসটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করবেন অথচ ইমাম আবু দাউদ (রহ) হাদিসটিকে মুরসাল বলে উল্লেখ করেছেন। হাদিসটির একজন বর্ণনাকারীকে ইমাম আহমদ (রহ) সহ অন্যান্য হাদিস শাস্ত্রবিদগণ জয়ীফ (দুর্বল) সনাক্ত করেছেন। মূল কথা হলো প্রবন্ধকারের বিশ্বাসের প্রতি একপেশী মনোভাব ও অজ্ঞতাই তাকে এই বিপদাপদ ও ধ্বংসাত্মক কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইমাম ইবনুল কায়্যিম আল জাওজী (রহ) বলেন  

                   যে দুখন্ড কাপড় পরিধান করেও নগ্ন থাকে

                   লাঞ্ছনা অপমানে মৃত্যুমুখে পতিত হবে সে।

                   তার পরনে ছিল গন্ড-মূর্খতার পোশাক

                   গোড়ামীর পোশাক কতইনা নিকৃষ্ট পোশাক।

                   আর গৌরবের পোশাক নিয়ে আসে ইনসাফের বাণী

                   সে পোশাকে সজ্জিত কর স্কন্ধ আর দেহের পার্শ্বখানি।

যুক্তিপ্রমাণ অন্বেষণ ও পরিশুদ্ধকরণ এবং ইলম ছাড়া দ্রুত কথা বলার ক্ষেত্রে ত্রটি-বিচ্যুতি ও অক্ষমতা থেকে লেখকের সতর্ক হওয়া উচিত। অন্যথায় সে তাদের দলভুক্ত হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন  অতঃপর ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় জালিম কে হতে পারে যে ইলম ছাড়া মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না। (সূরা আনআম-১৪৪)

কিংবা সে যুক্তিপ্রমাণ ও মিথ্যা প্রতিপন্নকরণের উপায় উপকরণ অন্বেষায় ত্রুটি-বিচ্যুতি একত্রিত করে, যার উপর যুক্তিপ্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বিষয়টি একেবারে নিকৃষ্টতায় রূপান্তরিত হয়। তার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত বাণী প্রযোজ্য  ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কে বড় জালিম হতে পারে যে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে এবং তার আনীত সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই জাহান্নাম কাফিরদের বাসস্থান।

হে আল্লাহ। তুমি আমাদেরকে সত্যকে সত্য জেনে অনুসরণ করার এবং মিথ্যাকে মিথ্যা জেনে বর্জন করার তাওফীক দাও। পরিচালিত কর তোমার সরল সঠিক পূণ্যপথে। তুমি তো দয়াবান, দানশীল। লাখো কোটি দুরুদ ও সালাম তোমার পেয়ারা হাবীব নবী-মুহাম্মদ (সা), তাঁর পরিবার পরিজন ও সাহাবায়ে কেরাম এবং সকল উম্মতে মুহাম্মদীর উপর। তোমার কাছে এইতো মোদের মুনাজাত।

গায়ের মুহরিম নারীর সাথে একান্তে অবস্থান ও মোহাবিষ্ট মেলামেশা

ড. মুহাম্মদ ইবন লুতফী আস-সাব্বাগ

ভূমিকাঃ সকল প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। দুরুদ ও সালাম খাতামুন নাবীয়্যীন মুহাম্মদ (সা) এর উপর ,অতঃপর কথা হলোঃ

আমাদের দীনি ভাই জনাব মুহাম্মদ ইব্ন লুতফী আস সাব্বাগ কর্তৃক রচিত মূল্যবান সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা সম্পর্কে আমি অবহিত হয়েছি এবং সেটির আদ্যপান্ত শুনেছি। পুস্তকটি আমার কাছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উৎকৃষ্ট পূর্ণাঙ্গ বলে মনে হয়েছে। কুরআন-সুন্নাহর প্রমাণাদির ভিত্তিতে বেগানা গায়র মুহরিম নারীর সাথে একান্তে অবস্থান ও বেগানা পুরুষের সাথে মেলামেশা হারাম সংক্রান্ত আলোচনা বইটিতে স্থান পেয়েছে। তাছাড়া নারীর একান্ত অবস্থান ও অবাধ মেলামেশার কারণে সংঘঠিত ঘটনাবলী, তার ফলে সৃষ্টি অশুভ পরিণতি স্পষ্টভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এ সকল হীনকর্মকান্ড জাতিকে এক ভয়বহ অবস্থার সম্মুখীন করে। আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তাঁর জ্ঞান ও পথ নির্দেশনাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করুন। এই লেখনীর বাদৌলতে তাকে কল্যাণ দান করুন। আমাদের সকলকে হাদী, হেদায়েতপ্রাপ্ত ও তোমার পথের সত্যিকার দায়ী হিসেবে কবুল করুন। তুমি তো সর্বশ্রোতা ও সদানিকটবর্তী। দরুদ ও সালাম নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা), তাঁর পরিবার পরিজন ও সকল সাহাবায়ে কেরামের উপর।

সফরে থাকাকালে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখির চিন্তা করি। তখন আমার কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছিল না। পরবর্তীতে তার সাথে আরো তথ্য সংযুক্ত করি এবং পুস্তকাটির ভূমিকা লেখি। নিঃসন্দেহে উল্লেখিত বিষয়টির বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। কারণ সমাজে নারীর অবস্থান যে কোন জাতির স্বভাব চরিত্রকে প্রমাণ করে। তার অবস্থা, আচার-আচরণে সমাজের অভ্যাস রীতিনীতি ফুটে উঠে, নির্ধারিত হয় জাতির ভবিষ্যৎ।

মুসলমানরা আজ প্রতারিত। তাদের বড় একটি অংশ যারা নারীদের স্বতীত্ব হরণ করতে এবং তাদেরকে ফেতনা-ফাসাদ ও অশালীন কর্মকাণ্ডে জড়িত করার লক্ষ্যে এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। নারীরা আজ এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের শিকার। তার এ ব্যাপক ক্ষতির কারণে সমাজ হারিয়ে ফেলেছে তার ভারসাম্য, সুখ-সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ও শান্তি।

এ কারণে উক্ত পুস্তিকাটি কন্যা-যুবতীর প্রতি একজন পিতার উপদেশ স্বরূপ পেশ করছি। যা তাদেরকে ধ্বংসাতœক অবস্থা, চরম অপমান-অপদস্থতা এবং ইহ ও পরকালীন ধ্বংস ও পদস্খলনের ব্যাপারে সতর্ক করবে।

দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের জিন্দেগীতে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যা দেখছি, শুনেছি তার ভয়াবহ অবস্থা থেকে জাতিকে রক্ষা করাই আমার একমাত্র অভিপ্রায়।

মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে এক শ্রেণীর লোক ভয়ানক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আত্মসম্মানবোধ ও দীনদারী না থাকার কারণে তারা না আল্লাহকে ভয় করে, না ভয় করে অসম্মান-অপদস্থতাকে। তাদের না আছে স্ত্রী, না আছে কন্যা সন্তান। কৃতকর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবার দিনকে তারা ভয় করে না অন্যদিকে তাদের কতেকের স্ত্রী-কন্যা থাকলেও তাদের মধ্যে নেই কোন আত্মসম্মানবোধ, এমনকি কতেক প্রাণীর মধ্যে যে আত্মসম্মানবোধ রয়েছে তাও তাদের মধ্যে নেই।

আর আমাদের দীন আমাদের মা-বোন-কন্যাদেরকে একনিষ্ঠভাবে নসীহত করতে, দীনের অধিকারে সীমালঙ্ঘন করলে প্রতীক্ষিত ভয়ানক শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করতে উদ্বুদ্ধ করে।

পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশার জন্য গৃহ থেকে নারীকে বের করার আহ্বান টেনে নিয়ে এসেছে নানা দুঃখজনক ঘটনা ও বিপর্যয়। (১) প্রথমে নারীকে সামাজিক বন্ধনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ব্যাপারটি (নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা) আকর্ষণীয় ও দেদীপ্যমান অবস্থায় তুলে ধরা হয়। কিন্তু লাঞ্ছনা- বঞ্চনার মধ্যদিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। তাদেরকে করা হয় রাস্তার ঝাড়দার, মদ্যপদের দেহরক্ষিতা। এ অবস্থায় মিসরের বিখ্যাত দৈনিক আল আখবার পত্রিকায় প্রকাশিত এ সম্পর্কিত দুটি ঘটনা শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরা হলো

১। মিসরের জাকাজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের জনৈক ছাত্রকে তার সহপাঠিনী হত্যা চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মেয়েটি তার ভালোবাসার আবেদনে সাড়া না দেওয়ার কারণে সে মেয়েটিকে উক্ত অনুষদের অভ্যন্তরে ধারালো ছুরি দ্বারা কয়েকটি আঘাত করে। মেয়েটি মারাত্মকভাবে আহত হয়। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। ছাত্রটিকে গ্রেফতার করা হয়। (দৈনিক আল আখবার ১৭/১২/১৯৭৯ ইং)

২। আঠারো বছর বয়স্কা জনৈকা যুবতীকে তার বাবা নির্বাচনী প্রচারভিযানে পাঠায়। তিনি এক ডাক্তারকে তার মেয়ের গর্ভপাতকরণ ও তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। মেয়েটি আল কাছর আল আইনী নামক হাসপাতালে মমর্ষু অবস্থায় স্থানান্তরের পর মারা যায়। উপদেষ্টা শাকুর-তুরকী এর নেতৃত্বে আহমাদ হামাদাহ ও আনওয়ার আল জাবালীকে সদস্য করে গঠিত ফৌজদারী বিচারালয়ের সামনে নির্যাতনের শিকার মেয়েটির ভার্সিটি পড়য়া সহোদর বোন সাক্ষ্য দেয় যে তার বোন একজন স্বনামধন্য ডাক্তারের ক্লিনিকে পরিচারিকা হিসেবে কাজ করত, দীর্ঘ ছয় মাস যাবত ডাক্তারের সাথে তার বোনের সখ্যতা গড়ে উঠে এবং কুমারী অবস্থায় গর্ভবতী হয়ে পড়ে। গর্ভধারণের চার মাস বয়সে সে গর্ভপাত-করণের জন্য অন্য এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। ডাক্তার প্রথমে তাকে এই ঘৃণ্য কর্ম থেকে নিষেধ করে। কিন্তু পরক্ষণে আট পাউন্ডের বিনিময়ে কাজটি সেরে দেয়। কিন্তু মেয়েটি ভীষণ যন্ত্রনা অনুভব করতে লাগল। সে আবার ডাক্তারের শরনাপন্ন হলো। ডাক্তার তাকে আল কাছর আল আইনী হাসপাতালে ভর্তি করে এবং তার পেট থেকে অবশিষ্ট ভ্রমণ বের করে। তার পনের দিন পর মেয়েটি মারা যায়। আদালত ডাক্তারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারি করেন এবং তার কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। কারণ সে মানবতাকে লংঘন করে মেয়েটির গর্ভপাতের চেষ্টা করে।  (দৈনিক আল আখবার ১৯/০৪/১৯৭৮)            

নারী যে ভয়ানক কর্মে নিজেকে সঁপে দেয়, যা তার মান-সম্মান, সতীর্থ এমনকি জীবনকেও কেড়ে নেয়, তার বাস্তব প্রমাণ উল্লেখ স্বরূপ বর্ণিত ঘটনাটি তুলে ধরেছি।

তবে সেই যিনাখোর ডাক্তার ও পাপীষ্ঠ পিতা ও ঘটনার অন্যান্য দিক সম্পর্কে আদালতের রায় প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

এঅবস্থায় গৃহ থেকে বের হওয়া কখনো তার সতীত্বের জন্য হুমকি ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাড়ায়। এই বিভীষিকাময় অবস্থা থেকে জাতিকে পরিত্রাণের দায়িত্ব খোদাভীরু মুসলিম নর-নারীর উপর আপতিত হয়েছে। তাই জালিমদের কর্ণকুহরে পৌঁছে দিতে হবে কল্যাণের বাণী।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সামনে সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধর এবং তার অনুসারী বানাও। আর মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধর এবং তা পরিহার করার তোফিক দাও। বিশ্ব জাহানের রব তুমি, তোমার জন্যেই সকল প্রশংসা।

ইসলাম গায়র মুহরিম নারীর সাথে একান্তে অবস্থান ও নারী-পুরুষের মাঝের মোহাবিষ্ট মেলামেশাকে হারাম করে দিয়েছে। আমাদের সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোর ধ্বংস এবং আল্লাহর আজাব ও গজব অবতীর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ এ দুটি। তাই আমাদের স্ত্রী-কন্যাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা উচিত। আমাদের জেনে রাখা উচিত তাঁরা আমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। রোজ কিয়ামতে আল্লাহর সামনে আমরা তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হব। আল্লাহ তায়ালা বলেন  

মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, সাথে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে। (আত্তাহ্রীম-৬)

একে অপর থেকে নৈতিক মানে দৃষ্টি অবনমিত রাখতে হবে। এই অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে ইসলাম এহেন কর্মকাণ্ডকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। তাই নির্জনে অবস্থান হারাম। যদি পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ ও তাকওয়াবান ব্যক্তি কোন গায়ব মুহরিম নারীর সাথে একান্তে অবস্থান করে তাও হারাম। অনুরূপ মানব জাতির ইহ ও পরকালীন কল্যাণের বিবেচনায় মোহাবিষ্ট নারী পুরুষের মেলামেশকে হারাম করা হয়েছে। এই অবাধ মেলামেশা থেকে দূরে থাকতে পারলে হারাম কাজ থেকে বাঁচা যায়।

বর্তমান বিত্তবানদের এক শ্রেণীর মাঝে পুরুষদেরকে কাজের লোক হিসেবে বাড়িতে বাড়ির আভ্যন্তরীণ কাজ কর্ম সম্পাদন এবং তাদের সাথে নারীদের মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। গৃহের মালিক নিজের কাজে, কখনো বন্ধুর উদ্দেশ্যে কিংবা অন্য কোন কাজে বাড়ির বাহিরে অবস্থান করে। আর কর্মচঞ্চল, শক্তিশালী সুঠামদেহী কাজের ছেলেকে নিজের স্ত্রীর কাছে রেখে যায়। কখনো তারা দুজন ছাড়া বাড়িতে আর কেহ থাকে না। সে তাকে কাজের আদেশ করে, তাকে নিজের কাছে ডেকে আনে, আবার কখনো কোন কাজ থেকে নিষেধ করে। কাজের ছেলে তার হুকুমের তালিম করে তার ডাকে সাড়া দেয়। আর শয়তান তো বনি আদমের রক্ত প্রবাহে চলাচল করে। যখন কেউ কোন নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করে, শয়তান সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে হাজির হয়। শয়তান তার কাছে নারীকে প্রিয় করে তোলে আবার নারীর কাছে তাকে প্রিয় করে তোলে। অবশেষে তারা অপরাধে লিপ্ত হয়।

আর এ যুগে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অনেক উপকরণ রয়েছে। বিশেষ করে রেডিও, টেলিভিশন, টেপরেকর্ডার, ভিডিও, পত্র-পত্রিকা ও যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বই পুস্তক ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে। এই উপকরণ সমূহ মানুষের জৈবিক জীবনকে এক মহা অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কখনো কাজের ছেলে হয় সুদর্শন, আর গৃহের মালিক হয় বয়স্ক কুশ্রী কিংবা দৈহিকভাবে  দুর্বল অথবা বদমেজাজী, ঝগড়াটে স্বভাবের। এ অবস্থায় যদি তাদের মাঝে খোদা ভীতি না থাকে তবে কি-না ঘটতে পারে?

আজীজ মিসরের বাড়ীতে থাকাকালে হযরত ইউসুফ (আ) যে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন আল কুরআন আমাদেরকে তা অবহিত করেছে। তিনি এক চরম উত্তেজনাকর ফিতনার মুখোমুখি হয়েছিলেন।

আল্লাহ বলেন  আর তিনি যে মহিলার ঘরে ছিলেন ঐ মহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল এবং দরজাসমূহ বন্ধ করে দিল। সে মহিলা বললো  শুন! তোমাকে বলছি, এদিকে আস।যদি আল্লাহ তাকে রক্ষা না করতেন, তার দলিল প্রমাণ না দেখাতেন তবে ব্যাপারটি ভয়াবহ কুৎসিত হয়ে যেত।

অনুরূপভাবে পাশ্চাত্যের ধ্বজাধারীদের একশ্রেণী যারা আল্লাহকে ভয় করে না, হালাল-হারামের তোয়াক্কা করে না, তাদের মাঝে স্বামীর অনুপস্থিতি তার বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করা, নিজ গৃহে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া, তার সাথে বসে আনন্দ-ফুর্তি করা, আন্তরিকতা দেখিয়ে কথাবার্তা, রসিকতা করা ইত্যাদি অনেক অশ্লীল কার্যকলাপ ছড়িয়ে পড়েছে।

এই পর পুরুষদের সাথে নারীর একান্ত অবস্থান শরয়ীভাবে নিষিদ্ধ। বন্ধুু ও স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ততার যুক্তি দেখিয়ে কোন স্বামীর জন্য এরূপ সহনশীলতা দেখানো জায়েয নেই। এর পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। অসুস্থ হৃদয়ের অধিকারী, আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তিই কেবল এরূপ কাজে সন্তুষ্ট হতে পারে।

তার চেয়ে আরো মারাত্মক হলো নারীর একাকী কিংবা ড্রাইভার বা খাদেমকে নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া। নারীর একাকী ডাক্তারের কাছে যাওয়াও উপরোক্ত অবস্থার শামিল। তাদের মাঝে নিষিদ্ধ নির্জনতা বিরাজ করে। পেশাগত কারণে ডাক্তার তার শরীরের কতিপয় স্থান বিবস্ত্র করে। অতঃপর সে রোগিনীকে এত সীমাতিরিক্ত প্রশ্ন করে যা হারামের দিকে ধাবিত করে।

স্ত্রী কিংবা কন্যাকে গাড়ির ড্রাইভারের সাথে অবাধে চলাফেরা করার অনুমতি দেওয়া যেমনটা কতেকে করে থাকেন। এটাও হুকুমের দিক থেকে পর্বের অবস্থার কাছাকাছি। ড্রাইভার তাকে নিয়ে তার ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ায়। গাড়ির অভ্যন্তরে তাদের দুজনের মাঝে কোন ধরনের কথাবার্তা চলতে থাকে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।

অনুরূপভাবে নারী-পুরুষ মিশ্রিত পারিবারিক বৈঠকগুলোতে নারীরা সেজে-গুঁজে হিজাবকে পরিহার করে দেহের আকর্ষণীয় স্থানসমহ উম্মোচিত করে উপস্থিত হয়। এ যুক্তি দেখায় যে তারা তাদের বন্ধু। কখনো আবার ঐ বৈঠকগুলোতে অশ্লীল কথাবার্তা, ধ্বাংসাত্মক ক্রিয়া-কৌতুক, খেল-তামাশা এবং বিশেষ কার্যাবলীর প্রদর্শনী চলতে থাকে। এসকল কাজকে ইসলাম কখনই জায়েয করে না। এগুলো পারিবারিক অস্তিত্বকে পতন্মুখ করে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার প্রেম-ভালোবাসা, মিল মহব্বতকে ম্লান করে দেয়।

এই মোহাবিষ্ট মেলামেশার কারণে অনেক সংখ্যক পরিবারের পারিবারিক সহানুভুতিমূলক সম্পর্ক এবং পারিবারিক সৌহার্দ-সম্প্রীতি, মিল-মহব্বত ও ঐক্যতা ধ্বসে পড়েছে।

নারীদের সাথে মেলামেশাকারী ঐ সকল পুরুষের কেউ যখন তার স্ত্রীকে নিজের বন্ধুর সাথে ঠাট্টা-রসিকতা করতে দেখে, তখন তার মধ্যেও আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হতে পারে, সে উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। সে নিজের স্ত্রীকে এই বলে দোষী সাব্যস্ত করে যে সে তার বন্ধুর দিকে আনন্দভরা আবেগময় ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়েছে। ফলে এক সময়ের গড়ে উঠা প্রেম-ভালোবাসা ও পারস্পরিক বিশ্বস্ততার পরিবর্তে পারিবারিক পরিবেশে দানাবাঁধে নানা ঝগড়া-ফাসাদ ও পারস্পরিক নানা অভিযোগ। এই অবস্থা কখনো তাদের যৌথ জীবনকে তালাক ও পারিবারিক ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যায়। যদি এরূপ ধ্বংসাত্মক ফলাফলের সৃষ্টি নাও হয়, তবে এর প্রভাবে একটি চরম সংবেদনশীল ও ক্রমাগত নানা অভিযোগ তাদের নিত্য-দিনের কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়। তাদের জীবন থেকে সুখ সৌভাগ্য হয় তিরোহিত।

আমি শায়খ মোস্তফা আস সিবাঈ (রহ) এর আলোচনা থেকে কিছু কথা তুলে ধরতে চাই। তিনি  কতেক ইউরোপীয় গবেষকদের কিছু কথা তার আলোচনায় কোড করেছেন। যার অনুভব করার মত হৃদয় এবং শোনার মত শ্রবণ শক্তি আছে তার জন্য তাতে উপদেশ রয়েছে।

ড. মোস্তফা আস সিবাঈ (রহ) বলেনঃ ঐতিহাসিকভাবে পরিজ্ঞ্যাত যে, গ্রীক সভ্যতার পতনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শনে মাত্রাতিরিক্ততা এবং পুরুষদের সাথে তাদের অবাধ মেলামেশা। রোমানদের মাঝে পরিপূর্ণভাবে এ অবস্থা বিরাজ করেছিল। এ সভ্যতার গোড়ার দিকে নারীরা ছিল সুরক্ষিত, লাজুক-শালীন। যার ফলে তারা বিভিন্ন বিজয়াভিযানে জয়লাভ করেছে। সক্ষম হয়েছে তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের ভিতকে মজবুত করতে। অতঃপর নারীরা মাত্রাতিরিক্তভাবে সেজে-গুজে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বিভিন্ন  ক্লাব, সভা-সমিতি, সমাবেশ ও সাধারণ পরিষদে আসা-যাওয়া শুরু করলে পুরুষদের চারিত্রিক বিপর্যয় ঘটে। তারা যুদ্ধ করার মত শৌর্য-বীর্ষ ও যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং ভয়ানকভাবে তাদের সভ্যতার পতন তরান্বিত হয়।

অতঃপর তিনি উনবিংশ শতাব্দীতে  প্রকাশিত বিশ্বকোষ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ

রোমীয় নারীরা তাদের প্রতি স্বামীদের অনুরাগ-ভালোবাসার ন্যায় কাজ-কর্মে আসক্ত ছিল। তারা গৃহের কার্য সম্পাদনে রত থাকত। আর তাদের স্বামী ও বাপ-দাদারা যুদ্ধের মধ্যে ডুবে থাকত। গৃহের কার্য পরিচালনার পাশাপাশি তাদের গুরুত্বপুর্ণ কাজ ছিল চরকায় সুতা কাটা ও পশম বুনা।

অতঃপর খেল-তামাশা ও ভোগ-বিলাসের অপচ্ছায়া নারীদেরকে গৃহ থেকে বের হতে আহবান করে। তাদেরকে পুরুষদের সাথে আনন্দ-ফুর্তি ও পারস্পরিক পরিচয়ের সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়। অস্থি-পাজরের মাঝ থেকে মন উড়াল মারার ন্যায় তারা গৃহ থেকে বের হতে শুরু করল। আর এ সুযোগে পুরুষরা স্রেফ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নারীদের চরিত্রকে কলংকিত, পবিত্রতাকে কলুষিত এবং জীবনকে তছনছ করতে সক্ষম হয়। সবশেষে তারা বিভিন্ন নাচ-গানের আসরে উপস্থিত হতে শুরু করে এবং তাদের কর্তৃত্ব প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ ও অপসারণে তাদের প্রথম ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়। এ অবস্থায় কিছু দিন যেতে না যেতেই রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংসের অতল সাগরে তলিয়ে যায়।

অতঃপর বিশ্বকোষে বলা হয়, আমরাই প্রথম নয়, যারা দিন দিন নারীদের রূপসজ্জার প্রতি আসক্তি থেকে সৃষ্ট আমাদের চরিত্রের উপর মন্দ প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। আমাদের প্রতিথযশা লেখকগণ এই সংকটপর্ণ বিষয়ে নিজেদেরকে লিপ্ত রাখতে আহ্বান করেননি। বর্তমান সভ্যতাকে ধার দেওয়া এই মরণব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় কি-যা আমাদের দ্রুত স্খলনের ভীতি প্রদর্শন করছে? একথা বললেও অত্যুক্তি কর হবে না যে আমাদেরকে এক প্রতিষেধকবিহীন স্খলনের ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে।

লক্ষণীয় যে, ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ নিজ জাতিদেরকে নারীদের স্বাজ-সজ্জা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশার ফলে রোমানদের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে শুরু করে। লুইস বেরোল নামক একজন মহা পণ্ডিত রাজনৈতিক বিশৃংখলাশিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। নিুে তার কিছু তুলে ধরা হলোঃ

সকল যুগে সকল কালেই রাজনৈতিক কাঠামোর বিশৃংখলা লক্ষ্যণীয়। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলোঃ অতীতে রাজনৈতিক কাঠামোতে বিশৃংখলার যে সব কারণ ছিল, বর্তমানে ঠিক একই কারণসমূহ বিদ্যমান। আর তা হলো নারী, যাকে মহৎ গুণাবলী ধ্বংসের অন্যতম শক্তিশালী কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অতঃপর এই বিদ্বান ব্যক্তি প্রজাতান্ত্রিক রোমান শাসনামলের সাথে বর্তমান যুগ ও সভ্যতার জন্য হুমকীস্বরূপ আলামতসমূহের মাঝে তুলনা করতে গিয়ে বলেনঃ

প্রজাতান্ত্রিক রোমান শাসনামলের গোড়ার দিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গরা হরেক রকমের চঞ্চলামতি নারীদের সান্নিধ্যে বসবাস করত। এদের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গিয়েছিল। বর্তমান যুগের অবস্থা সেই যুগের ন্যায় হয়ে পড়েছে। বিলাসিতা ও সুখ-স্বাদের অন্তরালে মানুষ উম্মাদের ন্যায় নগ্ন ভালোবাসার জোয়ারে ঝাপিয়ে পড়ছে।

ইংরেজ লেখিকা লেডিকুক এলিকোপত্রিকায় বলেনঃ পুরুষরা নারীদের অবাধ মেলামেশার পথ সৃষ্টি করে। এ কারণেই নারী তার স্বভাব বিরোধী কামনা করে এই মাত্রাতিরিক্তি অবাধ মেলামেশার কারণে জারজ সন্তানের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এখানেই নারী জাতির এক মহা বিপর্যয় ঘটে।

অতঃপর বলেন  পাশ্চাত্য সভ্যতার উপর নগ্নতা সংশ্লিষ্ট বালা মসিবত দুরীভূত হচ্ছে আমরা সে কথা বলছি না। তবে তার থেকে যা লঘু হয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনার সময় এসেছে। সময় এসেছে লাখো লাখো নিষ্পাপ শিশুদেরকে হত্যা নিধনের হাত থেকে বাঁচাবার বিভিন্ন পন্থা-পদ্ধতি গ্রহণ করার। পাপী তো পুরুষরাই যারা কোমলমতি নারীদেরকে পাপের সাগরে নিমজ্জিত করেছে।

সন্তানের জনক-জননীগণ, তোমরা সামান্য কয়েক দিরহামের জন্যে মেয়েদেরকে কর্মশালায় নিয়োজিত কর না। ইতোঃপূর্বে তাদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তোমরা তাদেরকে পুরুষদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দাও। জানিয়ে দাও সেখানে ঘিরে সৃষ্ট সুপ্ত প্রতারণার পরিণতি। পরিসংখ্যান মতে যে সব স্থানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বেশি, সেখানে যিনা-ব্যভিচার ব্যাপক ও ভয়াবহভাবে দেখা দেয়। তোমরা কি দেখছ না যে জারজ সন্তানদের অধিকাংশের মা হলো বিভিন্ন কর্মশালা ও কারখানায় নিয়োজিত মহিলা শ্রমিক এবং গৃহের পরিচারিকা অনেক সম্ভ্রান্ত নারীও এই ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ডাক্তারগণ গর্ভপাতের ঔষধ প্রদান না করলে জারজ সন্তানের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দিগুণ হত। পরিস্থিতি আমাদেরকে এত হীনতা ও নীচতার দিকে নিয়ে গেছে, যা কল্পনা করাও সুদূর পরাহত। কোন নগর সভ্যতা পতনের এটাই সর্বশেষ পর্যায়।

ইসলাম নারীকে অপরাধে পতিত হওয়া, সন্দেহ ও অশ্লীলতার মুখোমুখি এবং অশালীনতা থেকে নিজেদের সতীত্বের হেফাজতের লক্ষ্যেই তাদের উপর হিজাবের বিধানকে ফরজ করে দিয়েছে। আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী একজন নারী আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করে গায়র মুহরিম। পুরুষের সামনে এ যুক্তি দেখিয়ে পর্দার বিধান না মানে যে সে তার খাদেম, ড্রাইভার, ডাক্তার, দর্জি, স্বামীর বন্ধু কিংবা ওস্তাদ। এরূপ কোন অবস্থাতেই নারীর জন্য হিজাবের বিধান লংঘন করা জায়েয নেই।

আল্লাহকে ভয় করে এমন ব্যক্তি নিজের স্ত্রী-কন্যাকে একজন গায়র মুহরিম পুরুষের সাথে একাকী থাকতে দিয়ে নিজে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনা। ইসলাম অপরাধ সংঙ্ঘটন ও তার উপকরণ থেকে নিষেধ করেছে। কারণ যে অপরাধের উপায় উপকরণের মধ্যে সীমালঙ্ঘন করে সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যে পশু সংরক্ষিত চারণভূমির আশ-পাশ ঘুরাঘুরি করে তাতে তার মুখ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

হযরত নুমান ইবন বাশীর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি রাসুল (রা) কে বলতে শুনেছি, হালাল হারাম স্পষ্ট। এতদুভয়ের মাঝে কতিপয় সন্দেহপূর্ণ বিষয় রয়েছে, অনেকে তা জানে না। যে সন্দেহ-সুবহাত থেকে বেঁচে রইল, সে দীনের ও নিজের মান-সম্মানের বিষয়ে দায় মুক্তি হতে চাইল। আর যে সন্দেহপূর্ণ কাজে পতিত হল, সে হারাম কাজে পতিত হল। সন্দেহপূর্ণ কার্য সম্পাদনকারী রাখালের ন্যায় যে সংরক্ষিত চারণভূমির পাশে পশু চরায়, পশু তাতে বিচরণ করার সম্ভাবনা থাকে। সাবধান! নিশ্চয়ই প্রত্যেক রাজা-বাদশার চারণভূমি রয়েছে। জেনে রাখ! আল্লাহর চারণভূমি তার হারামবস্তু। জেনে রাখ! দেহের মধ্যে একটি মাংসখণ্ড রয়েছে যা ভালো  হলে সারা দেহ ভালো হয়ে যায়। আর তা খারাপ হলে সারা দেহ খারাপ হয়ে যায়। আর তা হলো আত্মা।       (বুখারী, মুসলিম)

দুই ভাবে নারী পুরুষদের সাথে মিশে থাকে। সৎকর্মশীলদের অনেকেই তা অবজ্ঞা করে থাকেন। ইসলামী সমাজের অস্তিত্ব বিনাশকারী এই দুই কুঠার নিয়ে আলোচনা জরুরী হয়ে পড়ছে।

১। নারীদের সহশিক্ষা। শিক্ষাব্যবস্থার পরিধি সম্প্রসারিত হওয়ার পর ছাত্র শিক্ষকদের স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে সহশিক্ষায় তাদেরকে উদ্ভূদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। এই অশুভ প্রথার প্রবর্তন কারীরা নারীদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এর ক্ষতিকর দিকটা আমাদের বাস্তব জীবনে খুঁজে পাওয়া যায়, যার কিছু কিছু সংবাদ পত্র-পত্রিকায় দৃষ্টিগোচর হয়। নিঃসন্দেহে এর ফলে চরিত্র হয় কলুষিত, শিক্ষা ব্যবস্থায় নেমে আসে চরম অবনতি এবং শিক্ষা-দীক্ষা ভিন্ন অন্য খাতে শক্তি সামর্থ্য ব্যয়িত হয়।

মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্বর থেকে মরণব্যাধি সহশিক্ষা বাদ দিতে পারলে বাস্তবিক পক্ষে তা হবে আমাদের জন্য এক উন্নত পদক্ষেপ। এর অর্থ এই নয় যে আমরা নারী শিক্ষাকে নিষিদ্ধ করছি। পুরুষের ন্যায় নারীর শিক্ষা মৌলিক অধিকার। তবে তাপত-পবিত্র শরয়ী সীমানার মধ্যে হতে হবে। আমার এই সংক্ষিপ্ত বাণীর বাস্তবায়ন কামনা করছি। অন্ধ অনুকরণ, পরাধীনতা ও অপরিবর্তনীয় ধ্বংসযজ্ঞ যুগের পরিসমাপ্তি অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

আমাদের ছেলে-মেয়েদের চরিত্রের হেফাজত, অধিক হারে জ্ঞান অর্জন, সর্বোপরি আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সহশিক্ষা ব্যবস্থাকে বন্ধ করা একান্ত জরুরী।

২। কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে নারীদের মেলামেশা। অনেক ভালো মানুষ ও তাতে জড়িয়ে পড়ে। কাজটি যে শরীআত সম্মত নয়, এব্যাপারে কেউ তাদেরকে সতর্ক করছে না। এই অন্যায়-গর্হিত কাজটিকে তারা ঘৃণা করে না, এমনি কি অন্তর দিয়ে ও নয়। এই অনিষ্টকর্ম থেকে নিষেধ করা কিংবা তার বাড়াবাড়ি বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের অনেকেই তা করে না। কারণ সে এ অবস্থাকে শরীআত বিরোধী মনে করে না। তাদের কতেককে দেখা যায়, স্ত্রী-কন্যাদেরকে অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ব্যতীত মিশ্রিত পরিবেশে কর্মস্থলে পাঠায়।

হাঁ, নারীর কাজ-কর্মের অধিকার রয়েছে। আল্লাহর নিুোক্ত বাণী তারই প্রমাণ বহন করেঃ

পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার জন্য, আর নারী যা অর্জন করে সেটা তার জন্য।

কিন্তু তার কাজ-কর্ম শরয়ী বিধান মত হওয়া শর্ত। তাহলোঃ (১) তার কাজ কর্মে মোহাবিষ্ট মেলামেশা ও হারাম নির্জনতা থাকতে পারবে না। অন্যথায় তার কাজ তাকে ফিতনার দিকে নিয়ে যাবে। (২) তার কাজের প্রকৃতি পুরুষদেরকে সম্বোধন এবং তাদের সাথে কোমল বাক্য বিনিময় বিষয়কনা হওয়া, যাতে সে নিজের কাজের খাতিরে তাদের সাথে মিলিত না হয়ে পড়ে।

(৩) হিজাব পরিধান করতঃ শালীনভাবে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া।

নারীদের কাজের অনেক চমৎকার ক্ষেত্র রয়েছে। যেমনঃ শিক্ষা বিভাগ, ধাত্রীবিদ্যা ও নারী চিকিৎসা। সকল রোগের  জন্য আমরা বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার পাব তা কতই না সুন্দর।

মহিলা চিকিৎসকরা কেবল মহিলাদের চিকিৎসা সেবা দিবে।

এসকল কাজ-কর্ম শুধু নারীর জন্য কল্যাণই বয়ে আনে না বরং তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য ব্যাপক কল্যাণ বয়ে আনে।

তাহলে বুঝা গেল, পুরুষদের সংম্পর্শ থেকে দূরে থেকে কাজ করার ব্যাপারে শরীআত কর্তৃক কোন বাধা- নিষেধ নেই। বরং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন কল্পে এবং প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করে কাজ-কর্ম করা যেতে পারে।

গৃহের বাহিরে নারীর কাজ-কর্ম দাম্পত্য জীবনে গোলযোগ সৃষ্টি করে। একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। নারীর স্বভাবগত অবস্থা চায় তার কাজ-কর্ম গৃহের অভ্যন্তরে হউক। গৃহের কার্য সম্পাদন নারীর এক কঠিন দায়িত্ব। এ কার্য সম্পাদনের জন্যে প্রয়োজন পরিপর্ণ কর্মমুক্ত থাকা। বিশেষত যখন কোন শিশু সন্তান থাকে।

প্রয়োজন ছাড়া নারীর গৃহের বাহিরে কাজ কর্ম করা ক্ষতিকর ও চরম কষ্টদায়ক। ইতোপর্বে তা আলোচনা করা হয়েছে। কাজের প্রচণ্ড চাপে নারী দুর্বল হয়ে পড়ে। সে ক্রুদ্ধ ও উত্তেজনাকর অবস্থায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে। তখন সে না পারে স্বামীর কোন কথা না সন্তানের কোন কথা সহ্য করতে (১)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকুরীজীবী স্ত্রী এবং স্বামীর মাঝের সম্পর্ক একটা বৈষয়িক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাদের মাঝে অনেক সময় এমন মারাতœক মতবিরোধ দেখা দেয় যার ফলে তাদের মধ্যকার প্রেম-ভালোবাসা, সখ্যতা- হৃদ্যতায় ভাটা পড়ে। নারী যখন তার আয়ের কিছু অংশ দ্বারা স্বামীকে সাহায্য করে তখন স্বামী তার অভিভাবকত্ব ও দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলে। নারী বাড়ির বাহিরে থাকার কারণে গৃহের পরিচর্যা ও সন্তান লালনপালন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনা।

নারীরা কর্মস্থলে নিজেদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দেখতে পায়। ইউরোপ আমেরিকায় নারীকর্মচারীদের মানসিক চাপ এবং বাহ্যিক ভয়-ভীতি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে হাজারো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ বাহ্যিক অবস্থা ভয়ানকভাবে ব্যাপকতা লাভ করেছে। ভীতি প্রদশনের সম্পর্কিত শত শত ঘটনা, যার কবলে নারী শতশত পুরুষের মাঝে পতিত হয়েছিল।

গ্লোরিয়া আরো বললেন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্বেলনে এ অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে শত শত নারী তাদের কর্মজীবন নিশেষ হওয়ার কাহিনী তুলে ধরেছে। তারা যে সকল পুরুষের সাথে কাজ করত তাদের জৈবিক কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় তারা এর পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল।

(দৈনিক আল আখার ১১/১১/১৯৭৭)   

জেনেভাস্ত আল-আখবার পত্রিকার রিপোর্টার বলেন  বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞগণ প্রমাণ করেছেন নারীদের নারীত্বের কারণে কাজ কর্ম দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা বলেন  কাজ-কর্ম আকর্ষণীয় হওয়ার শর্ত ধরা হয়নি পরন্ড চৈন্তিক ও অফিস আদালতের কাজকর্ম এবং দায়িত্বশীলগণের মধ্যে ও সেই একই প্রভাব বিদ্যমান। তিনি আরো বলেন  কর্মস্থলে নারী মানসিক অবসন্নতায় ভোগে, যা পারিবারিক জীবনের উপর প্রতিফলিত হয়। তিনি দৃঢ়তার সাথে আরো বলেনঃ এসব কাজ-কর্ম নারীর জৈবিক কামনা-বাসনার উপরও প্রভাব ফেলে। সংবাদটিতে এ সর্ম্পকে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

(দৈনিকআল আখবার ২০/০৫/১৯৭৭)

কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ভয়াবহতা অবহিত করে আমাদের কন্যা সন্তানদের মাঝে এক্ষেত্রে অনিহা সৃষ্টি করা উচিত। শিক্ষিত হলেই যে নারী গৃহের বাহিরে কাজ করতে হবে বিষয়টি কিন্তু এমন নয়।

কন্যাসন্তানদের জ্ঞানের প্রসারতা বিবেকের পরিপক্কতা এবং নতুন মুসলিম মুজাহিদ প্রজন্ম গঠনে অংশগ্রহণের জন্য আমরা তাদেরকে শিক্ষিত করব। নিঃসন্দেহে এহলো এক মহাদায়িত্ব।

আমরা চারিত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং শ্রেষ্ঠত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বড় হচ্ছি। এই দাবী করে যারা নারীর একান্তে অবস্থান এবং পাপপূর্ণ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে হেয় জ্ঞান করে তাদের দৃষ্টান্ত হলো এমন কতিপয় লোকজনের ন্যায় যারা জ্বলন্ত আগুনের পার্শ্বে কিছু পরিমাণ গোলা-বারুদ রেখে তা বিষ্ফোরিত না হওয়ার দাবি করে। নিঃসন্দেহে এ হলো বাস্তবতাশূণ্য সুদূর পরাহত কল্পনা এবং জীবনের স্বভাব-প্রকৃতি, ঘটনাবলীর বিভ্রান্তি ও আতœপ্রলাপ বৈ-আর কিছুই নয়।

যারা বলে অবাধ মেলামেশা কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে, স্বভাবকে করে পরিশুদ্ধ-পরিচ্ছন্ন, যৌন মাতলামিকে করে অপসারিত এবং ফিতনা-ফাসাদ থেকে দূরে রাখে। তাদের এ জঘন্যতম মিথ্যা দাবি ইউরোপের যেকোন দেশ ভ্রমণকারীর কাছে অসারতা প্রমাণিত হয়েছে। যে ব্যক্তি তাদের এই দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে রয়েছে, সে এই মহাদেশের কোন দেশ ভ্রমণ করলে তাদের কথার অসারতা খুঁজে পাবে। নিঃসন্দেহে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা কু-প্রবৃত্তি ও লাম্পট্যতার অগ্নিশিখাকে প্রচন্ডভাবে প্রজ্জলিত করে। বাড়িয়ে তোলে ফিতনা ফাসাদ। এর দৃষ্টান্ত হলো সমুদ্রের পানি পানকারী তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির ন্যায়। সমূদ্রের পানি যার তৃষ্ণাকে কেবল বাড়িয়ে তোলে।

পাশ্চাত্য জীবনের একটি চিহ্ন শ্রোতাদের করকমলে তুলে ধরা হলো। দৈনিক আস-সারক্ব আল আওসাত পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়  আমেরিকার ক্যালিফোর্ণিয়া রাজ্যের সান্তামুনিকা বিদ্যালয়ের জুফুতাস নামক উনিশ বছর বয়সী এক ছাত্র  তার ওস্তাদ জেমস বুনজি কে ক্লাস রুমে গুলি করে। তাৎক্ষণিক ভাবে আহত ব্যক্তির অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। যথাসময়ে পুলিশ প্রশাসন থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়  এক ছাত্রীকে ভালোবাসার প্রতিযোগিতার কারণে ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে সেই পূর্ব শক্রতার আগুন জ্বলে উঠেছিল।

অবাধ মেলামেশা নারীর কোন সম্মান বয়ে আনে না। নারী-পুরুষ মিশ্রিত বৈঠক সভা-সমিতিতে নারীর যে সম্মান প্রতিভাত হয়, তা প্রকৃতপক্ষে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও তিরস্কার করার নামান্তর। তারা নারীর দিকে ভোগের সামগ্রী মনে করে দৃষ্টি দেয়। নারী বৃদ্ধ হলে তারা কখনই তার প্রতি আগ্রহী হতনা অন্য দিকে ইসলাম এমন এক জীবন বিধান যা নারীকে তার উপযুক্ত মর্যাদা দিয়েছে। তাঁকে মাতা হিসেবে সম্মান, কন্যা হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ, স্ত্রী হিসেবে মর্যাদাদান এবং প্রতিবেশী ও মুসলিম বোন হিসেবে তাকে হেফাজত করা ফরজ করে দিয়েছে।

হে আমার প্রিয় কন্যাগণ ! হে নতুন প্রজন্মের কন্যারা! আমি তোমাদের সতর্ক করে বলছি,

পুরুষরা কেবল সেই নারীকে সম্মান করে যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, সতীত্ব এবং হিজাবকে শ্রদ্ধা করে। আর যে নারী সৌন্দর্য প্রদর্শন করে পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা করে তাকে সে খেল-তামাশার পাত্র মনে করে উপভোগ করার জন্য তার আশপাশে ঘুরাফেরা করে।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যারা পশ্চিমাদের জীবন ধারাকে ধার করে গ্রহণ করতে শুরু করে, তারা স্বজাতীয় চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারনা, মূল্যবোধ এবং প্রথা-ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হয়নি। নির্বোধ অধঃপতিত নষ্টাদের অবিরাম চেষ্টা সত্বেও জাতিকে তার ঐতিহ্য আদর্শ থেকে দুরে সরাতে পারেনি। পশ্চিমাদের কৃষ্টি-কালচার-সংস্কৃতি গ্রহণকারীরা কষ্ট বিপর্যয় এবং সার্বক্ষণিক দুঃখ-দুর্দশা-দুর্বিপাকে পতিত হওয়ার পর সে বাস্তবতা বুঝতে পেরেছে।

ইসলাম মৌলিকভাবে এই বিষয়টির পরিচর্যা করেছে  

১। চক্ষু অবনমিত করার ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে (আন্নুর-৩০)   

ইসলামী শরীয়াত গায়র মুহরিম নারীর দিকে দৃষ্টিকে এক প্রকারের যিনা বলে পরিগণিত করেছে। হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা) বলেনঃ বনি আদমের উপর জিনার অংশ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অবশ্যই, সে এটা অনুভব করে। দুচোখ দৃষ্টি দিয়ে, পা পদক্ষেপ ফেলে, হৃদয় কামনা-আকাংখা করে যিনা করে। আর লজ্জাস্থান এসব কাজের সত্যায়ন করে কিংবা মিথ্যা পতিপন্ন করে। (বুখারী, মুসলিম, আবুদাউদ, নাসায়ী)

আবু দাউদ শরীফের বর্ণনায় এসেছেঃ দুহাত যিনা করে তাদের যিনা হলো ধরা, দুপা যিনা করে, তাদের যিনা হলো হাটা, মুখ যিনা করে তার যিনা হলো চুমু দেওয়া। (১)

২। নারীর সাথে একান্তে অবস্থানের ব্যাপারে হারামের নির্দেশ এসেছে। যদিও সে হয় স্বামীর নিকটাত্মীয় তথাপি তার জন্য একান্তে সময় কাটানো হারাম।

হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন  মুহরিম নারী ছাড়া অন্য কোন নারীর সাথে কোন পুরুষ একান্তে অবস্থান করবে না (বুখারী মুসলিম)। হযরত উবাই ইবনে আমের (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেনঃ তোমাদের নারীদের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে সাবধান।

৩। মহানবী (সা) এর সহধর্মিনীদের সাথে অন্যান্য পুরুষদের সাথে সম্পর্কের সীমারেখা নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রে আল্লাহর কালামে এক মহাশিক্ষা ও পরিপূর্ণ উপদেশ রয়েছে। এ সম্পর্কিত আয়াতাবলী নিুে পেশ করা হবে। হেদায়েতের প্রত্যাশীদের জন্য এতে রয়েছে পরিপর্ণ উপদেশ। আল্লাহ বলেন  (আয়াত ও অর্থ ৭১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

আল্লাহ বলেন  হে নবীপতœীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকষর্ণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কু-বাসনা করে, যার হৃদয়ে ব্যাধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে। তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে, মুর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবেনা। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দুর করতে এবং তোমাদের পূর্ণভাবে পূত-পবিত্র রাখতে। আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভকথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সুক্ষèদর্শী, সর্ব বিষয়ে খবর রাখেন।

(আল আহযাব ৩২-৩৪)

আল্লাহ বলেনঃ হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য আহার্য রন্ধনের অপেক্ষা না করে নবীর গৃহে প্রবেশ করোনা। তবে তোমরা আহুত হলে প্রবেশ করো, অতঃপর খাওয়া শেষে আপনা আপনি চলে যেয়ো, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়োনা। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচবোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা তাঁর পতœীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসুলকে কষ্ট দেওয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তার পতœীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।   (আল- আহ্যাব ৫৩)

নবী (সাঃ) এর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতা। তাঁরা সম্মান ও মর্যাদার আসনে আসীন। তারা মুমিনদের জন্যে হারাম। তারা দ্বীনদারী ও তাকওয়ার সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করেছিলেন। তাঁদের গৃহসমূহে আল্লাহর বাণী ও হিকমত তেলাওয়াত করা হত। তাঁরা ওহী নাযিল এবং ইসলামী শরীআতের দুউৎস আল কোরআন ও আল হাদীসের জ্ঞানের প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করেছেন। আর সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন আদর্শ পুরুষ। কোন মানুষ কিংবা জাতি মর্যাদার যত উচ্চে আসীন হতে পারে, সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন তার সবচেয়ে উচু স্বরে। রাসুল (সাঃ) তাদের মর্যাদার সাক্ষ্য দিয়েছেন। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আল্লাহ বলেনঃ আর যারা সর্বপ্রথম হিজারতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তার প্রতি সন্তষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন কুঞ্জ যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণ সমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। (আত-তাওবা-১০০)

এতদসত্ত্বেও ঐ সকল সম্মানিত পুরুষদের সাথে নবীপতœীদের সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত আয়াতে কারীমায় এ আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। তাদেরকে নিজেদের উপর বড় চাদর ঝুলিয়ে দিতে, গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থান করতে, জাহেলী যুগের নারীর ন্যায় সৌন্দর্য প্রদর্শন না করতে, পুরুষদের সাথে কোমলভাবে কথা না বলতে, যাতে অসুস্থ হৃদয়ের অধিকারী-ব্যক্তির মাঝে কুবাসনা জাগ্রত হয় বরং তারা প্রয়োজনের তাগিদেই কথা বলবে ইত্যাদি বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এ সকল বিষয়ের সাথে সাথে সালাত কায়েম, যাকাত প্রদান এবং আল্লাহ তাঁর রাসুলের আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। নবী পরিবারের লোকজন থেকে অপবিত্রতাকে ধুয়ে মুছে ফেলতে এবং উত্তমভাবে তাঁদেরকে পবিত্র করার জন্যেই এ সকল কিছুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মুমিনগণ তাদের কাছ থেকে কোন সামগ্রী চাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে, তাদের ও এদের মাঝে ফারাক সৃষ্টিকারী পর্দার অন্তরাল থেকে তারা তাদের সাথে কথা বলবে। এ বিষয়ে মুমিনদেরকে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ এটা তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের  জন্যে অধিক পবিত্রতার কারণ।

অবশ্যই কেহ একথা বলবেনা যে ইহা মুসলিম নারীগণ ব্যতিত শুধু নবীপতœীদের জন্য খাস ছিল। এটা সকল মুসলমান থেকেই কাম্য, যে ভাবে তা নবীপতœীদের থেকে কাম্য হয়েছে। এটা দুভাবে হতে পারে।

প্রথমতঃ রাসুল (সাঃ) সকল মুসলমানের জন্যে আদর্শ। তাঁর কাজকর্ম হল সকলের অনুসৃত পথ। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্যে রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (মুহাম্মদ-২০) 

দ্বিতীয়তঃ নবীপতœীগণ ছিলেন দ্বীনের উপর অটল-অবিচল ও তাকওয়ার অধিকারিণী। তাদের মানসম্মান ও মর্যাদার আতিশয্যতা সকল সত্যবাদী মুমিনের নিকট স্বীকৃত। এতদসত্ত্বেও যখন আচার-আচরণ, চাল-চলনে তাদের থেকে এরূপ সতর্কতার দাবী করা হয়েছে, তখন অন্যান্য মুসলিম নারীদের এ সতর্কতাকে গ্রহণ করা সর্বাগ্রে আবশ্যক।

আমি মনে করি না যে আমার এ আলোচনা ভুল মতামতের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা থেকে মুক্ত। যাতে অনেকেই পতিত হয়। কেহ কেহ ইজতিহাদে ভুল করেন। তবে তাদের অধিকাংশই  স্বার্থপর ষড়যন্ত্রকারী। কারণ তারা যখন হাদীসের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত কোন ঘটনা দ্বারা দলীল পেশ করতে চান তখন উহাকে সাধারণ অর্থে প্রকাশ করেন। অথচ বর্তমান যুগ যে ধ্বংসাত্মক মহোবিষ্ট নারীর অবাধ মেলামেশায় নিমজ্জিত সে অর্থের প্রয়োগ না করে ঘটনাটিকে বন্দীদশায় রেখে দেয়।

তাদের মধ্যে কেহ কেহ পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিনে প্রবন্ধাবলী লেখেন। (১) অন্যরা আবার বিভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদের কথার উল্টো যুক্তি পেশ করেন। আমি এখানে তাদের মতামত রহিতকরণ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাইনি। মিথ্যা-অলীক কথার দিকে ইঙ্গিত করা এবং অধিকাংশ প্রবক্তাদের অশুভ উদ্দেশ্য উম্মোচন করাকেই যথেষ্ট মনে করছি। আল্লাহ সত্য বলেন। তিনি সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন।

হে আল্লাহর বান্দারা! সতর্ক থাক। আপতিত হওয়ার পূর্বেই বিপদাপদ, মহামারি তাড়িয়ে দাও, শয়তানের প্রতারণা ধোকা থেকে সতর্ক থাক। সে হলো আমাদের, আমাদের পরিবার পরিজন এবং সমগ্র জাতির সবচেয়ে বড় অনিষ্টকারী। দুনিয়া ও পরকালের সৌভাগ্য অর্জনে আল্লাহর আহবানে সাড়া দাও।

আল্লাহ বলেনঃ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য কর, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যাতে রয়েছে তোমাদের জীবন। জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষের ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। বস্তুতঃ তোমরা সবাই তারই নিকট সমবেত হবে। আর তোমরা এমন ফাসাদ থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষতঃ শুধু তাদের উপর পতিত হবে না যারা তোমাদের মধ্যে জালেম এবং জেনে রেখ যে, আল্লাহর আযাব অত্যন্ত কঠোর। (আল আনফাল ২৪-২৫)